মুসলিমদের হৃদয় জয় করলেন নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী

নিজস্ব ডেস্ক প্রতিবেদক : নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চে দুটি মসজিদে সন্ত্রাসীর গুলিতে ৫০ জন নিহতের ঘটনার পর দেশটির প্রধানমন্ত্রী জেসিন্ডা কেট লরেল আরডার্ন যেসব উদ্যোগ নিয়েছেন তাতে সন্তুষ্ট সেখানকার মুসলিম অধিবাসীরা। প্রধানমন্ত্রীর আন্তরিকতা তাদেরকে রীতিমত মুগ্ধ করেছে। শুধু সেখানকার মুসলিমরাই নয়, বিশ্ব মুসলিমের হৃদয়ও জয় করেছেন প্রভাবশালী এই নেতা।

মসজিদে হামলার ঘটনায় হতবাক করে নিউজিল্যান্ডবাসীকে। এ ধরনের কোনো ঘটনার সঙ্গে তারা আগে কখনো পরিচিত ছিল না। ঘটনার পর দেশটির প্রধানমন্ত্রী অভিযুক্তকে কোনো কার্পণ্য না করেই ‘সন্ত্রাসী’ ও ‘জঙ্গি’ হিসেবে অভিহিত করেন। দ্রুত অস্ত্র আইন পরিবর্তনের ঘোষণা দেন৷ ইতিমধ্যে সে প্রক্রিয়া শুরুও হয়েছে।

জেসিন্ডা আরডার্ন ক্রাইস্টচার্চের ঘটনার পর প্রতিদিনই ছুটে যাচ্ছেন নিহতদের স্বজনদের কাছে৷ তাদের জড়িয়ে ধরছেন, সমব্যাথী হচ্ছেন৷ শুধু তাই নয়, মুসলমানদের সঙ্গে একত্মতার প্রকাশ হিসেবে তিনি একাধিক দিন হিজাব পরে বেরিয়েছেন৷

১৯ মার্চ সংসদে বক্তব্য দেন আরডার্ন৷ শুরুতেই সবাইকে ‘আস সালামু আলাইকুম’ বলে সম্বোধন করেন তিনি৷ জানান ক্রাইস্টচার্চের ঘটনায় অভিযুক্তের নামও তিনি কখনো মুখে আনবেন না বলে জানান৷ এরই মধ্যে অস্ত্র আইন পরিবর্তন করার পদক্ষেপ নিয়েছেন। এছাড়া দুই ধরনের অস্ত্র নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

ঘটনার এক সপ্তাহ পর নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চ শহরে জুমার নামাজের আগে আয়োজন করা হয় মসজিদে সন্ত্রাসী হামলায় নিহতদের স্মরণসভা। আল-নুর মসজিদের বিপরীত দিকের হ্যাগলে পার্কের এই অনুষ্ঠানে অংশ নেন প্রধানমন্ত্রী নিজেও। সেখানে জুমার নামাজ শুরুর আগে নিহতদের স্মরণে দুই মিনিট নীরবতা পালন করা হয়।

এরপর জুমার খুতবা শুরুর আগে জনসাধারণের উদ্দেশে ভাষণ দেন নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী জাসিন্ডা আরডার্ন। এ সময় তিনি বলেন, ‘তোমাদের সঙ্গে আজ পুরো নিউজিল্যান্ড কাঁদছে। আমরা সবাই আজ এক।’

কালো স্কার্ফ পরিহিত আরডর্ন মহানবীর একটি হাদিসের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন, ‘আমরা একটি দেহের মতো, যখন শরীরের কোনও অংশে আঘাত লাগে তখন পুরো শরীরেই ব্যাথা অনুভূত হয়।’ তিনি সেখানে প্রায় আধা ঘণ্টা ছিলেন। সেখানে জড়ো হয়েছিল ১০ হাজারের বেশি মানুষ।

মূলত সন্ত্রাসী হামলার পর নানা উদ্যোগের কারণে নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী থেকে জাসিন্ডা আরডার্ন এখন পরিণত হয়েছেন বিশ্বকে শান্তির পথে নেতৃত্ব দেয়ার দূত হিসেবে৷

