চলন্ত বাস থেকে কীভাবে নিচে পড়লেন তরুণী?

নিজস্ব বার্তা প্রতিবেদক : কিশোরগঞ্জের কটিয়াদীতে যাত্রীবাহী বাসে তরুণী এক নার্সের রহস্যজনক মৃত্যু হয়েছে। গতকাল সোমবার রাতে কটিয়াদী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে নার্সের মরদেহ উদ্ধার করে থানায় নিয়ে যায় পুলিশ। নিহতের নাম শাহিনুর আক্তার ওরফে তানিয়া (২৫)।

এই তরুণীর মৃত্যু নিয়ে বাস কর্তৃপক্ষ ও পরিবারের ভিন্ন বক্তব্য পাওয়া গেছে। শাহিনুরের বাবা গিয়াস উদ্দিনের দাবি, চলন্ত বাসে তাঁর মেয়েকে একা পেয়ে বাসের কর্মীরা ধর্ষণ করেন। পরে দায় এড়ানোর জন্য বাস থেকে ফেলে হত্যা করেন। আর বাস কর্তৃপক্ষ বলছে, ওই তরুণী বাস থেকে লাফ দিয়ে নিচে পড়েছিলেন।

শাহিনুর ঢাকায় একটি বেসরকারি হাসপাতালে নার্স হিসেবে কর্মরত ছিলেন। তাঁর বাড়ি কটিয়াদী উপজেলার বাহেরচর গ্রামে। এ ঘটনায় পুলিশ বাসের চালক নুরুল ইসলাম ও চালকের সহযোগী মো. লালনকে আটক করে।

পুলিশ ও নিহত ব্যক্তির পরিবারের সদস্যরা জানান, শাহিনুর ঢাকায় কাজ করেন। গতকাল সোমবার বিকেল তিনটায় তিনি ঢাকার মহাখালী থেকে স্বর্ণলতা পরিবহনের বাসে ওঠেন। বাসটি মহাখালী থেকে কটিয়াদী হয়ে বাজিতপুর উপজেলার পিরিজপুর বাসস্ট্যান্ড পর্যন্ত যায়। রাত আটটার দিকে বাসটি কটিয়াদী বাসস্ট্যান্ডে পৌঁছায়। কটিয়াদী পৌঁছানোর পর বাসের সব যাত্রী নেমে পড়েন। কিন্তু শাহিনুর না নেমে বসে ছিলেন। শাহিনুরের বাড়ি কটিয়াদীর বাহেরচর হলেও বাসস্ট্যান্ড থেকে বাহেরচরের দূরত্ব অনেক। রিকশায় করে যেতে এক ঘণ্টার ওপর সময় লাগে। কিন্তু পিরিজপুর বাসস্ট্যান্ড থেকে বাহেরচরের রিকশায় ১০ মিনিটের পথ। সে কারণে শাহিনুর কটিয়াদী বাসস্ট্যান্ডে না নেমে পিরিজপুর যেতে আগ্রহী হন।

কটিয়াদী বাসস্ট্যান্ডে যাওয়ার পর শাহিনুর তাঁর ভাই সুজন মিয়াকে ফোনে করে বলেন, তিনি পিরিজপুর হয়ে আসবেন। তবে বাসে তিনি ছাড়া আর কোনো যাত্রী নেই। এর পর থেকে পরিবারের সদস্যরা শাহিনুরের জন্য অপেক্ষা করছিলেন। এক ঘণ্টা সময় পেরিয়ে গেলেও তিনি বাড়িতে না আসায় পরিবার থেকে ফোন দেওয়া হয়। কিন্তু তখন ফোনটি বন্ধ পাওয়া যায়। ফোন বন্ধ পাওয়ায় পরিবারের দুশ্চিন্তা বাড়ে। বেশ কয়েকজন পিরিজপুর বাসস্ট্যান্ডে গিয়ে দেখেন, স্বর্ণলতা পরিবহনের বাস পিরিজপুর আসেনি। রাত ১১টার দিকে কটিয়াদী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে ফোনে বলা হয় যে শাহিনুর মারা গেছেন এবং মরদেহ হাসপাতালে আছে।

