
বিশেষ প্রতিবেদক : নবম জাতীয় পে-স্কেলের গেজেট প্রকাশের আনুষ্ঠানিকতা শেষ পর্যায়ে রয়েছে। তবে এবারের পে-স্কেলের গেজেটে থাকছে গুরুত্বপূর্ণ চমক।
একটি মাত্র প্রজ্ঞাপনে না দিয়ে নবম পে-স্কেলের বিভিন্ন বিষয় সাতটি পৃথক এসআরও (স্ট্যাটুটরি রেগুলেটরি অর্ডার) আকারে প্রকাশ করা হতে পারে। এতে বিভিন্ন শ্রেণির কর্মকর্তা-কর্মচারীর বেতন কাঠামো, বেতন নির্ধারণ (ফিক্সেশন) এবং সংশ্লিষ্ট আর্থিক সুবিধা ও ভাতার বিষয়গুলো পৃথকভাবে নির্ধারণ করা হবে।
এজন্য নবম জাতীয় পে-স্কেলের গেজেট প্রকাশের প্রক্রিয়ায় আরও সময় লাগবে বলে মনে করছেন অর্থ মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, পে-স্কেল মূল সিদ্ধান্তের পর্যায়ে আটকে নেই। বরং অনুমোদনের পরের আনুষ্ঠানিক ও আইনি প্রক্রিয়াতেই সময় লাগছে। প্রক্রিয়া শেষে আইন মন্ত্রণালয়ের ভেটিং শেষে পাঠানো হবে বিজি প্রেসে।
এর পরই এসআরও জারি করে গেজেট প্রকাশের কথা রয়েছে। এ ছাড়া বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তাদের কিছু ভাতা নিয়ে প্রত্যাশা ও অর্থ বিভাগের অবস্থানের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। ফলে বিষয়টি চূড়ান্তভাবে নিষ্পত্তি না করে গেজেট প্রকাশ নিয়ে সতর্ক অবস্থানে রয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
অর্থাৎ মন্ত্রিসভা সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরও আরও কয়েকটি ধাপ পার হতে হচ্ছে। আর এই ধাপগুলো শেষ না হওয়ায় এখনো সরকারি কর্মচারীদের হাতে আসেনি নতুন বেতন কাঠামোর চূড়ান্ত সরকারি প্রজ্ঞাপন।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের পে-স্কেল নিয়ে কাজ করেন এমন এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, মন্ত্রিসভার অনুমোদনের পর পে-স্কেলের গেজেট ও সংশ্লিষ্ট প্রজ্ঞাপন তৈরির কাজ শুরু হয়ে গেছে। আমরা দিন-রাত পরিশ্রম করে যাচ্ছি যাতে দ্রুত প্রজ্ঞাপন দেওয়া যায়। তবে এটা দীর্ঘ প্রক্রিয়ার বিষয়। আমরা বিভিন্ন আইন যাচাই-বাছাই করে পেপার আইন মন্ত্রণালয়ের ভেটিংয়ের জন্য পাঠালে, সেখানে ভেটিং শেষে, কোনো সংশোধন থাকলে সেটা সংশোধন করে তা বাংলাদেশ সরকারি মুদ্রণালয়ে (বিজি প্রেস) পাঠানো হবে। যেহেতু এবার সাতটি পৃথক এসআরও জারি করা হবে, এজন্য সময়ও বেশি লাগবে।
তিনি বলেন, সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছিল, নতুন পে-স্কেল ১ জুলাই ২০২৬ থেকে কার্যকর হবে। ফলে গেজেট প্রকাশের পর বেতন পুনর্নির্ধারণ ও বকেয়া পাওনা সমন্বয়ের প্রক্রিয়াও এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে। তাই এটা নিয়ে প্যানিক হওয়ার কোনো কারণ নেই। যথাসময়েই প্রজ্ঞাপন হয়ে যাবে।
এর আগে গত ৩১ আগস্ট মন্ত্রিসভার বৈঠকে নবম জাতীয় পে-স্কেল অনুমোদন দেওয়া হয়। নতুন পে-স্কেল ১ জুলাই ২০২৬ থেকে কার্যকর ধরা হয়েছে। এতে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মূল বেতন উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ানোর পাশাপাশি বিভিন্ন ভাতা ও সুযোগ-সুবিধায় পরিবর্তন আনা হয়েছে।
নতুন কাঠামোয় প্রথম থেকে ১১তম গ্রেড পর্যন্ত মূল বেতন দ্বিগুণ এবং ২০তম গ্রেডে মূল বেতন সর্বোচ্চ ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। একইসঙ্গে প্রতিবন্ধী সন্তানের জন্য মাসিক ৩ হাজার টাকা ভাতা এবং সব গ্রেডের সরকারি কর্মচারীদের জন্য মোবাইল ভাতার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।
সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়ন করা হবে তিন ধাপে। জুলাই ২০২৬ থেকে জুলাই ২০২৭ পর্যন্ত। ফলে গেজেট প্রকাশের পর সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়ন নিয়ে যে অনিশ্চয়তা ছিল, তার অবসান হবে বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করছেন।
তারা বলছেন, বর্তমানে পে-স্কেলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হলো আইন মন্ত্রণালয়ের ভেটিং শেষ হওয়া। এরপর প্রয়োজনীয় এসআরও নম্বর দিয়ে বাংলাদেশ গেজেটে প্রজ্ঞাপন প্রকাশ করা হবে। অর্থাৎ দীর্ঘ আলোচনা, পর্যালোচনা ও মন্ত্রিসভার অনুমোদনের পর এখন পে-স্কেলের বাস্তবায়ন কার্যত নির্ভর করছে শেষ দিকের এই প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার ওপর।
সাত শ্রেণির জন্য পৃথক ব্যবস্থা
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, নবম পে-স্কেলের আওতায় সাতটি পৃথক শ্রেণি বা খাতের জন্য আলাদা এসআরও থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। সাতটি পৃথক এসআরও প্রকাশের বিষয়টি বাস্তবায়িত হলে নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের বিভিন্ন খাত ও শ্রেণির জন্য আলাদা নির্দেশনাও স্পষ্ট হয়ে যাবে।
এগুলো হলো-
বেসামরিক প্রশাসন: সাধারণ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা এই কাঠামোর আওতায় থাকবেন।
পুলিশ বিভাগ: পুলিশ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন ও সংশ্লিষ্ট আর্থিক সুবিধার জন্য পৃথক এসআরও থাকতে পারে।
বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি): বিজিবির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন ও আর্থিক সুবিধার বিষয়ে আলাদা বিধান থাকবে।
ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান: সরকারি ব্যাংক ও সংশ্লিষ্ট আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য পৃথক কাঠামো নির্ধারণ করা হতে পারে।
স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান: বিভিন্ন স্বায়ত্তশাসিত ও রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য আলাদা এসআরও থাকবে।
সশস্ত্র বাহিনী: সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনীর জন্য সংশ্লিষ্ট নির্দেশনা অনুযায়ী পৃথক বেতন কাঠামো থাকবে।
বিচার বিভাগ: বাংলাদেশ জুডিসিয়াল সার্ভিসের কর্মকর্তা ও বিচারকদের জন্য পৃথক বেতন কাঠামো নির্ধারণ করা হবে।
নতুন পে-স্কেল কার্যকর হলে সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন-ভাতা বৃদ্ধির পাশাপাশি অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পেনশনেও এর প্রভাব পড়বে। সরকারের হিসাবে প্রায় ২১ লাখ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী ও পেনশনভোগী নতুন বেতন কাঠামোর আওতায় আসবেন।
এদিকে সরকারি চাকরিজীবী ও পেনশনভোগীর জন্য তাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ খবর হলো কবে আসছে সেই গেজেট। কারণ মন্ত্রিসভার অনুমোদন পে-স্কেলের সিদ্ধান্তকে চূড়ান্ত করেছে। কিন্তু গেজেট প্রকাশই সেই সিদ্ধান্তকে বাস্তব বেতন কাঠামোয় রূপ দেওয়ার শেষ দরজা।
তাদের প্রত্যাশা, দ্রুত ভেটিং শেষ করে গেজেট প্রকাশ করা হবে। কারণ গেজেট প্রকাশ হলেই নতুন বেতন কাঠামোর বাস্তব প্রয়োগ, বেতন ফিক্সেশন এবং বকেয়া পাওনার হিসাবসহ পরবর্তী কাজগুলো শুরু করা সম্ভব হবে।
