আমি তো ভালা না গানটির গীতিকার ও সুরকারকে পাওয়া গেছে

নিজস্ব বিনোদন প্রতিবেদক : ‘অতীতের কথাগুলো পুরোনো স্মৃতিগুলো, মনে মনে রাইখো, আমি তো ভালা না ভালা লইয়াই থাইকো্। গানটি গত বছর ২০১৮ সালের  ৭ ফেব্রুয়ারি কামরুজ্জামান রাব্বি তাঁর ইউটিউব চ্যানেলে প্রথম গানটি প্রকাশ করেন। আজ বুধবার দুপুর পর্যন্ত গানটি ৯০ লাখ ৮৯ হাজার ৯৬৩ বার দেখা হয়েছে। এ ছাড়া ইউটিউবে আরও কয়েকটি চ্যানেলে রয়েছে গানটি। সব মিলিয়ে ইউটিউবে গানটি এরই মধ্যে ১ কোটিরও বেশি দেখা হয়েছে। পাশাপাশি গানটি ঈগল মিউজিকের ব্যানারে প্রকাশ করা হয়। অনেক দিন থেকেই গানটি নিয়ে বিতর্ক চলছে। বিতর্ক গানটির গীতিকার আর সুরকারকে নিয়ে। কারণ, গানটির গীতিকার ও সুরকার হিসেবে দুজন দাবি করেছেন। এদিকে গানের শেষ দিকে কামরুজ্জামান রাব্বি গেয়েছেন, ‘মাহবুব ভেবে বলে মায়ের কোলই ভালা মায়ের কোল ছেড়ে দেখি সংসারেতে জ্বালা।’

তার মানে গানের মধ্যেই কামরুজ্জামান রাব্বি বলেছেন, গানটির গীতিকার মাহবুব শাহ। কিন্তু এবার জানা গেছে, গানটির মূল গীতিকার ও সুরকার টিটু পাগল। কপিরাইট অফিস গানটির গীতিকার ও সুরকার হিসেবে টিটু পাগলকে সার্টিফিকেট দিয়েছে।

জানা গেছে, গানটির গীতিকার ও সুরকার হিসেবে স্বীকৃতি চেয়ে কপিরাইট অফিসে আবেদন করেন টিটু পাগল। এরপর বিষয়টি মীমাংসা করার জন্য তিনটি শুনানি হয়। বাদী টিটু পাগল ও বিবাদী মাহবুব শাহ, গানটির শিল্পী কামরুজ্জামান রাব্বি আর ঈগল মিউজিকের কর্ণধার কচি আহমেদকে ডাকা হয়। কোনো শুনানিতে মাহবুব শাহ উপস্থিত হননি। এরপর অন্যদের বক্তব্য পর্যালোচনা করে গানটির গীতিকার ও সুরকার হিসেবে টিটু পাগলকে স্বীকৃতি দেয় কপিরাইট অফিস।

ফেসবুক লাইভে অবিনাশ বাউল ও টিটু পাগল

গতকাল মঙ্গলবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ের কপিরাইট অফিস থেকে টিটু পাগলের হাতে গানটির গীতিকার ও সুরকার হিসেবে স্বীকৃতির সার্টিফিকেট তুলে দেওয়া হয়। এরপর সেখান থেকে শিল্পী অবিনাশ বাউলের ফেসবুক পেজ থেকে লাইভে আসেন টিটু পাগল। এখানে তিনি বলেছেন, ‘অনেক কষ্টের পর গানটি ফিরে পেয়েছি। আর গানটি ফিরে পেতে দুই বছর লেগেছে। এ কাজে কপিরাইট অফিসে যাঁরা আমাকে সহযোগিতা করেছেন, সবাইকে আন্তরিক ধন্যবাদ। তাঁরা আমাকে স্বীকৃতি দিয়েছেন।’

এর আগে টিটু পাগল জানিয়েছেন, তিনি বিক্রমপুরের চান মস্তানকে নিয়ে গানটি লিখেছেন। ২০১২ সালে তাঁর মাজারে তিনি প্রথম গানটি গেয়েছেন। এক অনুষ্ঠানে তাঁর কণ্ঠে গানটি শুনেছিলেন মাহবুব শাহ। গানটি তাঁর পছন্দ হয়। মাহবুব শাহ তাঁকে গানটি গাওয়ার জন্য শ্রীনগরে আমন্ত্রণ জানান। সেদিন একই মঞ্চে তাঁরা দুজন মিলে গানটি গেয়েছেন। এরপর কিছু অংশ পরিবর্তন করে মাহবুব শাহ গানটি নিজের নামে চালিয়ে দেন। তবে এই অভিযোগ গোড়া থেকে অস্বীকার করেছেন মাহবুব শাহ। শেষ পর্যন্ত গানটির স্বত্ব ফিরে পাওয়ার জন্য কপিরাইট অফিসে আবেদন করেন টিটু পাগল।