হাসপাতাল সূত্র জানায়, রাত পৌনে ১১টার দিকে দুই ব্যক্তি শাহিনুরকে হাসপাতালে নিয়ে যান। দুজনের মধ্যে একজন জরুরি বিভাগের তথ্য বইয়ে নিজের নাম আল আমিন লিপিবদ্ধ করান। বাড়ির ঠিকানা দেন গাজীপুরের কাপাসিয়া উপজেলার।

তখন কটিয়াদী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ছিলেন আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা (আরএমও) তাজনিনা তৈয়ব। তিনি শাহিনুরকে স্বাস্থ্য পরীক্ষা করেন। তিনি বলেন, ‘হাসপাতালে আনার আগেই শাহিনুরের মৃত্যু হয়েছে। প্রাথমিকভাবে আমরা লক্ষ করেছি শাহিনুরের ঠোঁটের ডান পাশে এবং বাম চোখের নিচে চামড়া উঠে আছে। দুই হাতে আঁচড়ের চিহ্ন ছিল। শরীরের আরও কিছু অংশে ফোলা পাওয়া যায়।’

এদিকে ধর্ষণের পর বাসের কর্মীরা শাহিনুরকে হত্যা করেছেন—গ্রামে এমন খবর ছড়িয়ে পড়লে আজ মঙ্গলবার সকালে বাহেরচর থেকে গ্রামবাসী পিরিজপুর বাসস্ট্যান্ডে গিয়ে স্বর্ণলতা পরিবহনের বাস ভাঙচুর করেন। পরে পিরিজপুর পুলিশ ফাঁড়ি থেকে পুলিশ গিয়ে পরিস্থিতি শান্ত করেন এবং চারজনকে আটক করে থানায় নিয়ে যায়। এ ঘটনার পর স্বর্ণলতা পরিবহনের বাস চলাচল বন্ধ আছে।

স্বর্ণলতা পরিবহনের তত্ত্বাবধায়ক মো. পাভেল বলেন, গতকাল রাত সাড়ে আটটার দিকে কটিয়াদীর কাউন্টার মাস্টার রফিক মিয়া ফোন করে সমস্যার কথা জানান। এরপর তিনি বাসের চালক নুরুল ইসলাম ও চালকের সহযোগী লালনের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করেন। চালক ও চালকের সহযোগী স্বর্ণলতা পরিবহন কর্তৃপক্ষের কাছে ওই নারীকে কিছু করার কথা অস্বীকার করেন। তাঁরা দাবি করেন, ওই নারী বাস থেকে লাফ দিয়ে নিচে পড়ে গিয়ে আহত হয়েছিলেন। কটিয়াদী বাসস্ট্যান্ড থেকে পিরিজপুর বাসস্ট্যান্ড ১০ মিনিটের পথ। এই সামন্য পথ পাড়ি দিতে গিয়ে মেয়েটি কেন বাস থেকে লাফ দেবেন?—এমন প্রশ্নের কোনো উত্তর মো. পাভেল দিতে পারেননি। তবে তিনি দাবি করেন, বাস কর্তৃপক্ষের নির্দেশে চালক ও চালকের সহযোগী কটিয়াদী থানা-পুলিশের কাছে গিয়ে ধরা দেন।

বাজিতপুর থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মো. সারোয়ার বলেন, আটক হওয়া চালক ও চালকের সহযোগীকে কটিয়াদী থানায় রেখে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। ময়নাতদন্তের জন্য মরদেহ কিশোরগঞ্জ সদর হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হয়েছে। ধর্ষণের আলামত রয়েছে কিনা, সেটি গুরুত্ব দিয়ে পরীক্ষা করার ব্যবস্থা করা হয়েছে।

থানা হেফাজতে চালক নুরুল ইসলাম ধর্ষণের অভিযোগ অস্বীকার করেন। তিনি দাবি করেন, মেয়েটি হঠাৎ করে জানালা দিয়ে লাফ দেন। এরপর তাঁরা মেয়েটিকে নিয়ে পিরিজপুর বাসস্ট্যান্ডের একটি ফার্মেসিতে যান। সেখান থেকে কটিয়াদী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান। তবে ওই তরুণী কেন লাফ দিলেন, এই প্রশ্নের জবাব নুরুল ইসলাম কিংবা লালন দিতে পারেননি।

Print Friendly, PDF & Email