২১ ঘণ্টায় সড়কে ঝরল অন্তত ১৫ প্রাণ, ৯ জনই মোটরসাইকেলের আরোহী

নয়াবার্তা প্রতিবেদক : ঈদের আনন্দের মধ্যেই দেশের বিভিন্ন জেলায় সড়কে ঝরেছে অন্তত ১৫ প্রাণ। তাঁদের কেউ ঈদ করতে বাড়ি ফিরছিলেন, কেউ নামাজ শেষে বন্ধু নিয়ে ঘুরতে বের হয়েছিলেন, আবার কেউ বাসে ঢাকায় ফিরছিলেন। নিহতদের মধ্যে নয়জনই মোটরসাইকেলের আরোহী ছিলেন।

গত বুধবার সন্ধ্যা থেকে আজ বৃহস্পতিবার বেলা তিনটা পর্যন্ত সড়ক দুর্ঘটনায় গোপালগঞ্জে পাঁচজন, দিনাজপুর, ফরিদপুর, নরসিংদী ও পটুয়াখালীতে দুজন করে এবং মাদারীপুর ও নড়াইলে একজন করে নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে তিন শিশু ও দুই কিশোর রয়েছে।

গোপালগঞ্জে নিহত ৫
গোপালগঞ্জে বাস ও মোটরসাইকেলের মুখোমুখি সংঘর্ষে পাঁচজন নিহত হয়েছেন। দুর্ঘটনায় আহত হয়েছেন অন্তত ২৫ জন। তাঁদের গোপালগঞ্জ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও গোপালগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। তাঁদের মধ্যে দুজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকেরা।

বৃহস্পতিবার দুপুর ১২টার দিকে ঢাকা-খুলনা মহাসড়কের গোপালগঞ্জে শহরের বেদগ্রাম এলাকায় এ দুর্ঘটনা ঘটে। নিহত পাঁচজনের মধ্যে তিনজনের পরিচয় পাওয়া গেছে। তাঁরা হলেন বাগেরহাটের চিতলমারী উপজেলার বড়বাড়িয়া গ্রামের সমেশ ঢালীর ছেলে শয়ন ঢালী (২০), একই উপজেলার গোলাগ্রামের মাহাবুব শেখের ছেলে সোয়াইব শেখ ও পিরোজপুরের নাজিরপুর উপজেলার কলারদোয়ানিয়া গ্রামের আবদুল খালেকের মেয়ে খাদিজা খাতুন।

পুলিশ সুপার জানায়, ঢাকা থেকে ছেড়ে আসা পিরোজপুরগামী দোলা পরিবহনের একটি যাত্রীবাহী বাস বেদগ্রাম এলাকায় পৌঁছালে বিপরীত দিক থেকে আসা একটি মোটরসাইকেলের সঙ্গে মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। এ সময় বাসটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে রাস্তার ওপর উল্টে যায়। ঘটনাস্থলে মোটরসাইকেলে দুই আরোহী ও বাসের দুই যাত্রী নিহত হন। পরে ফায়ার সার্ভিস ও পুলিশ হতাহতদের উদ্ধার করে গোপালগঞ্জ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও গোপালগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে যায়। সেখানে আহত ৬ বছরের এক শিশুকে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।

৪ জেলায় মোটরসাইকেলের ৭ আরোহী নিহত
ফরিদপুর, নরসিংদী, পটুয়াখালী ও নড়াইলে সাতজন নিহত হয়েছেন। তাঁরা সবাই মোটরসাইকেলের চালক কিংবা যাত্রী ছিলেন।

পটুয়াখালীতে ঈদের নামাজ শেষে মোটরসাইকেলে ঘুরতে বের হয়ে দুই কিশোর নিহত হয়েছে। বৃহস্পতিবার বেলা ১১টার দিকে উপজেলা শহরের গ্রামীণ ব্যাংক এলাকায় এ দুর্ঘটনা ঘটে।

