ইউনূস আমলে ৩ মাসে ৩ হাজার শিক্ষক মবের শিকার

বিশেষ প্রতিনিধি : ও ভাই…আমরা শিক্ষক মানুষ, আমরা রাজনীতি করি না। আমরা ছাত্র আন্দোলনের পক্ষে ছিলাম। ভাই, আমাদের মাইরেন না ভাই। আমাদের ওপর হামলা কইরেন না ভাই! ও ভাই…আমাদের বাঁচান, আমাদের বাঁচান…।

’ এভাবেই বদ্ধ ঘরের ভেতরে প্রাণভিক্ষা চেয়ে বুকফাটা আর্তনাদ করছিলেন কয়েকজন মানুষ। কেউ এ-ঘর থেকে ও-ঘরে ছোটাছুটি করে বাঁচার আকুতি জানাচ্ছেন, কেউ মোবাইল ফোনে কাউকে ফোন করার চেষ্টায়। বাইরে থেকে দরজায় সজোরে একের পর এক আঘাত। ধারালো অস্ত্রের কোপে ফেটে যাচ্ছে দরজার কাঠ…।

আমাদের অনুসন্ধানে পাওয়া ৫ মিনিট ৫০ সেকেন্ডের একটি ভিডিও ফুটেজে দেখা গেছে এই ভয়াবহ চিত্র। ঘটনাটি ২০২৪ সালের ১৮ আগস্টের। সেদিন বরিশালের গৌরনদীতে ‘মাহিলাড়া এএন মাধ্যমিক বিদ্যালয়’-এর স্টাফ কোয়ার্টারে প্রধান শিক্ষকের বাসায় এ হামলা করা হয়। প্রধান শিক্ষক প্রণয় কান্তি অধিকারীকে সপরিবারে ঘরের ভেতরে আটকে বিভীষিকাময় পরিস্থিতি সৃষ্টি করে শতাধিক ব্যক্তি।

প্রণয় কান্তির মেয়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আদৃতা অধিকারী ফেসবুক লাইভে ভয়াবহ পরিস্থিতি দেখানো শুরু করলে এক পর্যায়ে সেনাবাহিনী গিয়ে উদ্ধার করে আক্রান্ত পরিবারটিকে।

সে যাত্রায় প্রাণে বাঁচলেও পরে জোর করে পদত্যাগ করানো হয় প্রধান শিক্ষক প্রণয় অধিকারীকে। এরপর তিনি বরণ করেন নির্বাসিত জীবন। শুরু হয় বঞ্চনা আর মানবেতর জীবনযাপন। সেদিনের দুঃসহ স্মৃতি মনে করতেও ভয় পান এই শিক্ষক।

গত ১৯ এপ্রিল দুপুরে ফোনে যোগাযোগ করা হলে অজ্ঞাত স্থান থেকে প্রণয় অধিকারী বলেন, ‘আমার প্রাণের ক্যাম্পাসের ভেতরে আমাকে সপরিবারে এভাবে মেরে ফেলার চেষ্টা করেছে, এ কথা যতবার ভাবি, আমার গা শিউরে ওঠে।’

আর্থিক অনিয়ম ও স্বেচ্ছাচারিতার অভিযোগ শুনিয়ে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের উত্তেজিত করে দেন প্রতিষ্ঠানের কিছু শিক্ষক, এমন অভিযোগ প্রণয় কান্তির। তিনি বলেন, ‘আমি জীবনে কোনো দিন রাজনীতি করিনি। এখন মনে হয়, আমার দোষ একটাই—আমি কড়া প্রশাসক, কখনো কোনো অনিয়ম প্রশ্রয় দিইনি। অথচ আমাকে অপরাধী বানিয়ে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের উত্তেজিত করে এমন জঘন্য কাজে নামিয়ে দেওয়া হয়।’

এই শিক্ষক জানান, অনেক দৌড়ঝাঁপের পর গত বছরের ডিসেম্বরে তাঁর বেতন-ভাতা চালু হয়েছে। কিন্তু প্রাণের ভয়ে এখনো স্কুলে ফিরতে পারেননি।

ওই বিভীষিকাময় দিনের ঘটনার এক প্রত্যক্ষদর্শী বলেন, ‘বাড়িটির সব দরজা প্রায় ভেঙে ফেলা হয়েছিল। শেষ পর্যায়ে ফেসবুকে লাইভ শুরু হলে পরিস্থিতি কিছুটা বদলায়। না হলে কী যে হতো, তা ভাবতেও ভয় লাগে।’

একই স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত প্রবীণ শিক্ষক শহিদুল্লাহ বলেন, ‘একজন শিক্ষক সমাজ গঠনের কারিগর, অথচ তিনি আজ নিজেই অন্ধকারে। তাঁর পরিবার আজও বহন করে চলেছে এক ভয়াবহ দিনের দাগ, যা কোনো দিনই মুছে যাওয়ার না।’

