
নিজস্ব প্রতিবেদক : বাংলা একাডেমির সভাপতি ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক আর নেই। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। আজ রোববার বিকেলে রাজধানীর মিরপুরে তিনি শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর বয়স হয়েছিল ৮৫ বছর।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তাঁর মৃত্যুতে গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন।
পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, আজ দুপুরে অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক পরিবারের সদস্যদের নিয়ে মিরপুরে একটি চায়নিজ রেস্তোরাঁয় দুপুরের খাবার খেতে গিয়েছিলেন। এমন সময় তিনি গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লে ওই ভবনেই অবস্থিত একটি ক্লিনিকে তাঁকে নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসকেরা তাঁকে ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশনের নেওয়ার পরামর্শ দেন। দ্রুত তাঁকে হার্ট ফাউন্ডেশনর আনা হয়। সেখানে চিকিৎসকেরা জানান, হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই তিনি মারা গেছেন। এরপর পরিবারের সদস্যরা তাঁকে মিরপুরের পল্লবীতে বাড়িতে নিয়ে আসেন।
আজ এক শোকবার্তায় প্রধানমন্ত্রী বলেন, অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হকের মৃত্যুতে দেশ একজন প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ ও লেখককে হারালো।
তিনি বলেন, তাঁর মৃত্যুতে দেশের শিক্ষা অঙ্গনে যে শূন্যতার সৃষ্টি হয়েছে, তা সহজে পূরণ হওয়ার নয়।
প্রধানমন্ত্রী মরহুমের রুহের মাগফিরাত ও চিরশান্তি কামনা করেন এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান।
অধ্যাপক আবুল কাসেম স্ত্রী ফরিদা প্রধান, মেয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক শুচিতা শারমিন, পুত্রবধূ রাজিয়া রহমান, নাতি–নাতনিসহ অসংখ্য গুণগ্রাহী রেখে গেছেন। তাঁর ছেলে জাগৃতি প্রকাশনীর প্রকাশক ফয়সল আরেফিন দীপন। তাঁকে ২০১৫ সালে ৩১ অক্টোবর আজিজ সুপার মার্কেটে জঙ্গিরা হত্যা করে।
আবুল কাসেম ফজলুল হকের জন্ম ১৯৪০ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়া উপজেলার পাকুন্দিয়া গ্রামে। ময়মনসিংহের আনন্দ মোহন কলেজ থেকে ১৯৬২ সালে আইএসসি পাস করেন। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগ থেকে ১৯৬৫ সালে স্নাতক ও ১৯৬৬ সালে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন।
ছাত্রজীবনে তিনি ছাত্র ইউনিয়নের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। ১৯৬০-এর দশকের শেষ দিকে তিনি মার্ক্সবাদী ধারার রাজনীতিতেও সক্রিয় ছিলেন। ১৯৬০-এর দশকের প্রগতিশীল সব আন্দোলন এবং উনসত্তরের গণ–অভ্যুত্থানে তিনি সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। এরপর তিনি মার্ক্সবাদী রাজনীতির সব সাংগঠনিক সংযোগ ছিন্ন করেন। মূলত উনসত্তরের গণ–অভ্যুত্থানের পরে তিনি রাজনৈতিক কোনো সংগঠনে যুক্ত না থেকে বরং রাজনীতির ধারায় তিনি যা আশা করতেন, লেখার মাধ্যমে তা করার সংকল্প গ্রহণ করেন। এর মধ্যে মুক্তিযুদ্ধ সংঘটিত হয়। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে তিনি ঢাকা শহরে থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয় ও অর্থ সংগ্রহ করে দিয়ে সহযোগিতা করেন। স্বাধীনতার পর তিনি কোনো রাজনৈতিক সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত হননি।
১৯৭২ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে প্রভাষক হিসেবে যোগদান করেন। ২০১১ সালের ৩০ জুন তিনি অবসরে যান। সুপারনিউমারারি অধ্যাপক হিসেবে ২০১১–১৫ সাল পর্যন্ত একই বিভাগে কর্মরত ছিলেন। দুই বছর (২০২১–২৩) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে আহমদ শরীফ চেয়ার পদে নিয়োজিত ছিলেন।
সর্বস্তরে বাংলা ভাষার ব্যবহার নিশ্চিত করতে আবুল কাসেম ফজলুল হক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। তাঁর প্রথম বই ‘মুক্তিসংগ্রাম’ প্রকাশিত হয় ১৯৭২ সালে। ‘সুন্দরম’ ও ‘লোকায়ত’ নামে দুটি সাময়িকপত্রের সম্পাদনা ছাড়াও রয়েছে তাঁর অনেক গুরুত্বপূর্ণ বই। ‘একুশে ফেব্রুয়ারি আন্দোলন’, ‘রাজনীতি দর্শন’, ‘সাহিত্য চিন্তা’, ‘বাংলাদেশের রাজনীতিতে বুদ্ধিজীবীদের ভূমিকা’, ‘সংস্কৃতির সহজ কথা’সহ ৩২টির মতো মৌলিক গ্রন্থ রয়েছে তাঁর। অধ্যাপক আবুল কাসেমের সম্পাদনায় প্রকাশিত হয়েছে ‘ইতিহাসের আলোকে বাংলাদেশের সংস্কৃতি’, ‘স্বদেশচিন্তা’-এর মতো একাধিক গ্রন্থ। ১৯৮১ সালে তিনি বাংলা একাডেমি পুরস্কার পেয়েছিলেন। এ ছাড়া পেয়েছেন অলক্ত সাহিত্য পুরস্কার, বাংলাদেশ লেখক শিবির হুমায়ুন কবির স্মারক পুরস্কার, আলাওল সাহিত্য পুরস্কার এবং কলকাতা লিটল ম্যাগাজিন লাইব্রেরি ও গবেষণাকেন্দ্র থেকে ‘লিটল ম্যাগাজিন পুরস্কার’ পান।
অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হকের এই আকস্মিক মৃত্যুর খবরে রাজধানীর শিক্ষা–সংস্কৃতির অঙ্গনে শোকের ছায়া নেমে আসে।
বিএনপির মহাসচিব এবং স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর আবুল কাসেম ফজলুল হকের মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। তিনি মরহুমের রূহের মাগফেরাত কামনা ও শোকসন্তপ্ত পরিবার-পরিজনের প্রতি গভীর সমবেদনা প্রকাশ করেছেন বলে বিএনপি মিডিয়া সেলের সদস্য শাইরুল কবির খান জানিয়েছেন। এই সদস্য আরও জানান, সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী আবুল কাসেম ফজলুল হকের বাসায় যাবেন।
উল্লেখ্য, ১৯৮১ সালে বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কারপ্রাপ্ত এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক ২০২৪ সালের ২৮ অক্টোবর বাংলা একাডেমির সভাপতি পদে যোগ দেন।
