করোনায় বিপন্ন শিক্ষা ও শিক্ষা উদ্যোক্তা : ভবিষৎকে বাঁচাবে কে?

সৈয়দ মিজানুর রহমান : ঢাকার পথে আমি গাড়ি চালিয়ে যাচ্ছিলাম বেশ কিছুদিন আগে, আমার সাত বছর বয়সী শিশুসন্তান আমার পাশের সিটে বসেছিল। সে একটি বার্গার খাচ্ছিল। গাড়ি যখন সিগনালে থামল, তখন কাচের ওপাশ থেকে একটি শিশু হাত বাড়িয়ে বার্গারটি পেতে চাইল। আমার সন্তান তখন ভয়ে কিছুটা কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে বার্গারটি দিয়ে দিল। এরপর একে একে ওই পথশিশুর দেখাদেখি তার সহশিশুরাও দৌড়ে আসতে শুরু করলে আমার শিশুর নিরাপত্তার স্বার্থে গাড়ির কাচ তুলে দিলাম। গাড়ি টান দিলে আমার সন্তান জানতে চাইল, বাবা, বাকিদের দিবে না? ওই শিশুদের নিয়ে আমি আমার সন্তানের সঙ্গে আলাপ করলাম কিছুক্ষণ। আমার সন্তান আমাকে বলল, দেখেছ বাবা, ওরা কত অসহায়! আমি বললাম, ওরা আজ যেমন অসহায়, তেমনি একদিন তুমিও ওদের কাছে অসহায় হয়ে যেতে পারো। ছেলে জানতে চাইল, কীভাবে? আমি বললাম, ওদের আজকের ভিক্ষার কোমল হাতটি বদলে গিয়ে একদিন হয়ে উঠতে পারে ছিনতাইয়ের হাত। ওই অনাকাঙ্ক্ষিত পথ থেকে ফেরাতে হলে ওদের জন্য আমাদের স্কুল করা দরকার, ওরা যেন সড়কে এভাবে না দৌড়ায়। জানি না, আমার সন্তানরা বড় হয়ে নতুন কোনো উদ্যোগ বা বিদ্যালয় গড়ার এই দায়িত্ব কাঁধে নেবে কিনা; তা সময় আমাদের বলবে। তবে এ কথা ঠিক যে এ দেশের পথে-ঘাটে, বস্তিতে বা ফুটওভারব্রিজে বেড়ে ওঠা বহু শিশুর জন্য প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিতে আমরা ব্যর্থ হয়েছি।

এই করোনাকালে এসে দেখছি, বহু বিদ্যালয় বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। বিদ্যালয়ের উদ্যোক্তারা পথের ধারে ফল বা সবজি বিক্রি করছেন। কখনো এসব নিয়ে ট্রল করছি, কখনো বেদনায় আহত হচ্ছি। বন্ধ হতে যাওয়া বা বন্ধ হয়ে যাওয়া এসব বিদ্যালয় নিয়ে দুশ্চিন্তা হচ্ছে এখন। এসব উদ্যোক্তা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেছিলেন বলে অনেক শিশু বিদ্যালয় পেয়েছিল। আমরা দেখি যে এ দেশে অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর মাঝে বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার মতো সুন্দর সুন্দর উদ্যোগ গড়ে উঠেছে সাম্প্রতিক বছরগুলোয়। এর কোনোটি পুরোপুরি দাতব্য, কোনোটি স্বল্প খরচের বিদ্যালয়। সরকারি-বেসরকারি-বিদেশী ও ব্যক্তি পর্যায়ের নানা ধরনের সহযোগিতা নিয়ে বিদ্যালয়গুলো টিকে ছিল এতদিন। এসব বিদ্যালয়ে বাংলাদেশের একটি বড়সংখ্যক শিশুর শিক্ষার মতো মৌলিক চাহিদা পূরণ হয়। করোনার ছোবলে এখন এসব উদ্যোক্তা বিদ্যালয় বন্ধ করায়, বেঞ্চ-চেয়ার-টেবিল বিক্রি করে দেয়ায় শুধু ওই উদ্যোক্তাই সব হারিয়ে দেউলিয়া হয়ে যাননি, বরং অনেক শিশুও তার স্বপ্নের বিদ্যালয় থেকে বিচ্যুত হয়েছে। অনেক নামি কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়, বিশেষত যারা অর্থনৈতিকভাবে কিছুটা ভালো অবস্থানে রয়েছে, তারা হয়তো সব বাঁধা ঠেলে এগিয়ে যাওয়ার স্বপ্নে বিভোর এখন। প্রশ্ন হলো, দেশের অসংখ্য মানুষ যখন পিছিয়ে পড়ছে তখন এই এগিয়ে যাওয়া কতটা সফল হতে পারে। বিদ্যালয় হারানো এই শিশুরা শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হলে ভবিষ্যতে যে বঞ্চনা সৃষ্টি হবে, সেই ক্ষতির অর্থনৈতিক মূল্য কী হবে। শিক্ষার সঙ্গে রাজনীতি-অর্থনীতি-সমাজের গভীর যোগ রয়েছে। এসব বিষয় ভেবে দেখা জরুরি। নয়তো ক্ষতি ও ক্ষত প্রশমন হবে না। নভেল করোনাভাইরাসের কালে বিভিন্ন ধরনের প্রতিষ্ঠানকে সরকারিভাবে পৃষ্ঠপোষকতা দেয়া হলেও দুঃখজনক হলেও সত্য যে এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সুনজরের বাইরে রয়ে গেছে। এসব প্রতিষ্ঠান ছোট বলে, এদের প্রতিটিতে হাজার হাজার শিক্ষার্থী নেই বলে বা এসব প্রতিষ্ঠানের দৃষ্টিনন্দন স্থাবর সম্পত্তি নেই বলে হয়তো প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি আমাদের দৃষ্টি পড়েনি। একথা ভুলে গেলে চলবে না যে এ ধরনের ছোট হাজারো প্রতিষ্ঠান মিলেই এ দেশের একটি বড়সংখ্যক শিক্ষার্থীকে ধারণ করে আছে।