প্রণয় কান্তি অধিকারীর মতোই কঠিন পরিস্থিতির মুখে পড়েছেন দেশের বেসরকারি বিদ্যালয়ের অন্তত তিন হাজার শিক্ষক-শিক্ষিকা। আরো কয়েকজন কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকও মব-সন্ত্রাসের শিকার হয়েছেন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হলে দেশজুড়ে শুরু হয় ‘মবোৎসব’। এর থেকে রেহাই পাননি মানুষ গড়ার কারিগর শিক্ষাগুরুরাও। দুর্নীতির অভিযোগ তুলে, স্বৈরাচারের দোসর তকমা দিয়ে নিরপরাধ শিক্ষকদের অপমান-অপদস্থ’, শারীরিক-মানসিক নিপীড়ন চালানো হয়েছে। জোর করে পদত্যাগপত্রে সই করিয়ে নেওয়া হয়েছে, তারপর লঞ্ছিত করে তাঁদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে বের করে দেওয়া হয়েছে। তাঁদের বেতন-ভাতাও বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। তাঁদের পরিবারের ওপরও চালানো হয়েছে নিপীড়ন। ২০২৪ সালের আগস্ট, সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর—এই তিন মাসেই ঘটে গেছে মব-সন্ত্রাসের এসব নজিরবিহীন ঘটনা। এর পরও অবশ্য আরো কয়েকটি মবের ঘটনা ঘটেছে।

ঠিক কতজন শিক্ষক মবের শিকার হয়েছেন—সুনির্দিষ্টভাবে সে সংখ্যা শিক্ষা মন্ত্রণালয়, মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা (মাউশি) অধিদপ্তর বা জেলা শিক্ষা অফিসের কাছে—কোথাও পাওয়া যায়নি। মবের শিকার হওয়া শিক্ষকদের সংগঠন ‘পদবঞ্চিত প্রতিষ্ঠানপ্রধান ও শিক্ষক জোট’-এর তথ্য মতে, ৫ আগস্টের পর মব-সন্ত্রাসের শিক্ষার হয়েছেন প্রায় সাড়ে চার হাজার শিক্ষক।

বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, জেলা ও উপজেলা শিক্ষা কার্যালয় এবং শিক্ষক ও তাঁদের পরিবারের সঙ্গে আলাপ করে জানা যায়, ওই সময় সারা দেশে মবের শিকার হওয়া শিক্ষকের সংখ্যা হবে কমপক্ষে তিন হাজার। অনুসন্ধানে জানা গেছে, এর মধ্যে দুই হাজার ১০০ শিক্ষকের বেতন চালু হলেও এখনো অনেকেই স্কুলে যেতে পারছেন না। বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর গত ফেব্রুয়ারি মাসের শেষ দিক থেকে স্কুলে ফিরেছেন প্রায় ২০০ শিক্ষক, তাঁদের বেতনও চালু হয়েছে। তবে এখনো প্রায় ৭০০ শিক্ষকের বেতন বন্ধ, সব ধরনের দপ্তরে ঘুরেও যোগদান করতে পারছেন না তাঁরা। তাঁদের অনেককে স্কুলে যেতে বাধাও দেওয়া হচ্ছে।

অনুসন্ধানকালে দেশের বিভিন্ন স্কুল-কলেজের ১২৩ জন শিক্ষকের তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে; যাঁদের মবের মাধ্যমে জোর করে পদত্যাগে বাধ্য করা হয়েছে। এর মধ্যে ৪২ জন শিক্ষকের সঙ্গে আমাদের কথা হয়েছে। সংগ্রহ করা হয়েছে মবের একাধিক ভিডিও। তাতে দেখা যাচ্ছে, পদত্যাগপত্র মবকারীরা লিখে দিয়েছে; পরে জোর করে, এমনকি শিক্ষকের হাত চেপে ধরে, হুমকি-ধমকি দিয়ে স্বাক্ষর দিতে বাধ্য করা হয়েছে। স্বাক্ষর দিতে না চাইলে প্রাণনাশেরও হুমকি দিতে শোনা গেছে।

শিক্ষকদের ওপর নির্বিচারে হামলার ঘটনায় একবার মুখ খুলেছিলেন তখনকার শিক্ষা উপদেষ্টা ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ। তিনি সাংবাদিকদের বলেছিলেন, ‘চর দখলের মতো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো দখল হয়ে যাচ্ছে। শিক্ষকরা লাঞ্ছিত ও অপমানিত হচ্ছেন।’ কিন্তু ওই বলা পর্যন্তই; নেওয়া হয়নি কোনো কার্যকর পদক্ষেপ। বরং দেশের বিভিন্ন এলাকায় শিক্ষকদের ওপর মব রুখে দাঁড়ানোর আহবান জানিয়ে সভা-সমাবেশ করেছিল শিক্ষকদের বিভিন্ন সংগঠন।

২০২৪ সালের ২৪ অক্টোবর নোয়াখালীর বেগমগঞ্জে নরোত্তমপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ইউনুস নবীকে জোর করে বের করে দেয় বিদ্যালয় পরিচালনা পরিষদের সাবেক সভাপতি মুক্তার হোসেনের নেতৃত্বে মব বাহিনী। তখনকার উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোতাসিম বিল্লার সামনেই এ ঘটনা ঘটে। পরের বছরের ২৩ এপ্রিল বিদ্যালয়ে গেলে এই প্রধান শিক্ষককে মারধর করা হয়; পরনের জামা-কাপড় ছিঁড়ে ফেলা হয়।

