তিন বছরের মধ্যে ডেঙ্গুর সর্বোচ্চ সংক্রমণ

দুই সেরোটাইপের মিশ্রণে ঝুঁকি বেশি

নয়াবার্তা প্রতিবেদক : রাজধানীর ফার্মগেটে একটি বেসরকারি হাসপাতালের জরুরি বিভাগের সামনে গতকাল শুক্রবার সকালে নানা বয়সী ১০ জন মানুষ অপেক্ষা করছিলেন। তাঁদের একজন খালেদা আক্তার। সঙ্গে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত ২২ বছর বয়সী ছেলে ফাতেমি। দুটি সরকারি হাসপাতালে গিয়েও ছেলের জন্য শয্যা পাননি বলে জানান তিনি।

বেসরকারি এই হাসপাতালের পুরুষ রোগীদের জন্য নির্ধারিত ছয়টি শয্যার একটিও তখন খালি ছিল না। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তাঁদের অপেক্ষা করতে বলেছিল। একটি কেবিন খালি ছিল, দৈনিক ভাড়া আট হাজার টাকা। বেসরকারি স্কুলের শিক্ষক খালেদা আক্তারের পক্ষে এই ব্যয় বহন করা কঠিন। তবু শেষ পর্যন্ত কেবিন নেওয়ার কথাই ভাবছিলেন। খালেদা আক্তার বলেন, ‘শেষ পর্যন্ত কেবিনটাই নিতে হবে। ছেলের জীবন আগে। তিন দিনে অনেক টাকা গেছে। আরও হয়তো যাবে। উপায় নেই।’

দেশে প্রতিদিন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা এবং এতে মৃত্যু বাড়ছে। মে মাসে যত সংক্রমণ ছিল, জুনে তার তিন গুণ সংক্রমণ হয়েছে। আবার জুলাইয়ের সংক্রমণ জুন মাসের তুলনায় প্রায় তিন গুণ। এ সময় মৃত্যুও বেড়েছে তিন গুণের কাছাকাছি। গত আগস্ট মাসে তার আগের মাসের তুলনায় দ্বিগুণের বেশি সংক্রমণ হয়েছে, বেড়েছে মৃত্যুও।

এরই মধ্যে এবার ডেঙ্গু ভাইরাসের ডেন–৩ ধরনটি প্রধান হয়ে উঠেছে। তবে ডেন–২ উল্লেখযোগ্য মাত্রায় ছড়াচ্ছে। কোথাও ডেন–৩, আবার কোনো কোনো এলাকা ও গ্রামাঞ্চলে ডেন–২ বেশি পাওয়া যাচ্ছে। সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইইডিসিআর) এই পরিস্থিতিকে বলছে ‘মিশ্র চিত্র’। জনস্বাস্থ্যবিদ ডা. মুশতাক হোসেন মনে করেন, একই সময়ে দুই ধরনের সেরোটাইপের উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি এবারের দ্রুত সংক্রমণে ভূমিকা রাখতে পারে। তবে বিষয়টি নিশ্চিত হতে আরও বিস্তৃত গবেষণা প্রয়োজন।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাবে গতকাল শুক্রবার পর্যন্ত (১ জানুয়ারি থেকে ৪ সেপ্টেম্বর) ৪০ হাজারের বেশি রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। একই সময়ে গত তিন বছরের মধ্যে এটি সর্বোচ্চ।

জনস্বাস্থ্যবিদ ও কীটতত্ত্ববিদেরা বলছেন, চলতি মাসে ডেঙ্গু অনিয়ন্ত্রিত হয়ে উঠতে পারে। বছর শেষে আবারও ২০২৩ সালের মতো পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।

হাসপাতালে রোগী বাড়লেও রাজধানীতে শয্যা পাওয়ার জন্য ঘুরতে হচ্ছে অনেককে। এ চিত্র শুধু ঢাকার নয়, দেশের অন্যান্য স্থানেরও। ঢাকার বাইরে এবার রোগীর সংখ্যা অনেক বেশি। সেখানে আবার মশানিয়ন্ত্রণ ও ডেঙ্গু রোগের চিকিৎসাও অপর্যাপ্ত।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগনিয়ন্ত্রণ শাখার পরিচালক অধ্যাপক হালিমুর রশিদ বলেন, ‘সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ করার দায়িত্ব আমাদের না। চিকিৎসার বিষয়ে বলতে পারি, সরকারি হাসপাতালে সব সময়ই রোগীর চেয়ে শয্যা কম থাকে। এটা নতুন কিছু নয়, চিকিৎসায় কোনো ত্রুটি হচ্ছে না।’

