রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে আগুনে পুড়লো সার্ভার

৫৭ ঘণ্টায় স্বাভাবিক হয়নি ইন্টারনেট, পানি, বিদ্যুৎ

পাবনা প্রতিনিধি : আগুনে পুড়লো রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্পের পাইওনিয়ার বেইজের প্রায় সব কক্ষ। আগুনের লেলিহান শিখায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে গুরুত্বপূর্ণ সার্ভার রুম, পুড়েছে বিভিন্ন নথিপত্র। সাত ইউনিট ফায়ার সার্ভিসের চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে এলেও দুইদিনেও পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি প্রকল্পের একাধিক স্থাপনার বিদ্যুৎ ও অভ্যন্তরীণ ইন্টারনেট সেবা। সঙ্গে যোগ হয়েছে খাবার পানির সংকট। দেশের সবচেয়ে স্পর্শকাতর অবকাঠামোগুলোর একটিতে এমন অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় প্রশ্ন উঠছে অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা ও জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলার সক্ষমতা নিয়েও। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সোমবার ভোর ৪টার দিকে রূপপুর প্রকল্পের ২ নম্বর গেটের কাছাকাছি অবস্থিত বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের পুরনো কার্যালয় তথা পাইওনিয়ার বেইজে আগুনের সূত্রপাত হয়।Geographic Reference

প্রথমে একটি কক্ষে আগুন দেখা গেলেও পরে তা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। একপর্যায়ে বেইজের প্রায় সব কক্ষই আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে ছুটে যায় ফায়ার সার্ভিসের সাতটি ইউনিট। দীর্ঘ চেষ্টার পর আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়। তবে ততক্ষণে পুড়ে যায় সার্ভার রুমসহ বিভিন্ন কক্ষের মালামাল ও নথিপত্র। অগ্নিকাণ্ডের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে প্রকল্পের অভ্যন্তরীণ যোগাযোগব্যবস্থায়। আগুনে এনপিসিবিএল-এর সার্ভার রুম ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর থেকেই প্রকল্পের অভ্যন্তরীণ ইন্টারনেট সেবা ব্যাহত হচ্ছে। শুধু পাইওনিয়ার বেইজ নয়, সার্ভার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কারণে এর সঙ্গে সংযুক্ত ১.৬ ভবন এবং কাস্টমসের দু’টি ভবনের ইন্টারনেট ও বিদ্যুৎ সংযোগও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। দুইদিন পার হলেও এসব স্থাপনায় সেবা পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি। রূপপুর বিদ্যুৎকেন্দ্রের সাইট কার্যালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. রুহুল কুদ্দুস বলেন, সার্ভার স্টেশনে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির কারণে অভ্যন্তরীণ ইন্টারনেট সেবা ব্যাহত হচ্ছে। এটি স্বাভাবিক করার কাজ চলছে। অগ্নিকাণ্ডে বেশকিছু সরকারি নথিপত্র পুড়ে যাওয়ার কথাও জানা গেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ নথির পাশাপাশি এবিডি-সংক্রান্ত কিছু নথিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে প্রকল্প সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, এতে বড় ধরনের তথ্যগত ক্ষতির আশঙ্কা নেই।

কারণ গুরুত্বপূর্ণ ফাইলগুলোর ডিজিটাল অনুলিপি সংরক্ষিত রয়েছে। সাইট কার্যালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. রুহুল কুদ্দুস বলেন, কিছু নথিপত্র ক্ষতিগ্রস্ত হলেও প্রতিটি ফাইলেরই ডিজিটাল অনুলিপি সংরক্ষিত আছে। ফলে নথি পুড়ে যাওয়ায় বড় ধরনের সমস্যা হবে না। আগুনের পর শুধু ইন্টারনেট নয়, একাধিক স্থাপনার বিদ্যুৎ সংযোগও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। অগ্নিকাণ্ডের সময় পাইওনিয়ার বেইজ, কাস্টমস ভবন ও ক্যান্টিনের বিদ্যুৎ সংযোগ বন্ধ হয়ে যায়। পরবর্তীতে সার্ভার ও অবকাঠামোগত ক্ষতির কারণে ১.৬ ভবন এবং কাস্টমসের দু’টি ভবনও সমস্যার মধ্যে পড়ে। এর মধ্যেই দেখা দিয়েছে খাবার পানির সংকট। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, কাস্টমস ভবন, ১.৬ ভবন এবং ক্যান্টিনে বর্তমানে খাবার পানি পাওয়া যাচ্ছে না। এতে এসব স্থাপনায় কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ভোগান্তি বেড়েছে।

