হাইকোর্ট-সুপ্রিমকোর্ট বোঝেন না সওজ ম্যাজিস্ট্রেট!

শ্যামনগর প্রতিনিধি : হাইকোর্ট-সুপ্রিমকোর্ট বোঝেন না সাতক্ষীরা জেলার সড়ক ও জনপথ বিভাগ (সওজ) এর নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট। তিনি শুধু বোঝেন তাঁর দফতরের সার্ভেয়ারের ক্রস চিহিৃত নিশানা সম্বলিত অবকাঠামো। আর সেই অবকাঠামো বুলডোজারের আঘাতে মুহুর্তেই মাটিতে মিশিয়ে দিচ্ছেন। ঘটনাস্থল শ্যামনগর উপজেলা সদর হতে ভেটখালী বাজার পর্যন্ত জেলা সড়কের দু’পাশ দেখলে মনে হচ্ছে এটা বুঝি ইসরাইলী হামলায় যুদ্ধ বিদ্ধস্ত গাজার উপতাক্য।

২৩১ কোটি ৯৫ লাখ ৫ হাজার ৮৬১ টাকা প্রাক্কলিত ব্যয়ে ‘সাতক্ষীরা-সখিপুর-কালীগঞ্জ এবং কালীগঞ্জ-শ্যামনগর-ভেটখালী মহাসড়ক যথাযথ মানে উন্নীতকরণ’ প্রকল্পের অধিন বর্তমান ১৮ ফুটের সড়কটির উভয় পার্শ্বে ৩ ফুট করে মোট ৬ ফুট সম্প্রসারন করা হবে। প্রকল্প দু’টি বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ার অংশ হিসাবে সড়কটির উভয় পার্শ্বে উচ্ছেদ কার্যক্রম চলছে। অভিযোগ উঠেছে, এই উচ্ছেদ কার্যক্রমে এলাকার প্রভাবশালীদের স্থাপনা রক্ষা পেলেও গুড়িয়ে দেয়া হয়েছে বিশেষ কিছু রাজনৈতিক মতাদর্শের স্থাপনা ও সহায় সম্বলহীনদের শেষ আশ্রয় স্থল।

অভিযানে নেতৃত্ব দেন সড়ক ও জনপথ বিভাগের উপসচিব ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. আশরাফুল হক চৌধুরী এবং সড়ক ও জনপথ বিভাগ সাতক্ষীরার নির্বাহী প্রকৌশলী ও ম্যাজিস্ট্রেট মো. আনোয়ার পারভেজ। উচ্ছেদ অভিযানে সাতক্ষীরা র‌্যাব-৬ এর (সিপিজি-১) ডিএডি হাবিবুর রহমান, শ্যামনগর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হুমায়ূন কবির মোল্লা, সেনাবাহিনী, র‌্যাব, স্থানীয় প্রশাসন, পুলিশ এবং সড়ক ও জনপথ বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা উপস্থিত ছিলেন।

