‘তারা আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠন আইএসের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতো’

নিজস্ব আদালত প্রতিবেদক : নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন জামাআতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ (জেএমবি) আট শীর্ষ নেতার বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দিয়েছে ঢাকা মহানগর পুলিশের কাউন্টার টেররিজম ইউনিট। গত সোমবার ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতে অভিযোগপত্র দেওয়া হয় বলে আদালত সূত্র নিশ্চিত করেছে।

অভিযোগপত্র বলছে, ‘তারা নিষিদ্ধ সংগঠন জেএমবির সদস্য হলেও আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠন আইএসের সঙ্গে গোপনে যোগাযোগ করে বাংলাদেশে তাদের সংগঠন তৈরি, সদস্য সংগ্রহ ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড পরিচালনার নেতৃত্ব দিয়ে আসছে বলে তদন্তে প্রকাশ পায়।’

মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের উপপরিদর্শক (এসআই) মো. আমির হোসেন এই অভিযোগপত্র আদালতে জমা দেন।

অভিযোগপত্রভুক্ত আট জঙ্গি নেতা হলেন, আমিনুল ইসলাম বেগ (৩৮), সাকিব বিন কামাল (৩৪), আবদুল্লাহ আল গালিব (২৭), ফিদা মুনতাসির সাকের (২৯), সজিব চন্দ্র দেবনাথ ওরফে মুহাম্মদ সাইফুল্লাহ ওজাকি (৩৯), কাজী সাইফ উদ্দিন ইয়াহিয়া (৪৪), গাজী কামরুল সালাম সোহান ওরফে আবদুল্লাহ (৩০) এবং নজিবুল্লাহ আনছারী (৩০)। এঁদের মধ্যে সাইফুল্লাহ ওজাকি এবং নজিবুল্লাহ আনছারী পলাতক।

২০১৫ সালের ২৪ মে উত্তরায় জেএমবির সমন্বয়ক আমিনুল ইসলামের বাড়িতে জঙ্গিরা গোপন বৈঠক করেন। এ ঘটনায় সেদিন পুলিশ পরিদর্শক শাহাদাত হোসেন খান বাদী হয়ে উত্তরা পশ্চিম থানায় সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা করেন।

অভিযোগপত্রে বলা হয়, ২০০১ সালে শায়খ আবদুর রহমানের নেতৃত্বে জেএমবি গড়ে ওঠে। ২০০৪ সালে জেএমবির সিদ্দিকুর রহমান ওরফে বাংলা ভাই, আবদুল আওয়াল, আতাউর রহমান সানিসহ অন্যান্য নেতা আলোচিত ছিলেন। রাজশাহীর বাগমারায় বাংলা ভাইয়ের নেতৃত্বে সর্বহারা নিধন শুরু হলে সমালোচনার ঝড় ওঠে। ২০০৫ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি জেএমবিকে নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন হিসেবে ঘোষণা করা হয়।

জঙ্গি মুহাম্মদ সাইফুল্লাহ ওজাকি : অভিযোগপত্রে বলা হয়, সাইফুল্লাহ ওজাকি সিলেট ক্যাডেট কলেজ থেকে ২০০১ সালে উচ্চমাধ্যমিক পাস করেন। সজিত চন্দ্র দেবনাথ ধর্মান্তরিত হয়ে সাইফুল্লাহ ওজাকি নাম নেন। পরে জেএমবিতে যোগ দেন। কথিত খেলাফত প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করতে থাকেন। তাঁর নির্দেশে জঙ্গি নেতা আমিনুল ইসলাম ও সাকিব বিন কামাল ১ লাখ ২৫ হাজার টাকা জেএমবির তহবিলে দেন। এক্স ক্যাডেট ইসলামিক লার্নিং ফোরাম নামে ফেসবুক পেজ খোলেন। এই পেজের মাধ্যমে আসামিরা নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ করেন।

আমিনুল ইসলাম বেগ : আমিনুল ইসলাম বেগ বরিশাল ক্যাডেট কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক পাস করেন। আমিনুল ইসলাম বেগ আসামি গাজী সোহানের তহবিলে ১ হাজার মার্কিন ডলার দেন। ২০১৩ সালের মাঝামাঝি সময়ে জেএমবির সক্রিয় সদস্য সাইফুল্লাহ ওজাকির সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়। আসামি সাকিব বিন কামাল জেএমবির তহবিলে সিরিয়া যুদ্ধে আহত শিশু ও নারীদের সহায়তা এবং বাংলাদেশে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের জন্য ১ লাখ ২৫ হাজার টাকা গাজী সোহানকে দেন। দেশের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের টার্গেট করে হত্যার মাধ্যমে খেলাফত প্রতিষ্ঠার জন্য আন্তর্জাতিক সংগঠন আইএসের ভাবধারায় উদ্বুদ্ধ হয়ে সন্ত্রাসী কার্যক্রমের উদ্যোগ নের।

সাকিব বিন কামাল  অভিযোগপত্রে বলা হয়, সাকিব ২০০৫ সালে আগা খান স্কুল থেকে এ লেভেল পাস করেন। ২০০৯ সালে বনানীর এআইইউবি থেকে স্নাতক ডিগ্রি নেন। ২০১৪ সালে আমিনুল ইসলাম বেগের সঙ্গে পরিচয় হয়। তখন জেএমবিতে যোগ দেন। সাইফুল্লাহ ওজাকির পরামর্শে আমিনুল ইসলাম বেগের মাধ্যমে জেএমবির তহবিলে ১ লাখ টাকা দেন।

