কাটছাঁটের কারণে বিলম্ব হচ্ছে নবম পে-স্কেলের গেজেট

গাজী আবু বকর : নবম জাতীয় পে-স্কেল বাস্তবায়নের ঘোষণার পর চলতি ২০২৭-২৮ অর্থবছরের বাজেটে বরাদ্দও রাখা হয়েছে। অথচ এখনো গেজেট না হওয়ায় উদ্বিগ্ন সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। প্রশ্ন উঠেছে প্রজ্ঞাপন আগস্টে হবে নাকি আরও অপেক্ষা করতে হবে। তবে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সূত্র বলছে, নতুন বেতন কাঠামো কার্যকর হবে। এ নিয়ে সরকারের অবস্থানের কোনো পরিবর্তন নেই। কিন্তু কীভাবে বাস্তবায়ন হবে, কত ধাপে হবে এবং কমিশনের সুপারিশ কতটুকু গ্রহণ করা হবে এসব প্রশ্নের এখনো মীমাংসা হয়নি। আর এ কারণেই গেজেট প্রকাশে বিলম্ব হচ্ছে। এ ছাড়া কাটছাঁট হতে পারে বেতন কমিশনের সুপারিশও।

বাস্তবায়ন তিন ধাপ-নাকি দুই ধাপে এই প্রশ্নেরও এখনো সমাধান হয়নি। শুরুতে জাতীয় বেতন কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নের জন্য তিন ধাপের পরিকল্পনা করা হয়েছিল। পরিকল্পনা ছিল ২০২৬ সালের ১ জুলাই কমিশনের সুপারিশ করা মূল বেতনের ৫০ শতাংশ কার্যকর করা হবে। ২০২৭ সালের ১ জুলাই বাকি ৫০ শতাংশ এবং ২০২৮-২৯ অর্থবছর থেকে নতুন ভাতা ও অন্যান্য সুবিধা চালু হবে। কিন্তু বাস্তব হিসাব-নিকাশে দেখা যায়, গত কয়েক বছরের বার্ষিক ইনক্রিমেন্টের কারণে অনেক কর্মকর্তা-কর্মচারীর বর্তমান মূল বেতন এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে কমিশনের প্রস্তাবিত মূল বেতনের অর্ধেক কার্যকর করলে প্রকৃত বেতন বৃদ্ধি খুবই সামান্য হবে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে বেতন কাঠামোয় অসামঞ্জস্যও তৈরি হতে পারে। এর পরিপ্রেক্ষিতে তিন ধাপের পরিবর্তে দুই ধাপে বাস্তবায়নের চিন্তাভাবনা শুরু হয়। সে ক্ষেত্রে চলতি বছরের ১ জুলাই থেকেই নতুন মূল বেতন এবং ২০২৭-২৮ অর্থবছর থেকে নতুন ভাতা কার্যকর করার আলোচনা হয়। তবে সেটিও চূড়ান্ত হয়নি। সর্বশেষ আলোচনায় আবার তিন ধাপে বাস্তবায়নের বিষয়টি সামনে এসেছে। এবার প্রথম ধাপে শুধু মূল বেতন কার্যকর এবং পরবর্তী দুই ধাপে ভাতা ও অন্যান্য আর্থিক সুবিধা চালুর বিষয়ে আলোচনা চলছে। তবে সচিব কমিটির সর্বশেষ বৈঠকেও এ বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।

আইএমএফ এর অনাপত্তি

গত ১২ থেকে ১৬ জুলাই আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)-এর একটি প্রতিনিধি দল ঢাকা সফর করে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীসহ সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে বৈঠক করে। বৈঠকে নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের অর্থের উৎস সম্পর্কে জানতে চাইলেও আইএমএফের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক আপত্তি জানানো হয়নি। সেই বৈঠকের পর অর্থমন্ত্রী সাংবাদিকদের বলেছিলেন, নতুন পে-স্কেল এবং আইএমএফের ঋণ কর্মসূচির মধ্যে কোনো সম্পর্ক নেই। নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় কাজ এগিয়ে চলছে।

বাজেটে বড় বরাদ্দ, তবু কেন সংশয়

২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতার জন্য ৮৯ হাজার ৮৩৬ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। পেনশন ও গ্র্যাচুইটিসহ মোট বরাদ্দ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ২৫ হাজার ৫১৫ কোটি টাকা।

জনপ্রশাসন খাতের জন্য বরাদ্দ ধরা হয়েছে ১ লাখ ৪১ হাজার ৪৩৪ কোটি টাকা, যা আগের সংশোধিত বাজেটের তুলনায় প্রায় ৫৫ হাজার কোটি টাকা বেশি। এর বড় একটি অংশ থোক বরাদ্দ হিসেবে রাখা হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের ধারণা, এই অর্থের একটি বড় অংশ নতুন পে-স্কেলের আংশিক বাস্তবায়নে ব্যবহার করা হতে পারে।