সরেজমিনে দেখা গেছে, শ্যামনগর পৌরসভার ক্রিমসন রোজেলা সীফুড লিঃ নামের একটি প্রতিষ্ঠান ভাঙা হয়নি এমন অভিযোগের ভিত্তিতে দেখা যায়, প্রতিষ্ঠানটির দুই পাশের স্থাপনায় সড়ক ও জনপদ বিভাগের সার্ভেয়ারের লাল দাগ দেয়া হ্রস চিহ্ন পর্যন্ত ভেকু দিয়ে গুড়িয়ে দেয়া হয়েছে। অথচ ক্রিমসন রোজেলা সীফুড লিঃ এর বিল্ডিংটি মূল সড়কের প্রন্তসীমা ঘেষে থাকলেও বিল্ডিংটিতে একটু আঘাতও করা হয়নি এবং সেখানে কোন লাল চিহ্ন দেখা যায়নি। এ বিষয়ে সড়ক ও জনপদ বিভাগের সার্ভেয়ার মোঃ সোহেল রানা বলেন “রাস্তার দুই পাশের সরকারি জায়গায় কোন স্থাপনা থাকবে না। যে পর্যন্ত ভাঙা হবে আমরা লাল দাগ দিয়ে সে পর্যন্ত চিহ্ন করে দিয়েছি। কেউ নিজ উদ্যোগে না ভাঙলে আমরা ভেঙে দিচ্ছি। কোনো গেট বন্ধ থাকলে সামনের দেয়ালে লিখে দিয়েছি কত ফুট পর্যন্ত ভাঙতে হবে। এ বিষয়ে জানতে সাতক্ষীরার সড়ক ও জনপদ (সওজ) এর নির্বাহী ম্যাজিট্রেট আনোয়ার পারভেজকে মুঠোফোনে একাধিকবার কল দিলেও তিনি কল রিসিভ করেন নি। অবশেষে তাঁর হোয়াটসঅ্যাপ নাম্বারে সুনির্দিষ্ট তিনটি প্রশ্ন পাঠিয়ে তাঁর বক্তব্য চাওয়া হয়। প্রশ্ন গুলো হলো, (১) অভিযোগ উঠেছে, এই উচ্ছেদ কার্যক্রমে এলাকার প্রভাবশালীদের স্থাপনা রক্ষা পেলেও গুড়িয়ে দেয়া হয়েছে বিশেষ কিছু রাজনৈতিক মতাদর্শের মানুষের স্থাপনা ও সহায় সম্বলহীনদের শেষ আশ্রয় স্থল। (২) শ্যামনগরের ইসমাইলপুর মৌজার ১০৩ নং দাগে অবস্থিত একটি ঘর মিস্ত্রি দিয়ে অপসারন করার সময় সওজ এর উচ্ছেদকারীরা বুলডোজার নিয়ে সেখানে উপস্থিত হলে ঘরের মালিক মাননীয় হাইকোর্ট বিভাগের ১০৫৬৮/২০১৪ নং রিট মোকদ্দমার আদেশ দেখিয়ে যাতে ঘরটি তারা নিজেরাই সরিয়ে নেবার কাজ অব্যাহত রাখতে পারেন সেই সুযোগ দেবার অনুরোধ জানান। তখন উচ্ছেদ কার্যক্রমে অংশ নেয়া সওজ কর্মকর্তারা বলেন,“হাইকোট-সুপ্রিমকোর্ট দেখার সময় নাই”-একথা বলেই তারা বুলডোজার দিয়ে ১০ মিনিটের মধ্যে ঘরটি গুড়িয়ে দেয়। অথচ একই সময়ে একই এলাকায় ক্রিমসন রোজেলা সীফুড লিঃ এর বিল্ডিংটি মূল সড়কের প্রন্তসীমা ঘেষে থাকলেও বিল্ডিংটিতে একটু আঘাতও করা হয়নি এবং সেখানে কোন লাল চিহ্ন দেখা যায়নি। এ বিষয়ে আপনার ব্যাখ্যা কি? (৩) রাস্তার প্রান্ত সীমা থেকে ১০৪ ফুট ভেতরে গিয়ে সাবেক সংসদ সদস্য ও জাতীয় সংসদের সাবেক হুইপ এইচ এম গোলাম রেজার বাড়ীতে মাননীয় হাইকোর্ট বিভাগে দায়েরি ১২২৫০/২০১৭ নং রিট মোকদ্দমার নিষেধাজ্ঞার আদেশ উপেক্ষা করে বুলডোজার দিয়ে উচ্ছেদ কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়। অথচ একই এলাকার অরেকজন সাবেক সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামের মুরগির ফার্ম একেবারে রাস্তার প্রান্তসীমার মধ্যে হলেও সেটা উচ্ছেদ করা হয়নি। এ বিষয়ে আপনার ব্যাখ্যা কি? শেষ পর্যন্ত নির্বাহী ম্যাজিট্রেট আনোয়ার পারভেজ প্রশ্নগুলোর উত্তর দেননি।

