
বিশেষ প্রতিবেদক : বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য প্রতিমাসে মূল বেতনের ৬০ শতাংশ হারে ‘রেগুলেটরি ভাতা’ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে কমিশন। এর পক্ষে যুক্তি হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে সরকারের রাজস্ব আদায়ে ভূমিকা, টেলিযোগাযোগ খাত নিয়ন্ত্রণে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দায়িত্ব এবং চাকরি ছাড়ার ছয় মাস পর্যন্ত অন্য কোনো প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানে যোগ না দেওয়ার বাধ্যবাধকতার কথা বলছেন কমিশনের কর্মকর্তারা। বিটিআরসির সর্বশেষ কমিশন সভায় এ বিষয়ে সরকারের কাছে প্রস্তাব পাঠানোরও সিদ্ধান্ত হয়েছে। তবে মূল বেতনের ৬০ শতাংশ হারে ভাতা দেওয়ার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞেরা। তাঁরা বলছেন, শুধু রাজস্ব আদায়ের পরিমাণ দিয়ে নিয়ন্ত্রক সংস্থার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য বিশেষ ভাতার যৌক্তিকতা নির্ধারণ করা যায় না।
সাবেক সচিব ও বাংলাদেশ লোকপ্রশাসন প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের (বিপিএটিসি) সাবেক রেক্টর এ কে এম আবদুল আউয়াল মজুমদার বিটিআরসির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ৬০ শতাংশ রেগুলেটরি ভাতা নেওয়ার যুক্তিকে সমর্থন করেন না। জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘টেলিযোগাযোগ খাতের রাজস্ব আদায় করা বিটিআরসির কাজের অংশ। এটার জন্যই তারা চাকরিতে এসেছেন। তাই রাজস্ব আদায় বেশি করার অজুহাতে বাড়তি কিছু দাবি করা যুক্তিসঙ্গত নয়।’
দেশের টেলিযোগাযোগ খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে ২০০২ সালে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) প্রতিষ্ঠিত হয়। বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ আইন, ২০০১-এর অধীনে সংস্থাটি প্রতিষ্ঠা করা হয়। এর মূল দায়িত্ব দেশের টেলিযোগাযোগব্যবস্থার সুশৃঙ্খল উন্নয়ন, সেবার মান নিশ্চিত করা এবং খাতটিতে কার্যকর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা।
বিটিআরসির কাজের মধ্যে রয়েছে টেলিযোগাযোগ সেবার লাইসেন্স দেওয়া, স্পেকট্রাম ব্যবস্থাপনা, সেবার মান ও মূল্যসংক্রান্ত বিষয় তদারকি, গ্রাহকের স্বার্থ রক্ষা, লাইসেন্সের শর্ত পরিপালন নিশ্চিত করা এবং টেলিযোগাযোগ খাতের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করা। নিয়ন্ত্রক কাজের পাশাপাশি টেলিযোগাযোগ লাইসেন্সধারী প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে লাইসেন্স ফি, নবায়ন ফি, রাজস্ব ভাগাভাগি ও স্পেকট্রাম চার্জ আদায় করে সংস্থাটি।
ভাতা নেওয়ার পেছনে যুক্তি হিসেবে অবশ্য রাজস্ব আদায়কেই বড় করে দেখিয়েছে বিটিআরসি। কমিশনের অর্থ, হিসাব ও রাজস্ব বিভাগের তথ্য বলছে, ২০০১-০২ থেকে ২০২৫-২৬ অর্থবছর পর্যন্ত ২৫ বছরে বিটিআরসি মোট ৮৫ হাজার ৭৭৯ কোটি ৮২ লাখ টাকা রাজস্ব আদায় করেছে। সর্বশেষ ২০২৫-২৬ অর্থবছরে রাজস্ব আদায়ের পরিমাণ ৩ হাজার ৮৮৫ কোটি ২৪ লাখ টাকা।
