ইসলামী আন্দোলনের অভিযোগ-প্রশাসনের পাহারায় ভোট ডাকাতি হয়েছে

নিজস্ব প্রতিবেদক : পুলিশ ও র‌্যাবের পাহারায় ভোট ডাকাতির মহোৎসব হয়েছে, যা দেশের জন্য এক কলঙ্কজনক অধ্যায় হয়ে থাকবে। রবিবার (৩০ ডিসেম্বর) দুপুরে পল্টনে জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও দেশের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এ অভিযোগ করেন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের যুগ্ম মহাসচিব এটিএম হেমায়েতউদ্দীন। তবে ভোট নিয়ে দলের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত পরবর্তীতে জানানো হবে বলে জানান তিনি।

এদিকে, দলটির প্রেসিডিয়াম সদস্য ও ঢাকা-৪ আসনের প্রার্থী সৈয়দ মোসাদ্দেক বিল্লাহ আল-মাদানী ভোটকেন্দ্র দখলের অভিযোগ তুলে নির্বাচন বর্জন করেছেন। সংবাদ সম্মেলনে লাঙ্গল মার্কায় সিল দেওয়া দুটি ব্যালট পেপার দেখিয়ে মোসাদ্দেক বিল্লাহ আল-মাদানী দাবি করে— ১টা ১৫ মিনিটের দিকে শ্যামপুরের বাকচর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সরকার দলীয় লোকজন শতাধিক কেন্দ্র দখল করে সিল মারতে থাকে। সেখানে থাকা প্রিজা্ইডিং অফিসার, পুলিশ তাদের বাধা দেয়নি। আমি সেখানে দুটি ব্যালেট কুড়িয়ে পেয়েছি, যেখানে দেখা যাচ্ছে লাঙ্গলে ভোট দেওয়া। এ কারণে আমি নির্বাচন বর্জন করছি।’

সংবাদ সম্মেলনে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের যুগ্ম মহাসচিব এটিএম হেমায়েতউদ্দীন অভিযোগ করেন—সারাদেশে নির্বাচনের নামে যে তামাশা হচ্ছে, তাতে আমরা দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে চরমভাবে উদ্বিগ্ন। অধিকাংশ আসনে ভোট শুরুর কিছুক্ষণ পর থেকেই আমাদের সব এজেন্টকে জোরপূর্বক বের করে দেওয়া হয়। এরপর সরকারি দলের প্রার্থীর পক্ষে একতরফা সিল মারা হয়। এক-দেড় ঘণ্টার মধ্যেই ব্যালট পেপার শেষ হয়ে গেছে বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও অনেক ভোটার শেষ পর্যন্ত তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেননি। এতে প্রমাণিত হয় আনুষ্ঠানিকভাবে ভোট শুরুর আগেই সরকার দলীয় লোকেরা ব্যালট পেপারে সিল মেরে বাক্সভর্তি করে রেখেছেন। কোথাও কোথাও এই ভোট ডাকাতি প্রতিহত করতে গেলে আমাদের এজেন্ট ও ভোটারদের ওপর সশস্ত্র হামলা করা হয়।

এটিএম হেমায়েতউদ্দীন অভিযোগ করেন— সরকারের অধীনে সরকারের আজ্ঞাবহ নির্বাচন কমিশনের তত্ত্বাবধানে অনুষ্ঠিত এ নির্বাচনে সব প্রার্থীর জন্য লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড ছিল না। নির্বাচনে সরকারদলীয় প্রার্থীদের হুমকি, ধমকি, হামলা, পিস্তল ঠেকানো, অফিস ভাঙচুর, অফিসে আগুন দেওয়া ও নিরপরাধ কর্মীদের গ্রেফতার-হয়রানির ঘটনা উৎসবের নির্বাচনকে আতঙ্কের নির্বাচনে পরিণত করেছে। আর আজ নির্বাচনের নামে যা হচ্ছে, তা ইতিহাসে একটি কালো অধ্যায় হয়ে থাকবে।

এ সময় নির্বাচনে বিভিন্ন জেলার অনিয়ম তুলে ধরেন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের যুগ্ম মহাসচিব এটিএম হেমায়েতউদ্দীন। তিনি দাবি করেন, হাতপাখার অধিকাংশ এজেন্ট বের করে দেওয়া হয়েছে। হাতপাখার ভোটারকে প্রকাশ্যে নৌকায় ভোট দিতে চাপ প্রয়োগ করা হয়। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের অভিযোগের মধ্যে রয়েছে—ব্যালট পেপার অনেক জায়গায় ১১টার আগেই শেষ হয়ে যাওয়া, হাতপাখার ভোটারসহ সব ভোটারকে নখে কালি মাখিয়ে কেন্দ্র থেকে বের করে দেওয়া, ব্যালটে নৌকায় সিল মেরে বাক্সে ফেলা, হাতপাখার প্রার্থীদের সব অভিযোগ গ্রহণ না করা/অস্বীকার করা, হাতপাখার এজেন্টদের ওপর হামলা ও ঢাকা-৬ আসনসহ দেশের কয়েকটি আসনে হাতপাখার কর্মী গুম।

