
গাজী আবু বকর : ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ ও সমসাময়িক দলীয় ভূমিকা সংক্রান্ত বিতর্কে জাতীয় সংসদে ক্রমশ চাপের মুখে পড়ছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। এই চাপের মুখে মাঠের রাজনীতিতেক্ষমা চাওয়ার ইস্যুটি যখন প্রবল ঠিক তখনই বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির সৈয়দ আবদুল্লাহ মুহাম্মদ তাহের গতকাল সংসদে রাষ্ট্রপতির ভাষণের উপর আনিত ধন্যবাদ প্রস্তাবের আলোচনায় পক্ষান্তরে নিজেকে মুক্তিযোদ্ধা দাবি করে বসেছেন।তাঁর এই বক্তব্যের পর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ মুক্তিযুদ্ধকে ধারণ এবং নিজেকে মুক্তিযোদ্ধা দাবি করায় সংসদের বিরোধী দলীয় উপনেতাকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেছেন, ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি বাহিনী এবং তাদের এদেশীয় দোসর রাজাকার, আলবদর ও জামায়াতে ইসলামীর বিরুদ্ধে যারা লড়াই করেছেন, তারাই বীর মুক্তিযোদ্ধা এবং এটি এখন সংসদীয় আইনে সাব্যস্ত।তিনি বলেন, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে বারবার বিতর্ক সৃষ্টি করা সম্মানজনক নয়। আর বিরোধী দলের চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম বলেছেন,মুক্তিযুদ্ধ বাংলাদেশের ভিত্তি। এই প্রজন্মের হাত ধরে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে মূলত মুক্তিযুদ্ধের নবায়ন হয়েছে।
আজ ৩০ এপ্রিলবৃহস্পতিবার ছিলো ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের ২৫তম এবং সমাপনি দিন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় গঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন থেকেই বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর ঐতিহাসিক অবস্থান ও অতীত দায়বদ্ধতা নিয়ে প্রশ্ন ঘনীভূত হতে শুরু করে।সংসদের ভেতরে সরকারি ও বিরোধী উভয় শিবিরের প্রবীণ নেতাদের সমালোচনায় ১৯৭১ সালের ভূমিকা এবং জামায়াতের ‘ক্ষমা চাওয়ার’ বিষয়টি আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়। এর মধ্যেই দলটি রাজনৈতিকভাবে এক জটিল পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছে। একদিকে রাজপথে নতুন বাস্তবতায় সংগঠিত ও সক্রিয় উপস্থিতি, অন্যদিকে সংসদীয় রাজনীতিতে অতীত বিতর্কের চাপ।
যদিও যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান ১৯৪৭ থেকে ২০২৫ সালের ২২ অক্টোবর পর্যন্ত দলের নানা ভুলের জন্য নিঃশর্ত ক্ষমা প্রার্থনা করেন, তবে এ বক্তব্যকে ঘিরে দলটির পক্ষ থেকে পরবর্তীতে আনুষ্ঠানিক কোনো স্পষ্ট অবস্থান জানানো হয়নি। ফলে সামগ্রিকভাবে কার্যত দলটি‘কোণঠাসা’ হয়ে পড়ে।রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক নির্বাচনী ফল ও মাঠপর্যায়ের জনসমর্থনকে ভিত্তি করে জামায়াতে ইসলামী নিজেদের রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা ও ‘দেশপ্রেমিক’ অবস্থান প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে অর্জিত পরিবর্তনকে কাজে লাগিয়ে দলটি যেখানে নিজেদের পুনর্বিন্যাস ও প্রভাব বিস্তারের সুযোগ খুঁজছে, সেখানে জাতীয় সংসদের ভেতরে ১৯৭১ সালের ভূমিকা নিয়ে ধারাবাহিক প্রশ্নবাণ তাদের অবস্থানকে আরও জটিল করে তুলছে।