
নয়াবার্তা প্রতিবেদক : ৪০ বছরের অপেক্ষা, অবশেষে মিরপুরে হলো তার অবসান। বাংলাদেশের ওয়ানডে ক্রিকেটের ইতিহাসে প্রথমবার অস্ট্রেলিয়াকে সিরিজ হারাল টাইগাররা। সিরিজের দ্বিতীয় ওয়ানডেতে জয় তুলে নিয়ে ইতিহাস গড়েছে মিরাজের দল। বোলারদের দৃঢ়তা আর ব্যাটারদের ধৈর্য পরীক্ষায় এক ম্যাচ হাতে রেখেই নিশ্চিত হয়েছে বাংলাদেশের এই ঐতিহাসিক অর্জন। বৃহস্পতিবার মিরপুর শেরে বাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামে টসে জিতে ব্যাটিংয়ের সিদ্ধান্ত নেয় অস্ট্রেলিয়া। বৃষ্টি নামার আগে ৪২ ওভারে ১৮৭ রান তুলে সফরকারীরা। এরপর ওভার কমে বৃষ্টি আইনে বাংলাদেশের লক্ষ্য দাঁড়ায় ১৯২ রান। তবে ব্যাটারদের দলগত পারফরম্যান্সে সেই লক্ষ্য টপকে ৫ উইকেটে ম্যাচ জিতে ইতিহাস গড়ে বাংলাদেশ।
খেলার শুরু থেকেই স্কোর দেখে চোখ কচলাতে শুরু করার কথা যে কারোরই। দলটা আসলেই অস্ট্রেলিয়া তো, আর প্রতিপক্ষ বাংলাদেশ! অবিশ্বাসের সেই ঘোর নিশ্চয়ই কেটে গেছে সময়ের সঙ্গে। কিন্তু ঘটনাটা কতটা অভাবনীয়, তা বোঝা যাবে একটা পরিসংখ্যান দেখলেই।
ওয়ানডে সংস্করণে ১০২৪ ম্যাচ খেলে এই প্রথম অস্ট্রেলিয়া শূন্য রানে ৩ উইকেট হারাল। ম্যাচের শুরুর পর শেষেও আরেকটি প্রথম অস্বস্তির সাক্ষী হতে হয়েছে তাদের—প্রথমবারের মতো বাংলাদেশের কাছে ওয়ানডে সিরিজ হারের ধাক্কা, তা–ও এক ম্যাচ বাকি থাকতে।
ওই বাজে শুরুর পরও মিরপুরে ৪২ ওভার খেলে অস্ট্রেলিয়া ৮ উইকেট হারিয়ে করেছিল ১৮৭ রান। বৃষ্টিতে ইনিংসটা সেখানেই থেমে যাওয়ায় ডিএলএসের হিসাব–নিকাশে বাংলাদেশের জন্য ৪১ ওভারে ১৯২ রানের লক্ষ্য দাঁড়ায়।
মিরপুর শেরেবাংলা স্টেডিয়ামে সেটি তাড়া করতে গিয়ে বাংলাদেশেরও কম কষ্ট করতে হয়নি। ১৪৪ রানে ৫ উইকেট হারিয়ে ফেলার পর তো মনে হচ্ছিল ম্যাচটা হাত থেকে ছিটকেই না যায়!
