জাল নিলামে মুক্তিযোদ্ধার বিধবা স্ত্রীর ৬ তলা ভবন  গ্রাস প্রক্রিয়া আটকে গেছে

আবু বকর : রাজধানীর কাকরাইলে এক মুক্তিযোদ্ধার বিধবা স্ত্রীর ৬ তলা ভবন জাল নিলামের মাধ্যমে  গ্রাসের প্রক্রিয়া আটকে গেছে।এই প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে দায়েরকৃত রিট মামলায় সুপ্রিমকোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের  বিচারপতি মোহাম্মদ মুজিবুর রহমান মিঞা এবং বিচারপতি মহিউদ্দিন শামীম এর সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ ঢাকার দেউলিয়া বিষয়ক আদালতের ৪/৯৯ নং মামলার সরকারি রিসিভার এবং দৈনিক যুগান্তর পত্রিকার ডেপুটি ম্যানেজার (বিজ্ঞাপন) কে আগামি ২০ ফেব্রুয়ারি স্ব শরীরে আদালতে উপস্থিত হবার জন্য দ্বিতীয় দফায় আদেশ দিয়েছেন।এ দু’জনকে আজ স্ব শরীরে আদালতে উপস্থিত হবার জন্য গত ১৯ জানুয়ারি আদালত আদেশ দিয়েছিলেন।আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী ইতিমধ্যে ঢাকার দেউলিয়া বিষয়ক আদালত এই মামলার মুল নথি প্রেরন করেছেন।
গত ১৯ জানুয়ারি রবিবার বিচারপতি মোহাম্মদ মুজিবুর রহমান মিঞা এবং বিচারপতি মহিউদ্দিন শামীম এর সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চে ৫০৩৮/২০১৯ নং রিট এর চুড়ান্ত শুনানীর সময় আদালত এক অন্তর্বর্তীকালীন আদেশে ঢাকার দেউলিয়া বিষয়ক আদালতের ৪/৯৯ নং মামলার মুল নথি তলব করেন।একই সঙ্গে এই মামলায় নিযুক্ত সরকারি রিসিভার এবং দৈনিক যুগান্তর পত্রিকার ডেপুটি ম্যানেজার (বিজ্ঞাপন) কে ৯ ফেব্রুয়ারি স্ব শরীরে আদালতে উপস্থিত হবার আদেশ দেন। হাইকোর্টের এ সংক্রান্ত আদেশ গত ৩০ জানুয়ারি দৈনিক যুগান্তর গ্রহণ করে। গত বছর ৬ মে বিচারপতি আশফাকুল ইসলাম ও বিচারপতি মোহাম্মদ আলীর সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ এই রিট মামলায় ঢাকার দেউলিয়া আদালতের ৪/৯৯ নং মামলার নিলাম কার্যক্রম এবং দখল হস্তান্তরের আদেশ কেন বাতিল করা হবেনা তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেন। একই সঙ্গে দেউলিয়া আদালত কর্তৃক অনুমোদিত নিলাম ও দখল আদেশের কার্যক্রম স্থগিতের আদেশ সহ বিবাদীদের বিরুদ্ধে নিষেধাঙ্গা জারি করেন।
