‘ধর্ষণ মামলার আসামিরা অনেক ক্ষেত্রেই বেপরোয়া প্রকৃতির’: হাইকোর্ট

নিজস্ব বার্তা প্রতিবেদক : ‘আমাদের অভিজ্ঞতা হলো যে, ধর্ষণ সংক্রান্ত মামলার আসামিরা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বেপরোয়া ও দুর্দান্ত প্রকৃতির। এরা ভিকটিম ও তার পরিবারের ওপর চাপ-প্রভাব বিস্তার করে আদালতে সাক্ষ্য দিতে ভয়-ভীতি, প্রলোভনসহ বিভিন্ন ধরনের কূটকৌশল অবলম্বন করে। ক্ষেত্র বিশেষে সালিশের নামে সামাজিক বিচার করে ভিকটিম ও তার পরিবারকে মামলা প্রত্যাহারে বাধ্য এবং আদালতে সাক্ষ্যপ্রদানে বিরত থাকার জন্য চাপ দিয়ে থাকে।’

ধর্ষণ মামলার দুটি জামিন আবেদনের আপিলের নিষ্পত্তির আদেশে এমন অভিমত দিয়েছেন বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি মো. মোস্তাফিজুর রহমানের হাইকোর্ট বেঞ্চ।

গত ১৮ জুলাই দেওয়া এ রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে। আদেশে আদালত বলেন, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০০ এর ধারা ২০(৩)-এ সুস্পষ্টভাবে মামলা বিচারের জন্য নথি পাওয়ার তারিখ থেকে ১৮০ দিনের মধ্যে বিচারকার্য সমাপ্ত করা এবং ধারা ২০(২)-এ মামলার শুনানি শুরু হলে তা শেষ না হওয়া পর্যন্ত প্রতি কর্মদিবসে একটানা পরিচালনার নির্দেশনা থাকা সত্বেও তা যথাযথভাবে অনুসরণ ও প্রতিপালন হচ্ছে না; ব্যতিক্রম দু-একটি ক্ষেত্রে।’

‘সামগ্রিক অবস্থা বিবেচনায় ধর্ষণ এবং ধর্ষণ পরবর্তী হত্যা মামলাসহ নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০০ এর অধীন অন্যান্য মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য সংবিধানের ১০৯ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী হাইকোর্ট বিভাগকে প্রদত্ত ক্ষমতা প্রয়োগে নির্দেশনাগুলো দেওয়া হলো-

এক. দেশের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালগুলোতে বিচারাধীন ধর্ষণ ও ধর্ষণ পরবর্তী হত্যা মামলাগুলো অগ্রাধিকার ভিত্তিতে আইনের নির্ধারিত সময়সীমার (বিচারের জন্য মামলা প্রাপ্তির তারিখ থেকে ১৮০ দিন) মধ্যে যাতে দ্রুত বিচারকাজ সম্পন্ন করা যায় সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ট্রাইব্যুনালের বিচারকদের সব ধরনের আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া যাচ্ছে।

দুই. ট্রাইব্যুনালগুলোকে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন-২০০০ এর ধারা ২০ (২)-এর বিধান অনুসারে মামলার শুনানি শুরু হলে তা শেষ না হওয়া পর্যন্ত প্রতি কর্মদিবসে একটানা মামলা পরিচালনা করতে হবে।

তিন. ধার্য তারিখে সাক্ষী উপস্থিতি ও সাক্ষীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে প্রতি জেলায় অতিরিক্তি জেলা ম্যাজিস্ট্রেট, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন), সিভিল সার্জনের একজন প্রতিনিধি ও সংশ্লিষ্ট ট্রাইব্যুনালের পাবলিক প্রসিকিউটরের সমন্বয়ে একটি মনিটরিং কমিটি গঠন করতে হবে। ট্রাইব্যুনালে পাবলিক প্রসিকিউটর কমিটির সমন্বয়কের দায়িত্বে থাকবেন এবং কমিটির কার্যক্রম সম্পর্কে প্রতি মাসে সুপ্রিম কোর্ট, স্বরাষ্ট্র এবং আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে প্রতিবেদন পাঠাবেন। যেসব জেলায় একাধিক ট্রাইব্যুনাল রয়েছে সেসব জেলায় সেসব ট্রাইব্যুনালের পাবলিক প্রসিকিউটররা মনিটরিং কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত হবেন এবং তাদের মধ্যে যিনি জ্যেষ্ঠ তিনি সমন্বয়কের দায়িত্ব পালন করবেন।

