ডেঙ্গুতে আক্রান্ত ৩২ হাজার ছাড়িয়েছে

নিজস্ব বার্তা প্রতিবেদক : মা সনিয়া আক্তার ও মেয়ে জান্নাতি দুজনই ডেঙ্গুতে আক্রান্ত। মেয়ের অবস্থা ক্রমেই অবনতি হওয়ায় তাকে আইসিইউতে নিতে হবে, কিন্তু সেখানে বেড নেই। অপরদিকে সুযোগ না থাকায় মাকে নিতে হবে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে। মেয়ের বেডের ব্যবস্থা না হওয়ায় মেয়ের পাশে বসে অঝোরে কাঁদছেন মা। ছবিটি গতকাল মাতুয়াইল শিশু মাতৃ স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট থেকে তোলা —সামসুল হায়দার বাদশা
ডেঙ্গুতে প্রতিদিনই নারী, পুরুষ ও শিশু মরছে। মৃতের সংখ্যা একশ’ ছুঁইছুঁই। গত জানুয়ারি থেকে গতকাল বুধবার পর্যন্ত ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে ২৩ জনের মৃত্যু হয়েছে বলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানালেও বেসরকারি হিসেবে এ সংখ্যা ৯৫। ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে বুধবার আরো ৪ জন মারা গেছেন। এ বছর ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়েছেন ৩২ হাজার ৩৪০ জন। গতকাল একদিনে সর্বোচ্চ ২৪২৮ জন আক্রান্ত হয়েছেন। এডিস মশা নির্মূল না হওয়া পর্যন্ত এ মৃত্যুর মিছিল থামবে না বলে বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকরা জানিয়েছেন।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, গত বছর ২২টি হাসপাতাল দিলেও এ বছর সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ও বেসরকারি সব মিলিয়ে ৪০টি হাসপাতাল ডেঙ্গুর তথ্য দিচ্ছে। কিন্তু এর বাইরে আরো অনেক হাসপাতাল আছে যেগুলো তথ্য দেয় না। ফলে ডেঙ্গু রোগীর সঠিক তথ্য তারা দিতে পারছে না।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশনস সেন্টার ও কন্ট্রোল রুমের তথ্য অনুযায়ী, বছরের শুরু থেকে গতকাল বুধবার সকাল আটটা পর্যন্ত ৩২ হাজার ৩৪০ জন মানুষ ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এদের মধ্যে ৮ হাজার ৭০৭ জন বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিত্সাধীন। আর চিকিত্সা শেষে ছাড়পত্র পেয়েছেন ২৩ হাজার ৬১০ জন। গত ২৪ ঘণ্টায় সারাদেশে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ২ হাজার ৪২৮ জন। এরমধ্যে ঢাকায় ১ হাজার ২৭৫ এবং ঢাকার বাইরে ১ হাজার ১৫৩ জন মানুষ হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। ঢাকা বিভাগের জেলাগুলোতেই সবচেয়ে বেশি ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় এসব জেলার হাসপাতালগুলোতে ডেঙ্গু নিয়ে ভর্তি হয়েছেন ২৯৯ জন। এর আগে ২০১৮ সালে ১০ হাজারের বেশি ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তির সর্বোচ্চ রেকর্ড ছিল।

ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে সারাদেশে ৫৩ কোটি টাকার থোক বরাদ্দ : ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে সারাদেশে ৫৩ কোটি টাকার থোক বরাদ্দ দিয়েছে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়। এর মধ্যে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের জন্য বরাদ্দ ১৫ কোটি টাকা। বুধবার সচিবালয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে এসব তথ্য দেন স্থানীয় সরকার মন্ত্রী তাজুল ইসলাম। তিনি জানান, ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন ছাড়া বাইরের ১০টি সিটি করপোরেশন পাচ্ছে ৮ কোটি টাকা এবং সব পৌরসভার জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ৩০ কোটি টাকা। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে মশার প্রকোপ বেশি, সে বিবেচনায় ১ হাজার ৬শ’ কর্মী নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। উত্তর সিটি করপোরেশনেও চাহিদা অনুযায়ী নিয়োগ চলছে।

আজ থেকে ঢামেকের ডেঙ্গু রোগীদের জায়গা হবে বার্ন ইনস্টিটিউটে : ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে (ঢামেক) নতুন করে ভর্তি হতে আসা ডেঙ্গু রোগীদের মধ্যে যাদের অবস্থা ‘অপেক্ষাকৃত ভালো’ তাদের জায়গা হবে শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে। আজ বৃহস্পতিবার থেকেই এই সিদ্ধান্তের বাস্তবায়ন হবে। গতকাল দুপুরে ঢামেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল একেএম নাসির উদ্দিন সাংবাদিক সম্মেলনে এসব কথা জানান। এসময় আরো উপস্থিত ছিলেন শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম, সমন্বয়কারী অধ্যাপক ডা. সামন্ত লাল সেন, হাসপাতালের সহকারী পরিচালক ডা. আলাউদ্দিন আল আজাদ প্রমুখ।

