
গাজী আবু বকর: ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উড়োজাহাজে করে দেশত্যাগের একটি ভিডিও মুহূর্তেই সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে। এর পর বিভিন্ন মাধ্যমে খবর রটে যে, পুরাতন বিমানবন্দর তথা বাশার ঘাটির রাস্তার ওপর পাড়ের বিমানবাহিনীর অফিসার্স মেস থেকে ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট রিফাত ভিডিওটি ধারণ করেছিল।আর ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কে এম তাহসিফ সাউরি সেই ভিডিও গণমাধ্যমে ছড়িয়ে দিয়েছিলেন; মূলত তিনি ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’ এর এজন্ট। আর এই অভিযোগে তাঁকে চাকুরি ছাড়তে হয়। আটকে রাখা হয় তাঁর পাসপোর্ট। অবশেষে সেই আলোচিত ফ্লাইট লেফটেন্যান্টের মরদেহ উদ্ধার হয়েছে রাজধানীর তুরাগ নদ থেকে। গত ২৭ অক্টোবর মঙ্গলবার রাত থেকে নিখোঁজ থাকার পর বুধবার বিকেলে রাজাবাড়ী ঘাট সংলগ্ন তুরাগ নদ থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করে নৌ পুলিশ। তবে তার মৃত্যুর সঠিক কারণ এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। আর মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় তদন্তের আগে কোনো মন্তব্য করতে চান না স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেছেন, প্রাথমিক তদন্ত ও মরদেহের ময়নাতদন্তের পর বিস্তারিত জেনে এ বিষয়ে কথা বলবেন। অন্যদিকে তাহসিফের বাবা বলেছেন, এটা সুইসাইড নয়, সরকার তদন্ত করলে অপরাধীদের খুঁজে বের করতে পারবে। সুরতহাল রিপোর্ট বলছে, ‘তাহসিফের শরীরে কোনো আঘাতের চিহ্ন নেই। তাঁর নাকে রক্ত ছিল।’ গত বুধবার বিকেলে তুরাগ নদী থেকে তাঁর মরদেহ উদ্ধারের পর টঙ্গী নৌ-পুলিশ ফাঁড়ির উপপরিদর্শক (এসআই) মোস্তাফিজুর রহমান সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করেন।
প্রতিবেদনে বলা হয়, বুধবার সন্ধ্যা পৌনে ৬টার দিকে টঙ্গীর রাজাবাড়ি খেয়াঘাটের পাশ থেকে তুরাগ নদী থেকে তাহসিফের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এ ধরনের ঘটনায় পুলিশ ঘটনাস্থলে বা মরদেহ যেখানে পাওয়া যায় সেখানে শরীরের বাহ্যিক অবস্থা পরীক্ষা করে সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করে। সুরতহাল প্রতিবেদনে তাহসিফের শারীরিক বর্ণনাও দেওয়া হয়েছে। এতে বলা হয়, তিনি আনুমানিক ৫ ফুট ৭ ইঞ্চি লম্বা, কালো চুল এবং ছোট কালো দাড়ি-গোঁফ ছিল তার। মরদেহ উদ্ধারের সময় তার চোখ ও মুখ বন্ধ ছিল এবং নাক দিয়ে রক্ত বের হতে দেখা গেছে। দুটি হাতই কপালের দিকে বাঁকানো ছিল এবং দুই হাতের মুষ্টি খোলা ছিল। তবে তার পেট ফোলা ছিল বলেও এতে উল্লেখ করা হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, তার বুক, পেট, পিঠ, দুই পা এবং অন্যান্য অঙ্গ স্বাভাবিক দেখা গেছে। শরীরে বাহ্যিক কোনো আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়নি। উদ্ধারের সময় তিনি একটি কালো হাতাওয়ালা কাবলি শার্ট ও সাদা ট্রাউজার পরা ছিলেন।
মরদেহ উদ্ধারের বিষয়ে নৌ পুলিশের অভ্যন্তরীণ প্রতিবেদনে বলা হয়, বুধবার বিকেল সাড়ে চারটার দিকে জাতীয় জরুরি সেবা নম্বর ৯৯৯-এর মাধ্যমে খবর পাওয়া যায় যে রাজধানীর উত্তরখান থানা এলাকার রাজাবাড়ী ঘাট-সংলগ্ন তুরাগ নদে একটি মরদেহ ভাসছে। এ খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে যান নৌ পুলিশের সদস্যরা। তাঁরা অজ্ঞাতনামা এক ব্যক্তির (পুরুষ) মরদেহ উদ্ধার করেন।
অভ্যন্তরীণ প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, তাঁরা মরদেহের সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করেন। যাঁর মরদেহ উদ্ধার করা হয়, তাঁর পরনে ছিল সাদা পাজামা ও কালো জামা। হাতে ঘড়ি। তাঁর পকেটে একটি আইফোন পাওয়া যায়। এই আইফোনের মাধ্যমে তাঁর পরিচয় শনাক্ত করা হয়। তাহসিফ অবসরপ্রাপ্ত ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট ছিলেন।
ঘটনার বিষয়ে নৌ পুলিশের ঢাকা অঞ্চলের টঙ্গী ফাঁড়ির পরিদর্শক ফিরোজ উদ্দিন বলেন, সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করে ময়নাতদন্তের জন্য মরদেহটি রাজধানীর শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজের মর্গে পাঠানো হয়। তাঁর শরীরে আঘাতের কোনো চিহ্ন পাওয়া যায়নি। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়ার পর মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত করে বলা যাবে।