সরেজমিনে উচ্ছেদ কার্যক্রম:
সহকারী কমিশনার (ভূমি) কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, এই জেলার শ্যামনগর উপজেলার অধীন, ইসমাইলপুর মৌজার, ১নং খতিয়ানের এসএ, ১০৩ নং দাগে ডাঙ্গা শ্রেনীর ২৮ শতক জমিতে আনোয়ারা পারভীন দম্পত্তি বসবাস করেন। বর্ণিত জমি এই দম্পত্তির নামে ২০০৮-০৯ অর্থবছরে “তফসিল কেস নং-১৬/০৮-০৯’ শ্যামনগর উপজেলা কৃষি খাস জমি ব্যবস্থাপনা ও বন্দোবস্ত কমিটি কর্তৃক অনুমোদিত হয়। প্রস্তাবটি চূড়ান্ত অনুমোদনে সরকারপক্ষ বছরের পর বছর কালক্ষেপন করায় তফসিল সম্পত্তিতে বসবাসকারী দম্পত্তি মহামান্য সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে ১০৫৬৮/২০১৪ নং রিট মোকদ্দমা দায়ের করলে মাননীয় হাইকোর্ট বিভাগ ২০১৪ ইং সালের ১৮ জানুয়ারি তারিখে সরকারের বিরুদ্ধে “রুল নিশি” জারি করেন। এই “রুল নিশি” জারির এক বছর পর সহকারী কমিশনার (ভূমি) শ্যামনগর, সাতক্ষীরা কার্যালয়ের ২০১৫ ইং সালের ১৪ জানুয়ারি তারিখের ৩নং স্মারক মূলে উপজেলা ভূমি অফিস, শ্যামনগর, সাতক্ষীরা ১৯ জানুয়ারি ২০১৫ ইং তারিখে স্মারক নং- উ:ভূ:অ: (শ্যাম)/১৪-১৬৫(যুক্ত) স্মারকে উচেছদ কেস শুরু করে। অতঃপর মাননীয় হাইকোর্ট বিভাগ ২১ এপ্রিল ২০১৫ ইং তারিখে তফসিল বর্ণিত সম্পত্তিতে বসবাসরত রিটকারী দম্পত্তির শান্তিপূর্ণ দখল হতে উচ্ছেদ না করার জন্য সরকারের বিরুদ্ধে স্থগিতাদেশসহ নিষেধাজ্ঞার আদেশ দেন।

মাননীয় হাইকোর্ট বিভাগের উক্ত আদেশের পর সহকারী কমিশনার (ভূমি) শ্যামনগর তফসিল বর্ণিত সম্পত্তি সরেজমিন পরিদর্শন ও যাচাই বাছাই পূর্বক, পূর্বেকার “১৬/০৮-০৯ নং তফসিল কেস” এর স্থলে সড়কের প্রান্তসীমা থেকে ৩৫ ফুট বাদ দিয়ে অবশিষ্ট ২৮ শতক জমির ম্যাপ সম্বলিত “৬৮/১৯-২০ নং” তফসিল কেস সৃজন করে শ্যামনগর উপজেলা কৃষি খাস জমি ব্যবস্থাপনা ও বন্দোবস্ত কমিটির ২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৯ ইং তারিখের সভায় অনুমোদন দিয়ে সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে প্রেরণ করেন। জেলা কৃষি খাস জমি ব্যবস্থাপনা ও বন্দোবস্ত কামিটির ২৬ জুন ২০২২ ইং তারিখে অনুষ্ঠিত সভায় প্রস্তাবটি অনুমোদিত হয়। অতঃপর মাননীয় হাইকোর্ট বিভাগ রিট পিটিশনটি চুড়ান্ত শুনানী অন্তে গত ২৭ নভেম্বর ২০২৪ ইং তারিখে রুল নিশ্চিত করে তফসিল বর্ণিত ভূমি রিটকারী আনোয়ারা পারভীন ও তার স্বামী আবু বকর এর নামে রেজিস্ট্রি দলিল সম্পাদনের জন্য জেলা প্রশাসকের প্রতি আদেশ দিয়েছেন।