সংবাদ সম্মেলনে আরও অভিযোগ করা হয়, চাঁদপুর-১ আসনে হাতপাখার প্রার্থীর ওপর হামলা করা হয়। তার গাড়ি ভাঙচুর করে সহযোগীদেরও আহত করা হয়। দিনাজপুর-৪ আসনে রশিদুল নামের এক এজেন্টকে পুলিশ আটক করেছে। নীলফামারী-৪ আসনে বেলা ১১টায় হাতপাখার সব এজেন্টকে বের করে দেওয়া হয়। পুলিশি প্রহরায় সরকার দলীয় লোকজন লাঙ্গল মার্কায় সিল মারে। বগুড়া-৩ আসনে ইউএনও’র সামনে পৌর মেয়র বেলালের নেতৃত্বে ছাত্রলীগের কর্মীরা প্রার্থীর গাড়ি নিয়ে যায়। নাটোর-১ আসনে ১নং লালপুর ইউনিয়ন, ৫নং ওয়ার্ড বালিতিতা আদর্শ উচ্চবিদ্যালয় কেন্দ্রে ব্যালট পেপার না দিয়ে ভোটারদের হাতে কালি লাগিয়ে বের করে দেওয়া হয়। নোয়াখালী-২ আসনে ১০৩ কেন্দ্রের সবক’টি দখল করে নৌকায় প্রকাশ্যে সিল মারা হয়। চাঁদপুর-৩ আসনে ৩নং কল্যাণপুর ইউনিয়নে ছাত্রলীগের হামলায় হাতপাখার পাঁচ কর্মী আহত হন। শেরপুর-১ আসনে সব এজেন্টকে বের করে দেওয়া হয়েছে। রিটার্নিং অফিসার এ ব্যাপারে অভিযোগ গ্রহণ করেননি। ময়মনসিংহ-১০ আসনে সকাল ৯টার মধ্যে হাতপাখার সব এজেন্টকে বের করে দিয়ে আওয়ামী এজেন্টরা নৌকায় সিল মেরে ব্যালট বাক্স ভর্তি করে।

ঢাকা-৬ আসনে দক্ষিণ মহসিন গার্লস স্কুল থেকে ইমরান নামে হাতপাখার এক এজেন্টকে গুম করা হয়। ঢাকা-১৬ আসনে মিরপুর বাংলা স্কুল অ্যান্ড কলেজ কেন্দ্রে বোমা ফাটিয়ে কেন্দ্র দখল করা হয় এবং ভোটারদের প্রতি ইটপাটকেল নিক্ষেপ করা হয়। কুষ্টিয়া-২ আসনে ভেড়ামারা বামুনপাড়া প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে হাতপাখা প্রতীকে সিল মারার পরে নৌকার লোকেরা অনেক ব্যালট পেপার ছিঁড়ে ফেলে দেয়।

কুমিল্লা-৬ ও ৯ আসনে সকাল ৯টার মধ্যেই হাতপাখার সব এজেন্টকে বের করে দিয়ে আওয়ামী এজেন্টরা নৌকায় সিল মেরে ব্যালট বাক্স ভর্তি করে।নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনে আনন্দলোক উচ্চবিদ্যালয় কেন্দ্রে হাতপাখা প্রতীকে সিল মারার পরে নৌকার লোকেরা অনেক ব্যালট পেপার ছিঁড়ে ফেলে দেয়। চট্টগ্রাম-৯ আসনে প্রার্থীর গাড়ির ড্রাইভারকে সরকার দলীয় কর্মীরা অকথ্য ভাষায় গালাগালি এবং রক্তাক্ত করে। ঢাকা- ১৩ আসনে (ইভিএম) ইলেক্ট্রনিক্স ভোট মেশিনে ভোটগ্রহণ এলাকাতে জাফরাবাদ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় (৩৪নং ওয়ার্ড), ব্লুমিং চাইল্ড স্কুল (৩৪নং ওয়ার্ড), রায়েরবাজার কমিউনিটি সেন্টারসহ অন্যান্য সেন্টারে লাইন থেকে বের করে দেওয়া, ক্যাম্প ভেঙে ফেলা, ভোটের মেশিন নষ্ট ও মেশিনে সমস্যা দেখিয়ে ভোটারদের ভোট দিতে দেওয়া হয়নি।

সিরাজগঞ্জ-৪ আসনে লিখিত অভিযোগ নিতে সহকারী রিটার্নিং অফিসার অস্বীকার করেন। সুনামগঞ্জ-১ আসনে বেলা ১২টায় ব্যালট পেপার শেষ এবং বিভিন্ন আসনে নৌকা ও লাঙ্গলে জোরপূর্বক সিল মারা হয়। জয়পুরহাট-২ আসনে গোবিনাথপুর কেন্দ্র, গার্লস উচ্চবিদ্যালয় কেন্দ্র, মোহাম্মদপুরসহ বিভিন্ন কেন্দ্রে জোরপূর্বক সিল মারা হয়। বগুড়া-৭ আসনে রামেরশাপুর,সোনারায় দক্ষিণপাড়া কানৈল, নেপালীতলাসহ বিভিন্ন কেন্দ্রে ১২টার আগেই ব্যালট পেপার শেষ বলে জানানো হয় এবং দেশের সব আসনের একই চিত্র।

সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন দলের যুগ্ম মহাসচিব মাহবুবুর রহমান, ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সভাপতি ইমতিয়াজ আলম, ঢাকা মহানগর উত্তরের সভাপতি ফজলে বারী মাসউদ, ঢাকা-৮ আসনের প্রার্থী আবুল কাশেম, গণমাধ্যম সমন্বয়কারী শহিদুল ইসলাম কবির প্রমুখ।

Print Friendly, PDF & Email