কাজী সাইফ উদ্দিন ইয়াহিয়া : ২০১৩ সালে কাজী সাইফ উদ্দিনের মেয়ে উত্তরার পিস ইন্টারন্যাশনাল স্কুলে পড়াশোনা করত। সেখানে সাইফুল্লাহ ওজাকির সঙ্গে পরিচয় হয়। সাইফুল্লাহ পরে জাপানে চলে যান। সাইফুল্লাহর মাধ্যমে ইয়াহিয়া জেএমবিতে যোগ দেন। ইয়াহিয়া পরে জাপানে গিয়ে ওজাকির সঙ্গে দেখা করেন। ওজাকি বাংলাদেশে এলে ইয়াহিয়ার বাসায় অবস্থান করতেন। ওজাকি, আমিনুল, সাকিব একই মতাদর্শের হওয়ায় তাঁদের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে ওঠে। ওজাকি ইয়াহিয়াকে বলেন, ওজাকি তুরস্কে যাবেন। সিরিয়ার শরণার্থীদের জন্য খাবার ও শীতের কাপড় কিনবেন। এ জন্য ওজাকিকে তিনি ৭৫ হাজার টাকা দেন। ওজাকি একজন জাপানি বায়ারকে তাঁর অফিসে নিয়ে আসেন। নজিবুল্লাহকেও নিয়ে আসেন ওজাকি। পরে ইয়াহিয়া শোনেন, নজিবুল্লাহ এবং সোহান সিরিয়া গেছে আইএসে যোগ দেওয়ার জন্য।

গাজী কামরুল সোহান : অভিযোগপত্র বলছে, জাহান ২০১২ সালে এনার্জিপ্যাক ইঞ্জিনিয়ারিং নামের একটি কোম্পানিতে সহকারী প্রকৌশলী হিসেবে যোগ দেন। সেখানে ১০ মাস চাকরি করে ডেসকোতে যোগ দেন। ২০১৩ সালের মাঝামাঝি সময়ে এক্স ক্যাডেট ইসলামিক লার্নিং ফোরামে যোগ দেন। এ গ্রুপের অ্যাডমিন ছিলেন ওজাকি এবং আমিনুল। তাঁদের কাজ ছিল, মগজ ধোলাই করা এবং জিহাদের পথে নিয়ে আসা। আমিনুল সিরিয়ায় যুদ্ধে যাওয়ার ব্যাপারে উৎসাহিত করেন। ২০১৪ সালে ওজাকি ও আমিনুল তুরস্কের ভিসা পাওয়ার ব্যাপারে সহযোগিতা করেন। তুরস্কে গেলে ওজাকি তাঁকে গ্রহণ করেন। সিরিয়ায় যাওয়ার পর আইএসের সদস্যরা তাঁকে রাকা শহরে নিয়ে যান। তখন ওই এলাকা ছিল আইএসের নিয়ন্ত্রণে। পরে তাঁকে সেখানকার একটি বাসায় রাখা হয়। তাঁদের সহযোগিতা করার জন্য বলে। তিনি সহযোগিতা করতে অপারগতা করলে সোহানকে বাসায় আটকে রাখা হয়। তাঁদের বিরোধিতা করতে পারতেন না। কারণ তাঁরা লোকজনকে পুড়িয়ে জবাই করে মারত। পাঁচ মাস পর জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তেলাবিয়া, সিরিয়া শহরের বর্ডার দিয়ে তুরস্কে আসেন। পরে তুরস্ক পুলিশের কাছে সব কথা খুলে বলেন।
অভিযোগপত্রে আরও বলা হয়, তুরস্কে যাওয়ার আগে আমিনুল তাঁকে এক হাজার ডলার দেন। এই টাকা ওজাকিকে দেওয়ার জন্য বলেন আমিনুল।

আবদুল্লাহ আল গালিব : অভিযোগপত্র বলা হয়, গুলশানের একটি মসজিদে নাইজেরিয়ান নাগরিক ওয়াহেবির সঙ্গে পরিচয় হয় গালিবের। ওয়াহেবি তাঁকে আইএস সম্পর্কে বিভিন্ন ভিডিও ও ইসলামী জিহাদ বইপত্র অনলাইনে পড়তে দেন। গালিব নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন আনসারুল্লাহ বাংলা টিমসহ (আনসার আল ইসলাম) একাধিক সংগঠন তৈরি করে বিভিন্ন পরিকল্পনা করেন। গালিব আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের আঞ্চলিক সমন্বয়ক এবং আইএসের মতাদর্শী জেএমবির সক্রিয় সদস্য।

ফিদা মুনতাসির সাকের : পুলিশ বলছে, ফিদা মুনতাসির আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের সমন্বয়ক (আনসার আল ইসলাম)। আন্তর্জাতিক সংগঠন আইএসের মতাদর্শী জেএমবির সক্রিয় সদস্য।

নজিবুল্লাহ আনসারী : নজিবুল্লাহ আনসার সাইফুল্লাহ ওজাকির ঘনিষ্ঠ সহযোগী। ওজাকির মাধ্যমে জেএমবিতে নজিবুল্লাহ যোগ দেন। নাজিবুল্লাহ সিরিয়া গিয়ে আইএসের পক্ষে কাজ করার জন্য যান।

এই আসামিদের কাছ থেকে মুঠোফোন, ল্যাপটপ জব্দ করা হয়। অভিযোগপত্রে বলা হয়, ভিডিও পর্যালোচনায় প্রতীয়মান হয়, আসামিরা আন্তর্জাতিক সংগঠন আইএসের আদলে এবং এর ভাবধারায় বাংলাদেশের নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠনের সদস্য।