রিটকারি আনোয়ারা পারভীন বলেন, সরকার “তফসিল কেস নং- ৬৮/১৯-২০” এর মাধ্যমে যথাযথ নিয়ম অনুসরণ করে সড়কের প্রান্তসীমা থেকে ৩৫ ফুট বাদ দিয়ে ২৮ শতক জমি তাদেরকে বন্দোবস্ত দিয়েছেন। তার পরিবার বন্দোবস্তপ্রাপ্ত জমির মধ্যে ৪০ ফুট লম্বা ও ৩০ ফুট চওড়া একটি আঁধা পাকা ঘর নির্মান করে বসবাস করছেন। বরাদ্ধপ্রাপ্ত ২৮ শতক জমির মধ্যে সড়ক ও জনপথ বিভাগের কোন জমি থাকলে সেটি আমাদের জানার কথা নয়। তদুপরি সওজ গত ৮ অক্টোবর গণবিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে উচ্ছেদ কার্যক্রমের নোটিশ জারি করলে এবং আমার ঘরের দেয়ালে লাল কালিতে ৩৭ ফুট লিখে উর্দ্ধ ক্রস চিহৃ দিয়ে গেলে আমি গত ১২ আক্টোবর নির্বাহী প্রকৌশলী সওজ সাতক্ষীরাসহ সরকারের ৮ বিভাগে একটি লিগ্যাল নোটিশের মাধ্যমে জেলা প্রশাসক সাতক্ষীরা-এর কার্যালয় কর্তৃক আমার সম্পত্তি পরিমাপ না করে আমার আধা-পাকা ঘরটি না ভাঙার জন্য অনুরোধ জানাই এবং আমার ভবনে রিট মোকদ্দমার বিস্তারিত বিবরন সম্বলিত একটি নোটিশ ঝুলাই। ১৫ জুলাই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেখতে পাই যে, আমার এলাকার সাবেক সংসদ সদস্য ও জাতীয় সংসদের সাবেক হুইপ এইচ এম গোলাম রেজার বাড়ীতে মাননীয় হাইকোর্ট বিভাগে দায়েরি ১২২৫০/২০১৭ নং রিট মোকদ্দমার নিষেধাজ্ঞার আদেশ উপেক্ষা করে বুলডোজার দিয়ে উচ্ছেদ কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। এ ঘটনা দেখার পর আমি তাৎক্ষনিকভাবে সারাদিনে আমার ঘরের ব্যবহার্য আসবাবপত্র সরিয়ে নেই। পরের দিন ১৬ আক্টোবর ভোর হতে ঘরের চালের ছাউনির এ্যালবেস্টার জানালা দরজা খোলার কাজ শুরু করি। এই কার্যক্রম চলাকালীন সওজ কর্মকর্তারা বিকেল ৩টা ২০ মিনিটে বুলডোজার নিয়ে তফসিল সম্পত্তিতে প্রবেশ করে মিস্ত্রিদের নামিয়ে দিলে ঘটনাস্থলে উপস্থিত আমার আত্বীয়-স্বজন সওজ কর্মকর্তাদের মাননীয় হাইকোর্ট বিভাগের ১০৫৬৮/২০১৪ নং রিট মোকদ্দমার আদেশ দেখিয়ে যাতে ঘরটি আমরা নিজেরাই সরিয়ে নেবার কাজ অব্যাহত রাখতে পারি সেই সুযোগ দেবার অনুরোধ জানান। তখন উচ্ছেদ কার্যক্রমে অংশ নেয়া সওজ কর্মকর্তারা বলেন, “হাইকোট-সুপ্রিমকোর্ট দেখার সময় নাই”-একথা বলেই তারা বুলডোজার দিয়ে ১০ মিনিটের মধ্যে আমার ঘরটি গুড়িয়ে দেয়।

Share