আবার আগুন আবার প্রাণহানি

নিজস্ব বার্তা প্রতিবেদক : আবারও রাজধানীতে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড, আবারও বিপুল প্রাণহানি! পুরান ঢাকার চকবাজারের চুড়িহাট্টায় অগ্নিকাণ্ডে ক্ষত না শুকাতেই অভিজাত এলাকা বনানীর বহুতল এফআর (ফারুক-রূপায়ণ) টাওয়ারে গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। এতে সন্ধ্যা পর্যন্ত এক শ্রীলংকানসহ অন্তত ২৫ জন নিহত হন। দগ্ধ ও পড়ে আহত হয়েছেন কমপক্ষে ৭০ জন।নিখোঁজ রয়েছেন অনেকেই। ফায়ার সার্ভিসের ৫ ঘণ্টার চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আসার আগেই পুড়ে ছাই হয়েছে ২২ তলা ভবনটির চারটি ফ্লোর। নিহতের সংখ্যা আরও বাড়বে জানিয়ে গত রাতে ফায়ার সার্ভিসের ঢাকা বিভাগীয় উপপরিচালক (ডিডি) দেবাশীষ বর্ধন বলেন, ‘ভবনের ভেতরে উদ্ধার কাজ চলছে, সেখানে আরও কিছু মৃতদেহ আছে।’ এদিকে হতাহতের ঘটনায় শোক জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।গতকাল দুপুর পৌনে ১টার দিকে বনানীর কামাল আতাতুর্ক অ্যাভিনিউয়ের ২২ তলা এফআর টাওয়ারের সপ্তম তলায় আগুনের সূত্রপাত। বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট থেকে এ অগ্নিকা- বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে। ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের ২১টি ইউনিট প্রায় ৫ ঘণ্টার চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণ ও ভেতরে আটকাপড়া শতাধিক মানুষকে বের করে আনতে সক্ষম হয়। এর আগেই দগ্ধ ও ধোঁয়ায় আক্রান্ত এবং লাফিয়ে পড়ে আহত হয়ে মারা গেছেন শ্রীলংকার নাগরিক নিরশ ভিগমে রাজ (২৪), পারভেজ সাজ্জাদ (৪৭), আমেনা ইয়াসমিন (৪০), মামুন (৩৬), আবদুল্লাহ আল ফারুক (৩২), মাকসুদুর (৬৬) ও মনিরসহ (৫০) ২৫ জন। ঘন কালো ধোঁয়া, ভবন থেকে লাফিয়ে পড়ে এবং হুড়োহুড়ি করে নামতে গিয়ে আহত হয়েছেন অন্তত ৭০ জন। ফায়ার সার্ভিসের ছয় কর্মীও আহত হয়েছেন। সন্ধ্যা পর্যন্ত কুর্মিটোলা হাসপাতালে ১৫, ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ৬, ইউনাইটেড হাসপাতালে ১০, অ্যাপোলো হাসপাতালে ৯, সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে ৫ ও বনানী ক্লিনিকে ২ জন ভর্তি হয়েছেন বলে এসব হাসপাতাল-ক্লিনিক কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।এ অগ্নিকাণ্ড তদন্তে কয়েকটি তদন্ত কমিটি করা হয়েছে। এর একটি করেছে ফায়ার সার্ভিস। এ ছাড়া দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয় একটি, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় একটি এবং গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় আরেকটি কমিটি গঠন করেছে। এক প্রশ্নের জবাবে ফায়ার সার্ভিসের মহাপরিচালক (ডিজি) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সাজ্জাদ হোসেন বলেন, টাওয়ারের ভেতরে ফিনাইল বোর্ডের ডেকোরেশন ছিল। এর কারণে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে ও এর তীব্রতা বাড়ে। ফিনাইল বোর্ডসহ প্লাস্টিকের যেসব আইটেম আছে, সেগুলো ওয়ান কাইন্ড অব ফুয়েল। এগুলোতে আগুন লাগলে দ্রুত ছড়িয়ে যায় এবং তাই হয়েছে।