শিক্ষক ইউনুস নবীর অভিযোগ, স্কুলের সাবেক সভাপতি মুক্তার হোসেন, তাঁর ছোট ভাই একরাম হোসেন, শরীফপুর ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক শাহীন, ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি ডা. পারভেজ, ইউপি সদস্য বাহারসহ প্রায় ৩০ জন রাজনৈতিককর্মী তাঁকে অপদস্থ করেন। এ সময় মব বাহিনী নিজেদের লেখা পদত্যাগপত্রে জোর করে তাঁর সই নিয়ে যায়। তবে সরকারের উচ্চ পর্যায়ের নির্দেশনার কারণে ওই পদত্যাগপত্র গৃহীত হয়নি।

এ বিষয়ে বেগমগঞ্জের ইউএনও ও জেলা প্রশাসক বরাবর অভিযোগ দেন ইউনুস নবী। কিন্তু প্রশাসন কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না, আবার তাঁকেও স্কুলে যেতে দিচ্ছে না।

জানতে চাইলে মুক্তার হোসেন অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, তিনি বা তাঁর কেউ নন, স্থানীয় লোকজন দুর্নীতির কারণে প্রধান শিক্ষককে বের করে দেয়। পরে ওই শিক্ষক আদালতের আশ্রয় নিয়ে এখন নিজেই মামলা তুলে নিয়েছেন। বর্তমানে সহকারী প্রধান শিক্ষক দায়িত্বে আছেন।

ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি ও বেগমগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. কায়েসের রহমান জানান, ওই স্কুলের বিষয়ে তিনি অবহিত নন।

এক উপজেলায় মবের শিকার চার শিক্ষক

২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে অন্তত চারজন শিক্ষক মবের শিকার হন। ভাটিয়ারী হাজী তোবারক আলী উচ্চ বিদ্যালয়ের কান্তি লাল আচার্য্য নিজ পদে ফিরলেও মাদামবিবিরহাট শাহজাহান উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক এ বি এম গোলাম নূর এবং টেরিয়াইল উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রতন চক্রবর্তী এখনো কর্মস্থলে ফিরতে পারেননি। সীতাকুণ্ড বালিকা বিদ্যালয়ের শিক্ষক হিমেল শর্মা রানা ঘটনার পর থেকেই নির্বাসনে আছেন। তিনি কোথায় আছেন, কেউ জানে না।

অভিযোগ আছে, ২০২৫ সালের ১৮ আগস্ট গোলাম নূরকে জোর করে পদত্যাগের চেষ্টা করা হয়। অস্বীকৃতি জানালে তাঁকে স্কুল থেকে বের করে দেওয়া হয়। পরে জেলা শিক্ষা অফিস তাঁর যোগদানে সহযোগিতার নির্দেশ দিলেও স্থানীয়ভাবে কোনো সহায়তা পাননি তিনি। এমনকি যোগ দিতে গেলে তাঁকে লাঞ্ছিত করে তাড়িয়ে দেওয়া হয়।

আরো করুণ অবস্থা রতন চক্রবর্তীর। ২০২৪ সালের ১ সেপ্টেম্বর শতাধিক লোক তাঁকে স্কুল থেকে বের করে দেয়। তদন্তে দুর্নীতির অভিযোগ প্রমাণ না হওয়ায় মন্ত্রণালয় তাঁকে পুনর্বহাল ও বেতন চালুর নির্দেশ দিলেও তা বাস্তবায়ন হয়নি।

সীতাকুণ্ড উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ফখরুল ইসলাম বলেন, কিছু সমস্যা সমাধান হয়েছে, বাকিগুলো সমাধানের চেষ্টা চলছে। তবে রতন চক্রবর্তীর ঘটনাকে তিনি আগের প্রশাসনিক বিরোধের ফল বলে জানান। যদিও ভুক্তভোগীদের দাবি—মবই তাদের জীবন-জীবিকা বিপর্যস্ত করে দিয়েছে।

ভিকারুননিসায় স্বার্থ হাসিলের মব

রাজধানীর ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজেও মব সৃষ্টি করে অধ্যক্ষ কেকা রায় চৌধুরী এবং সহকারী অধ্যাপক ড. ফারহানা খানমকে পদত্যাগে বাধ্য করা হয়। এই মবে নেতৃত্ব দেন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটিরই প্রাক্তন কিছু শিক্ষার্থী ও কয়েকজন শিক্ষক। ২০২৪ সালের ১১ আগস্ট সকাল ১১টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত সময়ের ক্যাম্পাসের কিছু ভিডিও ফুটেজ বিশ্লেষণ ও অনুসন্ধানে দেখা যায়, মবের নেতৃত্ব দেন ভিকারুননিসার অ্যালামনাই ইফফাত গিয়াস আরেফিন ও তিথি। এই দুজনই ১৯৯৪ সালে এই প্রতিষ্ঠান থেকে এইচএসসি পাস করেন। জানা যায়, মবে আরো কয়েকজন বহিরাগত ও সাবেক শিক্ষার্থী ছিলেন যাঁদের নাম-পরিচয় নিশ্চিত হওয়া যায়নি; তবে ভিডিওতে একাধিকবার উপস্থিতির মধ্য দিয়ে শিক্ষার্থী জান্নাতুল ফেরদৌস শিলার মবের সঙ্গে জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া যায়। ফুটেজে শিক্ষক মাজেদা বেগমকেও দেখা গেছে। তিনিই এখন অধ্যক্ষের দায়িত্ব পালন করছেন।

