
গাজী আবু বকর : উচ্চ আদালতেও রামিসার ধর্ষক ও হন্তারকদের মৃত্যুদণ্ড বহালের আশাবাদ ব্যক্ত করে আইনমন্ত্রী মো.আসাদুজ্জামান বলেছেন, তিন মাসের মধ্যে এই রায় কার্যকর করা সম্ভব। । রাজধানীর পল্লবীতে ধর্ষণের পর শিশু রামিসাকে হত্যার অপরাধে আসামি সোহেল ও স্বপ্নার মৃত্যুদণ্ডের রায়ে তিনি সন্তোষ প্রকাশ করেছেন। রায় ঘোষণার পর গতকাল দুপুরে সচিবালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এসব কথা বলেন। তিনি আজ জাতীয় সংসদের বাজেট অধিবেশনের শুরুর দিনে ৩০০ বিধিতে প্রদত্ত বিবৃতিতে একই অভিমত ব্যক্ত করেন।
আইনমন্ত্রী বলেন, ‘আইনের প্রতিটি ধাপ অনুসরণ করে মাত্র ছয় কার্যদিবসের মধ্যে এ রকম একটি বেদনাদায়ক ঘটনার বিচার সম্পন্ন করতে পেরেছি। ঘোষিত শাস্তিতে আমরা আপাতত সন্তুষ্ট এবং আশা করি উচ্চ আদালতেও এ রায় বহাল থাকবে।’
মন্ত্রী বলেন, ঘটনার পর যেখানে ভুক্তভোগীর পরিবার বিচার পাওয়া নিয়ে চরম সংশয় প্রকাশ করে বলেছিল যে তারা বিচার চান না; সেখানে সরকারের বিশেষ তৎপরতা, পুলিশের দ্রুততম তদন্ত এবং আদালতের ছুটি বাতিলের অভূতপূর্ব সমন্বয়ে এই দৃষ্টান্তমূলক রায় নিশ্চিত করা সম্ভব হয়েছে।
বিকেলে জাতীয় সংসদের বাজেট অধিবেশনে এক বিবৃতিতে আইনমন্ত্রী বলেন, গত ১৯ মে পল্লবী এলাকায় শিশু রামিসা নির্মমভাবে ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডের শিকার হওয়ার পর মাত্র সাত ঘণ্টার মধ্যে পুলিশ মূল দুই আসামিকে গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়। ঘটনার ভয়াবহতায় প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীসহ সরকারের উচ্চপর্যায়ের একটি দল তাৎক্ষণিকভাবে ভুক্তভোগীর পরিবারের সঙ্গে দেখা করেন। সে সময় রামিসার বাবা দেশের বিচারব্যবস্থার ওপর হতাশা প্রকাশ করে বলেছিলেন, তিনি বিচার চান না, কারণ অতীতে এ জাতীয় ঘটনার বিচার পেতে দীর্ঘ সময় লেগেছে। তবে সরকারের পক্ষ থেকে তাকে আশ্বস্ত করা হয়েছিল, এই হত্যাকাণ্ডের দ্রুত ও সুষ্ঠু বিচার নিশ্চিত করতে প্রশাসন বদ্ধপরিকর। সেই প্রতিশ্রুতির আলোকেই পুলিশ বাহিনী মাত্র পাঁচ দিনের মাথায় ২৪ মে দুপুর ১২টার মধ্যে আদালতে তদন্ত প্রতিবেদন বা চার্জশিট দাখিল করে এবং একই দিন বিকালের মধ্যে তা সংশ্লিষ্ট ট্রাইব্যুনালে পাঠানো হয়।
বিচার প্রক্রিয়া দ্রুত শেষ করার ক্ষেত্রে একটি বড় চ্যালেঞ্জ ছিল ১ জুন থেকে নিম্ন আদালতগুলোর ১৫ দিনের গ্রীষ্মকালীন ছুটি। তবে নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা রোধে গঠিত বিশেষ ট্রাইব্যুনালগুলোকে সচল রাখতে সরকারের অনুরোধে প্রধান বিচারপতি এই ট্রাইব্যুনালগুলোকে ছুটির আওতাবহির্ভূত রাখার ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নেন। মামলার নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করতে এবং আসামি পক্ষ যাতে