জাল নিলামে মুক্তিযোদ্ধার বিধবা স্ত্রীর ৬ তলা ভবন গ্রাস মামলায় হাইকোর্ট ঢাকার দেউলিয়া আদালতের নথি তলব করেছেন

আবু বকর : জাল নিলামে এক মুক্তিযোদ্ধার বিধবা স্ত্রীর ৬ তলা ভবন গ্রাসের রিট মামলায় সুপ্রিমকোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ ঢাকার দেউলিয়া বিষয়ক আদালতের ৪/৯৯ নং মামলার মুল নথি তলব করেছেন।একই সঙ্গে এই মামলায় নিযুক্ত সরকারি রিসিভার এবং দৈনিক যুগান্তর পত্রিকার ডেপুটি ম্যানেজার (বিজ্ঞাপন) কে আগামি ৯ ফেব্রুয়ারি স্ব শরীরে আদালতে উপস্থিত হবার আদেশ দিয়েছেন।

১৯ জানুয়ারি রবিবার বিচারপতি মোহাম্মদ মুজিবুর রহমান মিঞা এবং বিচারপতি মহিউদ্দিন শামীম এর সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চে ৫০৩৮/২০১৯ নং রিট এর চুড়ান্ত শুনানীর এক পর্যায়ে আদালত অন্তর্বর্তীকালীন আদেশে ঢাকার দেউলিয়া বিষয়ক আদালতের ৪/৯৯ নং মামলার মুল নথি তলব করেন।একই সঙ্গে এই মামলায় নিযুক্ত সরকারি রিসিভার এবং দেনিক যুগান্তর পত্রিকার ডেপুটি ম্যানেজার (বিজ্ঞাপন) কে আগামি ৯ ফেব্রুয়ারি স্ব শরীরে আদালতে উপস্থিত হবার আদেশ দেন।

গত ৬ মে বিচারপতি আশফাকুল ইসলাম ও বিচারপতি মোহাম্মদ আলীর সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ এই রিট মামলায় ঢাকার দেউলিয়া আদালতের ৪/৯৯ নং মামলার নিলাম কার্যক্রম এবং দখল হস্তান্তরের আদেশ কেন বাতিল করা হবেনা তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেন। একই সঙ্গে দেউলিয়া আদালত কর্তৃক অনুমোদিত নিলামের কার্যক্রম স্থগিতের আদেশ সহ বিবাদীদের বিরুদ্ধে নিষেধাঙ্গা জারি করেন।

রিটকারির আইনজীবি ব্যারিস্টার তীর্থ সলিল পাল জানান, নিলাম প্রক্রিয়ায় ২০১৫ সালের ১৩ মে তারিখের দৈনিক যুগান্তর ও দৈনিক খবর পত্রিকায় নিলাম বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত হয়েছে মর্মে ঐ তারিখের দু’টি পত্রিকা ঢাকার দেউলিয়া বিষয়ক আদালতে জমা দেয়া হয়। অথচ ঐ দিনের মুল পত্রিকায় এ ধরনের কোন নিলাম বিজ্ঞপ্তিই প্রকাশিত হয়নি। নিলাম কার্যক্রম পরিচালনাকারী সরকারি রিসিভার ভুয়া নিলাম বিজ্ঞপ্তি সম্বলিত ঐ দু’টি জাতীয় দৈনিক পত্রিকার জাল প্রকাশনার কপি আদালতে জমা দেন। অতঃপর ভূয়া নিলামে মৃত মুক্তিযোদ্ধার অসহায় স্ত্রীর ১০ কোটি টাকার সম্পদ ১ কোটি ২০ লাখ টাকায় বিক্রি করা হয়। এই ভূয়া নিলাম জালিয়াতির ঘটনায় আড়াই কাঠা ভূমিতে নির্মিত ৬ তলা ভবনের কথা গোপন করে শুধু মাত্র ভূমি নিলাম করা হয়। অথচ ভূমি এবং ভূমির উপর নির্মিত ৬ তলা ভবনের আংশিক দখল নিলাম গ্রহীতার অনুকুলে বুঝিয়ে দেয়া হয়।