অধ্যক্ষ কেকা রায় চৌধুরী বলেন, “আমাদের যে মব করে পদত্যাগে বাধ্য করেছে, সেই প্রমাণ সিসিটিভি ফুটেজে আছে। এ ব্যাপারে জিডিও করেছি। গত দেড় বছরে আমি মন্ত্রণালয়, ডিজি, চেয়ারম্যানসহ কমপক্ষে দেড় শ জায়গায় আবেদন করেছি। ঢাকা বোর্ড, জেলা প্রশাসক তদন্ত করে ‘জোরপূর্বক পদত্যাগ’ বলে রায় দিয়েছে। গত বছরের ১৭ ফেব্রুয়ারি এ ব্যাপারে ডিসি অফিসও চিঠি দিয়েছে। চলতি বছরের ১০ ফেব্রুয়ারি মন্ত্রণালয় থেকে আমাকে পুনর্বহালের চিঠি দিয়েছে। তার পরও স্কুল থেকে কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। এমনকি দুই বছর ধরে আমার বেতন বন্ধ।’

ড. ফারহানা খানম বলেন, ‘আমি গভর্নিং বডির শিক্ষক প্রতিনিধি ছিলাম। তাই কোনো কাজে ভেটো দিলেই আমার ওপর দোষ এসে পড়ত। ইফফাত গিয়াস আরেফিন প্রতিষ্ঠানের লিগ্যাল অ্যাডভাইজার হওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। আমি ভেটো দিয়েছিলাম। তিথি তাঁরই বন্ধু বলে জেনেছি। আমি বিদায় নেওয়ার পর তাঁরা ঠিকই প্রতিষ্ঠান ঘিরে নানা ব্যবসা-বাণিজ্য করছেন। গত ঈদের আগেও মীনাবাজার নামে স্কুল প্রাঙ্গণে একটি মেলা করেছেন, যার নেতৃত্বে ছিলেন ইফফাত গিয়াস আরেফিন।’

ফারহানা খানম আরো বলেন, ‘মবের নেপথ্যে ছিলেন তিনজন শিক্ষক। তাঁদের একজন মাজেদা বেগম, যিনি ১১ আগস্টের পর অধ্যক্ষ হয়েছেন। আর তাঁর দুই সহযোগী—রসায়ন বিভাগের শিক্ষক বদরুল আলম এবং ইংরেজি বিভাগের শিক্ষক জান্নাতুল ফেরদৌস শিলা। তাঁরা দুজনই মূলত এখন প্রতিষ্ঠানটি চালাচ্ছেন। আমার এবং কেকা রায় চৌধুরীর আবার যোগদানে কোনো বাধা না থাকলেও বর্তমান অধ্যক্ষ কয়েকজন নেতার প্রভাব খাটিয়ে আমাদের যোগদান করতে দিচ্ছেন না।’

ফারহানা খানম বলেন, ‘মবের দিন আমাদের সকাল ১১টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত আটকে রেখেছিল ওরা। খবর পেয়ে আমার বড় ছেলে স্কুলে এলেও তাকে ঢুকতে দেওয়া হয়নি। শেষ পর্যন্ত সেনাবাহিনীর সহায়তায় আমি বের হই। আমার বাসা স্কুলের পাশাপাশি হওয়ায় সেখানেও মবের সৃষ্টি করা হয়। আমার দুই ছেলে ও স্বামীর ছবি দিয়ে ফেসবুকে ট্রল করা হয়। এতে বেশ কিছুদিন ওদের কলেজে যাওয়াই বন্ধ হয়ে যায়। আমার বোনের চাকরি চলে যায়। ঘটনার পরপর আমার শ্বশুর স্ট্রোক করেন; চলতি বছরের ২৬ জানুয়ারি তিনি মারা যান। আর আমি অনেক দিন ধরে বাসার বাইরে বের হতে পারিনি।’

এ বিষয়ে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মাজেদা বেগম বলেন, ‘শিক্ষকদের পদত্যাগের বিষয়ে আদালতে মামলা চলমান। তাই এ বিষয়ে বিস্তারিত বলতে পারব না। তবে মন্ত্রণালয় আমাদের যে পুনর্বহালের চিঠি দিয়েছে, সেটা স্পষ্টীকরণের জন্য আমরা আবার চিঠি দিয়েছি। সেই জবাব এলে কমিটিই এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেবে।’

