চাঁপাইনবাবগঞ্জে পানিবন্দি ৫ ইউনিয়নের মানুষ, বন্ধ ২৮ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান

চাঁপাইনবাবগঞ্জ প্রতিনিধি : চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর ও শিবগঞ্জ উপজেলার পাঁচ ইউনিয়নের প্রায় পাঁচ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। পদ্মা, মহানন্দা ও পুনর্ভবা নদীর পানি ধীরগতিতে কমতে শুরু করলেও প্রায় ২০ দিন ধরে জলবন্দি থাকায় এসব এলাকার মানুষের দুর্ভোগ বেড়েছে।

এরই মধ্যে বন্যার পানিতে ২০৬ দশমিক ৪ হেক্টর জমির ফসল তলিয়ে গেছে এবং ২৮টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পানি ঢুকে পড়ায় পাঠদান বন্ধ রয়েছে। চাঁপাইনবাবগঞ্জে পদ্মা নদীর পানি গত পাঁচদিন ধরে কমছে।

অন্যদিকে মহানন্দা ও পুনর্ভবা নদীর পানিও মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) থেকে কমতে শুরু করেছে। তবে সদর উপজেলার নারায়ণপুর ও আলাতুলি এবং শিবগঞ্জ উপজেলার পাঁকা, উজিরপুর ও দুর্লভপুর ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চলের বেশ কিছু এলাকা প্লাবিত হওয়ায় পানিবন্দি মানুষের দুর্ভোগ বেড়েছে। অনেকেই ঘরবাড়ি ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ে চলে গেছেন। প্রশাসনের পক্ষ থেকে ত্রাণ কার্যক্রম শুরু হলেও পানিবন্দি মানুষের ভাষ্য, দুর্ভোগের তুলনায় এ সহায়তা অপ্রতুল।

পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) জানায়, গত ২৪ ঘণ্টায় পদ্মা নদীর পানি ৬ সেন্টিমিটার কমেছে। মঙ্গলবার সকাল ৯টায় পদ্মার পাঁকা ইউনিয়নের পাঙ্খা পয়েন্টে পানি বিপৎসীমার ৪৬ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল।

অন্যদিকে মহানন্দা নদীর পানি ১ সেন্টিমিটার কমে বিপৎসীমার ১ দশমিক ৫ মিটার এবং পুনর্ভবা নদীর পানি ৪ সেন্টিমিটার কমে বিপৎসীমার ২ দশমিক ৩ মিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ পাউবো নির্বাহী প্রকৌশলী এসএম আহসান হাবীব জানান, বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, পদ্মায় পানি কমার সঙ্গে সঙ্গে জেলার অপর প্রধান দুটি নদীর পানিও মঙ্গলবার থেকে কমতে শুরু করবে।

তিনি আরও বলেন, নতুন করে আর কোনো এলাকা প্লাবিত না হলেও জলবন্দি মানুষের আরও কিছুদিন দুর্ভোগে থাকতে হতে পারে।

এদিকে সরেজমিন দেখা যায়, পানি বাড়ায় সদর ও শিবগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন নিম্নাঞ্চলের ঘরবাড়িতে পানি ঢুকে পড়েছে। কোথাও ঘরের আঙিনা, কোথাও বসতবাড়ির আশপাশে পানি জমেছে। এতে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে। গবাদিপশু, ঘরের আসবাব ও প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে গিয়ে বিপাকে পড়েছেন অনেকে।

শিবগঞ্জ উপজেলার পাঁকা ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান আব্দুল মালেক জানান, পাঁকা ইউনিয়নের প্রায় দুই হাজার পরিবার সরাসরি পানিবন্দি রয়েছে। এর মধ্যে ৬০০ পরিবারের উঠানে পানি ঢুকে পড়েছে এবং সব মিলিয়ে ইউনিয়নে প্রায় তিন হাজার মানুষ বর্তমানে পানিবন্দি অবস্থায় আছেন। বন্যার কারণে চারটি প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয় বন্ধ রয়েছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় গত দুদিনে ১০ কেজি করে ৪৬৬টি পরিবারের মধ্যে চাল বিতরণ করা হয়েছে এবং এই ত্রাণ বিতরণ কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।

এছাড়া বন্যার পানি নেমে গেলে বিভিন্ন রোগবালাই দেখা দিতে পারে আশঙ্কায় তিনি প্রশাসনের কাছে দ্রুত মেডিকেল টিম প্রস্তুত রাখার দাবি জানিয়েছেন।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার নারায়ণপুর ইউপির চেয়ারম্যান মো. নাজির হোসেন জানান, বর্তমানে পানিবন্দি অবস্থায় আছেন ৭০০ থেকে ৮০০ মানুষ। পানিবন্দি পরিবারের মধ্যে চাল বিতরণ চলছে।