তবে অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, বাজেটে বরাদ্দ রাখা হলেও এবার বাজেট ঘাটতি ২ লাখ ৩৬ হাজার ৮৫০ কোটি টাকা। পরিকল্পনা অনুযায়ী রাজস্ব ও ঋণ না এলে সরকার ব্যয়ের অগ্রাধিকার পুনর্বিন্যাস করতে পারে।

কমিশনের সুপারিশে কাটছাঁটের আভাস
২০২৫ সালে সাবেক অর্থসচিব জাকির আহমেদ খানের নেতৃত্বাধীন জাতীয় বেতন কমিশন সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন ১০০ থেকে ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর সুপারিশ করেছিল।

সুপারিশ অনুযায়ী সর্বনিম্ন বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে ২০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ বেতন ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা করার প্রস্তাব ছিল। ২০টি গ্রেড বহাল রাখারও সুপারিশ করা হয়।

তবে বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় সরকার সেই সুপারিশ হুবহু গ্রহণ করছে না বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। রাজস্ব আয়, মূল্যস্ফীতি, বাজেট ঘাটতি ও সরকারি ব্যয়ের চাপ বিবেচনায় কিছু ক্ষেত্রে মূল বেতন, ভাতা ও অন্যান্য সুবিধায় পরিবর্তন আনার বিষয়টি বিবেচনায় রয়েছে।

আগস্ট, নাকি অক্টোবর?
প্রজ্ঞাপন জারির সময় নিয়েও মিলছে ভিন্ন তথ্য। একাধিক সূত্র বলছে, অর্থ বিভাগের আনুষঙ্গিক কাজ শেষ হলেই প্রস্তাবটি মন্ত্রিসভার অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হবে। এরপর গেজেট প্রকাশ করা হবে।

তবে একটি সূত্রের দাবি, আগস্টেই প্রজ্ঞাপন জারি হতে পারে। অন্যদিকে আরেকটি সূত্র বলছে, সব প্রক্রিয়া শেষ করে অক্টোবরের আগে গেজেট প্রকাশের সম্ভাবনা কম।

সরকারের অবস্থান হলো, গেজেট প্রকাশে বিলম্ব হলেও নতুন বেতন কাঠামো ১ জুলাই থেকেই কার্যকর হিসেবে গণ্য হবে। অর্থাৎ গেজেট জারির পর কর্মকর্তা-কর্মচারীরা কার্যকারিতার তারিখ থেকে প্রাপ্য আর্থিক সুবিধা পাবেন।

শুধু অর্থ নয়, আছে প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জ
সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, শুধু অর্থের সংস্থান নয়, প্রযুক্তিগত জটিলতাও এখন বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বর্তমানে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন, ইনক্রিমেন্ট, পেনশন, গ্র্যাচুইটি ও অন্যান্য আর্থিক সুবিধা ইলেকট্রনিক ফান্ড ট্রান্সফার (ইএফটি) এবং আইবাস প্লাস সফটওয়্যারের মাধ্যমে পরিশোধ করা হয়। ধাপে ধাপে মূল বেতন কার্যকর করতে গেলে পুরো সফটওয়্যার কাঠামোয় পরিবর্তন আনতে হবে। এতে সময় ও কারিগরি প্রস্তুতি দুই-ই প্রয়োজন।

সচিব কমিটির এক সদস্য বলেন, কোথাও যেন কোনো ত্রুটি না থাকে, সে বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। পূর্ণাঙ্গ সুপারিশ দিতে প্রয়োজন হলে আরও বৈঠক হবে।

উদ্বিগ্ন কর্মকর্তা-কর্মচারীরা
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, অর্থমন্ত্রী ঘোষণা দিয়েছেন, তাই নতুন পে-স্কেল হবে এ নিয়ে তারা আশাবাদী। কিন্তু গেজেট প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত অনিশ্চয়তা কাটছে না।

তিনি বলেন, বর্তমান বাজারদরে বিদ্যমান বেতনে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। পরিবারের ব্যয়, বাসাভাড়া, চিকিৎসা ও সন্তানের শিক্ষা সব মিলিয়ে মাস শেষে হাতে কিছুই থাকে না।

শ্রম মন্ত্রণালয়ের আরেক কর্মকর্তা বলেন, সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বাড়লেই মূল্যস্ফীতি বাড়বে এমন সমালোচনা প্রায়ই শোনা যায়। কিন্তু বিদ্যমান বেতনে জীবনযাত্রার ব্যয় সামলানো কতটা কঠিন, সেটি খুব কমই আলোচনায় আসে।

যেসব প্রশ্নের উত্তর এখনো মেলেনি
নবম পে-স্কেল বাস্তবায়ন নিয়ে এখনো কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের জবাব অমীমাংসিত রয়ে গেছে। কমিশনের সুপারিশে কতটা পরিবর্তন আসবে, বাস্তবায়ন হবে একবারে নাকি ধাপে ধাপে, নতুন ভাতাগুলো কখন কার্যকর হবে, ২০টি গ্রেড অপরিবর্তিত থাকবে কি না এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ গেজেট ঠিক কবে প্রকাশ হবে। এসব প্রশ্নের উত্তর মিললেই শেষ হবে দীর্ঘদিনের অপেক্ষা।

Share