সুন্দরীর সর্বনাশের পদধ্বনি

নিজস্ব বার্তা প্রতিবেদক : সুন্দরবনের পশ্চিমাঞ্চলে সুন্দরীগাছের সংখ্যা কমে গেছে। বেড়েছে গরান ও গেওয়াগাছ। আর মধ্য অঞ্চলে সুন্দরীগাছের আগা মরা রোগ বেশি। পূর্বাঞ্চলের সুন্দরীগাছের সংখ্যা বেশি থাকলেও বীজ থেকে নতুন চারা গজানোর পরিমাণ তুলনামূলক অনেক কম। লবণাক্ততা বৃদ্ধি, গাছের আগা মরা রোগ, অন্য গাছের আধিক্য ও বীজ থেকে গাছের নতুন চারা কম হওয়ায় এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হচ্ছে। সাম্প্রতিক বিভিন্ন গবেষণায় এসব তথ্য উঠে এসেছে।

২০১৮ সালে নেপালের কাঠমান্ডুতে অনুষ্ঠিত নবম গ্লোবাল বিজনেস রিসার্চ কনফারেন্সে সুন্দরবনের উদ্ভিদের বৃদ্ধি নিয়ে একটি গবেষণা প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বাংলাদেশ বন গবেষণা ইনস্টিটিউট চট্টগ্রামের পরিচালক মাসুদুর রহমান ও ম্যানগ্রোভ সিলভিকালচার বিভাগ খুলনার বিভাগীয় প্রধান আ স ম হেলাল সিদ্দিকী। গবেষণায় তাঁরা দেখান, সুন্দরবনে প্রতি হেক্টরে গড়ে ৩৩ দশমিক ১৩৩টি বিভিন্ন প্রজাতির চারা জন্মে। এর মধ্যে সুন্দরী ৪৩ দশমিক ১৬ শতাংশ, গেওয়া ৩১ দশমিক ৮৯ শতাংশ, গরান ১০ দশমিক ৭৬ শতাংশ, কাঁকড়া ৩ দশমিক ৫২ শতাংশ, বাইন ১ দশমিক ১ শতাংশ, খলসী ৩ দশমিক ৯২ শতাংশ, আমুর ২ দশমিক ৪১ শতাংশ, গোলপাতা দশমিক ১০ শতাংশ, পশুর দশমিক ৯১ শতাংশ, কেওড়া দশমিক ২০ শতাংশ এবং বাকি অন্যান্য প্রজাতির উদ্ভিদ জন্মে ২ দশমিক ১২ শতাংশ।

এসবের মধ্যে সুন্দরবনে মৃদু লবণাক্ত অঞ্চলে সুন্দরীগাছ বেঁচে থাকার সর্বোচ্চ গড় হার মাত্র ৯ দশমিক ৪ শতাংশ ও তীব্র লবণাক্ত অঞ্চলে গেওয়ার বেঁচে থাকার সর্বোচ্চ গড় হার ১৭ দশমিক ৮৪ শতাংশ।

প্রবন্ধে উল্লেখ করা হয়, কম লবণাক্ত এলাকায় সুন্দরীগাছ জন্মানোর হার ১১ শতাংশ, মাঝারি ও বেশি লবণাক্ত এলাকায় মাত্র ২ শতাংশ। অন্যদিকে বেশি লবণাক্তপ্রবণ এলাকায় গরান ও গেওয়া জন্মানোর হার ১৩ শতাংশের বেশি।

সাধারণত প্রাক্-মৌসুমে (মে মাস) পানির লবণাক্ততা বৃদ্ধি পায়। সর্বোচ্চ প্রায় ৪০ পিপিটি পানির লবণাক্ততার পরিমাণ পাওয়া যায় মুন্সিগঞ্জ, শ্যামনগর ও সাতক্ষীরা অঞ্চলে। আর সর্বনিম্ন পরিমাণ পাওয়া যায় বগী, শরণখোলা, বাগেরহাট অঞ্চলে।

জানতে চাইলে আ স ম হেলাল সিদ্দিকী বলেন, সুন্দরবনের অধিকাংশ অঞ্চল এখন প্রায় জনমানবশূন্য। গাছ চুরি এখন নেই বললেই চলে। এমন পরিবেশ থাকলে বনে গাছপালার পরিমাণ বেড়ে যাবে। তবে পানিতে লবণাক্ততার পরিমাণ বেড়ে যাওয়ায় সুন্দরবনে সুন্দরী, পশুর ও ধুন্দলগাছ হুমকির মুখে রয়েছে। পরিবেশগত পরিবর্তনের কারণে একসময় হয়তো দেখা যাবে, সুন্দরবনে সুন্দরীগাছ হারিয়ে গেছে। সুন্দরীগাছের জায়গা দখল করছে অন্য গাছ।