নিহত দুজন হলো গলাচিপা পৌরসভার ২ নম্বর ওয়ার্ডের শ্যামলীবাগ এলাকার মৎস্য ব্যবসায়ী জব্বার হাওলাদারের ছেলে মো. ফয়সাল হাওলাদার (১৬) এবং একই এলাকার ব্যবসায়ী আবুল হোসেন মাতুব্বরের ছেলে তামিম মাতুব্বর (১৬)।

স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সকালে ঈদের নামাজ পড়ার পর ফয়সাল ও তামিম মোটরসাইকেল নিয়ে ঘুরতে বের হয়। বেলা ১১টার দিকে উপজেলা শহরের গ্রামীণ ব্যাংক এলাকা অতিক্রম করার সময় বিপরীত দিক থেকে আসা যাত্রীবাহী একটি অটোরিকশার সঙ্গে তাদের মোটরসাইকেলের মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। এতে তারা মোটরসাইকেলের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সড়কে ছিটকে পড়ে গুরুতর আহত হয়। পরে স্থানীয় লোকজন রক্তাক্ত অবস্থায় তাদের গলাচিপা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তামিমকে মৃত ঘোষণা করেন।

গুরুতর আহত ফয়সাল এবং অটোরিকশার দুই যাত্রী সোহরাব হোসেন (৫০) ও শরীফকে (২৫) উন্নত চিকিৎসার জন্য বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। তবে বরিশালে নেওয়ার পথে ফয়সালের মৃত্যু হয়।

গলাচিপা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. ইমতিয়াজ আহম্মেদ বলেন, সড়ক দুর্ঘটনায় দুই তরুণের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। তবে এ ঘটনায় পরিবারের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত কোনো অভিযোগ পাওয়া যায়নি।

নরসিংদীর শিবপুরে মোটরসাইকেলের মুখোমুখি সংঘর্ষে দুই তরুণ নিহত হয়েছেন। গতকাল বুধবার সন্ধ্যায় দুর্ঘটনাস্থলে একজনের মৃত্যু হয়। পরে আজ বৃহস্পতিবার সকালে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান অন্যজন।

এ ঘটনায় আহত আরেক তরুণ জাতীয় অর্থোপেডিক ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠানে (পঙ্গু হাসপাতাল) চিকিৎসাধীন আছেন।

নিহত দুজন হলেন শেরপুরের ঝিনাইগাতী উপজেলার প্রতাপনগর গ্রামের আবদুর রব মিয়ার ছেলে রুমান মিয়া (২৬) এবং নরসিংদী সদর উপজেলার শীলমান্দী ইউনিয়নের বাগহাটা গ্রামের শাহ আহাম্মদের ছেলে চান মিয়া (১৯)। আহত আবদুল্লাহ (১৯) একই ইউনিয়নের পালপাড়া এলাকার বাসিন্দা।

পুলিশ, স্বজন ও স্থানীয় ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বুধবার নিজের মোটরসাইকেলে শেরপুর থেকে নরসিংদীতে ফিরছিলেন রুমান মিয়া। অন্যদিকে বন্ধু আবদুল্লাহর মোটরসাইকেলে চড়ে এক আত্মীয়ের বাড়িতে যাচ্ছিলেন চান মিয়া। সন্ধ্যায় বাজনাব এলাকায় মোটরসাইকেল দুটির মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। এতে ঘটনাস্থলেই রুমান মিয়ার মৃত্যু হয়। চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান চান মিয়া।

চান মিয়ার চাচা সোলেমান খান বলেন, চান মিয়া একটি ডাইং কারখানায় শ্রমিক হিসেবে কাজ করতেন। ঈদের ছুটিতে বন্ধুর সঙ্গে আত্মীয়ের বাড়িতে যাওয়ার পথে দুর্ঘটনার শিকার হন তিনি। তাঁর মৃত্যুতে পরিবারটি উপার্জনক্ষম সদস্যকে হারিয়ে অসহায় হয়ে পড়েছে।

শিবপুর থানার উপপরিদর্শক (এসআই) অজয় বালা বলেন, অভিযোগ না থাকায় রুমান মিয়ার মরদেহ ময়নাতদন্ত ছাড়াই স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। আর ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মারা যাওয়া চান মিয়ার মরদেহ বাড়িতে নেওয়ার প্রস্তুতি চলছে।