যোগাযোগ করা হলে টঙ্গী নৌ-পুলিশ ফাঁড়ির পরিদর্শক ফিরোজ উদ্দিন বলেন, ‘পুলিশ খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে গিয়ে আনুমানিক ২৮ বছর বয়সী একজনের মরদেহ উদ্ধার করে। পরে সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করা হয়।’ ‘মরদেহের সঙ্গে থাকা আইফোনের মাধ্যমে তার পরিচয় শনাক্ত করা হয়েছে। তার নাম তাহসিফ সাউরি। তিনি বিমানবাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা বলে জানা গেছে। তার বাবার নাম কে এম এনায়েত এবং ঠিকানা উত্তরা।
বিমানবাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা কে এম তাহসিফ সাউরির মরদেহ নিতে এসে তাঁর বাবা কে এম এনায়েতুল করিম বলেছেন, তাঁর ছেলের মৃত্যুর ঘটনা আত্মহত্যা (সুইসাইড) নয়। সরকার তদন্ত করলে এর সঙ্গে জড়িত প্রকৃত অপরাধীদের বের করতে পারবে।
আজ বৃহস্পতিবার দুপুরে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ মর্গে তাহসিফ সাউরির লাশ গ্রহণ করার সময় সাংবাদিকদের এ কথা বলেন তিনি। শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ মর্গে ময়নাতদন্ত শেষে বেলা ২টা ২০ মিনিটে লাশ গ্রহণ করেন কে এম এনায়েতুল করিম। পরে মরদেহ ফ্রিজিং ভ্যানে উত্তরার বাসায় নেওয়া হয়। মর্গে এনায়েতুল করিম সাংবাদিকদের বলেন, ‘ঘটনার আগের দিন তাহসিফ তার মায়ের সঙ্গে ছিল। শপিং করেছে, হ্যাপি মুডে ছিল। সে তো অ্যাসেট। দেশের পাইলট। ওর দ্বীপ নামের একটা বন্ধু এসেছিল। মাকে বলেছিল নিচ থেকে কথা বলে আসছি। এরপরে আর ফেরে নাই।’ এনায়েতুল করিম আরও বলেন, ‘রাত ১টা ৩৫ মিনিটে তাহসিফ তাঁর মাকে ভয়েস মেসেজ দিয়েছিল, আমি আসতেছি। এরপর আর আসেনি। দ্বীপের কাছে তাহসিফের ব্যাপারে জানতে চাইলে সে বলে, আমি জানি না। তবে দ্বীপ বলেছিল, ঘটনার আগের দিন রাত ১২টা পর্যন্ত তাহসিফ আমাদের বাসার কম্পাউন্ডে ছিল।’ গতকাল দুপুরে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ মর্গে তাহসিফের লাশের ময়নাতদন্ত করেন কলেজের সহকারী অধ্যাপক নাসাত জাবিন। তিনি বলেন, তাহসিফের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের কিছু নমুনা পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে। সেখান থেকে প্রতিবেদন পাওয়ার পর মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত করে বলা যাবে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর প্রতিক্রিয়া: ঢাকার তুরাগ নদ থেকে বিমানবাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা কে এম তাহসিফ সাউরির (২৮) মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় তদন্তের আগে কোনো মন্তব্য করতে চান না স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেছেন, প্রাথমিক তদন্ত ও মরদেহের ময়নাতদন্তের পর বিস্তারিত জেনে এ বিষয়ে কথা বলবেন। গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে রাজশাহীর চারঘাট উপজেলার সারদায় বাংলাদেশ পুলিশ একাডেমিতে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এ কথা বলেন।
উল্লেখ্য, মরদেহ উদ্ধার হওয়া বিমানবাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কে এম তাহসিফ সাউরি মৃত্যুর প্রায় দুই মাস আগে এক পডকাস্টে বলেছিলেন, শেখ হাসিনার দেশত্যাগের ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগেই তাকে বিমান বাহিনী থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়ে থাকতে পারে। তবে ভিডিওটি ধারণ করার অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি প্রশ্ন তুলেছিলেন, তার বিরুদ্ধে অভিযোগের প্রমাণ কী। একই সঙ্গে ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’ এর সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগও তিনি নাকচ করেছেন।
গত ২১ জুলাই ‘স্পিক উইথ রশীদ’ ইউটিউব চ্যানেলে প্রকাশিত এক দীর্ঘ সাক্ষাৎকারে তাহসিফ তার চাকরিচ্যুতি, বিমান বাহিনীর অভ্যন্তরীণ অভিজ্ঞতা এবং গণমাধ্যমে তাকে নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদন নিয়ে খোলামেলা কথা বলেন। সেই ভিডিওটি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নতুন করে আলোচনায় উঠে এসেছে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার দেশত্যাগের সময়কার বহুল আলোচিত ভিডিও ধারণের সঙ্গে সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কে এম তাহসিফ সাউরির নাম জড়িয়ে পড়েছিল। এরপর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাকে নিয়ে শুরু হয় নানা আলোচনা ও বিতর্ক। পরবর্তীতে বিমান বাহিনী থেকে তার অবসর নেওয়ার বিষয়টিও সামনে আসে। এবার রাজধানীর উত্তরখানে তুরাগ নদ থেকে তার মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় নতুন করে আলোচনায় এসেছেন তিনি। ১৯৯৮ সালে জন্ম নেওয়া কে এম তাহসিফ সাউরির বয়স হয়েছিল ২৮ বছর। তার বাবার নাম কে এম এনায়েতুল করিম হেলাল। পরিবার নিয়ে রাজধানীর উত্তরার ১৮ নম্বর সেক্টরে বসবাস করতেন তিনি।