রিটকারির আইনজীবি ব্যারিস্টার তীর্থ সলিল পাল জানান, নিলাম প্রক্রিয়ায় নিযুক্ত সরকারি রিসিভার কর্তৃক ২০১৫ সালের ১৩ মে তারিখের দৈনিক যুগান্তর ও দৈনিক খবর পত্রিকায় নিলাম বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত হয়েছে মর্মে ঐ তারিখের দু’টি পত্রিকা ঢাকার দেউলিয়া বিষয়ক আদালতে জমা দেয়া হয়। অথচ ঐ দিনের সারাদেশে ও বিশ্বব্যাপী প্রচারিত মুল পত্রিকায় এ ধরনের কোন নিলাম বিজ্ঞপ্তিই প্রকাশিত হয়নি। দৈনিক যুগান্তরের ডেপুটি ম্যানেজার (বিজ্ঞাপন) আল-আমীন স্বাক্ষরিত এক প্রত্যয়ন পত্রে ঐ তারিখের দৈনিক যুগান্তর পত্রিকায় আলোচিত বিজ্ঞাপন প্রকাশিত না হবার বিষয়টি নিশ্চিৎ করা হয়। নিলাম কার্যক্রম পরিচালনাকারী সরকারি রিসিভার ভুয়া নিলাম বিজ্ঞপ্তি সম্বলিত ঐ দু’টি জাতীয় দৈনিক পত্রিকার জাল কপি আদালতে জমা দেন। অতঃপর ভূয়া নিলামে মৃত মুক্তিযোদ্ধার অসহায় স্ত্রীর ১৫ কোটি টাকার সম্পদ ১ কোটি ২০ লাখ টাকায় বিক্রি করা হয়। এই ভূয়া নিলাম জালিয়াতির ঘটনায় আড়াই কাঠা ভূমিতে নির্মিত ৬ তলা ভবনের কথা গোপন করে শুধু মাত্র ভূমি নিলাম করা হয়। অথচ ভূমি এবং ভূমির উপর নির্মিত ৬ তলা ভবনের আংশিক দখল নিলাম গ্রহীতার অনুকুলে বুঝিয়ে দেয়া হয়।
ব্যারিস্টার তীর্থ সলিল পাল জানান , এই ঘটনাটি ঘটে ঢাকার ৩৬/২ কাকরাইলে। বাংলাদেশ শিল্প ব্যাংক মেসার্স নিয়াজ গার্মেন্টস এর অনুকুলে ১৯৯৫ সালে ৩৯ লাখ ৭৫ হাজার টাকার ঋণ প্রদান করে। এই ঋনের অনুকুলে কোম্পানী কাফরুল থানায় স্থাপিত কোম্পানির কারখানা ব্যাংকের অনুকুলে মটগেজ প্রদান করেন। পরবর্তীতে কোম্পানি রুগ্ন হয়ে যায়। ফলে সময় মত ঋন পরিশোধ না করায় ব্যাংক অনাদায়ী ঋণের সুদাসল ৫৩ লাখ ২২ হাজার টাকার খেলাপি ঋণ আদায়ে ১৯৯৯ সালে কোম্পানির বন্দককৃত সম্পত্তি নিলাম করে টাকা আদায়ের চেষ্টা না, করে কোম্পানী ও তার পরিচালকদের দেউলিয়া ঘোষনা করাতে ঢাকার দেউলিয়া বিষয়ক আদালতে ৪/৯৯ নং মামলা দায়ের করেন। ব্যাংক কর্তৃপক্ষ তাদের মামলায় ঐ কোম্পানির ৪০% শেয়ার হোল্ডারধারী চেয়ারম্যান রোকসানা পারভীনের বসত বাড়ীটিই শুধু দেউলিয়া আদালতের “বি” তপশিলে দেখান। কিন্তু অন্য পরিচালকদের কোন সম্পত্তির বিবরণ দেননি। অবশেষে ২০০৮ সালে কোম্পানি ও তার ৪ জন পরিচালককে দেউলিয়া ঘোষনা করা হয়। আদালত কর্তৃক রোকসানা পারভীনের “বি” তপসিল বর্ণিত সম্পত্তি বিক্রয় করে ব্যাংকের টাকা আদায়ে অবসর প্রাপ্ত জেলা জজ সুলতান আহম্মেদ মিঞাকে রিসিভার নিয়োগ করা হয়। রোকসানা পারভীনের স্বামী বীর মুক্তিযোদ্ধা ও সেনা বাহিনীর অবসর প্রাপ্ত মেজর, কাজী মাজেদুর রহমান ২০১৪ সালের ১৩ নভেম্বর মারা যাওয়ার পর সরকারি রিসিভার অসহয় ঐ মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের “বি” তপসিল বর্ণিত সম্পত্তি নিলামে বিক্রয় করার জন্য ১৩ মে ২০১৫ তারিখের জাতীয় দৈনিক যুগান্তর ও দৈনিক খবর পত্রিকা আদালতে পেশ করেন। পেশকৃত