তিন মাসে দ্রুত বেড়েছে রোগী
দেশে ২০০০ সাল থেকে নতুন করে ডেঙ্গুর বড় প্রাদুর্ভাব দেখা দিতে শুরু করে। ২০১৯ সালে সংক্রমণ প্রথমবার এক লাখ ছাড়ায়। তবে অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে যায় ২০২৩ সালে। ওই বছর ৩ লাখ ২১ হাজার ১৭৯ জন ডেঙ্গু নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়; মৃত্যু হয় ১ হাজার ৭০৫ জনের।

বড় প্রাদুর্ভাবের পর জনগোষ্ঠীর একটি অংশে সংশ্লিষ্ট সেরোটাইপের বিরুদ্ধে প্রতিরোধক্ষমতা তৈরি হওয়ায় সাধারণত পরপরই একই মাত্রার আরেকটি ঢেউ দেখা যায় না। ২০২৩ সালের পর ২০২৪ ও ২০২৫ সালে সংক্রমণ ও মৃত্যু ওই রেকর্ড ছাড়ায়নি। চলতি বছরের প্রথম কয়েক মাসেও রোগীর সংখ্যা তুলনামূলক কম ছিল; কিন্তু জুলাই থেকে পরিস্থিতি দ্রুত বদলেছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, জুনে ডেঙ্গু নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন ২ হাজার ৯০৭ জন। জুলাইয়ে তা তিন গুণের বেশি বেড়ে হয় ৯ হাজার ২০৬। আগস্টে ভর্তি হন ২০ হাজার ৫৩৬ জন, যা জুনের তিন গুণের বেশি এবং জুলাইয়ের দ্বিগুণের বেশি। সেপ্টেম্বরের প্রথম চার দিনেও রোগী বাড়ার গতি কমেনি।

এ বছরে গতকাল শুক্রবার পর্যন্ত হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৪০ হাজার ৪৪ জন, মৃত্যু হয়েছে ১১১ জনের। গত বছরের একই সময়, অর্থাৎ ২০২৫ সালের ৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ভর্তি হয়েছিলেন ৩৩ হাজার ৩০৭ জন এবং মৃত্যু হয়েছিল ১৩০ জনের।

২০২৪ সালের ৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন ১৪ হাজার ৩২৫ জন, মৃত্যু হয়েছিল ৯৯ জনের।

সরকারি হিসাবটি মূলত হাসপাতালে ভর্তি রোগীর। মৃদু উপসর্গ নিয়ে বাড়িতে থাকা বা হাসপাতালে ভর্তি না হওয়া রোগীরা এই হিসাবে নেই।

দুই সেরোটাইপের মিশ্রণ ঝুঁকি বাড়িয়েছে
ডেঙ্গু ভাইরাসের চারটি সেরোটাইপ—ডেন–১, ডেন–২, ডেন–৩ ও ডেন–৪। একটি সেরোটাইপে আক্রান্ত হওয়ার পর ওই সেরোটাইপের বিরুদ্ধে দীর্ঘমেয়াদি রোগ প্রতিরোধক্ষমতা তৈরি হতে পারে। কিন্তু অন্য সেরোটাইপের বিরুদ্ধে সুরক্ষা সাময়িক। পরে ভিন্ন সেরোটাইপে আক্রান্ত হলে গুরুতর ডেঙ্গুর ঝুঁকি বাড়তে পারে বলে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানিয়েছে। তবে কোনো একটি সেরোটাইপকে বেশি বিপজ্জনক বলা যায় না। রোগের তীব্রতা রোগীর আগের সংক্রমণ, রোগ প্রতিরোধক্ষমতা, বয়স, অন্যান্য অসুস্থতা এবং ভাইরাসের বৈশিষ্ট্যসহ একাধিক বিষয়ের ওপর নির্ভর করে।