ব্যারিস্টার তীর্থ সলিল পাল জানান , এই ঘটনাটি ঘটে ঢাকার ৩৬/২ কাকরাইলে। বাংলাদেশ শিল্প ব্যাংক মেসার্স নিয়াজ গার্মেন্টস এর অনুকুলে ১৯৯৫ সালে ৩৯ লাখ ৭৫ হাজার টাকার ঋণ প্রদান করে। এই ঋনের অনুকুলে কোম্পানী কাফরুল থানায় স্থাপিত কোম্পানির কারখানা ব্যাংকের অনুকুলে মটগেজ প্রদান করেন। পরবর্তীতে কোম্পানি রুগ্ন হয়ে যায়। ফলে সময় মত ঋন পরিশোধ না করায় ব্যাংক অনাদায়ী ঋণের সুদাসল ৫৩ লাখ ২২ হাজার টাকার খেলাপি ঋণ আদায়ে ১৯৯৯ সালে কোম্পানির বন্দককৃত সম্পত্তি নিলাম করে টাকা আদায়ের চেষ্টা না, করে কোম্পানী ও তার পরিচালকদের দেউলিয়া ঘোষনা করাতে ঢাকার দেউলিয়া বিষয়ক আদালতে ৪/৯৯ নং মামলা দায়ের করেন। ব্যাংক কর্তৃপক্ষ তাদের মামলায় ঐ কোম্পানির ৪০% শেয়ার হোল্ডারধারী চেয়ারম্যান রোকসানা পারভীনের বসত বাড়ীটিই শুধু দেউলিয়া আদালতের “বি” তপশিলে দেখান। কিন্তু অন্য পরিচালকদের কোন সম্পত্তির বিবরণ দেননি। অবশেষে ২০০৮ সালে কোম্পানি ও তার ৪ জন পরিচালককে দেউলিয়া ঘোষনা করা হয়। আদালত কর্তৃক রোকসানা পারভীনের “বি” তপসিল বর্ণিত সম্পত্তি বিক্রয় করে ব্যাংকের টাকা আদায়ে অবসর প্রাপ্ত জেলা জজ সুলতান আহম্মেদ মিঞাকে রিসিভার নিয়োগ করা হয়। রোকসানা পারভীনের স্বামী বীর মুক্তিযোদ্ধা ও সেনা বাহিনীর অবসর প্রাপ্ত মেজর, কাজী মাজেদুর রহমান ২০১৪ সালের ১৩ নভেম্বর মারা যাওয়ার পর সরকারি রিসিভার অসহয় ঐ মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের “বি” তপসিল বর্ণিত সম্পত্তি নিলামে বিক্রয় করার জন্য ১৩ মে ২০১৫ তারিখের জাতীয় দৈনিক যুগান্তর ও দৈনিক খবর পত্রিকা আদালতে পেশ করেন। পেশকৃত ঐ দু’টি পত্রিকায় দরপত্র আহবানের নিলাম বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ দেখানো হয়। অথচ উল্লেখিত দু’টি পত্রিকার বর্ণিত ১৩ মে ২০১৫ তারিখের প্রকাশিত কোন সংখ্যায় এ ধরনের কোন নিলাম দরপত্রের বিজ্ঞপ্তিই প্রকাশিত হয়নি। উপরন্ত এই জাল জালিয়াতির নিলামে ঐ আড়াই কাঠা সম্পত্তির উপরে থাকা ভবনের কথা গোপন করে কারসাজির মাধ্যমে ১০ কোটি টাকার সম্পদ ১ কোটি ২০ লাখ টাকায় নিলাম বিক্রয় আদালতের মাধ্যমে সম্পন্ন করা হয়। অতঃপর নিলাম গ্রহিতার অনুকুলে ঐ আড়াই কাঠা জমি হস্তান্তর বাবদ ঢাকা সাব রেজিঃ অফিসে ১৮১৩/১৬ নং দলিল সম্পাদন করা হয়। ঐ দলিলেও ৬ তলা ভবনের কথা গোপন করা হয়। সরকারি রিসিভার গত ২০১৭ সালের ২১ জুন তারিখে নিলামকৃত আড়াই কাঠা জমির দখল নিলাম গ্রহিতার অনুকুলে বুঝিয়ে দিতে এসে ৬ তলা ভবনটিসহ দখল বুঝিয়ে দেন।

ব্যারিস্টার তীর্থ সলিল পাল জানান, তার মক্কেল রোকসানা পারভীন গত ২ মে ২০১৯ তারিখে মহামান্য সুপ্রিমকোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে ৫০৩৮/২০১৯ নং রিট দায়ের করলে আদালত ৬ মে রুল জারি করেন। একই সঙ্গে দেউলিয়া আদালত কর্তৃক অনুমোদিত নিলামের কার্যক্রম স্থগিত আদেশ সহ বিবাদীদের বিরুদ্ধে নিষেধাঙ্গা জারি করেন।এই রুলের চুড়ান্ত শুনানীতে আদালত ১৯ জানুয়ারি ঢাকার দেউলিয়া বিষয়ক আদালতের ৪/৯৯ নং মামলার মুল নথি তলব করেছেন।একই সঙ্গে এই মামলায় নিযুক্ত সরকারি রিসিভার এবং দৈনিক যুগান্তর পত্রিকার ডেপুটি ম্যানেজার (বিজ্ঞাপন) কে আগামি ৯ ফেব্রুয়ারি স্ব শরীরে আদালতে উপস্থিত হবার আদেশ দিয়েছেন।