এক্সপ্রেসওয়েতে ঢাকা-মাওয়া-ভাঙ্গা পাড়ি দিতেও দিতে হবে টোল

নয়াবার্তা প্রতিবেদক : পদ্মা সেতু চালু হবে আগামী মাসের শেষ সপ্তাহে। পদ্মা সেতুর জন্য এরই মধ্যে টোল হার নির্ধারণ করা হয়েছে। কিন্তু এ সেতু পাড়ি দিতে হলে টোল দিতে হবে ঢাকা-মাওয়া-ভাঙ্গা এক্সপ্রেসওয়েতেও। বর্তমানে এই এক্সপ্রেসওয়েতে টোল দিতে হয় না। মূলত এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণের খরচ তুলতে টোল বসাতে চায় সরকার। এ নিয়ে আজ মঙ্গলবার সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগে বৈঠক হওয়ার কথা। অবশ্য গতকাল দুপুরে সিদ্ধান্ত হয়, নতুন সচিব দায়িত্ব গ্রহণের পর বৈঠকের দিনক্ষণ নির্ধারণ করা হবে।

সাধারণত বড় বাসের টোল মাঝারি ট্রাকের ৯০ শতাংশ হয়। সেই হিসাবে এক্সপ্রেসওয়েতে বড় বাসের টোল কিলোমিটারে হয় ১৮ টাকা ১৬ পয়সা। তবে এ সংক্রান্ত কমিটি ৯ টাকা প্রস্তাব করেছিল। কিন্তু নীতিমালার চেয়ে কম টোল নির্ধারণ করলে আইনি প্রশ্ন উঠতে পারে। এ যুক্তিতে কমিটির প্রস্তাব থাকবে মাঝারি ট্রাকে যেন কিলোমিটারে ১৩-১৪ টাকা টোল নির্ধারণ করা হয়।

সেই হিসাবে ৫৫ কিলোমিটারের এক্সপ্রেসওয়ের পুরোটা পাড়ি দিলে ট্রেইলারের মতো একটি যানে দুই হাজার ৭৭৫ টাকা টোল দিতে হবে। পদ্মা সেতু পাড়ি দিতে গুনতে হবে ছয় হাজার টাকা। অর্থাৎ মোট টোল পড়বে আট হাজার ৭৭৫ টাকা। মাঝারি ট্রাকে কিলোমিটারের টোল ২০ টাকা ১৮ পয়সা। কিন্তু পদ্মা সেতুর উচ্চ টোল ও জনগণের ওপর চাপ কমাতে কিলোমিটারে ১০ টাকা প্রস্তাব করেছিল টোল নির্ধারণে গঠিত কমিটি। জনগণের আর্থিক সামর্থ্য বিবেচনায় টোল নীতিমালার হিসাবে যে হার নির্ধারিত হয়, তার অর্ধেক প্রস্তাব করা হয়েছিল গত বছর। অর্থ বিভাগ অনুমোদিত ওই টোল হার বাড়িয়ে পুনর্নির্ধারণ করে পদ্মা সেতু চালুর দিন থেকেই এক্সপ্রেসওয়েতে চলাচল করা গাড়ি থেকে আদায় করতে চায় সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়।

টোল আদায়ে মাঝারি ট্রাককে ভিত্তি হিসেবে ধরা হয়। এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণাধীন ঢাকা বাইপাসের সমজাতীয় প্রকল্প। বাইপাসে মাঝারি ট্রাকে কিলোমিটারে ১৬ টাকা ৫০ পয়সা টোল নির্ধারিত হয়েছে। তাই আপাতত ১৩-১৪ টাকা এবং দুই বছর পর বাইপাস চালু হলে এক্সপ্রেসওয়েতে সমান হারে টোল আদায়ের প্রস্তাব করা হবে। মাঝারি ট্রাকে কিলোমিটারে চার টাকা বাড়লে অন্যান্য যানবাহনে নীতিমালায় উল্লেখিত এই শতাংশের হিসাবে টোল বাড়বে।

এ বিষয়ে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী একেএম মনির হোসেন পাঠান আমাদের সময়কে বলেন, ঢাকা-মাওয়া-ভাঙ্গা এক্সপ্রেসওয়েটি দেশে প্রথম। অন্য দেশের এক্সপ্রেসওয়ের সঙ্গে তুলনা করে বাস্তবভিত্তিক বিবেচনায় টোল হারের একটি প্রস্তাব তৈরির কাজ করছে কমিটি। পদ্মা সেতু চালুর দিন থেকেই এক্সপ্রেসওয়েতে টোল কার্যকরের প্রস্তাব দেওয়া হবে। মন্ত্রণালয়ের বৈঠকে সেই প্রস্তাব তুলে ধরবে সওজ। এর পর তা পর্যালোচনা করে সিদ্ধান্ত নেবে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়।

ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব খোন্দকার এনায়েতউল্যাহ আমাদের সময়কে বলেন, টোলের হার নিয়ে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগে বৈঠক হবে। সেখানে টোলের বিষয়ে কী সিদ্ধান্ত হয়, তখন সে অনুযায়ী কথা হবে।

