
নিজস্ব প্রতিবেদক : দলের দুর্দিনে হাল ধরেছেন, রাজপথে মার খেয়েছেন—বিএনপির এমন অনেক ত্যাগী নেতাই এমপি কিংবা মন্ত্রী হতে পারেননি। আবার খালেদা জিয়ার সরকারের প্রভাবশালী মন্ত্রীরা তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন নতুন সরকারে কোনো পদই পাননি। দলের এই জ্যেষ্ঠ ও অভিজ্ঞ নেতাদের জন্য ভবিষ্যতে ‘ভালো কোনো পুরস্কার’ অপেক্ষা করছে, না কি তারা রাজনীতির মূল স্রোত থেকে ছিটকে পড়লেন—তা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে চলছে নানা গুঞ্জন।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ৪৯ সদস্যের নতুন মন্ত্রিসভা গঠনের পর দলের ভেতরে ও বাইরে এই আলোচনা এখন তুঙ্গে।
নতুন মন্ত্রিসভায় স্থান পাওয়া ৪৯ জনের মধ্যে ৪০ জনই নতুন মুখ। এমনকি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নিজেও এবারই প্রথম সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। নবীনদের ওপর আস্থা রাখলেও মন্ত্রিসভা থেকে বাদ পড়েছেন বিএনপির নীতি-নির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটির বেশ কয়েকজন প্রভাবশালী সদস্য, যারা বিগত দিনে খালেদা জিয়ার মন্ত্রিসভার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে ছিলেন।
বাদ পড়া হেভিওয়েটরা
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্যদের মধ্যে ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, গয়েশ্বর চন্দ্র রায় এবং ড. আব্দুল মঈন খান মন্ত্রিপরিষদে জায়গা পাননি।
তারা খালেদা জিয়ার শাসনামলে মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। এছাড়া স্থায়ী কমিটির প্রবীণ সদস্য ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার ও সেলিমা রহমানের নামও নেই মন্ত্রীদের তালিকায়।
তারেক রহমানের নির্বাসনকালে এবং খালেদা জিয়ার কারাবন্দি থাকার সময় দলকে সক্রিয় রাখতে এই নেতাদের ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য।
তবে মন্ত্রিপরিষদে স্থান না পেলেও মির্জা আব্বাস উদ্দিন আহমেদ, নজরুল ইসলাম খান ও রুহুল কবির রিজভী আহমেদকে মন্ত্রী পদমর্যাদায় প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা হিসাবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
মন্ত্রিত্ব না পাওয়ার বিষয়ে স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী ড. আব্দুল মঈন খান বলেন, “মন্ত্রিপরিষদে স্থান পাওয়ার বিষয়টি দেখছেন দলের চেয়ারম্যান। এটা নিয়ে আমার মন্তব্য না করা ভালো।”
যুগপৎ সঙ্গীদের ক্ষোভ ও হতাশা
নতুন মন্ত্রিসভায় তারেক রহমান বিএনপির জোটের শরিক ও তরুণ নেতৃত্বের ওপর আস্থা রেখেছেন। গণসংহতি আন্দোলনের জোনায়েদ সাকি, গণঅধিকার পরিষদের নুরুল হক নুর এবং এনডিএম চেয়ারম্যান ববি হাজ্জাজ দায়িত্ব পেয়েছেন। তবে যুগপৎ আন্দোলনের দীর্ঘদিনের সঙ্গী নাগরিক ঐক্যের মাহমুদুর রহমান মান্না, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাইফুল হক কিংবা ভাসানী জনশক্তি পার্টির শেখ রফিকুল ইসলাম বাবলুর জায়গা হয়নি।
এ নিয়ে কিছুটা ক্ষোভ ঝরেছে বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হকের কণ্ঠে। তিনি বলেন, “প্রথমত এটি পুরোটাই বিএনপির সরকার। যুগপৎ আন্দোলনের দুই-তিনজন থাকছেন। বিএনপি বাস্তবে যুগপৎ সঙ্গীদের বাদ দিয়েই, এক ধরনের খারিজ করে হাঁটছে। একলা চলো নীতির দিকে যাচ্ছে, অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস দেখা গেল নতুন মন্ত্রিসভায়।”
তিনি আরও বলেন, “তাদের (বিএনপি) কঠিন, দুর্দিনের সময়ে যারা সঙ্গী ছিল, তাদের বাদ দিয়ে সরকার গঠন করলো। এর তাৎপর্য বা অভিঘাত আরও কিছুদিন পর বোঝা যাবে।”
চমক নাকি বিতর্ক?
এই মন্ত্রিসভার সবচেয়ে বড় চমক হিসেবে দেখা হচ্ছে খলিলুর রহমানকে। তিনি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টার ‘জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা এবং রোহিঙ্গা সমস্যা বিষয়ক হাই রিপ্রেজেন্টেটিভ’ ছিলেন। বিদেশি কোম্পানিকে বন্দর ইজারা দেওয়া এবং প্রস্তাবিত রোহিঙ্গা করিডোর নিয়ে বিতর্কের জেরে বিএনপির অনেক নেতাকর্মীই তার অপসারণ চেয়েছিলেন। অথচ এমপি না হয়েও ‘টেকনোক্র্যাট’ কোটায় তিনি পেয়েছেন গুরুত্বপূর্ণ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব। খলিলুর রহমানের এই অন্তর্ভুক্তি নিয়ে দলের ভেতরেই বিস্ময় প্রকাশ করেছেন অনেকে।
যাদের কপাল খোলেনি
সাবেক মন্ত্রীদের মধ্যে মীর নাছির, আলতাফ হোসেন চৌধুরী, বরকত উল্লাহ বুলু, লুৎফুজ্জামান বাবর ও আমান উল্লাহ আমানের নাম আলোচনায় থাকলেও শেষ পর্যন্ত তারা ডাক পাননি। এছাড়া দলের দুঃসময়ের কান্ডারি হিসেবে পরিচিত যুগ্ম মহাসচিব হাবিবুন নবী খান সোহেলের নাম টেকনোক্র্যাট মন্ত্রী হিসেবে আলোচনায় থাকলেও তাদের ঠাঁই হয়নি।
স্থায়ী কমিটির এক সদস্য বলেন, “তারেক রহমান তার নিজের রাজনৈতিক কৌশলের মধ্য থেকে মন্ত্রিপরিষদ গঠন করেছেন। এটি নিঃসন্দেহে প্রধানমন্ত্রী করবেন। এ নিয়ে মতামতের কিছু নেই। মর্নিং শোজ দ্য ডে।”
তবে দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, সালাহউদ্দিন আহমদ, ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু, ডা. এজেডএম জাহিদ হোসেন এবং হাফিজ উদ্দিন খান মন্ত্রিসভায় স্থান পেয়ে নিজেদের অবস্থান ধরে রেখেছেন।
