একক নেতৃত্বের পরিণামে নেতৃত্বশূন্য আওয়ামী লীগ, সংকটে ৭৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী

নিজস্ব প্রতিবেদক : চার দশকের একচ্ছত্র নেতৃত্বের নেতিবাচক প্রভাব কাটিয়ে উঠতে না পারায় বর্তমানে চরম সাংগঠনিক বিপর্যয়ে পড়েছে আওয়ামী লীগ। ৭৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর প্রাক্কালে শীর্ষ নেতৃত্বের অনুপস্থিতিতে দলটি এখন সিদ্ধান্তহীনতা ও গভীর রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার মুখোমুখি। দীর্ঘ সময় শেখ হাসিনা-কেন্দ্রিক রাজনীতি করার ফলে দলে কোনো বিকল্প নেতৃত্ব গড়ে ওঠেনি, যার খেসারত এখন দিতে হচ্ছে মাঠপর্যায়ের নেতা-কর্মীদের।

১৯৮১ সাল থেকে শেখ হাসিনার একক কর্তৃত্বের অধীনে দল পরিচালিত হওয়ায় বর্তমানে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে বড় ধরনের শূন্যতা তৈরি হয়েছে। শীর্ষ নেতাদের একটি বড় অংশ বর্তমানে কারাগারে, আত্মগোপনে কিংবা দেশের বাইরে অবস্থান করছেন। এই নেতৃত্বহীনতার কারণে তৃণমূল পর্যায়ে দলটির সাংগঠনিক কাঠামো কার্যত ভেঙে পড়েছে এবং কোনো সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা পাওয়া যাচ্ছে না।

অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৫ সালের মে মাসে দলটির কার্যক্রম নিষিদ্ধ করার পর থেকে আওয়ামী লীগের তৎপরতা মূলত ভার্চ্যুয়াল মাধ্যমে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে। প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে দেশের বিভিন্ন স্থানে বিক্ষিপ্তভাবে ঝটিকা মিছিলের চেষ্টা করা হলেও কেন্দ্রীয় সমন্বয়ের অভাবে তা বিশেষ কোনো প্রভাব ফেলতে পারছে না। রাজধানীর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে ইতিমধ্যে ১৮ হাজারের বেশি পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে।

১৯৪৯ সালের ২৩ জুন প্রতিষ্ঠিত হওয়া এই দলটি মহান মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব দিলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোর বিতর্কিত নির্বাচন ও অপশাসনের কারণে জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর দলটির দীর্ঘ দেড় দশকের শাসনব্যবস্থার কাঠামোগত দুর্বলতাগুলো প্রকাশ্যে আসে। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে চলে যাওয়ার পর দলটির শীর্ষ পর্যায় থেকে শুরু করে সহযোগী সংগঠনের নেতারাও আত্মগোপনে চলে যান।

দলের ভেতরেই এখন সংস্কারের দাবি উঠছে এবং অনেক জ্যেষ্ঠ নেতা ঝটিকা মিছিলের মতো কর্মসূচির কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক নেতা মনে করেন, নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার ও আইনি লড়াইয়ের পরিবর্তে রাজপথে শক্তির মহড়া হিতে বিপরীত হতে পারে। তাদের মতে, দলটিকে টিকে থাকতে হলে ব্যক্তিকেন্দ্রিক কাঠামো থেকে বের হয়ে নতুন প্রজন্মের নেতৃত্বকে সামনে আনতে হবে।

সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় যেকোনো ধরনের নাশকতা ও বিশৃঙ্খলা মোকাবিলায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে সেনাবাহিনী মোতায়েনের জন্যও চিঠি দেওয়া হয়েছে। আওয়ামী লীগ এখন এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে তাদের পুনর্গঠন নাকি দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক অন্ধকার অপেক্ষা করছে, তা সময়ই বলে দেবে।

Share