এ ছাড়া ভেতরে অনেক ইলেকট্রনিকস যন্ত্রপাতি ছিল, বিশেষ করে কম্পিউটার, এসি ও আরও নানা কিছু। ফ্লোরে কার্পেট থাকার কারণেও আগুনের মাত্রা দ্রুত বাড়ে। আগুন ৮, ৯ ও ১০ নম্বর ফ্লোরে ছড়িয়েছে। ফায়ার সার্ভিসের পক্ষ থেকে তিন সদস্যের একটি কমিটি করা হয়েছে। প্রতিবেদন পাওয়ার আগে আগুনের উৎস বা ক্ষয়ক্ষতির সুনির্দিষ্ট তথ্য বলতে পারব না। আমাদের সার্চিং অপারেশন চলছে। ভেতরে ১০ থেকে ১২টি টিম ডিটেইলস সার্চ করছে। আগামীকাল (শুক্রবার) ১০টা পর্যন্ত তা চলবে। এর পর আমরা পুলিশের কাছে ভবনটি হস্তান্তর করব।তিনি আরও বলেন, প্রথম যাদের মৃত্যু হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে, তারা আগুনে পুড়ে মারা যাননি; ভয়ে লাফিয়ে পড়ে গুরুতর আহতাবস্থায় বিভিন্ন হাসপাতালে গেলে সেখানে মারা যান। আর পরে যাদের মরদেহ ভবনের ভেতর থেকে বের করা হয়, তারা সাফোকেশনে মারা গেছেন।রাতে শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত এ ঘটনায় নিখোঁজ ছিলেন ১৩ জন। আরও অনেকেই ঘটনার পর থেকে তাদের স্বজনকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না বলে জানিয়েছেন। তারা হলেনÑ রেজাউল করিম কাজী (৪২), হিরু (৫০), নজরুল ইসলাম (৫০), তানজির সিদ্দিক আবীর, মো. মোস্তাফিজুর রহমান (৪০), তানজির আবির, সালাউদ্দিন (৩০), নজরুল ইসলাম, জাফর আহমেদ, জসিম উদ্দিন, রেজাউল করিম রাজু, এসকে জেরিন বৃষ্টি (২৯) ও জেবুনেচ্ছা (২৭)। ঘটনার পর ওই ভবনে নানা কাজে থাকা ব্যক্তিদের স্বজনরা ভিড় জমান হাসপাতালগুলোয়।হতাহতদের দেখতে রাতে কুর্মিটোলা হাসপাতালে গিয়ে ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা প্রতিমন্ত্রী এনামুর রহমান বলেন, এফআর টাওয়ারে অগ্নিনির্বাপণের নিজস্ব কোনো ব্যবস্থা ছিল না। বিল্ডিংয়ের এমার্জেন্সি কলাপসিবেল গেট ছিল বন্ধ। সে কারণে উদ্ধার কাজ বিঘ্নিত হয়েছে। এ ছাড়া বিল্ডিংয়ের সিঁড়িও ছিল সরু।ভবনটিতে ওয়েভ গ্রুপ, হেরিটেজ এয়ার এক্সপ্রেস, আমরা টেকনোলজিস, ডার্ড গ্রুপ, মাইশা গ্রুপ ছাড়াও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের অর্ধশতাধিক অফিস রয়েছে। এ ছাড়া বেশ কয়েকটি রেস্তোরাঁও ছিল। ফায়ারের উপপরিচালক দিলীপ কুমার ঘোষও বলেন, এফআর টাওয়ারে কোনো অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা ছিল না। জরুরি বহির্গমন ব্যবস্থায়ও সমস্যা ছিল। এক প্রশ্নের জবাবে ফায়ারের উপপরিচালক (প্রশাসন) শামীম হাসান বলেন, একটি উঁচু ভবনে অগ্নিনিরাপত্তার যে ব্যবস্থা থাকা দরকার, তা এই ভবনে ছিল না। আগুন নেভাতে গিয়ে আমরা বারবার বাধার সম্মুখীন হয়েছি। আগুন নেভাতে ফায়ার সার্ভিসের কোনো ধরনের গাফিলতি ছিল না বলেও দাবি করেন তিনি।