অ্যালামনাই ইফফাত গিয়াস আরেফিনের কাছে মবের ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমি এ বিষয়ে কথা বলব না।’ অ্যালামনাই হওয়া সত্ত্বেও কেন মবে অংশ নিয়ে দুজন শিক্ষককে পদত্যাগে বাধ্য করেছিলেন—এমন প্রশ্ন করলে তিনি ফোনটি কেটে দেন।

আরেক অ্যালামনাই ডা. নওশীন শারমিন পূরবী বলেন, ‘আমাদের শিক্ষকদের সঙ্গে যা হয়েছে তাতে আমরা লজ্জিত। বড় ব্যাপার হচ্ছে, অ্যালামনাইয়ের কয়েকজন এতে নেতৃত্ব দিয়েছেন। শিক্ষকরা যদি অন্যায় করেন এ জন্য গভর্নিং বডি আছে, মন্ত্রণালয় আছে, অধিদপ্তর আছে, অ্যালামনাইয়ের কাজ তো এটা না। হয়তো ব্যক্তিস্বার্থেই তাঁরা এ কাজ করেছেন।’

এদিকে সম্মান ফেরত পাওয়ার আকুতি জানিয়ে অধ্যক্ষ বলেছেন, ‘আগামী ৩০ জুলাই আমার অবসর। মবকারীরা চাচ্ছেন, সময়ক্ষেপণ করতে, যাতে আমি এই সময়ের মধ্যে যোগদান করতে না পারি। এর পরও প্রতি মাসে আমি স্কুলে যাই। বাচ্চাদের সঙ্গে কথা বলি। আগে আমাকে বাধা দিলেও এখন দেয় না। কিন্তু আমাদের যোগদান করতে দেওয়া হচ্ছে না। আমার চাকরির শেষ সময়ে আমি সম্মানটুকু ফেরত চাই।’

শ্রেষ্ঠ অধ্যক্ষকে পদচ্যুত

২০২৩ সালে ঢাকার ধামরাই উপজেলার শ্রেষ্ঠ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নির্বাচিত হয় সূয়াপুর নান্নার স্কুল অ্যান্ড কলেজ। একই বছর উপজেলার শ্রেষ্ঠ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানপ্রধান নির্বাচিত হন ওই কলেজের অধ্যক্ষ আনোয়ারুল ইসলাম তালুকদার। অথচ ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পরই এই অধ্যক্ষকেই জোর করে পদত্যাগ করানো হয়।

অধ্যক্ষ আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, ‘২০২১ সালের ১৮ আগস্ট আমার যোগদানের মাত্র তিন বছরের মধ্যে জেলার শ্রেষ্ঠ প্রতিষ্ঠানের স্বীকৃতি পায়। এ জন্য আমাকে বেশকিছু পদক্ষেপ নিতে হয়েছে। ক্লাসরুমে কড়াকড়ির মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের কোচিংয়ে নিরুৎসাহ করেছি। নিম্নমানের পাঠ্যবই বাদ দিয়েছি। বিভিন্ন দিবস ও অনুষ্ঠানের নামে অযাচিত বিল ও সম্মানি নেওয়া বাদ দিয়েছি। এতে কয়েকজন সিনিয়র শিক্ষক আমার প্রতি ক্ষুব্ধ ছিলেন। সরকার পতনের পর কয়েকজন শিক্ষক আমার বিরুদ্ধে ছাত্রদের উসকে দেয়। এর মধ্যে ছিলেন সিনিয়র শিক্ষক সাজ্জাদ হোসাইন, সাইফুল ইসলাম খান, ফজলুল হক খান এবং সহকারী প্রধান শিক্ষক মোহাম্মদ আলমগীর। ১৫ আগস্ট গভর্নিং বডির সভাপতি আসাদুজ্জামান খান, যিনি অন্তর্বর্তী সরকারের একজন উপদেষ্টার স্বামী, তিনি লোক পাঠিয়ে আমাকে পদত্যাগপত্রে জোর করে স্বাক্ষর নেওয়ান। এরপর আমার আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে স্বপদে বহাল করতে রায় দেন আদালত। কিন্তু আজ পর্যন্ত আমি যোগ দিতে পারিনি।’

অনুসন্ধানে জানা গেছে, মবে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীদের মধ্যে ছিল টিটো হোসেন, ইসরাফিল আহমেদ, নাজমুল হাসান, মৃদুল, জান্নাতি আক্তার, পারমিতা প্রমুখ। জানতে চাইলে টিটো বলেন, ‘মবের কারণে আমার জীবনটাই পিছিয়ে গেছে। আমি আর এ ব্যাপারে কিছু বলতে চাই না।’ মৃদুল নামের আরেক শিক্ষার্থী বলেন, ‘আমাদের ভুল বুঝিয়ে আন্দোলনে নামানো হয়েছে। কমিটি ও কয়েকজন শিক্ষক মিলে আমাদের উসকানি দেন। এখন বুঝতে পারছি আমরা ভুল করেছি।’

একাদশ শ্রেণির ছাত্র ইসরাফিল আহমেদ বলেন, শিক্ষকদের উসকানিতে আমরা অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে আন্দোলন করেছিলাম। পরবর্তী সময়ে ভুল বুঝতে পেরে প্রতিবাদ করায় আমাকে এইচএসসি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে দেয়নি ওই স্যারেরা।