সরকারের রাজস্ব আয়ের হিসেবেও বিটিআরসির কাছ থেকে আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়। বছর বছর সেই লক্ষ্যমাত্রা বাড়ানো হচ্ছে। যেমন সরকারের ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের রাজস্ব আয় সংক্রান্ত বাজেটে ২০২৬-২৭ অর্থ বছরে বিটিআরসির জন্য রাজস্ব আয় লক্ষমাত্রা ঠিক করেছে ৬ হাজার ৩৬ কোটি টাকা। ২০২৭-২৮ অর্থ বছরে তা বাড়িয়ে ধরা হয়েছে ৬ হাজার ৬৪০ কোটি টাকা। আর ২০২৮-২৯ অর্থ বছরের জন্য ৭ হাজার ৩০৪ কোটি টাকা।
তবে বিটিআরসি কোনো বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচালিত হয় না। টেলিযোগাযোগ খাতের বিভিন্ন লাইসেন্সধারী প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে সরকার যে রাজস্ব পায়, তা সংগ্রহের দায়িত্ব পালন করে বিটিআরসি। ওই অর্থের বড় অংশই সরকারি কোষাগারে জমা হয়।
পাওনা আদায় নিয়ে প্রশ্নও আছে
বিশেষজ্ঞেরা বলছেন, বিটিআরসির রাজস্ব আদায়ের পরিমাণ বড় হলেও নিয়ন্ত্রক হিসেবে কমিশনের কাজের মূল্যায়ন শুধু রাজস্বের অঙ্ক দিয়ে করা যায় না। টেলিযোগাযোগ খাতের সেবার মান, গ্রাহকের অভিযোগ, অপারেটরদের লাইসেন্সের শর্ত মানা, স্পেকট্রাম ব্যবস্থাপনা এবং গ্রাহকের স্বার্থ রক্ষার বিষয়ও এর সঙ্গে যুক্ত।
সাম্প্রতিক সময়েও টেলিযোগাযোগ খাতে সরকারের বিপুল অঙ্কের পাওনা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। চলতি বছরের জুনে সংসদে দেওয়া তথ্যে ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম জানান, দেশের চার মোবাইল অপারেটরের কাছে সরকারের মোট ১৩ হাজার ১৪৪ কোটি টাকা রাজস্ব পাওনা রয়েছে। এর মধ্যে গ্রামীণফোনের কাছে ৬ হাজার ১০১ কোটি ৮২ লাখ, টেলিটকের কাছে ৫ হাজার ৯৫৪ কোটি, রবির কাছে ৬১৫ কোটি এবং বাংলালিংকের কাছে ৪৭৩ কোটি টাকা পাওনা রয়েছে। এসব পাওনার মধ্যে লাইসেন্স ফি, রাজস্ব ভাগাভাগি, স্পেকট্রাম ফি, প্রশাসনিক জরিমানা ও নিরীক্ষা আপত্তিসহ বিভিন্ন বিষয় রয়েছে।
আবার ইন্টারন্যাশনাল ইন্টারনেট গেটওয়ে (আইআইজি) প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছেও সরকারের দীর্ঘদিনের পাওনা আদায় করতে পারছে না বিটিআরসি। বিটিআরসির তথ্য বলছে, ২৪টি আইআইজি প্রতিষ্ঠানের কাছে প্রায় ২০০ কোটি টাকা বকেয়া পাওনা রয়েছে সরকারের।
এই বিপুল পাওনা আদায়, সেবার মান নিশ্চিত করা এবং লাইসেন্সের শর্ত পরিপালন করানোও নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে বিটিআরসির দায়িত্বের অংশ। এসব ক্ষেত্রে কমিশনের কার্যক্রম নিয়ে বিভিন্ন সময়ে প্রশ্ন উঠেছে।
৬০ শতাংশ ভাতার যুক্তি
বিটিআরসির নথিতে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য বিশেষ ভাতা দেওয়ার ক্ষেত্রে শুধু রাজস্ব আদায়ের বিষয়টি নয়, তাঁদের দায়িত্বের ধরন এবং পেশাগত দক্ষতার কথাও বলা হয়েছে।