কিন্তু তাওহিদ হৃদয়ের সঙ্গে মেহেদী হাসান মিরাজের ৪৮ বলে ৫১ রানের অবিচ্ছিন্ন জুটিতে ৫ উইকেটের জয় পায় বাংলাদেশই। মাঝে মাথায় বল লেগে অসুস্থ হয়ে যাওয়া অধিনায়ক মেহেদী হাসান মিরাজ ছক্কা মেরেই নিশ্চিত করেছেন সেটি।
ম্যাচের পর মাথা ঘোরানোয় তাঁকে নেওয়া হয় এভারকেয়ার হাসপাতালে। জাতীয় দলের ফিজিও বায়েজিদুল ইসলাম জানিয়েছেন, সেখানে কিছু পরীক্ষা–নিরীক্ষা চলবে মিরাজের, থাকবেন ২৪ ঘণ্টা পর্যবেক্ষণে।
বাংলাদেশের ইনিংসের শুরুটাও অবশ্য ভালো হয়নি। ইনিংসের দ্বিতীয় বলেই ওপেনার তানজিদ হাসান আউট হয়ে যান। পরের কিছু সময়েও অস্ট্রেলিয়া কয়েকটি সুযোগ তৈরি করেছিল।
জেভিয়ার বার্টলেট নিজের বলে নাজমুলের ক্যাচ হাতে জমাতে পারেননি, পরের বলে আম্পায়ার এলবিডব্লু দিলেও রিভিউ নিয়ে বেঁচে যান নাজমুল হোসেন।
কিন্তু যত সময় গড়িয়েছে, নাজমুল আর সৌম্য সরকার ততই ছন্দ খুঁজে পেয়েছেন। দৃষ্টিনন্দন সব শটে বল সীমানাছাড়া করেছেন। দলকে জয়ের ভিতটাও গড়ে দিয়ে গেছেন ৯৩ বলে ৮৬ রানের জুটি গড়ে।
দুজনই অবশ্য আউট হয়েছেন ফিফটি করতে না পারার আফসোস নিয়ে। প্রথম রান পেতেই ১০ বল লেগেছিল নাজমুলের, আউট হওয়ার আগে ৫৩ বলে তিনি করেন ৪১ রান আর সৌম্য ৪৭ বলে ৪২। তাঁদের বিদায়ের পর বিপদে পড়ে যাওয়া দলকে জয় অবধি পৌঁছে দেন মিরাজ ও হৃদয়।
জয়ের ভিতটা আসলে বাংলাদেশের জন্য গড়া হয়ে গিয়েছিল বোলিংয়েই। আগের ম্যাচে ম্যাথু শর্ট ব্যাট নামাতে নামাতেই রীতিমতো বোকা বনে গিয়ে তাসকিনের বলে বোল্ড হয়েছিলেন। গতকালও তাই—এবার বলটা ছাড়তে গিয়ে অজি ওপেনার দেখেন তাঁর স্টাম্প ভেঙে গেছে!
মোস্তাফিজের পরের ওভারের প্রথম বলেই লিটনের হাতে ক্যাচ দেন কুপার কনোলি, শেষ বলে ম্যাট রেনশও করেন একই কাজ। ২ ওভার শেষে অস্ট্রেলিয়ার তখন ৩ উইকেট নেই। ওয়ানডেতে অস্ট্রেলিয়ার দুই ওপেনারই ডাক মেরেছেন, এমন ঘটনা ঘটল কেবল তৃতীয়বারের মতো।
অস্ট্রেলিয়া তবু ঘুরে দাঁড়ানোর স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছিল জশ ইংলিসের ব্যাটে। কিন্তু ক্যারির সঙ্গে তাঁর ৩৩ বলে ২৫ আর ক্যামেরন গ্রিনের সঙ্গে ৫৮ বলে ৩৮ রানের জুটি ভেঙে তাদের আবার বিপদে ফেলে দেন তানভীর ইসলাম।
৮১ রানে ৬ উইকেট হারিয়ে ফেলার পর আরও একবার অস্ট্রেলিয়া ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করে। ওই চেষ্টায় গ্রিনের সহযাত্রী ছিলেন মার্নাস লাবুশেন। তাঁদের ১১৫ বলে ১০৩ রানের জুটিতে পরিস্থিতি সামাল দেয় অস্ট্রেলিয়া। কিন্তু পরপর দুই বলে গ্রিন আর অ্যাডাম জাম্পাকে বোল্ড করে তাসকিন ম্যাচে ফেরান বাংলাদেশকে। ৯ বল পর বৃষ্টি নামলে অস্ট্রেলিয়ার ইনিংস থেমে যায় ৪২ ওভারেই।
পরে ডিএল পদ্ধতিতে যে লক্ষ্যটা বাংলাদেশের সামনে দাঁড়ায়, তা–ও যথেষ্ট হয়নি অস্ট্রেলিয়ার জয়ের জন্য। তিন ম্যাচের সিরিজের প্রথম দুটিই জিতে সিরিজও নিশ্চিত করে ফেলেছে বাংলাদেশ দল। ঘরের মাঠে টানা ৫ সিরিজ জয়ের সঙ্গে তাতে একটা অপূর্ণতাও ঘুচেছে—টেস্ট খেলুড়ে দেশগুলোর মধ্যে এত দিন শুধু ইংল্যান্ড আর অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষেই ওয়ানডে সিরিজ জেতা হয়নি বাংলাদেশের। এখন সেই তালিকায় বাকি রইল শুধু ইংল্যান্ড।
তৃতীয় দ্বিপক্ষীয় সিরিজে এসে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম ওয়ানডে সিরিজ জেতার স্বাদ পেল বাংলাদেশ। আগামী পরশু শেষ ম্যাচে বাংলাদেশের সামনে থাকবে অজিদের ধবলধোলাই করার সুযোগও।
