
সংসদ প্রতিবেদক : র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব) বিলুপ্ত করে পুলিশের আওতাধীন ‘স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন’ (এসআরবি) নামে নতুন একটি বিশেষায়িত ইউনিট গঠনের বিধান রেখে জাতীয় সংসদে বিল উত্থাপন করা হয়েছে। আজ বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদের অধিবেশনে ‘স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) আইন-২০২৬’ নামে বিলটি উত্থাপন করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।
ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামালের সভাপতিত্বে অধিবেশনে বিলটি উত্থাপনের বিরোধিতা করেন বিরোধী দলীয় সদস্যরা। পরে বিলটি অধিকতর পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে পাঠানো হয়।
কমিটিকে যাচাই-বাছাই শেষে চার কার্যদিবসের মধ্যে সংসদে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।প্রস্তাবিত আইন কার্যকর হলে র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব) গঠনসংক্রান্ত বিদ্যমান আইন ও বিধান রহিত হবে।
উত্থাপিত বিলে বলা হয়েছে, জননিরাপত্তা রক্ষা, সন্ত্রাসবাদ ও সংঘবদ্ধ অপরাধ দমন এবং পুলিশ বাহিনীকে সহায়তার জন্য আধুনিক, পেশাদার, দক্ষ ও জবাবদিহিমূলক একটি বিশেষায়িত ইউনিট প্রয়োজন। একই সঙ্গে বাহিনীর ক্ষমতা প্রয়োগে স্বচ্ছতা, তদারকি ও কার্যকর জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
বিলের বিধান অনুযায়ী, পুলিশের আওতায় ‘স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন’ নামে একটি বিশেষায়িত ইউনিট থাকবে। প্রয়োজন অনুযায়ী পুলিশ বাহিনী ও অন্যান্য শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নির্ধারিত সংখ্যক কর্মকর্তা ও সদস্যকে পদায়ন বা প্রেষণে নিয়োগের মাধ্যমে এ ইউনিট গঠন করা হবে। এর সদর দপ্তর থাকবে ঢাকায়।
এসআরবির একজন মহাপরিচালক থাকবেন। বাংলাদেশ পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ মহাপরিদর্শক বা তদূর্ধ্ব পদমর্যাদার কর্মকর্তাদের মধ্য থেকে সরকার তাঁকে নিয়োগ দেবে। মহাপরিচালক ইউনিটের প্রশাসনিক, আর্থিক ও অপারেশনাল ক্ষমতা প্রয়োগ করবেন।
বিলটিতে এসআরবির দায়িত্বের মধ্যে জননিরাপত্তা রক্ষা, সন্ত্রাস ও সংঘবদ্ধ অপরাধ দমন, অবৈধ অস্ত্র, গোলাবারুদ ও বিস্ফোরক উদ্ধার এবং মাদক, সাইবার অপরাধ, গুম ও ভূমিদস্যুতার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
এ ছাড়া নারী ও শিশু নির্যাতন, ধর্ষণ, মানবপাচার ও অপহরণসহ মানবতাবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারবে ইউনিটটি। আইনশৃঙ্খলা-সংশ্লিষ্ট গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ এবং অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সহায়তাও করবে এসআরবি।
আদালত, সরকার বা পুলিশ মহাপরিদর্শকের নির্দেশে বিভিন্ন ফৌজদারি অপরাধের তদন্ত করার ক্ষমতাও দেওয়া হয়েছে প্রস্তাবিত ইউনিটটিকে।
প্রস্তাবিত আইনে এসআরবিকে কোনো স্থানে প্রবেশ, তল্লাশি, জব্দ ও গ্রেপ্তারের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। তবে এসব ক্ষমতা ফৌজদারি কার্যবিধি ও প্রচলিত অন্যান্য আইন অনুসরণ করে প্রয়োগ করতে হবে।
পুলিশের সাব-ইন্সপেক্টর পদমর্যাদার নিচে নন-এমন এসআরবি কর্মকর্তা তদন্তকারী কর্মকর্তার আইনগত ক্ষমতা ও দায়িত্ব প্রয়োগ করতে পারবেন।
তবে কাউকে গ্রেপ্তার বা কোনো আলামত জব্দ করার পর তা এসআরবির হেফাজতে রাখা যাবে না। অনতিবিলম্বে গ্রেপ্তার ব্যক্তিকে বা জব্দ করা আলামত নিকটস্থ থানার হেফাজতে দিতে হবে। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছেও প্রতিবেদন দিতে হবে।
বিলে এসআরবি সদস্যদের কর্তব্যে অবহেলা, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার আইনসংগত আদেশ অমান্য, দায়িত্ব পালনকালে নেশাগ্রস্ত থাকা, সহকর্মীর সঙ্গে অসদাচরণ, অস্ত্র বা সরঞ্জাম হারানো, অবৈধভাবে অর্থ আদায়, জমি দখল, অপরাধীকে আটক করতে ব্যর্থ হওয়া এবং জুয়া বা অবৈধ মাদকের সঙ্গে জড়িত হওয়াকে শৃঙ্খলা লঙ্ঘন হিসেবে গণ্য করা হয়েছে।
এসব অপরাধে বরখাস্ত, অপসারণ, বাধ্যতামূলক অবসর, চাকরি থেকে অব্যাহতি, পদাবনতি, পদোন্নতি স্থগিত এবং বেতন-ভাতা বা জ্যেষ্ঠতা বাজেয়াপ্তের মতো গুরুদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে।
লঘুদণ্ড হিসেবে জরিমানা, তিরস্কার এবং নির্দিষ্ট সময়ের জন্য আটক বা শাস্তিমূলক ড্রিলের বিধানও রয়েছে। তবে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়ে কোনো সদস্যকে শাস্তি দেওয়া যাবে না। বিভাগীয় আদেশের বিরুদ্ধে ৩০ দিনের মধ্যে আপিলের সুযোগও রাখা হয়েছে।
প্রস্তাবিত আইনে এসআরবি সদস্যদের বিরুদ্ধে অভিযোগ ও অভ্যন্তরীণ সংক্ষোভ নিষ্পত্তির জন্য ‘অভিযোগ প্রতিকার কমিটি’ গঠনের বিধান রাখা হয়েছে।
কমিটিতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পুলিশ সদর দপ্তরের প্রতিনিধির পাশাপাশি একজন বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তা এবং মানবাধিকার সংরক্ষণ ও বাস্তবায়নে অন্তত ১০ বছরের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন একজন ব্যক্তিকে রাখার কথা বলা হয়েছে।
বিলের উদ্দেশ্য ও কারণসংবলিত বিবৃতিতে বলা হয়েছে, অপরাধের ধরন পরিবর্তন এবং জাতীয় ও জননিরাপত্তার নতুন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় দ্রুত প্রতিক্রিয়াশীল একটি আধুনিক বিশেষায়িত ইউনিট প্রয়োজন। সেই প্রয়োজনের তাগিদে আইনের শাসন, মানবাধিকার, স্বচ্ছতা, তদারকি ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করেই এসআরবি পরিচালনার লক্ষ্য নিয়ে বিলটি আনা হয়েছে।
এদিন ‘আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন (এপিবিএন) বিল-২০২৬’ নামে আরও একটি বিল উত্থাপন করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। এর আগে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী ‘ব্যাংক রেজল্যুশন আইন-২০২৬’ নামে একটি বিল উত্থাপন করেন।
বিল দুটি অধিকতর পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য সংশ্লিষ্ট সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে পাঠানো হয়।