নথিতে বলা হয়েছে, টেলিযোগাযোগ সেবা ব্যবস্থা স্থাপন, পরিচালনা ও নিয়ন্ত্রণ, সেবার মান নিশ্চিত করা, রাজস্ব আদায় এবং সরকারি কোষাগারে অর্থ জমা দেওয়ার মতো কাজ বিটিআরসির কর্মকর্তা-কর্মচারীরা করেন। তাঁদের কাজের দক্ষতা, পেশাদারত্ব ও নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে প্রণোদনা প্রয়োজন। এ জন্য কমিশনের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মূল বেতনের ৬০ শতাংশ হারে রেগুলেটরি ভাতা দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে।
এ ক্ষেত্রে অন্য কয়েকটি সরকারি প্রতিষ্ঠানের সুযোগ-সুবিধার উদাহরণও দিয়েছে বিটিআরসি। নথিতে বাংলাদেশ ব্যাংক ও বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) কর্মকর্তাদের জন্য মূল বেতনের সমপরিমাণ ইনসেনটিভ বোনাস এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) কর্মকর্তাদের জন্য ২০ শতাংশ হারে ঝুঁকি ভাতার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
আবার টেলিযোগাযোগ আইনের সংশোধিত বিধান অনুযায়ী, বিটিআরসির কোনো কমিশনার, কর্মচারী বা পরামর্শক চাকরি ছাড়ার পর অন্তত ছয় মাসের মধ্যে কোনো লাইসেন্সপ্রাপ্ত টেলিযোগাযোগ প্রতিষ্ঠানে যোগ দিতে পারবেন না।
বিটিআরসির নথিতে এই চাকরি-পরবর্তী সীমাবদ্ধতাকে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য আর্থিক প্রণোদনা দেওয়ার অন্যতম যুক্তি হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
জানতে চাইলে বিটিআরসি চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) এমদাদ উল বারী বলেন, টেলিযোগাযোগ খাতের নিয়ন্ত্রক হিসেবে বিটিআরসির কর্মকর্তাদের চাকরি শেষে অন্তত ছয় মাস টেলিযোগাযোগ খাতে কাজের সুযোগ না থাকায় তাঁদের জন্য ক্ষতিপূরণের বিষয়টি বিবেচনা করা প্রয়োজন। তাঁর মতে, টেলিযোগাযোগ খাতে প্রতিদিন দ্রুত পরিবর্তন আসে। ফলে একজন কর্মকর্তা ছয় মাস এই খাতের বাইরে থাকলে তাঁর পেশাগত দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা দ্রুত পুরোনো হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। তিনি বলেন, এই কারণে অন্যান্য সরকারি প্রতিষ্ঠানে প্রচলিত প্রণোদনা ও বিটিআরসির রাজস্ব আদায়ের সুযোগ বিবেচনায় নিয়ে রেগুলেটরি ভাতার প্রস্তাব করা হয়েছে।
টাকা আসবে কোথা থেকে
বিটিআরসির কর্মকর্তারা বলছেন, টেলিযোগাযোগ খাতের শৃঙ্খলা বজায় রাখতে গাইডলাইনের শর্তের বাইরে শেয়ার ট্রান্সফার ফি, মার্জার ফি ও প্রশাসনিক জরিমানার মতো অর্থও কমিশন আদায় করে। কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৫ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত ২১ বছরে এসব খাত থেকে ১ হাজার ২১৫ কোটি টাকার বেশি আদায় করা হয়েছে।
অন্যদিকে বিটিআরসির নথি অনুযায়ী, কমিশনের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা বাবদ মাসে আনুমানিক ২ কোটি ৪৫ লাখ টাকা ব্যয় হয়। ২১ বছরে এই ব্যয়ের পরিমাণ প্রায় ৬১৭ কোটি টাকা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিটিআরসির একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, সরকার চাইলে কমিশনের বিভিন্ন খাত থেকে আদায় করা অর্থের একটি অংশ রেগুলেটরি ভাতা দেওয়ার কাজে ব্যবহার করতে পারে।
