‘পছন্দের পদের মোহেই বাড়ে দুর্নীতি’: তারেক রহমান

ডিসি সম্মেলনে জনপ্রশাসনের কর্মকর্তাদের প্রতি প্রধানমন্ত্রীর কড়া বার্তা

গাজী আবু বকর : সবসময় নিজেদের পছন্দের পদে পদায়ন কিংবা পোস্টিং পাওয়ার মানসিকতাই দুর্নীতিপরায়ণতা ও অপেশাদারিত্বের অন্যতম কারণ বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেন, “শুধুমাত্র পদোন্নতি কিংবা নিজেদের পছন্দের জায়গায় পোস্টিংয়ের জন্য পেশাদারিত্বের সঙ্গে আপস করলে সাময়িকভাবে হয়তো লাভবান হবেন, তবে সেটি সার্বিকভাবে জনপ্রশাসনের দক্ষতা ও নিরপেক্ষতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে জেলা প্রশাসক (ডিসি) সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে জনপ্রশাসনের কর্মকর্তাদের উদ্দেশ্যে দেওয়া বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছেন, প্রশাসনের প্রতিটি পদই সমান গুরুত্বপূর্ণ এবং কর্মকর্তাদের যে কোনো স্থানে কাজ করার মানসিক প্রস্তুতি থাকতে হবে।

প্রশাসনের প্রতিটি পদই অপরিহার্য: গতকাল সকালে চার দিনব্যাপী জেলা প্রশাসক সম্মেলনের উদ্বোধনকালে প্রধানমন্ত্রী মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তাদের উদ্দেশ্যে দিক-নির্দেশনামূলক বক্তব্য দেন। তিনি কর্মকর্তাদের মনে করিয়ে দেন যে, জনপ্রশাসনের কোনো পদই ছোট নয়। সরকারের লক্ষ্য বাস্তবায়নে প্রতিটি স্তরের কর্মকর্তাদের ভূমিকা অনস্বীকার্য। প্রধানমন্ত্রী বলেন, “জনপ্রশাসনের প্রতিটি পদকে গুরুত্বপূর্ণ ও অনিবার্য ভাবুন। দেশের যে কোনো স্থানে, যে কোনো সময় দায়িত্ব পালনে নিজেদের মানসিকভাবে প্রস্তুত রাখুন।” তার বক্তব্যে উঠে আসে প্রশাসনের শুদ্ধাচারের বিষয়টি। তিনি হুঁশিয়ারি দেন যে, বিশেষ কোনো পদের প্রতি মোহ কর্মকর্তাদের কেবল দুর্নীতিগ্রস্তই করে না, বরং প্রশাসনের সামগ্রিক চেইন অফ কমান্ডকেও ক্ষতিগ্রস্ত করে।

নিয়োগ ও পদোন্নতিতে ‘মেধা’ হবে একমাত্র মাপকাঠি: তারেক রহমান তার বক্তব্যে সিভিল সার্ভিসে আমূল পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিয়ে বলেন, এখন থেকে সততা, মেধা এবং দক্ষতাই হবে জনপ্রশাসনের নিয়োগ, বদলি কিংবা প্রমোশনের মূলনীতি। তিনি জানান, সরকার স্বচ্ছতা ও দ্রুততার সঙ্গে শূন্য পদে জনবল নিয়োগ এবং একটি শক্তিশালী পাবলিক সার্ভিস কমিশন (পিএসসি) গঠনের মাধ্যমে প্রশাসনিক কাঠামোকে ঢেলে সাজাতে বদ্ধপরিকর। এছাড়া বেসরকারি সার্ভিস রুল প্রণয়নসহ সর্বত্র জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার ওপরও তিনি জোর দেন।

জুলাই সনদের অঙ্গীকার ও জনগণের আকাঙ্ক্ষা: প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যে বিগত দিনের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও বর্তমান সরকারের ম্যান্ডেট নিয়ে কথা বলেন। তিনি বলেন, “বর্তমান সরকার একটি দীর্ঘ প্রতীক্ষিত জবাবদিহিমূলক, ন্যায়ভিত্তিক ও জনকল্যাণমুখী শাসন ব্যবস্থার প্রতিফলন। সাধারণ মানুষ সরকারের প্রতিটি কাজের মাধ্যমে তাদের আকাঙ্খার বাস্তবায়ন দেখতে চায়।” মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তাদের ‘সরকার ও জনগণের মধ্যকার প্রধান সেতুবন্ধন’ হিসেবে অভিহিত করে তিনি বলেন, “আপনাদের সততা ও দায়বদ্ধতার ওপরই সরকারের সাফল্যের ভাগ্য নির্ধারিত হবে।” তিনি গত ১২ তারিখের জাতীয় নির্বাচনে পেশাদারিত্ব বজায় রাখায় কর্মকর্তাদের ধন্যবাদ জানান এবং সতর্ক করে বলেন, অতীতে (২০১৪, ২০১৮ বা ২০২৪ সালে) প্রশাসনকে কাজ করতে না দেওয়ার ফল কী হয়েছিল, তা দেশবাসী দেখেছে।

