বাংলাদেশ-শ্রীলঙ্কা দ্বিতীয় টেস্ট ধ্বংসস্তূপ ঠেলে বিশ্বরেকর্ডের জুটি

নয়াবার্তা প্রতিবেদক : সকালে ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়া স্বাগতিকদের বিকেল ঝলমলে রঙিন। ৪২ মিনিটের বিভীষিকায় পড়া বাংলাদেশের ড্রেসিংরুম এখন প্রাণোচ্ছল। ২৪ রানে ৫ উইকেট হারানোর শোক মুছে গেছে জোড়া সেঞ্চুরিতে। মুশফিকুর রহিম আর লিটন কুমার দাস বিশ্বরেকর্ড জুটি গড়ায় রোমাঞ্চকর হয়ে ওঠে ঢাকা টেস্টের প্রথম দিন। ৫ উইকেটে ২৭৭ রান নিয়ে স্বস্তিতে বাংলাদেশ।

খেলা শুরু হওয়ার পর শেরেবাংলা স্টেডিয়ামকে মনে হচ্ছিল অস্ট্রেলিয়ার গ্যাবা। উইকেট পতনের মিছিল লেগে গিয়েছিল লঙ্কান দুই পেসারের আঘাতে। পাঁচ উইকেট পড়ে যাওয়ার পর বাংলাদেশ প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারবে- সে বিশ্বাস করার মতো লোক খুঁজে পাওয়া ছিল কঠিন।

মুশফিকুর রহিম ও লিটন কুমার দাস সেখান থেকেই ঘুড়ে দাঁড়ান অবিশ্বাস্যভাবে। সেঞ্চুরিও লেখা হয় দু’জনের নামের পাশে। লিটন ১৩৫, মুশফিক ১১৫ রানে অপরাজিত। এই জুটির দৃঢ়তা দেখে মনে হবে, মুশফিক-লিটনকে আউট করার মতো বোলার শ্রীলঙ্কার এই দলে নেই। প্রথম দিন শেষে অন্তত তাই মনে হচ্ছে। কারণ ষষ্ঠ উইকেটে তাঁরা অবিচ্ছিন্ন ২৫৩ রান করেছেন; যা ক্রিকেট ইতিহাসে নতুন কীর্তি। দেড়শ বছরের টেস্ট ইতিহাসে কখনোই কোনো দেশ ২৫ বা তার নিচে ৫ উইকেট হারিয়ে ২০০ রানের জুটি দেখেনি। এদিন সেই অবিশ্বাস্য কা করে দেখালেন মুশফিক-লিটন।

শ্রীলঙ্কান কোচ সিলভারউড পরিসংখ্যান ঘেঁটে পরিকল্পনা সাজান। এই ইংলিশ কোচের এঁকে দেওয়া ছকেই বোলিং করেন দুই পেসার কাসুন রাজিথা ও আজিথা ফার্নান্দো। ওপেনিং ওভারেই আঘাত করেন রাজিথা। অফ সাইডে পিচ করে ব্যাট প্যাডের ফাঁক দিয়ে স্টাম্পে আঘাত করে বল। চট্টগ্রাম টেস্টের হাফ সেঞ্চুরিয়ান মাহমুদুল হাসান জয়ের রানের খাতা খোলা হলো না। প্রথম টেস্টের সেঞ্চুরিয়ান তামিম ইকবালও শূন্য রানে আত্মাহুতি দেন। নাজমুল হোসেন শান্তকে দেখে মনে হচ্ছিল, মুমিনুল হকের সঙ্গে জুটি গড়ে তুলবেন। বিধিবাম সেখানেও। তারা দু’জনও উইকেট উপহার দিলেন। যে সাকিব আল হাসানের ওপর সবচেয়ে বেশি ভরসা, তিনিও পারলেন না টিকে থাকতে। সাত (৬.৫) ওভারে বিপর্যন্ত ব্যাটিং লাইনআপ। ব্যাটারদের ফেরার মিছিল দেখে ক্লান্ত দর্শক। এক পর্যায়ে স্বাগতিক ড্রেসিংরুমে নেমে আসে মড়াবাড়ির শোক। টিভিতে তখন বার বার দেখাচ্ছিল বিমর্ষ কোচ রাসেল ডমিঙ্গোকে। পাশে বসা ফিল্ডিং কোচ ম্যাকডারমট অস্বস্তিও টের পাচ্ছিলেন না। উদাস দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিলেন ২২ গজের দিকে। মুশফিক-লিটন তখন সংগ্রাম করছেন জুটি গড়তে। মিডল অর্ডারের এ দুই ব্যাটসম্যান থিতু হওয়ার পরই কিছুটা স্বস্তি ফেরে।

