
বিশেষ প্রতিবেদক : ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল (এফএসআরইউ) স্থাপন, দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র পূর্ণাঙ্গ চালু এবং ভোলার গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হওয়ার মাধ্যমে আগামী দেড় থেকে দুই বছরের মধ্যে দেশের গ্রাম ও শহরে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা সম্ভব হবে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার বিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান।
আজ মঙ্গলবার সকালে সচিবালয়ে তথ্য অধিদফতরের (পিআইডি) সম্মেলন কক্ষে সরকারের বিভিন্ন কার্যক্রমের অগ্রগতি নিয়ে আয়োজিত নিয়মিত সাপ্তাহিক প্রেস ব্রিফিংয়ে তিনি এ কথা জানান।
তথ্য উপদেষ্টা জানান, বর্তমানে জ্বালানি ঘাটতি, বিদ্যুৎ কেন্দ্রের যান্ত্রিক ত্রুটি ও সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বৃদ্ধির ফলে সৃষ্ট অতিরিক্ত চাহিদার কারণে যে বিদ্যুৎ সংকট তৈরি হয়েছে, তা কাটিয়ে উঠতে দীর্ঘমেয়াদি টেকসই পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে সরকার। তিনি বলেন, ‘আগে ঢাকাসহ বড় শহরগুলোকে নিরবচ্ছিন্ন রেখে গ্রামে অতিরিক্ত লোডশেডিং দেওয়ার যে বৈষম্যমূলক ব্যবস্থা ছিল, আমরা সেখান থেকে সরে এসেছি। সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্তের কারণে এখন সাময়িক কষ্টের বোঝা শহর ও গ্রামে সুষমভাবে বণ্টন করা হচ্ছে।’
দুই বছরের লক্ষ্যমাত্রা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘নতুন এফএসআরইউ স্থাপনের জন্য দেড় থেকে দুই বছর সময় লাগবে, যার ফলে এলএনজি আমদানি বৃদ্ধি পাবে। পাশাপাশি ভোলার গ্যাস জাতীয় গ্রিডে আনতে ৫০০ কোটি টাকার প্রকল্প এবং বাপেক্সের ১৫০টি কূপ খনন ও পুনঃখননের কাজ চলছে। এ ছাড়া চলতি সেপ্টেম্বর মাসেই রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের পরীক্ষামূলক চালুকরণ প্রক্রিয়া শুরু হবে। আগামী বছর থেকে এটি পূর্ণ স্কেলে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ করবে। এর ফলে আগামী দেড় থেকে দুই বছরে বিদ্যুৎ খাত আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে অধিক নির্ভরযোগ্য ও আনইন্টারাপ্টেড (নিরবচ্ছিন্ন) অবস্থায় পৌঁছাবে।’
উপদেষ্টা জানান, সরকারের অব্যাহত কূটনৈতিক বার্গেইনিংয়ের মাধ্যমে মালয়েশিয়া সরকার সম্পূর্ণ বিনামূল্যে (বিমান ব্যয়সহ) ১০ হাজার নতুন কর্মী নিতে নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকারের সময় গঠিত রিক্রুটিং সিন্ডিকেটের বাইরে এসে নতুন সিদ্ধান্তের মাধ্যমে পূর্বে অনুমোদিত ২৫টি প্রধান এজেন্সির পাশাপাশি আরও ৩১২টি সংস্থাকে অ্যাসোসিয়েট (সহযোগী) রিক্রুটিং এজেন্সি হিসেবে কর্মী প্রেরণের সুযোগ দেওয়া হয়েছে।
দেশে শিশু হারিয়ে যাওয়ার পরিসংখ্যান নিয়ে উপদেষ্টা স্পষ্ট করে বলেন, এটি রাতারাতি তৈরি হওয়া কোনো নতুন সংকট নয়। তথ্য উপাত্ত তুলে ধরে তিনি জানান, ২০২৫ সালের জুন-ডিসেম্বর মেয়াদের ১৩ হাজার ৮৭৬টি জিডির বিপরীতে পরবর্তী সাত মাসে ১৫ হাজার ৭১৭টি জিডি নথিভুক্ত হয়েছে, যা প্রায় একই ধারার পরিসংখ্যান নির্দেশ করে। তবে প্রতিটি নিখোঁজের ঘটনাতেই সরকার সর্বোচ্চ তৎপর রয়েছে।
সারের ঘাটতি সংক্রান্ত গুঞ্জন নিরসন করে তিনি জানান, বর্তমানে দেশে ইউরিয়া, টিএসপি, ডিএপিসহ মোট ১২ লাখ ৮৬১ মেট্রিক টন সারের মজুত রয়েছে, যা গত বছরের এই সময়ের (১২ লাখ মেট্রিক টন) চেয়েও বেশি। সরবরাহ বা বিতরণ ব্যবস্থার অনিয়ম দূর করে কৃষকের হাতে যথাসময়ে সার পৌঁছাতে কাজ চলছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে জাহেদ উর রহমান বলেন, তখন বাংলাদেশে রাষ্ট্র অস্তিত্বশীল ছিল বলে তিনি মনে করেন না।