ডেঙ্গুতে ঢাকা মেডিক্যালে আরো ৩ জনের মৃত্যু : ডেঙ্গুতে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে গতকাল আরো ৩ জন মারা গেছেন। মুন্সীগঞ্জ সদরের আওলাদ হোসেন (৩২) মঙ্গলবার রাতে ঢাকা মেডিক্যালে ভর্তি হয়ে গতকাল মারা যান। কুমিল্লার লাকসামের বাসিন্দা আছিয়া (৩৯) গতকাল মারা যান। ৩ দিন আগে ঢাকা মেডিক্যালে ভর্তি হওয়া শরীয়তপুরের আমেনা (৬০) গতকাল মারা যান। ইউনাইটেড হাসপাতালের আইসিইউতে চিকিত্সাধীন অবস্থায় গতকাল ঢাকার সরকারি তিতুমীর কলেজের ছাত্র মেহেদী হাসানের মৃত্যু হয়।

এদিকে, চিত্রনায়ক আলমগীরের পর? এবার ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়েছেন অভিনেত্রী ইয়ামিন হক ববি। এদিকে বগুড়া-৪ আসন থেকে বিএনপির নির্বাচিত সংসদ সদস্য মো. মোশারফ হোসেনের দুই সন্তান ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছে। তার মেয়ে মাইশা আক্তার রোজার বয়স ৫। ছেলে মোছাববির হোসেন সামির বয়স ৩ বছর।

দেশের ডেঙ্গু পরিস্থিতি মহামারি না, স্বাভাবিকও না : স্বাস্থ্যমন্ত্রী

স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী জাহিদ মালেক বলেন, দেশে ডেঙ্গুর বর্তমান পরিস্থিতিকে মহামারি বলব না, স্বাভাবিকও বলব না। তবে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। গতকাল মুগদা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগ বিষয়ে বৈজ্ঞানিক সেমিনারে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি আরো বলেন, ‘মশা মারার দায়িত্ব আমাদের না। যখন কোনো মানুষ ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে আসবে তাদের চিকিত্সার দায়িত্ব আমাদের। এজন্য সবাইকে নিজ অবস্থানে থেকে যার যার দায়িত্ব পালন করতে হবে।’ স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, রোগীর সংখ্যা আরো বাড়লে তাদের সেবা দেওয়ার জন্য আমরা চারটি হাসপাতাল প্রস্তুত করছি। একটি হচ্ছে শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউট। এখানে ১ হাজার বেড প্রস্তুত আছে। অপরদিকে মহাখালীর শেখ রাসেল গ্যাস্ট্রোলিভার ইনস্টিটিউট, পঙ্গু হাসপাতালের নতুন ৫০০ বেডের যে ভবন হচ্ছে সেটা এবং সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের বর্ধিত ভবন।’

ঢাকা-৯ আসনের সংসদ সদস্য সাবের হোসেন চৌধুরী বলেন, ডেঙ্গু একটি বৈশ্বিক সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে। বাংলাদেশ মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের আয়োজনে এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এ সময় উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ডা. মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিন প্রমুখ। অনুষ্ঠানে ডেঙ্গুর কারণ ও রোগীদের ম্যানেজমেন্ট নিয়ে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বিএসএমএমইউর রিউম্যাটোলজি বিভাগের অধ্যাপক ডা. সৈয়দ আতিকুল হক।

সরকারের সতর্কতামূলক পরামর্শ : পবিত্র ঈদে রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশের বিভিন্ন শহর থেকে ঘরমুখী মানুষের জন্য সরকারিভাবে ডেঙ্গু সম্পর্কে কতিপয় সতর্কতামূলক পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, ঈদে বাড়ি যাওয়ার সময় বাসার সব কক্ষের দরজা-জানালা ভালোভাবে বন্ধ করার পাশাপাশি বাসার টয়লেটের কমোড ঢেকে রাখা, বাথরুম-টয়লেটের জানালা বন্ধ করা এবং বালতি, বদনা ও ড্রাম খালি অবস্থায় উলটো করে রাখা। এছাড়া বারান্দায়, ছাদে ফুলের টব বা এমন কোনো পাত্র রাখা যাবে না যেখানে বৃষ্টির পানি জমতে পারে।

ডেঙ্গু রোগীদের জন্য ৩৪০টি আইসিইউ : ডেঙ্গু রোগীদের চিকিত্সা সেবা নিশ্চিতে দেশের সরকারি হাসপাতালগুলোতে ৩৪০টি আইসিইউ বেড (নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রের বিছানা) এবং ৩৩৫টি ডায়ালাইসিস ইউনিট চালু আছে বলে জানানো হয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এক সভায়। অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় উপস্থিত ছিলেন রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার পরিচালক অধ্যাপক ডা. সানিয়া তহমিনা, হাসপাতাল সার্ভিস ম্যানেজমেন্টের লাইন ডিরেক্টর ডা. সত্যকাম চক্রবর্তী, জাতীয় ম্যালেরিয়া নির্মূল ও এডিস বাহিত রোগ নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির প্রোগ্রাম ম্যানেজার ডা. এম এম আক্তারুজ্জামান।

Print Friendly, PDF & Email