আ স ম হেলাল সিদ্দিকী আরও বলেন, সুন্দরবনে নতুন নতুন চর তৈরি হচ্ছে। সেখানে বীজ পড়ে জন্মাচ্ছে গাছ। তবে সুন্দরী ও পশুরগাছের সংখ্যা তুলনামূলক অনেক কম। তাঁর মতে, সুন্দরবনে সুন্দরীগাছ না বাড়লেও আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়মেই সুন্দরবন টিকে থাকবে হাজার বছর ধরে।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বন ও পরিবেশবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ২০১৪ সাল থেকে তিন বছর ধরে সুন্দরবনের ওপর একটি গবেষণা পরিচালনা করে। ওই গবেষণা দলের প্রধান ছিলেন ওই ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক এ এইচ এম রায়হান সরকার।

ওই গবেষণায় তিনি দেখান, সুন্দরবনে ১৯৮৯ সালে সুন্দরীগাছ ছিল ১ লাখ ৬৭ হাজার ৬৪৬ হেক্টর বনভূমিতে। ২০১৪ সালে তা কমে দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ১২ হাজার ৯৯৫ হেক্টরে। ২৫ বছরে সুন্দরীগাছ কমেছে প্রায় ৫৩ হাজার হেক্টরে।

খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফরেস্ট্রি অ্যান্ড উড টেকনোলজি ডিসিপ্লিনের কয়েকজন শিক্ষক সুন্দরবনের চারটি গুরুত্বপূর্ণ গাছের জন্মহার নিয়ে একটি গবেষণা করেন। ওই গবেষণায় দেখা যায়, সুন্দরবনে বীজ থেকে ৫০ শতাংশের বেশি সুন্দরীগাছের চারা জন্মে। কিন্তু লবণাক্ততার পরিমাণ যে অঞ্চলে বেশি, ওই অঞ্চলে সুন্দরী চারার টিকে থাকার পরিমাণ অনেক কম। ওই তুলনায় পশুরগাছের চারা অনেক বেশি লবণাক্ত এলাকায় টিকে থাকতে পারে।

ওই গবেষণা দলের প্রধান অধ্যাপক মাহমুদ হাসান বলেন, গাছের আগা মরা, লবণাক্ততা বৃদ্ধিসহ বিভিন্ন কারণে সুন্দরবনের ঐতিহ্য সুন্দরীগাছ হুমকির মধ্যে রয়েছে। দিন দিন লবণাক্ততা বেড়ে যাওয়ায় ওই গাছের জন্মহার কমে যাচ্ছে। বিশেষ করে সাতক্ষীরা অঞ্চলের অধিক লবণাক্তপ্রবণ এলাকায় সুন্দরী ও পশুরগাছের আধিক্য কমে গেছে, সেখানে বেড়েছে গরান ও গেওয়াগাছ।

সুন্দরীগাছ কমে যাওয়ার কারণ হিসেবে মাহমুদ হাসান বলেন, সুন্দরবনের নদীতে পলি পড়ার হার অনেক বেশি। পলি পড়ার কারণে গাছের শ্বাসমূল ঢেকে যাচ্ছে, ফলে বড় গাছগুলো মারা যাচ্ছে। অন্যদিকে নতুন গাছ জন্মাতে না পারার কারণে সুন্দরীগাছ কমে গেছে।

তবে সুন্দরবন থেকে সুন্দরীগাছ কখনোই হারিয়ে যাবে না বলে মনে করেন সুন্দরবন পশ্চিম বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা বশির-আল-মামুন। প্রথম আলোকে তিনি বলেন, লবণাক্ততার কারণে সুন্দরবনের পশ্চিমাঞ্চলে লবণসহিষ্ণু গাছের আধিক্য বেশি। তবে সেখানেও সুন্দরীগাছ রয়েছে, হয়তো তার তুলনামূলক বৃদ্ধি কম। এতে আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। কারণ, সুন্দরবনের বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী বন যত দিন থাকবে, প্রাকৃতিক নিয়মেই সুন্দরীগাছও তত দিন টিকে থাকবে।