অগ্নিনির্বাপণ ও উদ্ধারকাজে ফায়ার সার্ভিসের সঙ্গে যৌথভাবে সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনী ছাড়াও অংশ নেয় রেডক্রস, রেড ক্রিসেন্ট, র‌্যাব, পুলিশ, ডিবি, আনসার এবং বেশ কিছু বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজের শিক্ষার্থীরা। অভিযানে অংশ নেয় বিমানবাহিনীর হেলিকপ্টার, নৌবাহিনীর ফায়ার ইউনিট ও র‌্যাবের ড্রোনও। আগুন নিয়ন্ত্রণে আসার পর ভবনের সব ফ্লোরেই তল্লাশি চালানো হয়। কেউ আটকা পড়ে থাকলে বা হতাহত থাকলে তাদের উদ্ধারে তল্লাশি অব্যাহত থাকবে বলে জানান ফায়ার সার্ভিস কর্মকর্তারা।অভিযোগ উঠেছে-ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা দেরিতে ঘটনাস্থলে পৌঁছানোয় আগুনের ভয়াবহতা ও মৃতের সংখ্যা বেড়েছে। আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে দীর্ঘ সময় লাগায় প্রশ্ন তুলেছেন অনেকে। অবশ্য বিপুলসংখ্যক উৎসুক মানুষের ভিড়ের কারণে ফায়ার সার্ভিস কর্মীদের ঘটনাস্থলে সরঞ্জাম নিয়ে যেতে বেগ পেতে হয়েছে। প্রতিটি দুর্ঘটনার মতো এ ঘটনাতেও গোটা এলাকা ঘিরে ভিড় করে থাকা মানুষ উদ্ধারকাজে সহযোগিতার পরিবর্তে মোবাইল ফোনে ছবি তোলায় ব্যস্ত ছিলেন। এ নিয়ে ফেসবুকেও ব্যাপক সমালোচনা দেখা গেছে। ফায়ার সার্ভিস কর্তৃপক্ষও এ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছে।ফায়ার সার্ভিসের ডিডি দেবাশীষ বর্ধন জানান, খবর পেয়েই ঘটনাস্থলে পৌঁঁছায় ফায়ার সার্ভিসের ৮টি ইউনিট। পরে যোগ দেয় আরও ১৩টি ইউনিট। তিনি বলেন, মূলত দুটি কারণে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে দেরি হয়েছে। আগুন নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য প্রচুর পানির প্রয়োজন। কিন্তু এক সময় পানির জোগান এবং তা যথাস্থানে দ্রুত সময়ে পৌঁছানো চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। এ কারণে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে বেশি সময় লাগে। তা ছাড়া ভবনটিতে প্রচুর দাহ্য পদার্থ রয়েছে। বেশিরভাগ তলায় বিভিন্ন অফিস। যেগুলোয় সাজসজ্জার কাজে সিনথেটিক ফাইবার ও ফোম ব্যবহার করা হয়েছে, যাতে আগুন ধরে গিয়ে প্রচুর ধোঁয়ার সৃষ্টি হয়। এ কারণেও আগুন নিয়ন্ত্রণে সময় বেশি লাগে। দেবাশীষ বর্ধন অভিযোগ করেন, উদ্ধার অভিযানে সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা ছিল উৎসুক জনতা। তাদের ভিড়ের কারণে আগুন নেভাতে বেশি বেগ পেতে হয়েছে উদ্ধারকর্মীদের।দুপুর ১২টা ৫৫ মিনিটের দিকে এফআর টাওয়ারের সপ্তম তলা থেকে অগ্নিকা-ের সূত্রপাত হয়। পরে এ আগুন ছড়িয়ে পড়ে পুরো ভবনে। ফায়ার সার্ভিসের তৎপরতার পাশাপাশি হেলিকপ্টার থেকে ভবনের ওপর বালু ফেলে আগুন নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চালানো হয়। এ ছাড়া ল্যাডার ইউনিট (বহুতল ভবন থেকে উদ্ধারকারী সিঁড়ি) ও মোটরসাইকেল ইউনিটও উদ্ধারকাজে অংশ নেয়। কাচে ঘেরা পুরো ভবনটির বাইরে থেকে কাচ ভেঙে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা ভেতরকার ধোঁয়া বের করে ল্যাডার দিয়ে আটকেপড়া মানুষকে উদ্ধার করে নিচে নামিয়ে আনেন। এর পর ভবনের নিচে রাখা বেশ কয়েকটি অ্যাম্বুলেন্স দিয়ে আহতদের হাসপাতালে পাঠানো হয়।