এছাড়া আলাতুলি ইউপি চেয়ারম্যান জয়নাল আবেদীনও পানিবন্দি মানুষের মধ্যে ত্রাণ বিতরণের কথা জানিয়েছেন। তার ইউনিয়নের ৫০০ পরিবার পানিবন্দি অবস্থায় আছেন। নদীভাঙনের আশঙ্কা আবারও রয়েছে এবং বর্তমানে তার এলাকায় তিনটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে। এ ছাড়াও দুর্লভপুর ও উজিরপুর ইউনিয়নের পাঁচ শতাধিক পরিবার পানিবন্দি রয়েছে।

এদিকে জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, জেলার বিভিন্ন এলাকায় প্রায় ২০৬ দশমিক ৪ হেক্টর জমির আমন-আউশ ধান, গ্রীষ্মকালীন পেঁয়াজ ও শাকসবজি পানিতে তলিয়ে গেছে। এর মধ্যে রোপা আমন, আউশ ও পেঁয়াজ বীজতলাসহ প্রায় ১৩০ দশমিক ৪০ হেক্টর জমির ফসল পানির নিচে তলিয়ে গেছে।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদরে ১২৪ দশমিক ৬ হেক্টর, শিবগঞ্জে ৭৬ দশমিক ৮ হেক্টর ও গোমস্তাপুরে ৫ হেক্টর জমির ফসল আক্রান্ত হয়েছে।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক কৃষিবিদ আতিকুল ইসলাম বলেন, চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর, শিবগঞ্জ ও গোমস্তাপুরে ২০৬ দশমিক ৪ হেক্টর ফসল আক্রান্ত হয়েছে। এর মধ্যে আউশ ধান ১১৩ হেক্টর, আমন ৫ হেক্টর, মাসকলাই ১০ দশমিক ৬ হেক্টর, শাকসবজি ৪০ হেক্টর, গ্রীষ্মকালীন পেঁয়াজের বীজতলা দশমিক ৩ দশমিক ৪ হেক্টর, মরিচ ৩ হেক্টর, হলুদ ৪ হেক্টর, পেঁপে ২ হেক্টর ও কলা ২৮ হেক্টর জমির ফসল আক্রান্ত হয়েছে।

পদ্মার পানি বৃদ্ধির কারণে প্রায় ২০ দিন ধরে চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর ও শিবগঞ্জ উপজেলার পাঁচ ইউনিয়নের নারায়ণপুর, আলাতুলি, দুর্লভপুর, উজিরপুর ও পাঁকা এলাকার প্রায় পাঁচ হাজার পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। প্লাবিত এলাকাগুলোতে সুপেয় পানির তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে এবং চর্মরোগ ও ডায়রিয়াসহ পানিবাহিত রোগের প্রকোপ বাড়ছে। বন্যার কারণে সদর ও শিবগঞ্জ উপজেলার ২৯টি প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শ্রেণিকক্ষে পাঠদান বন্ধ রাখা হয়েছে। তবে কিছু এলাকায় উঁচু স্থানে বিকল্প পাঠদানের ব্যবস্থা করা হয়েছে।

সদর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) বন্যাকবলিত এলাকা পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের জানান, সদরের ছয়টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, একটি উচ্চ বিদ্যালয় ও একটি মাদ্রাসা বন্ধ রয়েছে। জায়গা স্বল্পতার কারণে মানুষের দুর্ভোগের চেয়ে পশুপাখি রাখার জায়গায় বেশি সংকট দেখা দিয়েছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় স্থানীয় উপজেলা প্রশাসন ও জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ থেকে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর মধ্যে চাল, ত্রাণসামগ্রী, পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট ও জরুরি ওষুধ বিতরণ কার্যক্রম শুরু করা হয়েছে।

তবে জেলা প্রশাসক (ডিসি) আবু ছালেহ মো. মুসা জঙ্গী জানান, সদর ও শিবগঞ্জ উপজেলাসহ মোট পাঁচটি ইউনিয়নের দুই হাজার ৯০০ পরিবার পানিবন্দি রয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জন্য মোট ২৯ টন চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে এবং তা বিতরণ শুরু হয়েছে। বন্যা পরিস্থিতির বিষয়টি সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে বলেও জানান জেলা প্রশাসক।

Share