ফরিদপুরের ভাঙ্গায় মুখোমুখি সংঘর্ষে দুই মোটরসাইকেলের দুই চালক নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় আহত হয়েছেন দুই মোটরসাইকেলের দুই আরোহী। গত বুধবার রাত সাড়ে ১০টার দিকে ঢাকা-বরিশাল মহাসড়কে ফরিদপুরের ভাঙ্গা উপজেলার পূর্ব সদরদী বাসস্ট্যান্ড এলাকায় এ দুর্ঘটনা ঘটে।

নিহত দুই ব্যক্তি হলেন ফরিদপুরের ভাঙ্গা উপজেলার গঙ্গাদরদী এলাকার কাঞ্চন মোল্লার ছেলে সাইফুল মোল্লা (২৫) এবং বরিশাল সদর উপজেলার রূপাতলী হাউজিং এলাকার জিয়ানগর মহল্লার জাহাঙ্গীর শরীফের ছেলে আল ইমরান শরীফ (২৮)।

ভাঙ্গা হাইওয়ে থানা-পুলিশ জানায়, রাত সাড়ে ১০টার দিকে ঢাকা-বরিশাল মহাসড়ক দিয়ে একজন আরোহী নিয়ে ঈদের ছুটিতে ঢাকা থেকে বরিশাল সদরের বাড়িতে যাচ্ছিলেন আল ইমরান। পথে ভাঙ্গা উপজেলার পূর্ব সদরদী বাসস্ট্যান্ড এলাকায় পৌঁছালে অপর দিক থেকে একজন আরোহী নিয়ে আসা সাইফুল মোল্লার মোটরসাইকেলের সঙ্গে সেটির মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। এতে ঘটনাস্থলেই দুই মোটরসাইকেলের দুই চালক মারা যান।

আহত দুজন হলেন রেজাউল ইসলাম হাওলাদার ও মো. বাসার মোল্লা। তাঁদের চিকিৎসার জন্য ভাঙ্গা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পাঠানো হয়েছে।

ভাঙ্গা হাইওয়ে থানার ওসি মো. হেলাল উদ্দিন বলেন, রাতে নিহত দুজনের লাশ হাইওয়ে থানায় রাখা হয়। স্বজনদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে মরদেহগুলো বৃহস্পতিবার ভোরে তাঁদের পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। দুর্ঘটনাকবলিত মোটরসাইকেল দুটি থানায় রাখা হয়েছে।

এদিকে নড়াইলের লোহাগড়ায় মোটরসাইকেলে ঘুরতে বেরিয়ে দুর্ঘটনায় এক তরুণ নিহত হয়েছেন। বৃহস্পতিবার বেলা তিনটার দিকে উপজেলার আলামুন্সির মোড় এলাকায় বাসের সঙ্গে সংঘর্ষে এ দুর্ঘটনা ঘটে। এতে মোটরসাইকেলের আরেক আরোহী গুরুতর আহত হয়েছেন।

নিহত তরুণ সাব্বির গাজী (১৮) যশোর জেলার অভয়নগর উপজেলার দিঘলিয়া গ্রামের বাবুল গাজীর ছেলে। আহত শওকত হোসেন (১৯) একই গ্রামের রিপন গাজীর ছেলে।

লোহাগড়া থানা-পুলিশের পরিদর্শক (তদন্ত) অজিত কুমার রায় বলেন, ঘটনাস্থল ও হাসপাতালে পুলিশ পাঠানো হয়েছে। হাসপাতাল থেকে নিহতের মরদেহ পুলিশ হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। আইনি প্রক্রিয়া শেষে মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হবে।

দুই জেলায় আরও তিনজন নিহত
দিনাজপুরের ঘোড়াঘাট উপজেলায় মহাসড়কে দাঁড়িয়ে থাকা একটি ট্রাকের পেছনে সিএনজিচালিত অটোরিকশার ধাক্কায় দুই শিশু নিহত হয়েছে। এ ঘটনায় আহত হয়েছেন ওই দুই শিশুর মায়েরা। বৃহস্পতিবার ভোর সাড়ে পাঁচটার দিকে উপজেলার কানাগাড়ি বাজার এলাকায় দিনাজপুর-গোবিন্দগঞ্জ আঞ্চলিক মহাসড়কে এ দুর্ঘটনা ঘটে।