বিশ্বের আলোচিত নেতা জাসিন্ডা আরডার্ন

১৯৮০ সালে জন্ম নেয়া আরডার্নের বেড়ে ওঠা মুরুপাড়া নামে নিউজিল্যান্ডের মাউরি আদিবাসী অধ্যুষিত একটি ছোট্ট শহরে৷ যেখানে শিশুদের পায়ে দেয়ার মতো জুতা ছিল না, এমনকি দুপুরে তারা খাবারও পেত না৷ এই ঘটনাই তাকে রাজনীতিতে উদ্বুদ্ধ করে৷ উচ্চ মাধ্যমিক শেষে আর্ডার্ন পড়াশোনা করেন যোগাযোগ বিদ্যায়৷ তার আগে ১৭ বছর বয়সেই যুক্ত হন নিউজিল্যান্ডের লেবার পার্টির রাজনীতিতে৷

স্নাতক শেষ করে আরডার্ন নিউজিল্যান্ডের লেবার পার্টির একজন সংসদ সদস্যের অধীনে গবেষক হিসেবে কাজ করেন৷ ২০০৫ সালে পাড়ি জমান ব্রিটেনে৷ আড়াই বছর ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ারের মন্ত্রিসভার দপ্তরে চাকরি করেন৷ ২০০৭ সালে ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন অব সোশ্যালিস্ট ওয়েলথের প্রেসিডেন্ট হিসেবে ঘুরে বেড়িয়েছেন আলজেরিয়া, চীন, ভারত, ইসরায়েল, জর্ডান ও লেবাননে৷

২০০৮ সালে আর্ডার্ন লেবার পার্টির সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচনে অংশ নিয়ে ১৩ হাজার ভোটে হেরে যান৷ কিন্তু দেশটির সংবিধানিক নিয়মে তিনি সংসদে যাওয়ার সুযোগ পান৷ ২৮ বছর বয়সে সর্বকনিষ্ঠ রাজনীতিবিদ হিসেবে জায়গা করে নেন হাউস অফ রিপ্রেজেন্টেটিভে৷

২০১৭ সালে লেবার পার্টির উপ প্রধান নির্বাচিত হন আর্ডার্ন৷ নির্বাচনের দু’মাস আগে দলটির প্রধান পদত্যাগ করলে সেই ভারও চাপে তার কাঁধে৷ নির্বাচনী প্রচারে তরুণদের কাছে ব্যাপক জনপ্রিয় হন আরডার্ন৷ তাকে নিয়ে এসময় দেশটিতে জনপ্রিয়তার যে ঢেউ উঠে, তা পরিচিত ‘জেসিডামেনিয়া’ নামে৷

মাত্র দু’মাসের নেতৃত্বে অনেকটা অপ্রত্যাশিতভাই দলকে নির্বাচনে বিজয়ী করেন আরডার্ন৷ ২০১৭ সালে ৩৮ বছর বয়সে বিশ্বের সর্বকনিষ্ঠ নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেন৷ নিউজিল্যান্ডের ১৫০ বছরের ইতিহাসেও তিনি সবচেয়ে কম বয়সি সরকার প্রধান৷

আরডার্ন জলবায়ু পরিবর্তন, শিশু দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে তিনি উচ্চকিত৷ প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, নিউজিল্যান্ডের সরকার হবে সহানুভূতিশীল৷ ২০১৮ সালে ‘ফোর্বসের পাওয়ার উইমেনের’ তালিকায় জায়গা করে নেন তিনি৷ আছেন টাইম ম্যাগাজিনে সবচেয়ে প্রভাবশালী ১০০ ব্যক্তির তালিকাতেও৷

টিভি উপস্থাপক ক্লার্ক গেফোর্ডকে সঙ্গী হিসেবে বেছে নিয়েছেন তিনি৷ ২০১৮ সালের ২২ জুন বেনজির ভুট্টোর পর বিশ্বের দ্বিতীয় প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্বকালে সন্তানের জন্ম দেন আরডার্ন৷ এজন্য মাত্র ছয় সপ্তাহের মাতৃত্বকালীন ছুটি নিয়েছিলেন তিনি৷

বিশ্বে প্রথমবার কোনো প্রধানমন্ত্রী জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনের কক্ষে সন্তান নিয়ে বক্তৃতা দিতে যান৷ তিনি জেসিন্ডা আর্ডার্ন৷ গত বছর নেলসন ম্যান্ডেলা পিস সামিটে অংশ নিয়ে আর্ডার্ন বিশ্ব গণমাধ্যমে খবরের শিরোনাম হয়েছেন৷ বক্তৃতা দেয়ার সময় সন্তান ছিল সঙ্গী ক্লার্ক গেফোর্ডের কোলে৷

Print Friendly, PDF & Email