ক্যাসিনো সরঞ্জাম আমদানি হয় ভ্যাট ফাঁকি দিয়ে মিথ্যা ঘোষণায়

নিজস্ব বার্তা প্রতিবেদক : দেশে ২০০৯ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত প্রায় ৫২ চালানে ক্যাসিনো সরঞ্জাম আমদানি হয়েছে। কখনও ঘোষণায়, কখনও ঘোষণাবহির্ভূত আবার কখনও মিথ্যা ঘোষণায় আমদানি হয় ক্যাসিনো সরঞ্জাম। এর মাধ্যমে শুল্ককর ফাঁকির পাশাপাশি অর্থ পাচারের প্রমাণ পেয়েছে কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর। সেজন্য ২০ প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অর্থ পাচারের অভিযোগে মানি লন্ডারিং আইনে মামলার সুপারিশ করা হয়েছে।

এরই মধ্যে বেশ কয়েকটি মামলার প্রতিবেদন জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) চেয়ারম্যানের অনুমোদনের জন্য পাঠানো হয়েছে; কিছু প্রতিবেদন প্রক্রিয়াধীন। অনুমোদন হলে সহসাই এসব মামলা করবে কাস্টমস গোয়েন্দা। ক্যাসিনোকাণ্ডে প্রথমবারের মতো এনবিআরের পক্ষ থেকে মামলা করা হচ্ছে। তবে ক্যাসিনোকাণ্ডে জড়িতদের কর ফাঁকি খতিয়ে দেখছে এনবিআরের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা (সিআইসি)। এনবিআর সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।

সূত্র জানায়, গত ১৮ সেপ্টেম্বর থেকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে ক্যাসিনোর সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে বেশ কয়েকজন প্রভাবশালী গ্রেফতার হন। তখন কোটি কোটি টাকা মূল্যের ক্যাসিনো সরঞ্জাম কীভাবে দেশে আমদানি হয়েছে, তা খতিয়ে দেখতে কাস্টমস গোয়েন্দাকে নির্দেশ দেয় এনবিআর। এরই পরিপ্রেক্ষিতে ২০০৯ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত কোন কোন প্রতিষ্ঠান ক্যাসিনো সরঞ্জাম আমদানি করেছে, তা তদন্ত শুরু করে কাস্টমস গোয়েন্দা। তদন্তে ২০ প্রতিষ্ঠান জড়িত থাকার প্রাথমিক তথ্য পাওয়া যায়। যাতে দেখা যায়, খেলনা, জুতার সরঞ্জাম, কম্পিউটার, মোবাইল পার্টস ও বার্থডে আইটেম ঘোষণায় ক্যাসিনো সরঞ্জাম আমদানি হয়। তবে কিছু প্রতিষ্ঠান বলছে, ক্যাসিনো পণ্য ঘোষণা দিয়ে তারা আমদানি করেছে। কিন্তু তদন্তে দেখা যায়, ফান আইটেম ঘোষণায় ক্যাসিনো সামগ্রী খালাস নেওয়া হয়।

সূত্র আরও জানায়, কাস্টমস গোয়েন্দা ২০ প্রতিষ্ঠানের ৪৫টি সন্দেহজনক আমদানি পণ্য চালান শনাক্ত করে তদন্ত শুরু করে। এর মধ্যে যেসব প্রতিষ্ঠান মিথ্যা ঘোষণায় ক্যাসিনো পণ্য আমদানি করে, তার মধ্যে রয়েছে ঢাকার দক্ষিণখান এলাকার এএম ইসলাম অ্যান্ড সন্স। প্রতিষ্ঠানটি বিভিন্ন বাণিজ্যিক পণ্যের সঙ্গে ক্যাসিনো চিপস আমদানি করে। পরে এসব চিপস বিভিন্ন ক্যাসিনোয় সরবরাহ করে। আর ক্যাসিনো চিপস আমদানির আড়ালে কৌশলে বৈদেশিক মুদ্রা পাচার করা হচ্ছে।

কাস্টমস গোয়েন্দার তদন্তে দেখা যায়, প্রতিষ্ঠানটি ২০১৬ সালের ২৭ আগস্ট সাউথইস্ট ব্যাংক উত্তরা শাখায় ৪০ হাজার ডলারের একটি এলসি খোলে। যাতে বলা হয়, চীন থেকে মোটর পার্টস, বাল্ক টোনার, মোবাইল এক্সেসরিজ, কপিআর পার্টস, কম্পিউটার পার্টস, সিএনজি স্পেয়ার পার্টস আমদানি করা হবে। একই বছরের ৭ ডিসেম্বর এলসি অনুযায়ী অটো পার্টস, মোবাইল এক্সেসরিজ পণ্য ঘোষণা দিয়ে তিন হাজার ৫০০ ডলার উল্লেখ করে পণ্য খালাস নেয়।

পণ্য চালানের বিল অব এন্ট্রি, ইনভয়েস ও প্যাকিং লিস্ট পর্যালোচনা করে দেখা যায়, আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানটি ৯৮ কেজি শো-এক্সেসরিজ ঘোষণা দিয়ে বিল অব এন্ট্রি দাখিল করে। কিন্তু কায়িক পরীক্ষায় ৫৩ কেজি শো-এক্সেসরিজ ও ৪৪ কেজির তিন হাজার ৯২৯টি ক্যাসিনো চিপস পাওয়া যায়। ক্যাসিনো পণ্যের কোডে শুল্কায়ন না করে ফুটওয়্যার পণ্য হিসেবে শুল্কায়ন করা হয়। এ ক্যাসিনো পণ্য রাজধানীর একটি স্বনামধন্য ক্লাবে সরবরাহ করা হয়।