প্রত্যক্ষদর্শী কয়েকজন জানান, ভবনের সপ্তম বা অষ্টম তলায় আগুন লাগে। এর পর তা ছড়িয়ে পড়ে নবম তলাতেও। অগ্নিকাণ্ডের পর ভবনের কাচ ভেঙে দেয়াল বেয়ে অনেকেই নামতে থাকেন। তখন পড়ে গিয়ে আহত হন বেশ কয়েকজন। অনেককে জানালা দিয়ে হাত বাড়িয়ে উদ্ধারের আকুতি জানাতে দেখা যায়। পরে ভবনের কাচ ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে তাদের উদ্ধার করেন উদ্ধারকারীরা।গৃহায়ণ ও গণপূর্তমন্ত্রী শ ম রেজাউল করিম বলেন, ওই ভবনে কোনো অনিয়ম আছে কিনা খতিয়ে দেখতে মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিবের নেতৃত্বে চার সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। ঘটনা সার্বক্ষণিক মনিটরিং করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিচ্ছেন বলে জানান তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ। ঘটনার পর পরই সেখানে ছুটে যান ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র আতিকুল ইসলাম, দক্ষিণের মেয়র সাঈদ খোকন, ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়া ও ফায়ার সার্ভিসের ডিজি। ঘটনাস্থলে দেখা যায় ডাকসুর ভিপি নুরুল হক নুরকেও। এফআর টাওয়ার আগুন লাগার পর পাশের দুটি ভবনে অবস্থিত দুরন্ত টেলিভিশন ও এফএম রেডিও টুডের সম্প্রচার সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়।কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল রফিকুননবী জানান, তার হাসপাতালে ৩২ জনকে নেওয়া হয়েছে। তাদের মধ্যে শ্রীলংকার নাগরিক নিরশ ভিগমে রাজকে মৃত ঘোষণা করা হয়। চিকিৎসাধীনদের মধ্যে গুরুতর দগ্ধ কেউ নেই। অধিকাংশই ধোঁয়ায় অসুস্থ হয়ে বা লাফিয়ে পড়ে আহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে তিনজনের মরদেহ ইউনাইটেড হাসপাতালে রাখা হয়েছে। ওই হাসপাতালেই আহতাবস্থায় ভর্তি হয়েছেন ১৯ জন।নিহত আবদুল্লাহ আল ফারুক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমবিএ করে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করছিলেন। চাঁদপুরের হাজীগঞ্জের ছেলে ফারুকের বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্ডটি পাওয়া গেছে তার পকেটে। নিহত নিরশ স্ক্যানওয়েল লজিস্টিক বিডির ইমপোর্ট ম্যানেজার ছিলেন। তার মৃত্যুর খবরে বাংলাদেশে নিযুক্ত শ্রীলংকান হাইকমিশনারসহ কর্মকর্তারা হাসপাতালে ছুটে যান।আইএসপিআরের সহকারী পরিচালক রাশেদুল ইসলাম খান জানান, অগ্নিকা-ের ঘটনায় আহত পাঁচজনকে সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) ভর্তি করা হয়েছে।এদিকে গত ২০ ফেব্রুয়ারি চুড়িহাট্টায় তিনটি ভবনে আগুন লাগলে নিহত হন ৭০ জন।

Print Friendly, PDF & Email