প্রতিষ্ঠানের গভর্নিং বডির সাবেক সভাপতি ড. মোহাম্মদ সাইদুর রহমান সেলিম জানিয়েছেন, কিছু কতিপয় স্বার্থান্বেষী শিক্ষক ও বহিরাগতরা অবৈধ স্বার্থ আদায়ের জন্য শিক্ষার্থীদের ভুল বুঝিয়ে মবের সৃষ্টি করে। শারীরিক ও মানসিকভাবে হেনস্তার ভয়ভীতি দেখিয়ে অধ্যক্ষকে পদত্যাগে বাধ্য করানো হয়।

জানতে চাইলে বর্তমান ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মোহাম্মদ আলমগীর বলেন, ‘আগের অধ্যক্ষ আসলে শিক্ষক হওয়ারই যোগ্য নন। বিভিন্ন অনিয়মের সঙ্গে তিনি যুক্ত ছিলেন; পরে স্বেচ্ছায় পদত্যাগপত্র পাঠিয়ে দিয়েছেন। তাকে জোর করা হয়নি।’

পদত্যাগ করানো শিক্ষককে যোগদানে বাধা দিলে তারও বেতন বন্ধ করা হবে—মাউশির এমন নির্দেশনার প্রসঙ্গ তুললে বর্তমান অধ্যক্ষ বলেন, ‘এখন যেহেতু কমিটি নেই, তাই মাউশি অধিদপ্তর ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা যদি আগের অধ্যক্ষকে যোগদান করতে বলেন, তাতে আমরা বাধা দিতে পারি না।’

মবের সঙ্গে প্রাণসংশয়ও

বরিশালের গৌরনদীর শরিকল মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক কণিকা মুখার্জী শুধু মবের শিকারই নন, প্রাণ সংশয়ের মধ্যেও পড়েছিলেন। তিনি কান্নাজড়িত কণ্ঠে ঘটনার বর্ণনায় বলেন, ‘২০২৪ সালের ৩ সেপ্টেম্বর দুপুর ১২টায় আমি বায়োলজি ক্লাস নিচ্ছিলাম। এমন সময় দশম শ্রেণির তিনজন ছাত্র ও এলাকার তিনজন লোকের নেতৃত্বে ২০ থেকে ২৫ জন এসে সব শিক্ষার্থীকে বের করে দেয়। তারা অকথ্য গালাগাল ও নানা অপবাদ দিয়ে আমাকে পদত্যাগ করতে বলে। ওই দিন স্থানীয় একজনের সহায়তায় আমি স্কুল থেকে বের হই। এরপর ৪ ও ৫ সেপ্টেম্বর স্কুল বন্ধ ছিল। ৬ ও ৮ সেপ্টেম্বর স্কুলে এলে মবের সৃষ্টি হয়।’

কণিকা মুখার্জী আরো বলেন, ‘২০২৪ সালের ৯ সেপ্টেম্বর রাত ৩টার দিকে একদল লোক আমাদের বাড়িতে আসে। জানালা দিয়ে বলে, কালকেই পদত্যাগ করবি, নয়তো স্বামীসহ তোকে জবাই করব। পরে একজন শুভাকাঙ্ক্ষী জানালেন, আপনাদের বাড়িতে হামলা হতে পারে। এরপর আমরা দ্রুত বাড়ি থেকে পালিয়ে যাই। ১৬ সেপ্টেম্বর বাড়িতে ফিরে এলে আবারও একই অবস্থার সৃষ্টি হয়। পরে ২১ সেপ্টেম্বর সাদা কাগজের পদত্যাগে স্বাক্ষর করতে বাধ্য করা হয়। যদিও ইউএনও তা গ্রহণ করেননি। আমি তিন মাস ছুটিতে থেকে ১ ডিসেম্বর স্কুলে গেলে দুই ঘণ্টার মধ্যে আবার লোকজন জড়ো হয়। কেউ শাড়ি ধরে টানে, কেউ ব্যাগ ধরে টানে, কেউ মোবাইল নিয়ে যায়। তখনো আবার পদত্যাগপত্র লিখে স্বাক্ষর নেয়। যদিও সেটাও গ্রহণ করেননি ইউএনও। এরপর আমি বারবার শিক্ষার সব দপ্তর, প্রশাসনে ধরনা দিলেও অদৃশ্য কারণে এখনো আমার বেতন চালু হয়নি। আমাকে স্কুলেও যেতে দেওয়া হচ্ছে না।’