রূপপুর বিদ্যুৎকেন্দ্রের ফায়ার স্টেশনের স্টেশন অফিসার মো. আবুল হাশেম বলেন, আগুন লাগার পরপরই ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনেন। অগ্নিকাণ্ডের কারণ সম্পর্কে তিনি বলেন, প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, একটি শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়ে থাকতে পারে। তবে এটিই আগুনের প্রকৃত কারণ কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়। কারণ অনুসন্ধানে রূপপুর কর্তৃপক্ষ একটি অভ্যন্তরীণ তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। কমিটি সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণসহ বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত যাচাই করছে। রূপপুরের এবারের অগ্নিকাণ্ডের পর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছে প্রকল্পের অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে। এর আগে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) প্রতিনিধিরা রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিদর্শনের সময় অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থার অপ্রতুলতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে।

আন্তর্জাতিক মানের পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে অত্যাধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং পর্যাপ্ত প্রশিক্ষিত জনবল থাকার কথা। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, রূপপুরে বর্তমানে মাত্র ৪৯ জন কর্মী নিয়ে ফায়ার স্টেশনের কার্যক্রম চলছে। অবশ্য ফায়ার স্টেশনের কর্মকর্তাদের দাবি, তাদের কাছে প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম রয়েছে। জরুরি পরিস্থিতিতে পার্শ্ববর্তী ফায়ার স্টেশনগুলোর সহায়তাও নেয়া যায়। প্রকল্পের নিজস্ব প্রশিক্ষিত জনবল নিয়োগের প্রক্রিয়া শেষ হলে অগ্নিনিরাপত্তা সক্ষমতা আরও বাড়বে।

পাবনা ফায়ার সার্ভিসের উপসহকারী পরিচালক মো. সাদেকুল বারী বলেন, রোববার গভীর রাতে বায়েকের পাওনিয়ার বেজের সার্ভার রুমে হঠাৎ আগুনের সূত্রপাত হয়। মুহূর্তের মধ্যে আগুন ও ধোঁয়া দ্রুত আশপাশের কক্ষগুলোতে ছড়িয়ে পড়ে। খবর পেয়ে ঈশ্বরদী ফায়ার সার্ভিসের চারটি ইউনিট ঘটনাস্থলে পৌঁছে দীর্ঘ প্রচেষ্টার পর আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে।

অগ্নিকাণ্ডের পর থেকে পাওনিয়ার বেজসহ আশপাশের দুটি ভবনে বিদ্যুৎ সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। একই সঙ্গে প্রকল্পের নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেড (এনপিসিবিএল) ও বায়েকের বিভিন্ন কার্যালয়ে ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক প্রকল্পের একজন সাইট ইনচার্জ বলেন, অগ্নিকাণ্ডের পর বুধবার বেলা ১২টা পর্যন্তও গুরুত্বপূর্ণ এসব স্থাপনায় ইন্টারনেট সংযোগ স্বাভাবিক হয়নি। ফলে আন্তঃযোগাযোগে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন প্রকল্পে কর্মরতরা। এমনকি কাস্টমস ভবন ও ক্যান্টিনে বিদ্যুৎ ও পানি সরবরাহ বন্ধ রয়েছে।

দীর্ঘ সময় ইন্টারনেট ও বিদ্যুৎ সংযোগ না থাকায় এবং সার্ভার রুম ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় প্রকল্পের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ও নথিপত্র নষ্ট হওয়ার আশঙ্কায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন প্রকল্পসংশ্লিষ্টরা।

রূপপুর গ্রিনসিটি মডার্ন ফায়ার সার্ভিসের স্টেশন মাস্টার মো. শহিদুল ইসলাম জানান, “সার্ভার রুমের প্রযুক্তিগত সরঞ্জাম ও কাগজপত্র পুড়ে যাওয়ায় বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। তবে ক্ষতির সুনির্দিষ্ট পরিমাণ নিরূপণ করা সম্ভব হয়নি।”

ফায়ার সার্ভিসের উপসহকারী পরিচালক মো. সাদেকুল বারী বলেন, প্রাথমিকভাবে বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত শেষে অগ্নিকাণ্ডের প্রকৃত কারণ জানা যাবে।

এদিকে অগ্নিকাণ্ডের বিষয়ে বক্তব্য জানতে চেষ্টা করা হলেও প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা কেউ কথা বলেনি, পাশাপাশি প্রকল্প পরিচালক (পিডি) কবীর হোসেনের মুঠোফোনে একাধিকবার কল ও খুদে বার্তা পাঠানো হলেও তার কোনো সাড়া মেলেনি।

Share