আরও দেখা যায়, মিথ্যা ঘোষণায় এসব পণ্য খালাস নেওয়ার মাধ্যমে শুল্ককর ফাঁকি দেওয়া হয়েছে। এছাড়া এসব চিপস আমদানিতে পাঁচ হাজার ৮৮৩ ডলার ব্যাংকিং চ্যানেলের বাইরে বিদেশে পাচার করা হয়েছে। আমদানিকারক মো. জাহিদুল ইসলাম মণ্ডল, রফতানিকারক মো. কাউছার ও সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট এম কে ইন্টারন্যাশনাল, পণ্যের গ্রাহক মো. রাজু কৌশলে এসব অর্থ বিদেশে পাচার করেছেন। তাই এদের বিরুদ্ধে অর্থ পাচারের অভিযোগে মানি লন্ডারিং আইনে মামলার সুপারিশ করে ১৮ নভেম্বর এনবিআর চেয়ারম্যানের অনুমোদনের জন্য প্রতিবেদন পাঠানো হয়েছে।

অপরদিকে, কাস্টমস গোয়েন্দা গোপন সংবাদের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে বেশ কিছু জুয়ার সামগ্রী মাহাজং জব্দ করেছে। এর মধ্যে নারায়ণগঞ্জের বেস্ট টাইকুন (বিডি) এন্টারপ্রাইজ লিমিটেড নামে এক মোবাইল ফোন উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান থেকে ক্যাসিনো সামগ্রী জব্দ করা হয়। এটি ভিভো ফোনের সংযোজনকারী প্রতিষ্ঠান। মোবাইল সামগ্রী ঘোষণা দিয়ে মাহাজং আমদানির মাধ্যমে অর্থ পাচার করা হয়েছে। এছাড়া নারায়ণগঞ্জের ব্যাটারি প্রস্তুতকারী কারখানা ডংজিন লংজারভিটি ইন্ডাস্ট্রি লিমিটেড ও মুন্সীগঞ্জের নিউ হোপ এগ্রোটেক বাংলাদেশ লিমিটেড নামে পোলট্রি ফিড ফ্যাক্টরি থেকে মাহাজং জব্দ করা হয়। এসব প্রতিষ্ঠানও মিথ্যা ঘোষণার মাধ্যমে অর্থ পাচার করেছে। এসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মানি লন্ডারিং আইনে মামলার সুপারিশ করা হয়েছে।

সম্প্রতি কাস্টমস গোয়েন্দা থেকে এনবিআর চেয়ারম্যানকে ক্যাসিনো বিষয়ে একটি প্রতিবেদন দেওয়া হয়। তাতে বলা হয়, অ্যাসাইকুডা ওয়ার্ল্ড সিস্টেম থেকে ক্যাসিনো সামগ্রী আমদানির তথ্য যাচাই করা হয়েছে। এতে দেখা গেছে, এইচএস কোড হেডিং ৯৫০৪-এর বিপরীতে বিভিন্ন গেমস ও গেমস ইকুইপমেন্ট আমদানি করা হয়েছে। এর মধ্যে চার প্রতিষ্ঠান সরাসরি ক্যাসিনো সামগ্রী ঘোষণা দিয়ে আমদানি করেছে। এছাড়া বিভিন্ন ধরনের গেমস ইকুইপমেন্ট; যেমন- মাহাজং গেম, কয়েন অপারেটেড মেশিন, স্পোর্টস টেবিল, গেম মেশিন ঘোষণা সন্দেহে ৪৫ চালান শনাক্ত করা হয়েছে।

পুষ্পিতা এন্টারপ্রাইজ নামে একটি প্রতিষ্ঠান ক্যাসিনো ওয়্যার গেম টেবিল, পোকার গেম চিপস, রোলেট গেম টেবিল আমদানি করেছে। এ-থ্রি ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল নামে প্রতিষ্ঠান ভারত থেকে বার্থডে আইটেমের সঙ্গে রোলেট গেম সেট ও পোকার সেট আমদানি করেছে। এছাড়া আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠান ক্যাসিনো পণ্য আমদানি করে বিক্রি করে দিয়েছে। বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠান হংকং ও ম্যাকাওয়ে ক্যাসিনোর জুয়ায় ব্যবহƒত মাহাজং আমদানি করেছে। ২০ প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ১১টিই মিথ্যা ঘোষণায় মাহাজং আমদানি করেছে।

প্রতিবেদনে আমদানিনীতির নিষিদ্ধ পণ্যের তালিকায় ক্যাসিনো সামগ্রী অন্তর্ভুক্তের সুপারিশ করা হয়। এছাড়া ক্যাসিনোর জন্য আলাদা এইচএস কোড না করা পর্যন্ত গেমস চালানগুলো শতভাগ কায়িক পরীক্ষা করতে সব কাস্টম হাউসকে নির্দেশনা দেওয়ার অনুরোধ করা হয়। এরই আলোকে এনবিআর থেকে সব কাস্টম হাউসকে নির্দেশ দেওয়া হয়।