সংসদ সদস্যদের কড়া সমালোচনায় বারবার উঠে আসছে মুক্তিযুদ্ধকে রাষ্ট্রের মৌল ভিত্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠার প্রসঙ্গ এবং সেই প্রেক্ষাপটে জামায়াতের অতীত অবস্থান।ফলে একদিকে দলটিকে ৫ আগস্ট-পরবর্তী আন্দোলনের রাজনৈতিক অংশীদারিত্ব ও অর্জনকে রক্ষা করার লড়াই চালাতে হচ্ছে, অন্যদিকে মুক্তিযুদ্ধ-সংক্রান্ত ঐতিহাসিক দায় ও জবাবদিহির চাপ তাদের রাজনৈতিক কৌশলকে ক্রমশ সীমিত করে দিচ্ছে। এই দ্বৈত বাস্তবতা জামায়াতকে এখন এক জটিল ও সংবেদনশীল রাজনৈতিক সমীকরণের মধ্যে দাঁড় করিয়েছে।জাতীয় সংসদে জামায়াতে ইসলামীর অতীত ভূমিকা ও মুক্তিযুদ্ধসংক্রান্ত অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন তোলার পর বিষয়টি রাজনৈতিক পরিসরের বাইরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। এই বিতর্ককে ঘিরে বিভিন্ন পক্ষ নিজেদের অবস্থান জোরালো করতে গিয়ে আওয়ামী লীগের অতীত শাসন, কর্তৃত্ববাদ ও রাজনৈতিক আচরণের প্রসঙ্গও সামনে আনছে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন থেকে জামায়াতের রাজনৈতিক অবস্থান ও ৭১ সালের তাদের কর্মকাণ্ড নিয়ে বিতর্ক শুরু হলেও সাম্প্রতিক সময়ে তা আরও বেড়েছে। উল্লেখযোগ্যভাবে, গত ২৮ এপ্রিলমঙ্গলবার কিশোরগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য ও প্রবীণ রাজনীতিবিদ বীর মুক্তিযোদ্ধা ফজলুর রহমান সংসদে বিস্ফোরক বক্তব্য দেন। তিনি ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থানকে মহান মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে তুলনা করার তীব্র বিরোধিতা করেন। তিনি বলেন, “যতদিন বাংলাদেশ থাকবে, এদেশের জঙ্গলে রয়েল বেঙ্গল টাইগার থাকবে— ততদিন মুক্তিযোদ্ধারা জিতবে, রাজাকাররা কোনোদিন এদেশে জয়লাভ করতে পারবে না।”
এ নিয়ে সংসদে তুমুল সমালোচনার জবাব দেন দলটির আমির ডা. শফিকুর রহমান। তিনি নিজেকে “মুক্তিযোদ্ধার পরিবারের সন্তান দাবি করে বলেন, মুৃক্তিযোদ্ধা এবং মুক্তিযোদ্ধার পরিবারের সন্তান হিসেবে জামায়াত করা যাবে না- এমন কোনো বিধান সংবিধান বা রাষ্ট্র কাউকে দেয়নি। এই মন্তব্য নাগরিক অধিকারের ওপর হস্তক্ষেপ এবং গুরুতর অপরাধ।
জামায়াতের অবস্থান নিয়ে সমালোচনা করে ‘আমরা রাজাকারের সঙ্গে যুদ্ধ করেছি’ বলে মন্তব্য করেন ভোলা-১ আসনের সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার আন্দালিব রহমান পার্থ। তিনি বলেন, ‘গত ১৭ বছর ধরে তরুণ সমাজ যে অত্যাচার দেখেছে, তা হয়তো তারা পুরোপুরি উপলব্ধি করতে পারেনি বলেই বারবার শুধু জুলাইয়ের ৩৬ দিনের কথা বলে।
জামায়াতের সমালোচনা করে বিএনপির সিনিয়র নেতা ও সংসদ সদস্য জয়নাল আবদিন ফারুক ‘গুপ্ত হচ্ছে স্বৈরাচার গুপ্তের বাবা রাজাকার’ বলে মন্তব্য করেন।