আইইডিসিআরের পরিচালক ডা. কাজী আহমেদ জাকী বলেন, গত জুনে বান্দরবান, বরগুনা ও পটুয়াখালী—এই তিন জেলায় নমুনা জরিপ করা হয়েছিল। বরগুনা ও পটুয়াখালীর শহরাঞ্চলে ডেন–৩ প্রধানত পাওয়া গেছে; কিন্তু একই দুই জেলার গ্রামাঞ্চলে ডেন–২ ছিল প্রধান। আবার বান্দরবানে ডেন–২-তে আক্রান্ত রোগীই বেশি পাওয়া গেছে।

কাজী আহমেদ জাকী বলেন, সার্বিকভাবে এবার ডেন–৩ বেশি। তবে ডেন–২ উল্লেখযোগ্য পরিমাণে আছে। ফলে এবার একটি মিশ্র পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।

এটি তিন জেলার সীমিত নমুনা জরিপ। তাই এর ফল দিয়ে সারা দেশের প্রতিটি এলাকার সেরোটাইপ পরিস্থিতি নির্ধারণ করা যাবে না। তবে ফলটি দেখাচ্ছে—জাতীয়ভাবে একটি সেরোটাইপ প্রধান হলেও অঞ্চল এবং শহর ও গ্রামভেদে ভিন্ন সেরোটাইপের বিস্তার ঘটতে পারে। ডেঙ্গু মোকাবিলার পরিকল্পনায় এই স্থানীয় পার্থক্য বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।

২০২৩ সালের ভয়াবহ প্রাদুর্ভাবের সময় ডেন–২ প্রধান ছিল। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ওই বছরের সেপ্টেম্বরের পরিস্থিতি প্রতিবেদনে ৩২৫টি নমুনার ফল উল্লেখ করা হয়েছিল। এর মধ্যে ৬২ শতাংশে ডেন–২, ২৯ শতাংশে ডেন–৩ এবং ৯ শতাংশে ডেন–২ ও ডেন–৩—দুটিই পাওয়া যায়। পরের দুই বছরও দেশে ডেন–২ প্রধান ছিল। তবে গত বছর থেকেই ডেন–৩-এর উপস্থিতি বাড়ছিল। এবার সেটিই সার্বিকভাবে প্রধান হয়ে উঠেছে, যদিও ডেন–২ সরে যায়নি।

জনস্বাস্থ্যবিদ ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, দুই ধরনের সেরোটাইপের এই মিশ্রণ এবারের সংক্রমণ দ্রুত বাড়ার পেছনে ভূমিকা রাখতে পারে। তবে এটিকে এখনই নিশ্চিত কারণ বলা যাবে না; এ নিয়ে আরও গবেষণা দরকার।

এডিস মশার লার্ভার উপস্থিতি হিসাব করা হয় ব্রুটো ইনডেক্সের (বিআই) মাধ্যমে। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের সর্বশেষ মশা পর্যবেক্ষণে (২১ থেকে ২৫ আগস্ট) ফুলের টব, প্লাস্টিকের পাত্র, বেজমেন্ট, ড্রেন, পানির ট্যাংক, বোতলসহ এডিস মশার প্রজননস্থলে লার্ভার ঘনত্ব উদ্বেগজনক পর্যায়ে পাওয়া গেছে। উত্তর সিটির পাঁচটি ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় জরিপে সর্বনিম্ন বিআই পাওয়া গেছে ২০, সর্বোচ্চ ৪০ দশমিক ৩৩। তবে ঢাকার চেয়ে বাইরে এডিস মশার উপস্থিতি অনেক বেশি বলে জানান কীটতত্ত্ববিদ ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক কবিরুল বাশার। তিনি বলেন, আগস্ট মাসের জরিপে বান্দরবানের মতো জায়গাতেও বিআই পেয়েছি ৪০–এর বেশি।

জনস্বাস্থ্যের সাধারণ নিয়মে ডেঙ্গুর সংক্রমণ বাড়ার অর্থ হলো রোগবাহী মশা এবং মানুষ ও মশার সংস্পর্শ বেড়েছে। এ কারণে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণের মূল কাজ হলো এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস এবং নিয়মিত নজরদারি। শুধু রোগী শনাক্ত ও চিকিৎসার প্রস্তুতি দিয়ে সংক্রমণের উৎস নিয়ন্ত্রণ করা যায় না।

