ভূয়া নিলাম করিয়ে মৃত মুক্তিযোদ্ধার স্ত্রীর ৬তলা ভবন জবর দখল

আনোয়ারা পারভীন : ঢাকার দেউলিয়া আদালতে দেউলিয়া ঘোষিতের বাড়ি বিক্রির জাল নিলাম কার্যক্রমের চাঞ্চলকর তথ্য উদঘাটিত হয়েছে। এই ঘটনায় রাজধানীর কাকরাইলে স্কাউট ভবনের পেছনে এক মৃত মুক্তিযোদ্ধার অসহায় স্ত্রীর ভূমি ভূয়া নিলাম করিয়ে ভূমিসহ নিলাম বহির্ভূত ৬তলা ভবন জবর দখল করা হয়েছে।

তথ্যানুসন্ধানে দেখা গেছে, মুল পত্রিকায় নিলাম বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিতই হয়নি। অথচ আদালতে নিলাম কার্যক্রম পরিচালনাকারী রিসিভার কর্তৃক দু’টি জাতীয় দৈনিকে নিলাম বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত হয়েছে মর্মে ঐ দু’টি পত্রিকার ভুয়া নিলাম বিজ্ঞপ্তির সত্যায়িত ফটো কপি জমা দিয়ে ভূয়া নিলামে মৃত মুক্তিযোদ্ধার অসহায় স্ত্রীর ১০ কোটি টাকার সম্পদ ১ কোটি ২০ লাখ টাকায় বিক্রি করা হয়েছে। এই ভূয়া নিলাম জালিয়াতির ঘটনায় আড়াই কাঠা ভূমিতে নির্মিত ৬ তলা ভবনের কথা গোপন করে শুধু মাত্র ভূমি নিলাম করা হয়েছে। উপরন্ত নিলামের টাকা ব্যাংকে বুঝিয়ে না দিয়েই নিলামকৃত ভূমি এবং ভূমির উপর নির্মিত ভবনের আংশিক দখল নিলাম গ্রহীতার অনুকুলে বুঝিয়ে দেয়া হয়েছে।

ঘটনাটি ঘটেছে ঢাকার ৩৬/২ কাকরাইলে। ঘটনার তথ্যানুসন্ধানে জানা গেছে, মেসার্স নিয়াজ গার্মেন্টস এর অনুকুলে ১৯৯৫ সালে বাংলাদেশ শিল্প ব্যাংক থেকে ৩৯ লাখ ৭৫ হাজার টাকার ঋণ প্রদান করে। এই ঋনের অনুকুলে কোম্পানী কাফরুল থানার এক জমি ব্যাংকের অনুকুলে মটগেজ প্রদান করেন। পরবর্তীতে কোম্পানি দেউলিয়া হয়ে যায়। ফলে সময় মত ঋন পরিশোধ না করায় ব্যাংক অনাদায়ী ঋণের সুদাসল ৫৩ লাখ ২২ হাজার টাকার খেলাপি ঋণ আদায়ে ১৯৯৯ সালে কোম্পানির বন্দককৃত জমি নিলাম করে টাকা আদায়ের চেষ্টা না, করে কোম্পানী ও তার পরিচালকদের দেউলিয়া ঘোষনা করতে ঢাকার দেউলিয়া আদালতে ৪/৯৯ নং মামলা দায়ের করেন। ব্যাংক কর্তৃপ তাদের মামলায় ঐ কোম্পানির ৪০% শেয়ার হোল্ডার রোকসানা পারভীনের বসত বাড়ীটিই শুধু দেউলিয়া আদালতের বি তপশিল দেখান। কিন্তু অন্য পরিচালকদের কোন সম্পত্তির বিবরণ দেননি। অবশেষে ২০০৮ সালে কোম্পানি ও তার ৪ জন পরিচালককে দেউলিয়া ঘোষনা করা হয় এবং অসহায় ঐ মুক্তিযোদ্ধা পরিবার রোকসানা পারভীনের বি তপসিল বর্ণিত সম্পত্তি বিক্রয় করে ব্যাংকের টাকা আদায়ে অবসর প্রাপ্ত জেলা জজ সুলতান আহম্মেদ মিঞাকে রিসিভার নিয়োগ করা হয়। রোকসানা পারভীনের স্বামী বীর মুক্তিযোদ্ধা ও সেনা বাহিনীর অবসর প্রাপ্ত মেজর, কাজী মাজেদুর রহমান ২০১৪ সালের ১৩ নভেম্বর মারা যাওয়ার পর রিসিভার অসহয় ঐ মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের বি তপসিল বর্ণিত সম্পত্তি নিলামে বিক্রয় করার জন্য ১৩ মে ২০১৫ তারিখের জাতীয় দৈনিক যুগান্তর ও দৈনিক খবর পত্রিকায় নিলাম দরপত্র আহবানের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত হবার কথা আদালতে উল্লেখ করেন। অথচ বর্ণিত তারিখের উল্লেখিত দু’টি পত্রিকায় এধরনের কোন নিলাম দরপত্রের বিজ্ঞপ্তিই প্রকাশিত হয়নি। উপরন্ত এই জাল জালিয়াতির নিলামে ঐ আড়াই কাঠা সম্পত্তির উপরে থাকা ভবনের কথা গোপন করে কারসাজির মাধ্যমে ১০ কোটি টাকার সম্পদ ১ কোটি ২০ লাখ টাকায় নিলাম বিক্রয় আদালতের মাধ্যমে সম্পন্ন করে নিলাম গ্রহিতার অনুকুলে ঐ আড়াই কাঠা জমি হস্তান্তর বাবদ ঢাকা সাব রেজিঃ অফিসে ১৮১৩/১৬ নং দলিল সম্পাদন করেন। ঐ দলিলেও ৬ তলা ভবনের কথা গোপন করা হয়। রিসিভার গত ২০১৭ সালের ২১ জুন তারিখে নিলামকৃত জমির দখল নিলাম গ্রহিতার অনুকুলে বুঝিয়ে দিতে এসে ৬ তলা ভবনটিসহ দখল বুঝে দিতে গেলে তাতে বাধ সাধেন ঐ ভবনের মালিক অসহায় ঐ মুক্তিযোদ্ধা পরিবারটি। কিন্তু নিলাম ক্রেতার সাথে শত শত লাঠিয়াল গুন্ডা বাহিনী থাকায় ভবনের একটি অংশ বাদে বাদবাকি অংশ জোর করে দখল নেয়া হয়।