অনুসন্ধান ও ভিডিও বিশ্লেষণ করে জানা যায়, কণিকা মুখার্জীর মবের সময় নেতৃত্ব দেয় কয়েকজন স্থানীয় ব্যক্তি। তাদের মধ্যে জাহাঙ্গীর গোমস্থা, নয়ন মৃধা, নুরুল ইসলাম মেম্বার, সুমন শরীফ ও নুরুল আমিন অন্যতম। তাদের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন স্কুলটির প্রধান শিক্ষক মোহাম্মদ ইব্রাহীম। কণিকা মুখার্জী ২০২৩ সালের আগে পাঁচ বছর ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করেছেন। তখন থেকেই মূলত দ্বন্দ্বের শুরু। বিশেষ করে নয়ন মৃধা একটি ফটোকপির দোকান চালান। সে চাইত স্কুলের সব ফটোকপি, কাগজপত্র কেনা তার দোকান থেকে হোক। আর অন্যরা চাইত স্কুলের নিয়ন্ত্রণ। অন্যদিকে প্রধান শিক্ষক শুধু কণিকা মুখার্জীর ওপর দায় চাপিয়ে নিজে মুক্ত হতে চাইছেন এবং তাঁর কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী রাখতে চাননি। ফলে মবের শিকার হয়েছেন তিনি।

প্রতিষ্ঠানটির মবের সময় দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী তিসা, শিফাত, সিয়াম ও নুরনীর নেতৃত্বে ১০ সেপ্টেম্বর শিক্ষার্থীরা আন্দোলনে নামেন। সিয়াম ও নুরনীর সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁরা সাড়া দেননি।

মব সৃষ্টিকারী সুমন শরীফ বলেন, ৫ আগস্টের পর শহীদ আবু সাঈদকে নিয়ে শিক্ষক কনিকা মুখার্জীর একটি মন্তব্য ঘিরে শিক্ষার্থীরা আন্দোলনে নামেন। শিক্ষার্থীদের বুঝিয়ে শ্রেণিকক্ষে ফেরানোর চেষ্টা করেছি। কিন্তু বিষয়টি স্পর্শকাতর হওয়ায় আমরাও পরে আন্দোলনে যুক্ত হতে বাধ্য হই।

বর্তমান প্রধান শিক্ষক মো. ইব্রাহীম বলেন, কনিকা মুখার্জী ২০২৪ সালের ৩ সেপ্টেম্বর পদত্যাগ করেছেন বলে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও জেলা প্রশাসককে লিখিতভাবে জানিয়েছিলেন। কিন্তু সেই পদত্যাগপত্রের কোনো অনুলিপি দেখাতে পারেননি। বিষয়টি জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের তদন্তেও উঠে এসেছে।

জামা-ওড়না ধরে টানাটানি

মবের শিকার হয়েছেন রাজধানীর উত্তর কাফরুল উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শাম্মী আক্তার। ২০২৪ সালের ২৯ ডিসেম্বর তাঁকে জোরপূর্বক পদত্যাগে বাধ্য করা হয়। একটি ভিডিওতে দেখা যায়, ওই দিন রুমে ঢুকে বেশ কয়েকজন ছাত্র-ছাত্রী প্রধান শিক্ষককে পদত্যাগের জন্য জোর করছে। তাঁর দুই হাত দুই পাশ থেকে ধরে টানাটানি করছে কয়েকজন। কেউ কেউ ওড়না ও জামা ধরেও টানছে। কেউ কেউ দুর্ব্যবহার করছে। এই অবস্থায় শাম্মী আক্তার ভীত হয়ে পড়েন। শেষে অনেকটা জোর করেই তাঁর হাতে কলম ধরিয়ে পদত্যাগপত্রে স্বাক্ষর করানো হয়।

শাম্মী আক্তার বলেন, ‘এই স্কুলে আমার যোগদানের বয়স মাত্র এক বছর। সবাইকে চিনতামও না। বিভিন্ন সরকারি অনুষ্ঠানে সরকারদলীয় লোকজনের সঙ্গে ছবি ছিল, যেগুলোকে কেন্দ্র করে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আমার বাড়ির সামনে মব করে। এরপর ১৮ আগস্ট স্কুলে গেলে সেখানেও মবের সৃষ্টি করে। তিন মাসের ছুটির পর ২৯ ডিসেম্বর স্কুলে গেলে আবারও জোরপূর্বক পদত্যাগে বাধ্য করা হয়।’

শাম্মী আক্তার আরো বলেন, ‘স্থানীয় কয়েকজন ব্যক্তি বলেছেন, কিছু টাকা-পয়সা দিলে তাঁরা আমাকে স্কুলে ফেরার ব্যবস্থা করে দেবেন। কিন্তু তাতে সাড়া না দেওয়ায় তাঁরা আমার প্রতি আরো বেশি রাগান্বিত।’

অনুসন্ধানে জানা যায়, এই মবের নেপথ্যে ছিলেন প্রতিষ্ঠানটির সহকারী প্রধান শিক্ষক শামসুল আলম। তিনি প্রধান শিক্ষক হওয়ার স্বার্থে এতে যোগ দেন। এ ছাড়া স্কুলের শিক্ষক নজরুল ইসলাম, মাজেদা আক্তার, নুসরাত ফারিয়া ও সাজেদা খানম পদত্যাগ করতে চাপ দেন।

আরো যত ‘মবোৎসব’

