রাজস্ব আদায়ে লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ব্যর্থতার ধ্বস ঠেকাতে রাজস্ব প্রশাসনে ব্যাপক রদবদল

নিজস্ব প্রতিবেদক : রাজস্ব আদায়ে লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ব্যর্থতার ধ্বস ঠেকাতে অর্থবছরের মাঝপথে রাজস্ব প্রশাসনের উচ্চপদে ব্যাপক রদবদল করা হয়েছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড পরবর্তী ৫ মাসে রাজস্ব ঘাটতি পুরণ করতে ৫১ শতাংশ প্রবৃদ্ধির টার্গেট দিয়ে ৬ জন কমিশনারের পদ পুনর্বিন্যাস করেছে। চলতি ২০১৮-১৯ অর্থবছরের প্রথম ৬ মাসে (জুলাই-ডিসেম্বর) জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ২৮ হাজার ৭৬০ কোটি টাকা কম রাজস্ব আহরণ করায় উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ব্যাপক চাপের মুখে পড়েন। আলোচ্য সময়ে ১ লাখ ২৬ হাজার কোটি টাকা লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে আদায় হয় ৯৭ হাজার ২৪০ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরে এনবিআরের রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা হলো ২ লাখ ৯৬ হাজার ২০১ কোটি টাকা। আমদানি শুল্ক ও স্থানীয় পর্যায়ে ভ্যাট (মূল্য সংযোজন কর) আদায়ে বেশি পিছিয়ে আছে এনবিআর। চলতি অর্থবছরে রাজস্ব আদায়ে প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করা হয়েছে প্রায় ৪০ শতাংশ।
গতকাল এনবিআর এক প্রজ্ঞাপনে শুল্ক মূল্যায়নের কমিশনার ড. মইনুল আলম খানকে ভ্যাট ঢাকা পশ্চিম কমিশনারেট এবং এখানকার কমিশনার হুমায়ুন কবিরকে বন্ড কমিশনারেটে পদায়ন করা হয়েছে। ভ্যাট ঢাকা দক্ষিণ কমিশনারেটের কমিশনার কাজী মোস্তাফিজুর রহমানকে চট্রগ্রাম কাস্টম হাউসে এবং সেখানকার কমিশনার ড. একে এম নুরুজ্জামানকে শুল্ক মূল্যায়নে পদায়ন করা হয়েছে। আপিল ট্রাইব্যুনালের কমিশনার মজিবুর রহমানকে ভ্যাট রাজশাহী কমিশনারেটে এবং সেখানকার কমিশনার মো. মোয়াজ্জেম হোসেনকে ভ্যাট ঢাকা দক্ষিণ কমিশনারেটে পদায়ন করা হয়েছে। বন্ডের কমিশনার আল আমিন প্রামানিক বর্তমানে বাণিজ্য মেলার দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি যাবেন জেনেভা দূতাবাসে।
গত ৬ মাসে রাজস্ব আদায় কম হওয়ায় চাপের মুখে পড়েছে এনবিআর। এনবিআরের কাছে সরকারের উচ্চ পর্যায় থেকে রাজস্বের গতি মন্থরতার কারণ জানতে চাওয়া হচ্ছে। কাক্সিক্ষত হারে রাজস্ব আদায় না হওয়ায় এনবিআর চেয়ারম্যান মোশাররফ হোসেন ভুঁইয়া মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কয়েক দফা বৈঠক করেছেন। সেসব বৈঠকে রাজস্ব ঘাটতির কারণ খোঁজা হয়েছে। এসব বৈঠকে মিথ্যা ঘোষণায় পণ্য আমদানি বাড়ছে কিনা কিংবা অন্য কোনো উপায়ে ভ্যাট ট্যাক্স ফাঁকি রোধ করতে এনবিআরের তদারকি বাড়ানোর উপর গুরুত্ব দেয়া হয়েছে।
এনবিআর কর্মকর্তারা বলছেন, নির্বাচনের আগে সরকার কয়েকটি জনবান্ধব খাতে আয়কর, ভ্যাট ও সম্পূরক শুল্ক ছাড় দিয়েছে। এ কারণে রাজস্বে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। বিশেষত তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি আমদানিতে ভ্যাট ও সম্পূরক শুল্ক ছাড় দেয়ায় এ খাত থেকে চলতি বছর প্রায় ১১ হাজার কোটি টাকার সম্ভাব্য রাজস্ব কমবে। অন্যদিকে ইন্টারনেট সেবায় ভ্যাট ছাড় এবং কিছু খাতে কর ছাড় দেওয়া হয়েছে। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে রাজস্বে। এছাড়া পেট্রোবাংলাসহ কয়েকটি খাত থেকে বড় অঙ্কের রাজস্ব বকেয়া পড়ে থাকলেও সমন্বয়ের অভাবে ওই অর্থ আদায় হচ্ছে না। কেবল পেট্রোবাংলার কাছেই প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব বকেয়া রয়েছে। এনবিআরের আওতাধীন সংশ্লিষ্ট ভ্যাট অফিস থেকে একাধিকবার উদ্যোগ নেয়া হলেও তাতে কাক্সিক্ষত সুফল মেলেনি। এসব কারণে রাজস্বে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
এনবিআর সূত্র জানিয়েছে, গত ৬ মাসে আমদানি শুল্ক আদায়ের লক্ষ্যমাত্রার ৪০ হাজার ৫৭০ কোটি টাকার বিপরীতে আদায় হয়েছে ৩০ হাজার ৫০২ কোটি টাকা। গত ২০১৭-১৮ অর্থবছরের প্রথম ৬ মাসে ২৯ হাজার ৭১২ কোটি টাকার আমদানি শুল্ক আদায় হয়েছিল। অর্থাৎ গত ৬ মাসে শুল্ক আদায় বেড়েছে ২ দশমিক ৭২ শতাংশ। অথচ গত অর্থবছরের একই সময়ে শুল্ক আদায়ে প্রবৃদ্ধি ছিলো ১৯ শতাংশের বেশি। চলতি অর্থবছরের প্রথম ৬ মাসে ভ্যাট খাতে লক্ষ্যমাত্রা ছিলো ৫০ হাজার ২৪ কোটি টাকা। আদায় হয়েছে ৩৭ হাজার ৯৬৪ কোটি টাকা। গত ২০১৭-১৮ অর্থবছরের একই সময়ে ভ্যাট আদায় হয়েছিলো ৩৬ হাজার ৫৩১ কোটি টাকা। পূর্বের অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে গত ৬ মাসে আদায় বেড়েছে ৩ দশমিক ৯২ শতাংশ। অথচ গত অর্থবছরে ভ্যাট আদায়ে প্রবৃদ্ধি ছিলো প্রায় ২০ শতাংশ। আয়কর খাতেও গত ৬ মাসে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে প্রায় পৌনে সাত হাজার কোটি টাকা কম আদায় হয়েছে। তবে আয়কর আদায়ে প্রবৃদ্ধি হয়েছে প্রায় ১১ শতাংশ।