চার. ধার্য তারিখে রাষ্ট্রপক্ষ সঙ্গত কারণ ছাড়া সাক্ষীকে আদালতে উপস্থাপন করতে ব্যর্থ হলে মনিটরিং কমিটিকে জবাবদিহি করতে হবে।

পাঁচ. মনিটরিং কমিটি সাক্ষীদের উপর দ্রুততম সময়ে যাতে সমন জারি করা যায় সে বিষয়েও মনিটরিং করবেন।

ছয়. সমন জারির পরও ধার্য তারিখে অফিসিয়াল সাক্ষীরা যেমন- ম্যাজিস্ট্রেট, পুলিশ, ডাক্তার বা অন্যান্য বিশেষজ্ঞরা সন্তোষজনক কারণ ব্যতিরেকে সাক্ষ্য দিতে উপস্থিত না হলে, ট্রাইব্যুনাল ওই সাক্ষীর বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ এবং প্রয়োজনে বেতন বন্ধের আদেশ দিতে বিবেচনা করবেন।’

আদালতের অভিমত ও প্রত্যাশা : ‘আমাদের অভিজ্ঞতা হলো যে, ধর্ষণ সংক্রান্ত মামলার আসামিরা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বেপরোয়া ও দুর্দান্ত প্রকৃতির। এরা ভিকটিম ও তার পরিবারের উপর চাপ-প্রভাব বিস্তার করে আদালতে সাক্ষ্য দিতে ভয়-ভীতি, প্রলোভনসহ বিভিন্ন ধরনের কূটকৌশল অবলম্বন করেন। ক্ষেত্র বিশেষে সালিশের নামে সামাজিক বিচার করে ভিকটিম ও তার পরিবারকে মামলা প্রত্যাহারে বাধ্য এবং আদালতে সাক্ষ্য দিতে বিরত থাকার জন্য চাপ দিয়ে থাকে।’

‘উপরোক্ত অবস্থা বিবেচনায় নিয়ে আদালতের সুচিন্তিত অভিমত এই যে, অবিলম্বে সাক্ষী সুরক্ষা আইন প্রণয়ন করা প্রয়োজন এবং আদালত এটাও প্রত্যাশা করছে যে, সরকার দ্রুততম সময়ে এ বিষয়ে আইন প্রণয়ন করবে।’

‘এসব নির্দেশনা বাস্তবায়ন ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য আদেশের অনুলিপি সংশ্লিষ্ট ট্রাইব্যুনালসহ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সুরক্ষা ও সেবা বিভাগের সচিব, আইন সচিব, সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেলকে পাঠাতে বলা হয়েছে।’

আদালতে আসামিদের পক্ষে ছিলেন, আইনজীবী আব্দুল্লাহ আল মাহবুব।

রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম, সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল মৌদুদা বেগম, হাছিনা মমতাজ ও শাহানা পারভীন।

গত বছরের ২৮ জুন তৃতীয় শ্রেণির ছাত্রীকে ধর্ষণের ঘটনায় বগুড়ার সারিয়াকান্দি থানায় মামলা করেন ছাত্রীর বাবা। এ ঘটনায় তদন্ত শেষে পুলিশ ২ সেপ্টেম্বর অভিযোগপত্র দেয়। ওই মামলায় এখন পর্যন্ত অভিযোগ গঠন না হওয়ায় আসামি মো. রাহেল ওরফে রায়হান সংশ্লিষ্ট ট্রাইব্যুনালে জামিন চাইলে গত ১ জুলাই তার জামিন আবেদনটি খারিজ হয়।

পরে হাইকোর্টে জামিন আবেদন করেন রাহেল। ১৮ জুলাই হাইকোর্ট তার আবেদন খারিজ করে দেন।

গত বছর ১৭ মার্চ ঢাকার শনির আখড়ায় আট বছরের এক শিশুকে ধর্ষণের মামলায় আসামি সেকান্দার আলীর জামিন চলতি বছরের ২৪ জুন নামঞ্জুর করেন ঢাকার ট্রাইব্যুনাল-৩।

এর বিরুদ্ধে হাইকোর্ট জামিন আবেদনের পর ১৮ জুলাই তাদের আবেদনও খারিজ করেন হাইকোর্ট।

Print Friendly, PDF & Email