মুন্সীগঞ্জের সিরাজদিখানে মাস্টার আব্দুর রহমান একাডেমির প্রধান শিক্ষক শিবেন্দ্র চক্রবর্তী মবের শিকার হন। তিনি জানান, ২০২৪ সালের ৮ আগস্ট সহকারী প্রধান শিক্ষক দেলোয়ার হোসেনের নেতৃত্বে বহিরাগতরা বিদ্যালয়ে ঢুকে শিক্ষার্থীদের উসকে দেন। এরপর তাঁকে ছুটি নিতে বাধ্য করা হয়। ছুটি শেষে আবার স্কুলে গেলে প্রচণ্ড অপমান করে জীবননাশেরও হুমকি দেওয়া হয়। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে এই শিক্ষকের বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ তোলা হলেও তদন্তে তা প্রমাণ হয়নি। এর পরও স্কুলে ঢুকতে পারেননি এই শিক্ষক। তাঁর বেতন-ভাতাও বন্ধ।

মানিকগঞ্জের দৌলতপুরে বিঞ্চুপুর জিএম উচ্চ বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক হাফিজুর রহমান জানান, ২০২৪ সালের ২৫ আগস্ট অফিসকক্ষে ঢুকে স্থানীয় ও বহিরাগতদের একটি দল তাঁকে ভয়ভীতি দেখিয়ে জোর করে পদত্যাগপত্রে স্বাক্ষর করায়, পরে বিদ্যালয় থেকে বের করে দেয় এবং প্রাণনাশের হুমকি দেয়। তাঁর বেতন-ভাতাও বন্ধ করে দেওয়া হয়।

রাজধানীর বাড্ডার আব্দুল খালেক মেমোরিয়াল উচ্চ বিদ্যালয়ে ২০২৪ সালের ৮ আগস্ট শিক্ষার্থী ও বহিরাগতদের একটি দল ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক আয়শা আক্তারকে কক্ষে আটকে রেখে জোরপূর্বক পদত্যাগে বাধ্য করে, পরে তাঁকে রাস্তায় অশালীন আচরণ ও হেনস্তা করা হয়।

চট্টগ্রামের টাইগারপাস বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ে যোগদান করতে গিয়ে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত হন প্রধান শিক্ষক মোজাম্মেল হক। একটি ভিডিওতে দেখা যায়, বিদ্যালয়ের একটি কক্ষে পরিচালনা কমিটির সভাপতি হারুন অর রশিদ, ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মোজাম্মেল হকসহ বেশ কয়েকজনের মধ্যে বাগবিতণ্ডা হচ্ছে। এক পর্যায়ে পেছন থেকে কয়েকজন ব্যক্তি এসে মোজাম্মেলকে ধাক্কা দিতে থাকেন। এরপর আরো কয়েকজন তাঁকে ধাক্কা দিয়ে বিদ্যালয়ের বাইরে বের করে দেন।

কোম্পানীগঞ্জের মানিকপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ফরিদা ইয়াসমিন স্থানীয় চাপ ও হামলার আশঙ্কায় সন্তানকে নিয়ে এলাকা ছাড়তে বাধ্য হন। ২০২৫ সালের ২৮ মে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক ও বীর মুক্তিযোদ্ধা এস এম আনোয়ারা বেগমকে শিক্ষার্থীরা ঘিরে ধরে পুলিশের হাতে তুলে দেন; পরে তাঁকে একটি মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়।

নরসিংদীর পলাশে ২০২৪ সালের ৭ আগস্ট মব সৃষ্টি করে প্রধান শিক্ষক বরুণ চন্দ্র দাসকে সরিয়ে দেওয়া হয়। পরে অবশ্য নির্দোষ প্রমাণ হলে তাঁকে পুনর্বহাল করা হয়। ২০২৪ সালের ৭ আগস্ট ঢাকা সিটি কলেজে পদ দখলের অভিযোগে অধ্যক্ষকে জোর করে পদত্যাগে বাধ্য করা হয় এবং পরে আরো কয়েকজন শিক্ষক প্রতিষ্ঠান ছাড়তে বাধ্য হন। ২০২৫ সালের ২ মে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে এক শিক্ষককে মারধরের অভিযোগ ওঠে, আর ২০২৫ সালের ৩০ এপ্রিল টাঙ্গাইলের মধুপুরে এক প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে মব গড়ে ওঠে।

এ ছাড়া ২০২৪ সালের ১১ আগস্ট ঢাকা মডেল ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষকে এবং মিরপুর কলেজের উপাধ্যক্ষকে জোরপূর্বক সরিয়ে দেওয়া হয়।

গাজীপুরের কালিয়াকৈরে গোলাম নবী পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আলকাছ উদ্দিন আহমেদ, ধানমণ্ডির বিসিএসআইআর স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ ড. মো. ইদ্রিস আলী, কুমিল্লার দিদার মডেল হাই স্কুলের প্রধান শিক্ষক মহাদেব চন্দ্র দে, ঢাকার কোতোয়ালির আনন্দময়ী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক নাজমা বেগম, মানিকগঞ্জের দড়গ্রাম উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক সিদ্দিকুল ইসলাম, বনানী মডেল স্কুলের সহকারী প্রধান শিক্ষক মো. জহিরুল ইসলাম মবের শিকার হন।

Share