পাকিস্তান–প্রেসিডেন্টের ফোন পেয়েছিলেন সৌরভ, কেন?

নিজস্ব ডেস্ক প্রতিবেদক : ২০০৪ সালে পাকিস্তান সফরে এক রাতে লাহোরে কাবাব খেতে গিয়েছিলেন সে সময়কার ভারতীয় অধিনায়ক সৌরভ গাঙ্গুলী। নিরাপত্তা–ব্যবস্থাকে ফাঁকি দিয়ে ঝুঁকিপূর্ণ সেই ঘুরতে যাওয়ার খবর পৌঁছেছিল পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট পারভেজ মোশাররফের কানেও।
নিজের আত্মজীবনী ‘অ্য সেঞ্চুরি ইজ নট এনাফ’ এ ঘটনাটা বেশ রসিয়েই বর্ণনা করেছেন সৌরভ গাঙ্গুলী। ভারতের সাবেক অধিনায়ক, বর্তমানে ক্রিকেট বোর্ডের সভাপতি আজ থেকে ১৬ বছর পাকিস্তান সফরে কীভাবে নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে ফাঁকি দিয়ে বন্ধু–বান্ধবদের সঙ্গে হাওয়া খেতে বেরিয়েছিলেন তাঁর সবিশেষ বর্ণনা আছে বইটির একটি অধ্যায়ে। তবে ঘটনার শেষ এখানেই নয়।

সৌরভের নিরাপত্তা–ব্যবস্থাকে ফাঁকি দেওয়ার খবর পৌঁছে গিয়েছিল তৎকালীন পাকিস্তান প্রেসিডেন্ট জেনারেল পারভেজ মোশাররফের কানে। পাকিস্তান প্রেসিডেন্টের কাছ থেকে এ জন্য সৌরভকে মৃদ্যু তিরস্কারও শুনতে হয়েছিল।
২০০৪ সালে সৌরভের নেতৃত্বে পাকিস্তান সফর করে ভারতীয় দল। সেবার টেস্ট ও ওয়ানডে, দুই সিরিজেই জয় পায় ভারত। দীর্ঘ দিন পর পাকিস্তানের মাটিতে ভারতের সিরিজ জয় স্বাভাবিকভাবেই সৌরভের অধিনায়কত্বকে করেছিল সমৃদ্ধ। ঘটনাটি ওয়ানডে সিরিজ জয়ের দিন রাতে। ফুরফুরে মন নিয়ে সেদিন সৌরভ ফাঁকি দিয়েছিলেন লাহোরের পার্ল কন্টিনেন্টাল হোটেলকে দুর্গ বানিয়ে রাখা এক গাদা কমান্ডোকে।

কাবাব খেতে বেরিয়েছিলেন সৌরভ, সঙ্গে কলকাতার কয়েকজন বন্ধু–বান্ধব। ওয়ানডে সিরিজ জিতে যেন কিছুটা অ্যাডভেঞ্চারের নেশাই পেয়ে বসেছিল তাঁকে। কাবাব ও অন্যান্য মুখরোচক খাবারের জন্য বিখ্যাত লাহোরের গোয়ালমান্ডি এলাকা। সৌরভ ও তাঁর বন্ধুরা গেলেন সেখানেই। রাতের অন্ধকারে লোকের ভিড়ে মিশে মজার করে কাবাব খাওয়ার আশায়।

গোয়ালমান্ডি এলাকাটিতে প্রচুর খাবারের দোকান। সবই রাস্তায়। সারা রাত ধরে সেখানে থাকে রসনাবিলাসী মানুষের ভিড়। সেদিনও এর ব্যতিক্রম ছিল না। বন্ধুদের সঙ্গে সৌরভের ভোজনের সময় দুই একজন মানুষের হয়তো মনে হয়েছিল, ওই টেবিলের লোকটা ভারত অধিনায়ক সৌরভ গাঙ্গুলীর মতো দেখতে না? ব্যস, ওই পর্যন্তই। সাধারণ মানুষও সেদিন ভাবতে পারেননি, এমন কঠোর নিরাপত্তা–ব্যবস্থা ভেদ করে ভারতের অধিনায়ক কীভাবে গোয়ালমান্ডিতে কাবাব খেতে আসবেন!