বিচার প্রক্রিয়াকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে না পারে, সে জন্য রাষ্ট্রপক্ষ থেকে ২৪ মে আসামিদের জন্য ‘স্টেট ডিফেন্স ল ইয়ার’ বা সরকারি আইনজীবী নিয়োগ দেওয়া হয়। এরপর ঈদের ছুটি শেষে ১ জুন আদালত খোলার দিনই মামলার অভিযোগ গঠন করা হয়। পরদিন ২ জুন দ্রুততার সঙ্গে ১৬ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণ শেষ করা হয় এবং পরবর্তী দুই দিনে আসামিদের আত্মপক্ষ সমর্থন ও উভয় পক্ষের যুক্তিতর্ক সম্পন্ন হয়। শুক্র ও শনিবার আদালত বন্ধ থাকার পর আজ ৭ জুন মাত্র ৪১ মিনিটের রায় পর্যালোচনা ও আদেশ পাঠের মধ্য দিয়ে আদালত মূল আসামি সোহেল এবং তার সহযোগিতাকারী স্ত্রীকে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দেন।
তিনি বলেন, এই যুগান্তকারী রায়ের মাধ্যমে রামিসার পরিবারের হারানো আস্থা ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে। মাও সেতুংয়ের ঐতিহাসিক উক্তি স্মরণ করে তিনি বলেন, কিছু মৃত্যু থাই পাহাড়ের মতো ভারী আর কিছু মৃত্যু পাখির পালকের মতো হালকা। রামিসার নির্মম মৃত্যু পুরো জাতির বুকে পাহাড়সম ভার হয়ে চেপে বসেছিল, যা এই ফাঁসির রায় কার্যকরের মাধ্যমে হালকা হবে। একইসঙ্গে রামিসা হত্যাকাণ্ড ছাড়াও সাম্প্রতিক সময়ে ঘটে যাওয়া অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ মামলাগুলোর তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়া দ্রুত শেষ করার জন্য সরকারের পক্ষ থেকে বিশেষ তদারকি অব্যাহত রয়েছে বলেও জানান আইনমন্ত্রী।
অন্যদিকে সকালে সচিবালয়ে সাংবাদিকদের মন্ত্রী জানান, প্রধান বিচারপতির সম্মতিতে শিশু ট্রাইব্যুনালকে আদালতের অবকাশের বাইরে রাখা হয়েছিল। ফলে ২৪ মে মামলাটি ট্রাইব্যুনালে স্থানান্তরের পর দ্রুত বিচার কার্যক্রম শুরু করা সম্ভব হয়। গত ১ জুন অভিযোগ গঠন, পরবর্তী দিনগুলোতে সাক্ষ্যগ্রহণ, আসামির জবানবন্দি ও যুক্তিতর্ক শেষে কার্যত ছয় কার্যদিবসের মধ্যেই রায় ঘোষণা করা হয়েছে; এটি বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথম।
মো.আসাদুজ্জামান বলেন, বিচারপ্রক্রিয়ার কোনো ধাপে যাতে ন্যায়বিচার প্রশ্নবিদ্ধ না হয়, সেজন্য আইন অনুযায়ী সব প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়েছে। আসামিপক্ষ আইনজীবী নিয়োগ না করায় রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে একজন আইনজীবীও নিয়োগ দেওয়া হয়। যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে এর থেকে দ্রুততম সময়ের মধ্যে বিচারকাজ সম্পন্ন করা সম্ভব ছিল না।
তিনি বলেন, আমার প্রত্যাশা আগামী তিনমাসের মধ্যে এ বিচারকার্য সম্পন্ন করা সম্ভব, যদি সুপ্রিম কোর্টের সংশ্লিষ্ট বেঞ্চ এটাকে প্রাধান্য দিয়ে শুনানি করেন। তাঁরা সেটা করবেন বলে আমি আশাবাদী।
মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি সোহেলের ব্যাপারে তিনি বলেন, ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেওয়ার পরেও বিচারকে অন্য খাতে প্রবাহিত করতে, বিচার প্রক্রিয়াকে বিলম্বিত করতে তিনি মামলার রেকর্ডে নেই এমন একজনের নাম বলেছে। বিচার থেকে মানুষের ফোকাস অন্যদিকে ঘোরাতেই সে এ কাজটি করেছে। কিন্ত আমরা আমাদের জায়গায় অটল ছিলাম, যথাযথ প্রক্রিয়া অবলম্বন করে দ্রুত এগিয়ে গেছি।
উচ্চ আদালতে বিচারপ্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রিতার বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে আইনমন্ত্রী বলেন, প্রধান বিচারপতির সঙ্গে আলোচনা হয়েছে এবং ডেথ রেফারেন্স মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তির বিষয়ে সুপ্রিম কোর্ট আরও গুরুত্ব দেবে বলে তিনি আশ্বাস দিয়েছেন।
সাংবাদিকদের আরেক প্রশ্নের জবাবে ডেথ রেফারেন্স নিষ্পত্তির প্রক্রিয়ার সময় কমিয়ে আনার ওপর জোর দিয়ে মন্ত্রী বলেন, ‘শিশু রাজন ও রাকিব হত্যাসহ দীর্ঘদিন ধরে বিচারাধীন থাকা মামলাগুলোর বিষয়েও আমরা সচেতন। আইনে কতদিনের মধ্যে এ ধরনের মামলা নিষ্পত্তি করতে হবে সেটির উল্লেখ না থাকলেও শিশু আছিয়া ও রামিসার মামলাসহ সব ডেথ রেফারেন্স যত দ্রুত সম্ভব নিষ্পত্তির জন্য আমরা কাজ করে যাব।’
তিনি বলেন, শুধু কঠোর আইন দিয়ে এ ধরনের অপরাধ সম্পূর্ণ বন্ধ করা সম্ভব নয়। সামাজিক মূল্যবোধ, পারিবারিক সচেতনতা ও সামাজিক প্রতিরোধও সমান গুরুত্বপূর্ণ। সমাজ ও রাষ্ট্র থেকে এ ধরনের জঘন্য অপরাধ নির্মূলে সবার সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
তিনি জানান, আইনি ধাপগুলো অনুসরণ না করে দ্রুত কার্যকর করা হলে প্রশ্ন উঠতে পারে। আসামিরা চাইলে উচ্চ আদালতে আপিল করতে পারবে, সেখানেও নিয়ম অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
আইনি বাধ্যবাধকতা অনুযায়ী সাত দিনের মধ্যে মামলার নথি ডেথ রেফারেন্স কনফার্মেশনের জন্য হাইকোর্টে পাঠানো হবে উল্লেখ করে মো. আসাদুজ্জামান জানান, এরপর সুপ্রিম কোর্টের তত্ত্বাবধানে পেপার বুক প্রস্তুত করা হবে এবং নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুযায়ী শুনানি শেষে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হবে।
উল্লেখ্য, গত ১৯ মে রাজধানীর পল্লবীতে শিশু রামিসা আক্তারকে (৮) নৃশংসভাবে হত্যার ঘটনায় দায়ের করা মামলায় আসামি সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারের মৃত্যুদ-ের আদেশ দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল।
গতকাল রোববার ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীন এ রায় ঘোষণা করেন।
মৃত্যুদন্ডের পাশাপাশি সোহেলকে ৫ লাখ টাকা এবং স্বপ্নাকে ২ দুই লাখ টাকা অর্থদন্ডের আদেশও দেন ট্রাইব্যুনাল।