বিপর্যয়ের ভেতরেও মুশফিককে বেশ ‘কুল’ দেখাচ্ছিল। প্রথম বল থেকে সাহস দেখান তিনি। ষষ্ঠ উইকেট জুটি মধ্যাহ্ন বিরতি পর্যন্ত টিকে যাওয়ায় এক চিলতে আলো দেখতে পায় টিম ম্যানেজমেন্ট। প্রথম সেশনে ৫ উইকেটে ৬৬ রানে ছিল বাংলাদেশ। দ্বিতীয় সেশনে আরও সাবলীল ছিল মুশফিক-লিটন জুটি। ৪৭ রানে লিটন জীবন পেয়ে হাত খোলেন। দু’জনই পাল্লা দিয়ে রান বাড়ান। বাউন্ডারি মেরে হাফ সেঞ্চুরি স্পর্শ করার পরই স্বরূপে আবির্ভূত হন লিটন। ১৪৯ বলে সেঞ্চুরির দেখা পান তিনি। ৯৬ রান থেকে সিঙ্গেল নিতে গেলে মিস ফিল্ডিংয়ে বল চলে যায় বাউন্ডারিতে। পাঁচ রান যোগ হয় লিটনের নামে। লিটনের তৃতীয় টেস্ট সেঞ্চুরি এটি। ছয় মাসের ব্যবধানে উইকেটরক্ষক এ ব্যাটারের তিন শতক তিনটি ভিন্ন দলের বিপক্ষে। ২০২১ সালের ২৬ নভেম্বর চট্টগ্রামে পাকিস্তানের বিপক্ষে করেন অভিষেক সেঞ্চুরি। জানুয়ারিতে ক্রাইস্টচার্চে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে খেলেন শতরানের অনিন্দ্য ইনিংস। গতকাল মিরপুরে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে করেন ক্যারিয়ারসেরা রান। কে বলতে পারে, ধৈর্য এবং একাগ্রতা দেখাল একশকে দুইশ রানে নিয়ে যেতে পারবে না লিটন।

সেঞ্চুরির দৌড়ে লিটনের পেছনেই ছিলেন মুশফিক। ২১৮ বলে তিনিও দেখা পান শতকের। রমেশ মেন্ডিসের বল আলতো করে পয়েন্টে ঠেলে দিয়ে ৯৯ রানকে তিন অঙ্কে নিয়ে যান মুশফিক। ৮২ টেস্টে নবম আর শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে তৃতীয়। দেশের পক্ষে প্রথম ডাবল সেঞ্চুরিটিও মুশফিকের শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে। সিংহলিদের বিপক্ষে মাঝে আরও কিছু টেস্ট খেললেও সেঞ্চুরি করা হয়নি। এবার দেশের মাটিতে দুই টেস্টে হাঁকান জোড়া সেঞ্চুরি। নিউজিল্যান্ড এবং ভারতের পর টানা দুই টেস্টে সেঞ্চুরি দ্বিতীয়বার। তবে জোড়া ইনিংসে সেঞ্চুরি করলেন এই প্রথম। চট্টগ্রামে ক্যারিয়ারের সবচেয়ে মন্থর সেঞ্চুরিয়ান মুশফিক ঢাকা টেস্টে ক্ল্যাসিক ব্যাটিং করেন। সাড়ে পাঁচ ঘণ্টা ক্রিজে থেকে একটিও ভুল শট খেলেননি তিনি। রিভার্স সুইপের মতো আত্মঘাতী শট খেলার বিলাসিতা দেখাননি। ২৫৩ রানের রেকর্ড জুটিকে আরও খানিকটা এগিয়ে নিতে আজ নতুনভাবে শুরু করবেন মুশফিক-লিটন। ষষ্ঠ উইকেটে বাংলাদেশের আগের সেরা জুটি ছিল আশরাফুল ও মুশফিকের ১৯১ রান ২০০৭ সালে কলম্বোতে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে খেলা। নতুন জুটিতেও থাকলেন মুশফিক।