তিনি বলেন, ‘অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ১৫০-২০০ মাজার ভেঙে ফেলা হয়েছে। মব হয়ে অসংখ্য… যাত্রা, নাটক, মেলা, জাস্ট মেলা বসে—আড়াইশ বছরের পুরোনো মেলা বসতে পারে নাই। তিনজন অভিনেত্রী শোরুম উদ্বোধন করবেন, সেটাও হতে দেওয়া হয় নাই। বাংলাদেশে এই ঘটনাগুলো ঘটেছে।’ তিনি বলেন, ‘ঘোষণা দিয়ে দুটো পত্রিকা অফিসে আগুন জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে। ওই সময় বাংলাদেশে স্টেট এক্সিস্ট করে নাই। বিভিন্ন তুচ্ছ দাবি নিয়ে রাস্তা বন্ধ করে বসে থাকা হয়েছিল। বাংলাদেশে তখন কোনো স্টেট এক্সিস্ট করেছিল বলে মনে করি না।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমি বলছি না অপরাধ হচ্ছে না, অপরাধ হচ্ছে। সেগুলো আপনারা আনছেন, এটাও লজিক্যাল। একটা অপরাধও যেন না ঘটে বা ঘটলে সেটার দায় সরকারের, মানতে আমি একেবারেই দ্বিধা করছি না। কিন্তু আমরা কোন জায়গায় আছি, কতটুকু আছি সেই ব্যাপারটা একটু বোঝা দরকার আছে।’
তথ্য উপদেষ্টা বলেন, ‘আপনি যদি ডেটা দেখেন, হত্যাকাণ্ডের সংখ্যা বা হত্যাকাণ্ডের মামলার সংখ্যা গত ইন্টারিমের সময়ের তুলনায় কিছুটা বেড়েছে। কিন্তু অন্য অপরাধ—চুরি, ডাকাতি, ছিনতাইয়ের মতো অপরাধের মামলার সংখ্যা কমেছে। ওভারঅল মামলা দিয়েই হয়তো ডেটাটা বলতে পারব, সেটা কিন্তু আবার কমেছে।’ তিনি বলেন, ‘মাত্র ছয় মাস গেল, আশা করি এই সমস্যাটার সমাধান ধীরে ধীরে হবে।’
তথ্য উপদেষ্টা বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ের তুলনায় বর্তমানে হত্যাকাণ্ড বা হত্যা মামলার সংখ্যা কিছুটা বেড়েছে, তবে চুরি-ছিনতাইয়ের মতো অপরাধের মামলার সংখ্যা কমেছে। তিনি বলেন, ‘মাত্র ছয় মাস গেল, আমরা আশা করি এই সমস্যাটার সমাধান ধীরে ধীরে হবে।’ বর্তমান পরিস্থিতিতে অপরাধের দায় সরকার এড়িয়ে যাচ্ছে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি। ‘আমি বলছি না অপরাধ হচ্ছে না, অপরাধ হচ্ছে। সেগুলো আপনারা আনছেন, এটাও লজিক্যাল। একটা অপরাধও যেন না ঘটে সরকার বা ঘটলেও সেটার দায় সরকারের, মানতে আমি একেবারেই দ্বিধা করছি না।’ তবে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ের তুলনায় বর্তমান পরিস্থিতি খুব বেশি খারাপ নয় বলেই মনে করেন তথ্য উপদেষ্টা। তার ভাষ্য, সরকার ‘একেবারে মনোবল শেষ হওয়া’ পুলিশ বাহিনীকে নিয়ে কাজ করছে।
জাহেদ উর রহমান বলেন, ‘অন্তর্বর্তী আর আমরা একটা সুনির্দিষ্ট প্রেক্ষাপটে কাজ করছি। সেটা হলো একেবারে ধ্বংসপ্রাপ্ত, মনোবল শেষ হওয়া একটা পুলিশ বাহিনী নিয়ে কাজ করছি।’ পুলিশের আত্মবিশ্বাস এখনো পুরোপুরি ফেরেনি বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
সাংবাদিকদের চাকরি ও জীবিকার নিরাপত্তার গুরুত্ব তুলে ধরে ডা. জাহেদ উর রহমান বলেন, নবম ওয়েজ বোর্ড বাস্তবায়ন ও দশম ওয়েজ বোর্ড গঠনের প্রক্রিয়ার পাশাপাশি টেলিভিশন ও অনলাইন সংবাদমাধ্যমকে একই ছাতার নিচে এনে সংবাদকর্মীদের অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিতে সরকার দ্রুত আইনি পদক্ষেপ নেবে।
ব্রিফিংয়ে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা বলেন, ব্যাটারিচালিত রিকশার মেকানিক্যাল স্পেসিফিকেশন ও রুট নির্ধারণে স্থানীয় সরকার বিভাগের নেতৃত্বে একটি সুনির্দিষ্ট বিধিমালা প্রণয়ন করা হচ্ছে। পে-স্কেলে বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন সন্তানের চিকিৎসার খরচ ও পরিচর্যার কথা বিবেচনা করে প্রতি মাসে ৩ হাজার টাকা হারে ভাতা রাখা হয়েছে।
চট্টগ্রাম বন্দরে ডেনমার্কের সহায়তায় লালদিয়া কনটেইনার টার্মিনালের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন দেশের বৈচিত্র্যময় অর্থনৈতিক গতিশীলতাকে বাড়িয়ে দেবে বলে ব্রিফিংয়ে জানানো হয়।
ব্রিফিংয়ে তথ্য অধিদফতরের প্রধান তথ্য কর্মকর্তা সৈয়দ আবদাল আহমদ, তথ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব কে এম আবদুল ওয়াদুদ এবং তথ্য অধিদফতরের উপ-প্রধান তথ্য কর্মকর্তা ফখরুল ইসলাম উপস্থিত ছিলেন।
