এইচএসসি পরীক্ষাকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে তীব্র বিক্ষোভ

শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ দাবিতে অবরোধ-ঘেরাও

নয়াবার্তা প্রতিবেদক : বন্যা, টানা বর্ষণ ও জলাবদ্ধতার মধ্যেও এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা গ্রহণ, প্রশ্নপত্রে ভুল এবং শিক্ষার্থীদের নিয়ে শিক্ষামন্ত্রীর বিতর্কিত মন্তব্যকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে নজিরবিহীন আন্দোলন ছড়িয়ে পড়েছে। রাজধানী ঢাকাসহ অন্তত ১১ জেলায় সড়ক অবরোধ, শিক্ষা বোর্ড ঘেরাও, মানববন্ধন, বিক্ষোভ ও স্মারকলিপি কর্মসূচি পালিত হয়েছে। দিনভর আন্দোলনের পর সন্ধ্যায় জাতীয় সংসদ ভবনের সামনে জড়ো হয়ে সংসদে প্রবেশের চেষ্টা করলে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর লাঠিচার্জ করে পুলিশ। এতে কয়েকজন শিক্ষার্থী আহত হন। অন্যদিকে জাতীয় সংসদে শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন ক্ষতিগ্রস্ত কেন্দ্রগুলোতে প্রয়োজনে পুনঃপরীক্ষা নেওয়ার আশ্বাস দিয়ে শিক্ষার্থীদের রাজপথ ছেড়ে পড়ার টেবিলে ফিরে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তবে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা তা প্রত্যাখ্যান করে দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন।

গতকাল মঙ্গলবার সকাল থেকেই রাজধানীর সায়েন্সল্যাব, ঢাকা শিক্ষা বোর্ড, উত্তরা বিএনএস টাওয়ার, ইসিবি চত্বরসহ বিভিন্ন স্থানে শিক্ষার্থীরা অবস্থান নেন। সড়ক অবরোধের কারণে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়। গুলশান ট্রাফিক বিভাগ জানায়, উত্তরা ও ইসিবি চত্বরে অবরোধের কারণে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে তীব্র যানজট তৈরি হয় এবং যানবাহনের সারি কুড়িল ফ্লাইওভার পর্যন্ত পৌঁছে যায়। নাগরিকদের বিকল্প সড়ক ব্যবহারের পরামর্শ দেয় ট্রাফিক পুলিশ।

শুধু রাজধানী নয়, বরিশাল, ময়মনসিংহ, কুমিল্লা, বগুড়া, টাঙ্গাইল, রাজশাহী, সিলেট, রংপুর, নওগাঁ, কুড়িগ্রাম ও সুনামগঞ্জেও বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। কোথাও ঢাকা-বরিশাল ও ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক অবরোধ, কোথাও শিক্ষা বোর্ড ঘেরাও, আবার কোথাও জেলা প্রশাসকের কাছে স্মারকলিপি দেওয়া হয়। ফলে বিভিন্ন মহাসড়কে ঘণ্টার পর ঘণ্টা যান চলাচল বন্ধ থাকে এবং সাধারণ মানুষ চরম দুর্ভোগে পড়েন।

আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, বন্যা ও জলাবদ্ধতার কারণে হাজারো পরীক্ষার্থী নির্ধারিত সময়ে কেন্দ্রে পৌঁছাতে পারেননি। অনেককে কোমর বা বুকসমান পানি পেরিয়ে পরীক্ষাকেন্দ্রে যেতে হয়েছে। এর মধ্যেই অস্বাভাবিক কঠিন ও ত্রুটিপূর্ণ প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা নেওয়া হয়েছে। তাঁরা দাবি করেন, দুর্যোগ পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত সব শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা স্থগিত করতে হবে, ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষার্থীদের পুনঃপরীক্ষার সুযোগ দিতে হবে, প্রশ্নপত্রে ভুলের জন্য দায়ীদের শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে এবং শিক্ষার্থীদের নিয়ে করা মন্তব্যের জন্য শিক্ষামন্ত্রীকে ক্ষমা চেয়ে পদত্যাগ করতে হবে।