ভালোই ছিল সেই ভোজনপর্ব। বলতে গেলে কেউই সেই ভিড়ে সৌরভকে চিনতে পারেননি। কিন্তু গোল বাঁধান সৌরভেরই স্বদেশী এক সাংবাদিক—রাজদীপ সারদেশাই। তিনিও সেদিন সেখানে খেতে গিয়েছিলেন। সঙ্গে কেন্দ্রীয় তথ্য ও সংস্কৃতি মন্ত্রী রবি শঙ্কর প্রসাদ। রাজদীপ সৌরভকে চিনতে পেরেই চিৎকার করে ওঠেন, ‘আরে সৌরভ, তুমি এখানে কী করছ?

ব্যস, আর যায় কোথায় পুরো গোয়ালমান্ডি ভেঙে পড়ে সৌরভরে ওপর। খাওয়া–টাওয়া ফেলে সবাই ছুটে আসে—একটা ছবি যদি তোলা যায়, কিংবা একটা অটোগ্রাফ। ১৬ বছর আগে সময়টা ‘সেলফি’র ছিল না, ছিল না সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের। কিন্তু ততদিনে মোবাইল ফোনে ক্যামেরা আসা শুরু হয়ে গেছে। পাকিস্তানের মাটিতেও সৌরভ যে এত জনপ্রিয়, সেদিন সেটি বোঝা গিয়েছিল। কোনোমতে সেদিন পুলিশের সাহায্যে পাকিস্তানি ভক্তদের কাছ থেকে রেহাই মিলেছিল তাঁর।

পরদিন সকালে আগের রাতে বাইরে বের হওয়ার ঘটনাটি সৌরভ স্বীকার করেন দলীয় ম্যানেজারের কাছে। তিনি যে খুব খুশি হননি সেটি সৌরভ লিখেছেন তাঁর আত্মজীবনীতে, ‘পরদিন সকালে দলের ম্যানেজারের কাছে বলতেই হতো আগের রাতে কী হয়েছিল। আমি স্বীকার করলাম, আগের রাতে বাইরে বের হওয়ার ব্যাপারটি। তিনি যে খুব খুশি হননি, সেটি বলাই বাহুল্য।’

এই স্বীকারোক্তির পরপরই হোটেল কক্ষে ফিরে প্রেসিডেন্ট পারভেজ মোশাররফের ফোন পান সৌরভ। তিনি লিখেছেন, ‘স্বীকারোক্তি দিয়ে হোটেলে রুমে ফেরার সঙ্গে সঙ্গেই ফোন বেজে উঠল। পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জেনারেল পারভেজ মুশাররফের কার্যালয় থেকে ফোন। ফোনে আমাকে বলা হলো, প্রেসিডেন্ট আমার সঙ্গে কথা বলতে চান। আমার তখন ভয়ে জিহ্বা জড়িয়ে যাওয়ার অবস্থা। এমন কি ঘটল যে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ভারতীয় ক্রিকেট দলের অধিনায়কের সঙ্গে কথা বলতে চান?’

সৌরভ অবাক হয়েছিলেন জেনারেল মোশাররফের কথা শুনে। আগের রাতে সৌরভ নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে ফাঁকি দিয়ে যে গোয়ালমান্ডিতে কাবাব খেতে গিয়েছিলেন, সেটি সম্পর্কে পুরোপুরি ওয়াকিবহাল ছিলেন পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট। সৌরভকে তিনি বলেস, ‘এর পর তুমি যদি বাইরে যতে চাও, তাহলে অবশ্যই নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিবর্গের সঙ্গে যোগাযোগ কোরো। ব্যাপারটা তাদের জানিও। আমরা তোমার জন্য নিরাপত্তারক্ষীর ব্যবস্থা করব। তবে দয়া করে আর কোনো অ্যাডভেঞ্চারে যেও না।’

প্রেসিডেন্ট মোশাররফের এমন কথা শুনে কেমন অবস্থা হয়েছিল সৌরভের, ‘আমার মনে হয়েছিল এর চেয়ে তো ওয়াসিম আকরামের সুইং খেলা অনেক সহজ!’