ঐ দু’টি পত্রিকায় দরপত্র আহবানের নিলাম বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ দেখানো হয়। অথচ উল্লেখিত দু’টি পত্রিকার বর্ণিত ১৩ মে ২০১৫ তারিখের প্রকাশিত মূল পত্রিকার কোন সংখ্যায় এ ধরনের কোন নিলাম দরপত্রের বিজ্ঞপ্তিই প্রকাশিত হয়নি। উপরন্ত এই জাল জালিয়াতির নিলামে ঐ আড়াই কাঠা সম্পত্তির উপরে থাকা ভবনের কথা গোপন করে কারসাজির মাধ্যমে ১৫ কোটি টাকার সম্পদ ১ কোটি ২০ লাখ টাকায় নিলাম বিক্রয় আদালতের মাধ্যমে সম্পন্ন করা হয়। অতঃপর নিলাম গ্রহিতার অনুকুলে ঐ আড়াই কাঠা জমি হস্তান্তর বাবদ ঢাকা সাব রেজিঃ অফিসে ১৮১৩/১৬ নং দলিল সম্পাদন করা হয়। ঐ দলিলেও ৬ তলা ভবনের কথা গোপন করা হয়। সরকারি রিসিভার গত ২০১৭ সালের ২০ জুন তারিখে উপ-পুলিশ কমিশনার, মতিঝিল বিভাগ, ডি,এম,পি,ঢাকা বরাবরা এক পত্রে তপসিল বর্ণিত আড়াই কাঠা জমির দখল নিলাম ক্রেতার বরাবরে বুঝিয়ে দিতে ২২ জুন ২০১৭ তারিখ সকাল ১০ টায় প্রয়োজনীয় সংখ্যক পুলিশ ফোর্স মজুদ রাখার বিষয়ে য়থাযথ ব্যবস্থা গ্রহনের জন্য বলেন। ডি,এম,পি’র মতিঝিল বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার ২১ জুন-২০১৭ তারিখে ২০৭৪ নং স্মারক পত্রে যুগ্ন পুলিশ কমিশনার (অপারেশন) কে তপসিল বর্ণিত আড়াই কাঠা সম্পত্তির বাস্তব দখল কাজে আইন শৃঙ্খলা রক্ষার্থে পুলিশ অফিসার ও ফোর্স মোতায়েনের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহনের নির্দেশ দেন। অতঃপর সরকারি রিসিভারের সহকারি জনৈক এ্যাডভোকেট আহসান হাবিব ২২ জুন-২০১৭ তারিখে ঘটনাস্থলে নিজেকে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট পরিচয় দিয়ে পুলিশের সহায়তায় ভূয়া নিলামকৃত আড়াই কাঠা জমির দখল নিলাম গ্রহিতার অনুকুলে বুঝিয়ে দিতে এসে ৬ তলা ভবনসহ তপসিল বর্ণিত জমির দখল বুঝিয়ে দেন।
ব্যারিস্টার তীর্থ সলিল পাল জানান, তার মক্কেল রোকসানা পারভীন গত ২ মে ২০১৯ তারিখে মহামান্য সুপ্রিমকোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে ৫০৩৮/২০১৯ নং রিট দায়ের করলে আদালত ৬ মে রুল জারি করেন। একই সঙ্গে দেউলিয়া আদালত কর্তৃক অনুমোদিত নিলামের কার্যক্রম স্থগিত আদেশ সহ বিবাদীদের বিরুদ্ধে নিষেধাঙ্গা জারি করেন।এই রুলের চুড়ান্ত শুনানীতে আদালত ১৯ জানুয়ারি ঢাকার দেউলিয়া বিষয়ক আদালতের ৪/৯৯ নং মামলার মুল নথি তলব করেন।একই সঙ্গে এই মামলায় নিযুক্ত সরকারি রিসিভার এবং দৈনিক যুগান্তর পত্রিকার ডেপুটি ম্যানেজার (বিজ্ঞাপন) কে ৯ ফেব্রুয়ারি স্ব শরীরে আদালতে উপস্থিত হবার আদেশ দিয়েছিলেন।