বিকেলে রাজধানীর সায়েন্সল্যাবে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা শিক্ষামন্ত্রীকে সন্ধ্যা ৬টার মধ্যে পদত্যাগ ও জাতির কাছে ক্ষমা চাওয়ার আলটিমেটাম দেন। একই সঙ্গে সোমবার অনুষ্ঠিত পরীক্ষা পুনরায় গ্রহণ এবং পরবর্তী পরীক্ষাগুলো স্থগিত করে নতুন রুটিন প্রকাশের দাবি জানান। পরে সন্ধ্যায় শতাধিক শিক্ষার্থী জাতীয় সংসদ ভবনের সামনে গিয়ে অবস্থান নেন। সংসদের অধিবেশন চলাকালে তারা বিভিন্ন স্লোগান দিতে থাকেন। একপর্যায়ে সংসদ ভবনের ভেতরে প্রবেশের চেষ্টা করলে পুলিশ লাঠিচার্জ করে তাদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়। এ সময় কয়েকজন শিক্ষার্থী পুলিশের দিকে ইট-পাটকেল নিক্ষেপের চেষ্টা করলে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।

একই সময়ে জাতীয় সংসদে প্রশ্নোত্তর পর্বে শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন বলেন, সরকারও বর্ষা মৌসুমে পরীক্ষা নেওয়া নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিল। আবহাওয়া অনুকূলে থাকার পূর্বাভাসের ভিত্তিতেই পরীক্ষা নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। তবে কোথাও পানি ওঠার খবর পাওয়া মাত্র স্থানীয় প্রশাসনের সহায়তায় বিকল্প কেন্দ্রে পরীক্ষা নেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। তিনি বলেন, প্রশাসনিক গাফিলতি বা বাস্তব সমস্যার কারণে কোনো পরীক্ষার্থী ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে থাকলে তথ্য যাচাই করে সেখানে পুনরায় পরীক্ষা নেওয়া হবে। সরকারের কাছে পর্যাপ্ত বিকল্প প্রশ্নপত্র প্রস্তুত রয়েছে বলেও তিনি জানান।

শিক্ষামন্ত্রী বলেন, শিক্ষার্থীদের অধিকার কোনোভাবেই ক্ষুণ্ন হতে দেওয়া হবে না। আন্দোলনের পরিবর্তে তারা যেন পড়াশোনায় মনোযোগ দেয় এবং সরকারের ওপর আস্থা রাখে।

এদিকে পরীক্ষা স্থগিতের দাবির মুখে আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির কর্মকর্তারা জরুরি বৈঠকে বসেন। শিক্ষা মন্ত্রণালয় প্রথমে চট্টগ্রাম বোর্ড ছাড়া অন্য সব বোর্ডের পরীক্ষা যথারীতি চলবে বলে বিজ্ঞপ্তি দিলেও পরে সেটি প্রত্যাহার করে নেয়। পরে জানানো হয়, সার্বিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানানো হবে।

চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের সামনে কয়েকশ শিক্ষার্থী বিক্ষোভ করে সব বোর্ডের পরীক্ষা স্থগিত, প্রশ্নপত্রে ভুলের জন্য দায়ীদের শাস্তি এবং বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত প্রবেশপত্র দ্রুত পুনরায় ইস্যুর দাবি জানান। বোর্ড সচিব তাঁদের দাবিগুলো বিবেচনার আশ্বাস দিলেও আন্দোলন অব্যাহত রাখার ঘোষণা দেন শিক্ষার্থীরা।

এদিকে ইসলামী ছাত্র আন্দোলন বাংলাদেশ পৃথক বিবৃতিতে দুর্যোগ পরিস্থিতি বিবেচনায় এইচএসসি ও আলিম পরীক্ষা সাময়িক স্থগিতের দাবি জানিয়েছে। সংগঠনটি শিক্ষা প্রশাসনের সমন্বয়হীনতার সমালোচনা করে শিক্ষামন্ত্রীর নৈতিক দায় নির্ধারণের আহ্বান জানায়।

অন্যদিকে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক ও সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের প্রতি সমর্থন জানিয়ে বলেন, শিক্ষার্থীরা কোনো পরীক্ষাগারের ‘গিনিপিগ’ নয়। তাঁদের ভবিষ্যৎ নিয়ে দায়িত্বহীন সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং অবমাননাকর মন্তব্য কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

দিনভর বিক্ষোভ, সড়ক অবরোধ, যানজট এবং সন্ধ্যায় সংসদ ভবনের সামনে সংঘর্ষের ঘটনায় এইচএসসি পরীক্ষা ঘিরে সৃষ্ট সংকট নতুন মাত্রা পেয়েছে। সরকার পুনঃপরীক্ষার আশ্বাস দিলেও পরীক্ষা স্থগিতের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না আসা পর্যন্ত আন্দোলন আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এখন শিক্ষা প্রশাসনের পরবর্তী সিদ্ধান্তের দিকেই তাকিয়ে রয়েছে লাখো পরীক্ষার্থী, অভিভাবক এবং সংশ্লিষ্ট মহল।

Share