কবিরুল বাশার বলেন, এবার যে অবস্থা, তাতে এই সেপ্টেম্বর মাসেই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে—এমন আশঙ্কার কথা আমরা আগে থেকেই বলেছিলাম।

দেশে দুটি সেরোটাইপে বেশি আক্রান্ত হচ্ছেন মানুষ; কিন্তু জনস্বাস্থ্যবিদদের ধারণা, এর সঙ্গে তৃতীয় কোনো সেরোটাইপের যুক্ত হওয়ার আশঙ্কা আছে। এর কারণ হলো গত পাঁচ বছরে সেরোটাইপ–২ এবং ৩ পাল্টাপাল্টি চলে এসেছে। মাঝে কখনো সেরোটাইপ–৪– এ আক্রান্ত হওয়ার ঘটনাও পাওয়া গেছে। এই দুটিতে আক্রান্ত হওয়া মানুষের বাইরে গত পাঁচ বছরে নতুন অনেক শিশুর জন্ম হয়েছে। তারা যেকোনো টাইপে আক্রান্ত হতে পারে—এমন আশঙ্কা আছে বলে মনে করেন ডা. মুশতাক হোসেন। তিনি বলেন, বছরের শেষ দিকে সংক্রমণ আরও বাড়তে পারে এবং পরিস্থিতি জটিল হতে পারে যদি নতুন কোনো টাইপ যুক্ত হয়। বছরের শুরু থেকেই জনস্বাস্থ্যবিদেরা বড় সংক্রমণের আশঙ্কার কথা বলে আসছিলেন; কিন্তু সেই সতর্কতার ভিত্তিতে যথেষ্ট প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে—এমন নজির দেখিনি।

আইইডিসিআরের পরিচালক কাজী আহমেদ জাকীও গবেষণার ফল কাজে লাগানোর ঘাটতির কথা বলেন। তিনি বলেন, ‘গবেষণার কাজ আমরা করে দিয়েছি। মশার ধরন ও সেরোটাইপের কথাও জানিয়েছিলাম; কিন্তু সেসব মেনে কতটা কাজ হয়েছে জানি না।’

চলতি বছর ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ১০ হাজার ৪৮ জন। বাকি সবাই ঢাকার বাইরের। ডেঙ্গু একসময় শুধু ঢাকার রোগ ছিল; কিন্তু এখন এর বিস্তার ঘটেছে দেশের সর্বত্র। এবার বান্দরবানের রোয়াংছড়ির মতো প্রত্যন্ত এলাকায় ডেঙ্গুর জীবাণুবাহী এডিসের বিস্তার ঘটেছে, এ তথ্য আইইডিসিআর সূত্রেই জানা গেছে।

ঢাকার বাইরের এত সংক্রমণ ভাবাচ্ছে জনস্বাস্থ্যবিদদের। কারণ, ভালো–মন্দ মিলিয়ে ঢাকায় মশানিয়ন্ত্রণ ও চিকিৎসা—দুইয়ের ক্ষেত্রেই একটি ব্যবস্থাপনা দাঁড় হয়েছে; কিন্তু ঢাকার বাইরে এর কোনোটিই নেই। এতে মারাত্মক কষ্টের মুখে পড়েছেন এসব এলাকার মানুষ।

খুলনার টুটপাড়ার বাসিন্দা এক শিক্ষক গত মঙ্গলবার ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হন। ওই দিনই তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পরামর্শ দেন চিকিৎসক। আক্রান্ত ব্যক্তির পরিবার নগরের সব সরকারি এবং বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিক খুঁজে একটি শয্যা পায়নি। গত বৃহস্পতিবার একটি বেসরকারি হাসপাতালে একটি শয্যা পায়।

সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গুতে সর্বোচ্চ সংক্রামিত হয়েছে চট্টগ্রামে ১০৯ জন। ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন বাদ দিয়ে চলতি বছর সবচেয়ে বেশি সংক্রামিত হয়েছেন খুলনা বিভাগে ৬ হাজার ৩২৪ জন। এই বিভাগে চলতি বছর এ পর্যন্ত দ্বিতীয় সর্বোচ্চ মৃত্যু হয়েছে ১৯ জনের।

Share