বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিনিধি দল রিজার্ভ চুরির ঘটনায় মামলার কার্যক্রম পর্যালোচনায় যুক্তরাষ্ট্র গেছেন

নিজস্ব প্রতিবেদক : বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির ঘটনায় চলতি মাসের মাঝামাঝি সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের আদালতে মামলা করা হচ্ছে। মামলার কার্যক্রম পর্যালোচনায় বাংলাদেশ ব্যাংকের ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) প্রধান আবু হেনা মোহাম্মদ রাজি হাসান গত রাতে যুক্তরাষ্ট্রে গেছেন । ইতিমধ্যে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব মো. আসাদুল ইসলামের নেৃৃত্বে একটি প্রতিনিধিদলও সেখানে গিয়ে পৌঁছেছেন। আগামী ৩ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত এই মামলা দায়েরের সময় রয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র সিরাজুল ইসলাম এ তথ্য জানিয়ে বলেন, মামলার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের দুটি ল’ ফার্মকে নিয়োগ দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এই ফার্ম দুটির কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করতে এরই মধ্যে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব মো. আসাদুল ইসলামের নেতৃত্বে উচ্চপর্যায়ের একটি প্রতিনিধিদল যুক্তরাষ্ট্রে গেছেন। আর, ৮ জানুয়ারি মঙ্গলবার রাতে যুক্তরাষ্ট্রে গেছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) প্রধান আবু হেনা মোহাম্মদ রাজি হাসান। আশা করছি, নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই সেখানে মামলা করা সম্ভব হবে।’ নিয়ম অনুযায়ী, আগামী ৩ ফেব্রুয়ারির মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের আদালতে এ মামলা করতে হবে।

২০১৬ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকে সংরতি বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভের ১০ কোটি ১০ লাখ মার্কিন ডলার চুরি হয়। বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ সাইবার চুরির এই ঘটনা বাংলাদেশের মানুষ জানতে পারে ঘটনার এক মাস পর, ফিলিপিন্সের একটি পত্রিকার খবরের মাধ্যমে। বিষয়টি চেপে রাখায় সমালোচনার মুখে গভর্নরের পদ ছাড়তে বাধ্য হন আতিউর রহমান। ওই সময় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের শীর্ষপর্যায়ে আনা হয় বড় ধরনের রদবদল।

জানা গেছে, চুরি হওয়া অর্থের মধ্যে শ্রীলঙ্কা থেকে দুই কোটি ডলার ফেরত আসে। কিন্তু ফিলিপাইনে যাওয়া ৮ কোটি ১০ লাখ ডলারের মধ্যে এখনও ৬ কোটি ৬৪ লাখ ডলার ফেরত আসেনি। এই ৬ কোটি ৬৪ লাখ ডলার ফেরত পাওয়ার জন্যই যুক্তরাষ্ট্রের আদালতে মামলা দায়ের করা হবে। এ জন্য দেশটিতে দুটি ল’ ফার্মকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তাদের ফি নিয়ে একটি প্রাথমিক চুক্তিও করা হয়েছে।
চুক্তি অনুযায়ী, চুরি যাওয়া ৬ কোটি ৬৪ লাখ ডলার উদ্ধার করে দিতে পারলে ল’ ফার্ম দুটিকে সেই অর্থের ১০ ভাগ দেওয়া হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র জানান, রিজার্ভ চুরির বিষয়ে প্রধান আসামি করা হবে ফিলিপাইনের রিজাল কমার্শিয়াল ব্যাংককে (আরসিবিসি)। তবে দ্বিতীয় আসামি হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকের বিরুদ্ধে করা হবে কিনা, তা নিশ্চিত হওয়া যাবে ল’ ফার্মের কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলাপের পর।

এর আগে গত নভেম্বরে ফেডের প থেকে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরকে চিঠি দিয়ে বলা হয়েছে, ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক অব নিউইয়র্ক (ফেড) বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির অর্থ উদ্ধারে সর্বাত্মক সহযোগিতা করবে। ফেডের প থেকে এ ধরনের আশ্বাস পাওয়ার ব্যাপারটি ইতিবাচক হিসেবে নিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

উল্লেখ্য, গত ৬ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির সঙ্গে উত্তর কোরিয়ার হ্যাকার পার্ক জিনের জড়িত থাকার তথ্য প্রকাশ করে এফবিআই। ওই সময় যুক্তরাষ্ট্রের একটি আদালত আনুষ্ঠানিকভাবে পার্ক জিনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনেরও নির্দেশ দেন। এই ঘটনায় বাংলাদেশের চুরি যাওয়া টাকা ফেরত পাওয়ার ব্যাপারে বেশি আশাবাদী হয়ে উঠেছে।

জানা গেছে, চুরি যাওয়া প্রায় ২ কোটি ৮০ লাখ ডলার (২৪৪ কোটি টাকা) গেছে সোলারি ক্যাসিনিওতে। এই পরিমাণ অর্থ ফিলিপাইনের সুপ্রিম কোর্টের আদেশে ফ্রিজ করে রাখা হয়েছে। আর ১ কোটি ৪৫ লাখ ৪০ হাজার এবং আরসিবিসি ব্যাংকে জমা ৭০ হাজার ডলার ফেরত পাওয়া গেছে। এখন পর্যন্ত সন্ধান পাওয়া যায়নি ১ কোটি ৪২ লাখ ডলারের। বাকি অর্থের মধ্যে ১ কোটি ৭০ লাখ ডলার আছে ফিলিপাইনের রেমিটেন্স কোম্পানি ফিলরেমোর হিসাবে। ৬০ লাখ ডলার এখনও রয়েছে কিম অং-এর কাছে। এছাড়া ১২ লাখ ডলারের সন্ধান পাওয়া গেছে কিম ওয়াংয়ের দুজন কর্মচারীর ব্যাংক হিসাবে।

বিশ্বজুড়ে আলোড়ন তোলা এই রিজার্ভ চুরির ঘটনায় বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিনের নেতৃত্বাধীন তদন্ত কমিটি অর্থমন্ত্রীর কাছে অনেক আগে প্রতিবেদন জমা দিলেও এ পর্যন্ত তা প্রকাশ করা হয়নি।

Print Friendly, PDF & Email