টিটু পাগল আরও জানান, তিনি গানটি ছয় বছর ধরে মুন্সিগঞ্জ, ফরিদপুর, বরিশাল, কুমিল্লার বিভিন্ন জায়গায় পরিবেশন করেছেন। পাশাপাশি টিটু পাগলের অনুমতি নিয়ে আরেকজন শিল্পী অবিনাশ বাউলও বিভিন্ন স্থানে গানটি গেয়েছেন।

গতকাল ফেসবুক লাইভে অবিনাশ বাউল বলেন, মাহবুব শাহ গানটির অন্তরা পরিবর্তন করেছেন। এ সময় তিনি ও টিটু বাউল গানের অন্তরা গেয়ে শোনান। গানের মূল অন্তরা হলো—

‘কান্দে আমার নয়নমণি, কান্দে জীবনদাতা
চান্দেরে না পাইলে এই জীবন বৃথা…’

কপিরাইট অফিসের রেজিস্ট্রার জাফর রাজা চৌধুরী এখন দেশের বাইরে আছেন। টিটু পাগলের আবেদনের রায় তিনিই দিয়েছেন। এ ব্যাপারে উপরেজিস্ট্রার জোহরা বেগম বলেন, ‘উপস্থাপিত সব তথ্য পর্যালোচনা করে রায়টি দেওয়া হয়েছে।’

এদিকে আজ বুধবার সকালে গানটির অন্যতম শিল্পী কামরুজ্জামান রাব্বি ফেসবুক লাইভে আসেন। এখানে তিনি বলেন, ‘আমি কিন্তু গোড়া থেকেই বলেছি, আমরা সত্যটা জানতে চাই। মাহবুব শাহ আমাকে গানটি দিয়েছেন, তিনি নিজেকে গানটির গীতিকার ও সুরকার হিসেবে জোর দিয়ে বলেছেন। আমি একজন শিল্পী। আমি শুধু গানটা গেয়েছি। আমার কণ্ঠে গানটা জনপ্রিয় হয়েছে, এটা আমার অপরাধ? এখানে তো আমার কিছু করার ছিল না। চা–বাগানে আমি গানটির যে ভিডিও করেছিলাম, তা অসংখ্য দর্শক দেখেছেন। এরপরই কিন্তু গীতিকার আর সুরকারের বিষয়টা সামনে এসেছে। এবার আমরা সত্যটা জেনেছি, গানটির আসল গীতিকার ও সুরকার টিটু পাগল। এখন থেকে যেখানেই আমি গানটি করব, সেখানেই টিটু পাগলের নাম বলব। মাহবুব শাহ আমাদের সবার সঙ্গে প্রতারণা করেছেন।’

গত বছর ১ ডিসেম্বর কামরুজ্জামান রাব্বি বলেন, ‘টিটু পাগলকে মাহবুব শাহর সঙ্গে বসার জন্য অনুরোধ করেছি। এখানে আমি শুধু গানটি গেয়েছি মাত্র। কে গীতিকার আর কে সুরকার, তা নিয়ে গবেষণা করে গান গাওয়া সম্ভব? আমি তাঁকে বলেছি, আপনারা বসে ঠিক করুন আসলে গানটি কার। আপনার দাবি সত্যি হলে অবশ্যই সংবাদ সম্মেলন করে সবাইকে বলব।’

‘অতীতের কথাগুলো পুরোনো স্মৃতিগুলো’ গানটি কামরুজ্জামান রাব্বি কীভাবে পেয়েছেন? তিনি বললেন, ‘একজন বড় ভাইয়ের সঙ্গে আমি বিক্রমপুর গিয়েছিলাম, মাহবুব শাহর বাসায়। সেখানে রাতে অনেক গান শুনেছি। এই গানটি আমার ভালো লাগে। গানটি গাওয়ার ব্যাপারে আগ্রহ প্রকাশ করি। তখন মাহবুব শাহ বলেছেন, গানটির গীতিকার ও সুরকার তিনি। গানটি গাওয়ার জন্য তিনি আমাকে মৌখিক ও লিখিতভাবে অনুমতি দেন।’

তখন কামরুজ্জামান রাব্বি আরও বলেন, ‘আমি কিন্তু কোথাও কখনো বলিনি, মাহবুব শাহ আমার জন্য গানটি লিখেছেন। কিংবা আমার সামনে বসে গানটি তিনি রচনা করেছেন। আমি শুধু গানটি গেয়েছি। আজ গানটি ভাইরাল হয়েছে, সবাই শুনছেন। অন্য শিল্পীরাও গাইছেন। গানটি ইউটিউবে দেওয়ার মাসখানেক পর থেকে আমার ওপর দিয়ে অনেক ঝড় বয়ে যাচ্ছে। অনেকেই আমাকে এ ব্যাপারে প্রশ্ন করেন। আমি বলতে বলতে ক্লান্ত।’

Print Friendly, PDF & Email