যে বিষয়টি নিয়ে মূলত সংসদে দলটিকে নিয়ে সমালোচনা হচ্ছে, সেটি নিয়ে কোনো মন্তব্য না করলে ১৯৬৯, ১৯৭০ তৎকালীন নেতারা কি করেছিলেন, সেটির ফিরিস্তি তুলে ধরেন চট্টগ্রাম-১৫ আসন থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য শাহজাহান চৌধুরী। জামায়াতের এ নেতা দাবি করেন, ১৯৬৯ সালে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা থেকে শেখ মুজিবুর রহমানকে মুক্ত করতে তৎকালীন জামায়াতে ইসলামী পাকিস্তান ডেমোক্রেটিক মুভমেন্টের মাধ্যমে আন্দোলন করেছিল এবং সেই সময় সবচেয়ে বেশি অর্থের জোগান দিয়েছিল।তিনি ১৯৭০ সালের নির্বাচনের পর অধ্যাপক গোলাম আযমের পক্ষ থেকে শেখ মুজিবের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের আহ্বানের বিষয়টিও স্মরণ করিয়ে দেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, শাহজাহান চৌধুরী এসব দাবি ১৯৭১ সালের জামায়াতে ইসলামীর ‘নেতিবাচক’ ইমেজ ঝেড়ে ফেলে একটি ‘গণতান্ত্রিক’ ও ‘ইতিহাসের অংশীদার’ হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা।
তবে জামায়াতের এমন আত্মপক্ষ সমর্থনকে নস্যাৎ করে দিয়েছেন সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম। গত বুধবার জাতীয় সংসদের অধিবেশনে তিনি বলেন, ‘১৯৪১ সালে প্রতিষ্ঠিত একটি রাজনৈতিক দল (জামায়াত), যাদের জনগণ কখনও ভোটের মাধ্যমে ক্ষমতায় বসায়নি, তাদের দীর্ঘদিনের যন্ত্রণা থাকতে পারে। নির্বাচনের আগে যাদের কৃতকর্মের জন্য ক্ষমা চাইতে হয়, তারা রাজনৈতিকভাবে ব্যর্থ।’তিনি আরও বলেন, ‘জামায়াত অতীতে বিভিন্ন সময় ভুল স্বীকারের কথা বললেও আনুষ্ঠানিকভাবে একাত্তরের ভূমিকার জন্য ক্ষমা না চাওয়ায় তারা বারবার রাজনৈতিক চাপের মুখে পড়ছে।’
ইতিহাস পর্যালোচনায় দেখা যায়, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় জামায়াতে ইসলামী পাকিস্তানের অখণ্ডতার পক্ষে অবস্থান নেয় এবং শান্তি কমিটি, রাজাকার ও আল-বদর বাহিনীর সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগে দীর্ঘদিন ধরে সমালোচিত হয়ে আসছে। পরবর্তী সময়ে দলটির ভেতর থেকেই একটি অংশ ওই ভূমিকার জন্য আনুষ্ঠানিক ক্ষমা প্রার্থনার দাবি তোলে এবং এ ইস্যুতে ভিন্নমতের জেরে কেউ কেউ দল ত্যাগও করেন।যদিও এরপর বিষয়টি নিয়ে আলোচনা কার্যত হয়নি এবং জাতীয় সংসদেও এ বিষয়ে জামায়াত কোনো শক্ত অবস্থান নিতে পারেনি।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘ সময় ধরে বিএনপি ও আওয়ামী লীগের শাসনামলে জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমা না চাওয়ার পেছনে কৌশলগত ও রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশই প্রধান ভূমিকা রেখেছে। তাদের মতে, মুক্তিযুদ্ধকালীন ভূমিকা স্বীকার করে প্রকাশ্যে ক্ষমা চাইলে দলটির একটি অংশের সমর্থনভিত্তি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা ছিল, বিশেষ করে যারা ঐতিহাসিক ব্যাখ্যায় ভিন্ন অবস্থান ধারণ করে। আরও বড় বিষয় হলো, একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে হওয়া মামলায় জামায়াতের যেসব নেতার বিচার করা হয়েছে, তা সঠিক ছিল বলেই প্রতীয়মান হবে। তবে জাতীয় সংসদে নবীন-প্রবীণ রাজনীতিকদের কঠোর সমালোচনা ইঙ্গিত দিচ্ছে, মুক্তিযুদ্ধকালীন ভূমিকা ঘিরে বিতর্ক এখনো তাদের জন্য বড় রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ হিসেবেই রয়ে গেছে। সবচেয়ে বড় কথা, একাত্তর এখনো বাংলাদেশের রাজনীতিতে গভীর ও সংবেদনশীল বিষয়। মুক্তিযুদ্ধ রাষ্ট্রের ভিত্তি হওয়ায় সে সময় জামায়াতের অবস্থান নিয়ে ‘একাত্তরের কলঙ্ক’ প্রশ্নটি সহজে মুছে যাওয়ার নয়।