নিহত শিশুরা হলো জয়পুরহাটের পাঁচবিবি উপজেলার রশিদপুর গ্রামের শামসুল হক ও দুলালী বেগম দম্পতির ছেলে মো. আবদুল্লাহ (৪) এবং দিনাজপুরের হাকিমপুর উপজেলার আলিহাট ইউনিয়নের বারো আরিয়া গ্রামের আল আমিন ও ফরিদা বেগম দম্পতির মেয়ে আরিফা খাতুন (৪)। দুর্ঘটনায় আহত দুলালী বেগম (২৫) ও ফরিদা বেগম (২০) দিনাজপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।

পুলিশ ও নিহত শিশুদের পরিবার সূত্রে জানা গেছে, ঈদ করতে বুধবার রাতে মায়েদের সঙ্গে ঢাকা থেকে গ্রামের বাড়ির উদ্দেশে রওনা হয় দুই শিশু। ভোরে গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জে বাস থেকে নেমে তারা সিএনজিচালিত অটোরিকশায় ভাদুরিয়া বাজারের দিকে যাচ্ছিল। পথে ঘোড়াঘাট উপজেলার কানাগাড়ি বাজার এলাকায় মহাসড়কে দাঁড়িয়ে থাকা একটি ট্রাকের পেছনে অটোরিকশাটি ধাক্কা দেয়। এতে অটোরিকশাটি সড়কের পাশে ছিটকে পড়ে উল্টে যায়।

স্থানীয় লোকজন আহত ব্যক্তিদের উদ্ধার করে ঘোড়াঘাট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে চিকিৎসক দুই শিশুকে মৃত ঘোষণা করেন। পরে আহত দুই নারীকে উন্নত চিকিৎসার জন্য দিনাজপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়।

ঘোড়াঘাট থানার ওসি শহিদুল ইসলাম বলেন, দুর্ঘটনার পর ট্রাকচালক পালিয়ে গেছেন। পরিবারের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ময়নাতদন্ত ছাড়াই দুই শিশুর মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। এ ঘটনায় থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়েছে।

এ ছাড়া মাদারীপুরের শিবচরের বাস থেকে ছিটকে পড়ে সাত্তার হাওলাদার (৫৫) নামের এক ব্যক্তি নিহত হয়েছেন। বৃহস্পতিবার দুপুরে ঢাকা-ভাঙ্গা এক্সপ্রেসওয়ের পদ্মা সেতুসংলগ্ন সীমানা এলাকায় এ দুর্ঘটনা ঘটে। নিহত সাত্তার হাওলাদারের বাড়ি ফরিদপুরের সদরপুরে।

শিবচর হাইওয়ে পুলিশ জানায়, ভাঙ্গা থেকে ঢাকার উদ্দেশে ছেড়ে আসা প্রচেষ্টা পরিবহনের একটি বাসে করে ঢাকা যাচ্ছিলেন সাত্তার হাওলাদার। বাসের সামনের দিকে (ইঞ্জিন কভার) বসে ছিলেন তিনি। বাসটি পাঁচ্চর পার হয়ে সীমানা নামক স্থানে গেলে হঠাৎ ব্রেক কষেন চালক। এ সময় সাত্তার ছিটকে বাসের দরজা দিয়ে বাইরে পড়ে যান। পরে গুরুতর আহত অবস্থায় তাঁকে শিবচর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।

শিবচর হাইওয়ে থানার ওসি মো. মিজানুর রহমান বলেন, বাসটি হঠাৎ জোরে ব্রেক করলে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে খোলা দরজা দিয়ে বাইরে পড়ে গিয়ে লোকটির মৃত্যু হয়। পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে। এ বিষয়ে আইনি ব্যবস্থা প্রক্রিয়াধীন।

Share