আগামীর লক্ষ্য; ‘শিশুদের মতো অদম্য স্পৃহা’: বক্তব্যের এক পর্যায়ে প্রধানমন্ত্রী গত শনিবার বিকেলের একটি শিশু ক্রীড়া অনুষ্ঠানের উদাহরণ টেনে আনেন। শিশুদের অদম্য স্পৃহা ও এগিয়ে যাওয়ার মানসিকতাকে এই সম্মেলনের মূল মন্ত্র বা ‘মোটো’ করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, “সামনে এগিয়ে যাওয়াই হোক আজকের অনুষ্ঠানের স্পিরিট।”

ভঙ্গুর অর্থনীতি ও বর্তমান চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা: সরকার গঠনের সময়কার প্রতিকূল পরিস্থিতির কথা স্মরণ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “আমরা যখন দায়িত্ব নেই, তখন দেশ এক ভঙ্গুর অর্থনীতি এবং বিভাজিত জনপ্রশাসনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল। ফ্যাসিবাদী শাসনামলের লুটপাটে রাষ্ট্র ঋণের ফাঁদে ডুবে ছিল। তার ওপর বর্তমান যুদ্ধ পরিস্থিতি আমাদের সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ নিয়ে এসেছে।” তবে গত আড়াই মাসে প্রশাসনের সহযোগিতায় পরিস্থিতির অনেক উন্নতি হয়েছে বলে তিনি সন্তোষ প্রকাশ করেন।

ডিসিদের জন্য প্রধানমন্ত্রীর সুনির্দিষ্ট নির্দেশনাবলী: প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নিত্যপণ্যের বাজার নিয়ন্ত্রণ, ভেজাল রোধ, সিন্ডিকেট ভাঙতে ও দুর্নীতি দমন এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠায় জেলা প্রশাসকদের (ডিসি) দায়িত্ব পালনে কঠোর হওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বাজার তদারকি এবং কৃষকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে কড়া নজরদারি; নিয়মিত ও দৃশ্যমান মোবাইল কোর্ট পরিচালনার মাধ্যমে শৃঙ্খলা বজায় রাখাসহ হয়রানি বন্ধে সরকারি অফিসে আসা সেবা প্রার্থীরা যেন কোনোভাবেই অনিয়ম বা বিলম্বের শিকার না হয় সে বিষয়ে সতর্কবাণি উচ্চারণ করেন। তিনি সামাজিক সুরক্ষায় কৃষক কার্ড, ফ্যামিলি কার্ড এবং ধর্মীয় গুরুদের সম্মানী প্রদানের কার্যক্রম নিখুঁতভাবে পরিচালনা; সামাজিক ব্যাধি রোধে বাল্যবিবাহ, মাদক নিয়ন্ত্রণ এবং নারী ও শিশু নির্যাতনের বিরুদ্ধে আপসহীন অবস্থানসহ দেশের হাজার বছরের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষায় জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণের নির্দেশনা দেন।

প্রযুক্তির ছোঁয়া ও জাতীয় ঐক্য: বর্তমান যুগকে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগ উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী কর্মকর্তাদের বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার জন্য তথ্যপ্রযুক্তিতে দক্ষ হওয়ার পরামর্শ দেন। আইন বা নিয়মকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট কাজ বিলম্বিত না করার জন্যও তিনি ডিসিদের সতর্ক করেন।

পরিশেষে, জাতীয় ঐক্যের ওপর গুরুত্বারোপ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “আমাদের মধ্যে মতভেদ থাকতে পারে, কিন্তু দেশের স্বার্থে সবার আগে বাংলাদেশ; এই নীতিতে অটল থাকতে হবে।”

উল্লেখ্য, চার দিনব্যাপী এই সম্মেলনে মোট ৩৪টি অধিবেশন অনুষ্ঠিত হবে। ৫৬টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগের মন্ত্রী-সচিবরা এতে অংশ নিয়ে ডিসিদের প্রয়োজনীয় দিক-নির্দেশনা দেবেন। ৬ মে এই সম্মেলন শেষ হওয়ার কথা রয়েছে।

Share