রোকসানা পারভীন এর আইনজীবি জানান, এ বিষয়ে দৈনিক আমাদের অর্থনীতি’র গত ২৩ ফেব্রুয়ারি সংখ্যায় একটি অনুসন্ধানি প্রতিবেদন প্রকাশিত হওয়ায় জালিয়াত চক্র নানামুখী অপতৎপরতা শুরু করেছে। তারা আদালতের নথি থেকে গুরুত্বপূর্ণ দলিলাদি সরিয়ে ফেলছে। এই আইনজীবি ঢাকার দেউলিয়া আদালতে মামলার আদেশ সহ অন্যান্য দলিলাদির নকল সরবরাহের আবেদন করেও পাচ্ছেননা। তিনি আরও বলেন, এই জাল চক্রের বিরুদ্ধে তিনি তার মক্কেলের পক্ষ্যে ফৌজদারি বা দেওয়ানী মামলা করতে পারছেননা। কারণ দেউলিয়া বিষয়ক আইনে সকল ক্ষমতা দেউলিয়া আদালতের। তাছাড়া আদালতের সেরাস্তাদার নথি সংরক্ষণ করেন। আর ঐ নথিতে বিজ্ঞ রিসিভার কর্তৃক জমা দেওয়া জাল ভুয়া নিলাম বিজ্ঞপ্তির নোটিশ সংক্রান্ত পত্রিকার কাটিং সরিয়ে ফেলা হয়েছে। তাই তিনি সংশ্লিষ্ট আদালতে নথি পুটআপ দিয়ে গত ২ মে আবেদন করেন। কিন্তু সেরেস্তাদার সময় মতো আদালতে নথি পেশ করতে অস্বীকৃতি জানান। তার পিড়াপিড়িতে আদালত চলাকালীন শেষের দিকে আদালতে নথি পেশ করা হয়। তিনি বলেন, দেউলিয়া আইন মোতাবেক বিজ্ঞ রিসিভারের ইচ্ছাকৃত ভুল কর্মে কোন পক্ষের ক্ষতি হলে রিসিভারের ব্যক্তিগত সম্পত্তি ক্রোক করে ক্ষতি পুরণ আদায়ের বিধান আছে।

এ প্রসঙ্গে রোকসানা পারভীন জানান, বাড়ি জবর দখলের তান্ডবে তিনি ব্যাপক অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন। দীর্ঘ চিকিৎসার পর এখন কোন রকম চলা ফেরার অবস্থা তৈরি হওয়ায় তিনি তার ভবন নিলাম না হওয়ার পরেও জবর দখলের চেষ্টা প্রতিরোধ করতে ব্যাংক কর্তৃপ এবং আদালতকে বারবার লিখিত আবেদন নিবেদন জানালেও তাতে তারা কর্নপাত করছেননা। রোকসানা পারভীন আরও জানান, তাঁকে তাঁর বাড়ী থেকে বের করে দেয়ার জন্য নিলাম ক্রেতা বারবার হুমকি প্রদান করছেন। তিনি বলেন, তার স্বামী মারা যাওয়ার পর এই চক্রটি তার ভবন অবৈধ ভাবে দখল করে মাসে মাসে ভবনে এসে জোর করে ভাড়ার টাকাগুলো নিয়ে যাচ্ছেন। যার ফলে তিনি ও তার পরিবার মানবেতর জীবন জাপন করছেন। আপে করে তিনি বলেন, বাসা ভাড়ার টাকায় কোন রকমে তার সংসার চলছিলো। তাঁর স্বামী দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে অংশ নিয়ে দেশটাকে স্বাধীন করেছিলেন। আর সেই দেশে তিনি পরাধীনতার শৃংখলে আবদ্ধ আছেন। ব্যাংক ঋনের শেয়ার অনুযায়ী তিনি ৪০ লাখের ভেতরে ৪০% শেয়ারে ১৭ লাখ টাকা আদালতে প্রদান করলেও তাঁকে দেউলিয়ার দায় থেকে মুক্তি দেয়া হয়নি। তিনি আরও বলেন, বর্তমান অবস্থায় জমির মালিক ভূয়া নিলাম ক্রেতা। আর ভবনের মালিক আমি। কিন্ত আমার নিলাম বহির্ভূত ভবনে ভাড়ার টাকা রিসিভারের ভুল কর্মে নিলাম গ্রহিতা জোর পূর্বক আদায় করে নিয়ে যাচ্ছে।

Print Friendly, PDF & Email