শিক্ষা ক্ষেত্রে নভেল করোনাভাইরাস মহাবিপদ ডেকে এনেছে। এখন অনেক বড় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক পর্যন্ত ভাবছেন, শিক্ষা ক্ষেত্র অনেক বেশি ঝুঁকিপূর্ণ ও অনিরাপদ। শিক্ষায় যারা ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা, তারা ফোবিয়ায় আক্রান্ত এখন। বিদ্যালয় বন্ধ হওয়ায় তাদের দশা নদী শিকস্তি মানুষের মতো—যারা সব হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে যায়। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া অবস্থায় শিক্ষার্থীদের মাঝে পিছিয়ে পড়া মানুষদের নিয়ে কাজ করার আগ্রহ থাকে, পরবর্তী সময়ে অনেকের মাঝেই সেই আগ্রহ উবে যায়। এর পেছনেও নানা কারণ ও ব্যাখ্যা রয়েছে। আমরা বন্ধুরা মিলেও বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালীন নানা ধরনের দাতব্য কাজের সঙ্গে যুক্ত ছিলাম। তখন দেখেছি অনেক দরিদ্র মা, যারা বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভিন্ন কাজের মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করতেন, তারা আকুতি জানাতেন যেন তাদের সন্তান শিক্ষিত হয়ে উঠতে পারে। আমার সন্তান যেন থাকে দুধে-ভাতে। দারিদ্র্যের যদি নিউক্লিয়াস থেকে থাকে, তবে তা এখানেই। এই দারিদ্র্যের নিউক্লিয়াস খোঁজার জন্যই আমি যুক্ত হয়েছিলাম নানান প্রচেষ্টার সঙ্গে, সেই ছাত্রজীবন থেকে। এসব বহুরৈখিক প্রচেষ্টার সঙ্গে সরকারি-বেসরকারিভাবে তরুণদের যুক্ত করতে হবে। আজকের শিশু-কিশোর ও তরুণদের চিন্তা ও কর্মের পরিশুদ্ধি নিয়ে বেড়ে ওঠা প্রয়োজন, পরিশুদ্ধির সেই পরিবেশ সৃষ্টি প্রয়োজন, কারণ হাত কী করবে, তার পুরোটাই নির্ভর করে ব্যক্তির মগজের ওপর; আর মগজের শুদ্ধির ক্ষেত্রে এখনো শিক্ষাই একমাত্র বিকল্প। সেদিন আমার শিশুপুত্রের কাছে আমার বলা হয়ে ওঠেনি যে আজকের পথশিশুদের কোমল হাত যথাযথ পরিচর্যা না পেলে সেই হাত শুধু ছিনতাইয়ের হাত নয়, এর চেয়েও ভয়ংকর কিছু হয়ে উঠতে পারে একদিন।

সৈয়দ মিজানুর রহমান : ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির স্টুডেন্ট অ্যাফেয়ার্সের পরিচালক