ঈদের আগে রেমিট্যান্স প্রবাহে বড় উত্থান, ২৩ দিনে এলো ৩৬ হাজার ৬০৬ কোটি টাকা

গাজী আবু বকর : আসন্ন কোরবানির ঈদকে সামনে রেখে পরিবার-পরিজনের উৎসব উদযাপনের জন্য প্রবাসী বাংলাদেশিরা ব্যাংকিং চ্যানেলে দেশে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা পাঠাচ্ছেন। চলতি মে মাসের প্রথম ২৩ দিনেই প্রবাসীরা দেশে পাঠিয়েছেন ২৯৭ কোটি ৬০ লাখ ৫০ হাজার বা ২ দশমিক ৯৭ বিলিয়ন ডলার। বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রতি ডলার ১২৩ টাকা হিসাবে যার পরিমাণ ৩৬ হাজার ৬০৫ কোটি ৭৫৩ লাখ ৮০ হাজার টাকা। আজ ২৪ মে রোববার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রকাশিত হালনাগাদ পরিসংখ্যান এবং গত বছরের একই সময়ের সঙ্গে তুলনা করলে দেখা যায়, এবারের রেমিট্যান্স প্রবাহ ৪১ দশমিক ৩১ শতাংশ বেশি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, রেমিট্যান্স প্রবাহের এই অভাবনীয় ঊর্ধ্বমুখী ধারা দেশের অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে। গত বছরের একই সময়ে দেশে রেমিট্যান্স এসেছিল ২১০ কোটি ৬০ লাখ ২০ হাজার ডলার। অর্থাৎ, গত বছরের তুলনায় এবার মে মাসে প্রবাসীরা উল্লেখযোগ্য হারে বেশি অর্থ দেশে পাঠিয়েছেন। শুধু মে মাসেই নয়, পুরো চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের পরিসংখ্যানেও রেমিট্যান্স প্রবাহের এই ইতিবাচক ধারা স্পষ্ট।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে, চলতি অর্থবছরের প্রথম ১০ মাস ২৩ দিনে (জুলাই থেকে ২৩ মে পর্যন্ত) দেশে মোট রেমিট্যান্স এসেছে ৩ হাজার ২৩০ কোটি ৯০ লাখ ৪০ হাজার ডলার বা ৩২ দশমিক ৩১ বিলিয়ন ডলার। যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ২১ দশমিক ২৬ শতাংশ বেশি। গত অর্থবছরের একই সময়ে প্রবাসীরা পাঠিয়েছিলেন ২ হাজার ৬৬৪ কোটি ৩৪ লাখ ২০ হাজার ডলার বা ২৬ দশমিক ৬৪ বিলিয়ন ডলার।

খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রবাসী আয় বৃদ্ধির পেছনে বেশ কয়েকটি কারণ রয়েছে। সাধারণত রোজা, ঈদুল ফিতর এবং ঈদুল আজহার মতো বড় ধর্মীয় উৎসবকে কেন্দ্র করে প্রবাসীরা পরিবারের জন্য বাড়তি অর্থ পাঠান। বিশেষত ঈদুল আজহায় পশু কোরবানির জন্য দেশে অতিরিক্ত অর্থের প্রয়োজন হয়। ফলে ঈদের আগে রেমিট্যান্স প্রবাহ বৃদ্ধি পাওয়াটা স্বাভাবিক প্রবণতা। এবারও এর ব্যতিক্রম হয়নি। তবে এবার উৎসবের পাশাপাশি আরেকটি বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটও কাজ করছে। বাংলাদেশের প্রবাসী আয়ের সবচেয়ে বড় উৎস মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো। বর্তমানে সেখানে যুদ্ধ পরিস্থিতি ও অস্থিরতা বিরাজ করছে। এই অস্থিতিশীল পরিবেশে প্রবাসীরা তাদের উপার্জিত অর্থ বিদেশে গচ্ছিত না রেখে দ্রুত দেশে পরিবারের কাছে পাঠিয়ে দেওয়াকে বেশি নিরাপদ মনে করছেন। রেমিট্যান্স বৃদ্ধির ক্ষেত্রে এটিও অন্যতম একটি বড় কারণ হিসেবে কাজ করেছে বলে ধারণা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রকাশিত প্রতিবেদনের তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, চলতি এপ্রিল মাসের প্রথম ১৬ দিনে রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে প্রবাসী আয় এসেছে ৩৪ কোটি ৯ লাখ ৪০ হাজার ডলার। বিশেষায়িত কৃষি ব্যাংকের মাধ্যমে এসেছে ২৩ কোটি ২৭ লাখ ৩০ হাজার ডলার। বেসরকারি খাতের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে এসেছে ১৩৮ কোটি ২৭ লাখ ৮০ হাজার ডলার। আর দেশে ব্যবসারত বিদেশি ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে এসেছে ৩৪ লাখ ৫০ হাজার মার্কিন ডলার। একক ব্যাংক হিসাবে সর্বোচ্চ প্রবাসী আয় এসেছে ইসলামী ব্যাংকের মাধ্যমে ৩৫ কোটি ৬২ লাখ ৭০ হাজার মার্কিন ডলার।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে আসে ২৪৭ কোটি ৭৮ লাখ ৭০ হাজার বা ২ দশমিক ৪৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, আগস্টে আসে ২৪২ কোটি ১৮ লাখ ৯০ হাজার বা ২ দশমিক ৪২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, সেপ্টেম্বরে আসে ২৬৮ কোটি ৫৫ লাখ ৬০ হাজার বা ২ দশমিক ৬৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, অক্টোবরে আসে ২৫৬ কোটি ২৪ লাখ ৪০ হাজার বা ২ দশমিক ৫৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, নভেম্বরে আসে ২৮৮ কোটি ৯৭ লাখ ৩০ হাজার বা ২ দশমিক ৮৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, ডিসেম্বরে আসে ৩২২ কোটি ৩৬ লাখ ৭০ হাজার বা ৩ দশমিক ২২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা ছিলো চলতি অর্থবছরে ঐ সময়কাল পর্যন্ত সর্বোচ্চ রেকর্ড। জানুয়ারিতে আসে ৩১৭ কোটি ১৬ লাখ ৩০ হাজার বা ৩ দশমিক ১৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, ফেব্রুয়ারিতে আসে ৩০১ কোটি ৯৪ লাখ ৫০ হাজার বা ৩ দশমিক ০১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। মার্চে আসে সকল রেকর্ড ভাঙা ৩৭৫ কোটি ২২ লাখ ১০ হাজার বা ৩ দশমিক ৭৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের রেমিট্যান্স।

উল্লেখ্য, প্রবাসী আয় হলো দেশে ডলার জোগানের একমাত্র দায়বিহীন উৎস। কারণ, এই আয়ের বিপরীতে কোনো বিদেশি মুদ্রা খরচ করতে হয় না বা কোনো দায়ও পরিশোধ করার দরকার পড়ে না। অন্যদিকে রপ্তানি আয়ের বিপরীতে দেশে ডলার এলেও তার জন্য কাঁচামাল ও যন্ত্রপাতি আমদানি করতে আবার বিদেশি মুদ্রা খরচ করতে হয়। আবার বিদেশি ঋণ পরিশোধ করতেও ডলারের প্রয়োজন হয়। ফলে প্রবাসী আয় বাড়লে দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকে ডলারের রিজার্ভ বা মজুত দ্রুত বৃদ্ধি পায়। প্রবাসী আয় বৃদ্ধি পাওয়ায় ব্যাংকগুলোয় ডলারের যে সংকট চলছিল, তা অনেকটা কেটে গেছে বলে জানান কর্মকর্তারা। তাঁরা বলেন, ডলারের দাম নিয়ে যে অস্থিরতা ছিল, তা-ও কিছুটা কমে এসেছে। ব্যাংকগুলো এখন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বেঁধে দেওয়া সর্বোচ্চ ১২৩ টাকার মধ্যেই প্রবাসী আয় কিনছে।

Share