পদ্মা সেতু চালু হলে দেশের দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ১৯টি জেলা সরাসরি সারাদেশের সঙ্গে যুক্ত হবে। আগেই ঢাকা-ভাঙ্গা পথে এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণের ফলে এই পথে যাতায়াতের সময় কমে এক ঘণ্টায় নেমে আসবে। পদ্মা সেতুর টোলের সঙ্গে যুক্ত হবে এক্সপ্রেসওয়ের টোল। ঢাকা-মাওয়া-ভাঙ্গা এক্সপ্রেসওয়ে পদ্মা সেতু হয়ে দক্ষিণবঙ্গকে রাজধানীর সঙ্গে যুক্ত করবে। প্রবেশ নিয়ন্ত্রিত এ সড়কে অযান্ত্রিক যান, তিন চাকার যানবাহন এবং কৃষি যানবাহন চলাচল নিষিদ্ধ। এসব যানবাহন দুই পাশের ধীরগতির লেনে চলবে। বর্তমানে ঢাকা-মাওয়া-ভাঙ্গা এক্সপ্রেসওয়েতে অবস্থিত বুড়িগঙ্গা সেতু-১, ধলেশ্বরী সেতু ও আড়িয়ল খাঁ সেতু- এ তিনটি সেতুতে টোল আদায় করা হচ্ছে। এক্সপ্রেসওয়ের সঙ্গে এ তিনটি সেতু যুক্ত। এক্সপ্রেসওয়েতে সেতু তিনটির টোল বিবেচনায় নিয়ে নতুন করে হার নির্ধারণ করবে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর (সওজ)।

সংশ্লিষ্টরা জানান, ঢাকা-মাওয়া-ভাঙ্গা এক্সপ্রেসওয়ের ৫৫ কিলোমিটার দীর্ঘ মহাসড়কে ৩টি সেতু রয়েছে। বুড়িগঙ্গা সেতুর (চীন-বাংলাদেশ মৈত্রী সেতু) দৈর্ঘ্য ৮৪৭.৩২ মিটার। ১ ও ২ ধলেশ্বরী সেতুর দৈর্ঘ্য ৮৫৩.২০ মিটার ও আড়িয়ল খাঁ সেতুর দৈর্ঘ্য ৪৫০ মিটার। গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়কের সেতুর জন্য ভিত্তি (মিডিয়াম ট্রাক) টোল ৪০০ টাকা। এটি ৭৫১ থেকে ১ হাজার মিটার দৈর্ঘ্যরে সেতুর জন্য। আর মহাসড়কের ভিত্তি টোল কিলোমিটারপ্রতি ২ টাকা। সেহিসাবে যাত্রাবাড়ী-মাওয়া পর্যন্ত দুটি সেতু ও ৩৫ কিলোমিটার সড়কাংশের জন্য ভিত্তি টোল দাঁড়ায় ৮৭০ (৪০০+৪০০+৭০) টাকা। কিলোমিটারপ্রতি ভিত্তি টোল দাঁড়ায় ২৪.৮৫ টাকা। আর পাচ্চর-ভাঙ্গা পর্যন্ত রয়েছে ১টি সেতু ও ২০ কিলোমিটার সড়কাংশের জন্য ভিত্তি টোল দাঁড়ায় ২৪০ (২০০+৪০) টাকা। কিলোমিটারপ্রতি ভিত্তি টোল দাঁড়ায় ১২ টাকা। সব মিলে যাত্রাবাড়ী-মাওয়া-পাচ্চর-ভাঙ্গা পর্যন্ত ৫৫ কিলোমিটার এক্সপ্রেসওয়ের জন্য ৩টি সেতু ও সড়কাংশসহ মোট ভিত্তি (মিডিয়াম ট্রাক) টোল দাঁড়ায় ১ হাজার ১১০ টাকা। কিলোমিটারপ্রতি টোল দাঁড়ায় ২০.১৮ টাকা।

নীতিমালা অনুযায়ী, তিন এক্সেলের ট্রেইলারের টোল মাঝারি ট্রাকের আড়াই গুণ, বড় ট্রাকে দুই গুণ। বড় বাসে টোল মাঝারি ট্রাকের ৯০ শতাংশ। মিনি ট্রাকে ৭৫%, মিনিবাসে ৫০%, মাইক্রোবাস ও পিকআপে ৪০%, প্রাইভেট কারে ২৫% এবং মোটরসাইকেলে ৫%। এ হিসেবে এক্সপ্রেসেওয়ের প্রতি কিলোমিটারে ট্রেইলারে ৫০ টাকা ৪৫ পয়সা, বড় ট্রাকে ৪০ টাকা ৩৬ পয়সা, ছোট ট্রাকে ১৫ টাকা ১৪ পয়সা, মিনিবাসে ১০ টাকা ৯ পয়সা, মাইক্রোবাস ও পিকআপে আট টাকা সাত পয়সা, প্রাইভেট কারে পাঁচ টাকা পাঁচ পয়সা এবং মোটরসাইকেলে এক টাকা এক পয়সা।

৫৫ কিলোমিটারের এক্সপ্রেসওয়ের পুরোটায় চললে ট্রেইলারের টোল দুই হাজার ৭৭৫ টাকা লাগতে পারে। মাঝে পদ্মা সেতুতে ছয় হাজারসহ মোট টোল দাঁড়াবে আট হাজার ৭৭৫ টাকায়। নীতিমালা অনুযায়ী, এক্সপ্রসেওয়েতে বড় ট্রাকে দুই হাজার ২২০, বড় বাসে ৯৯৯, ছোট ট্রাকে ৮৩৩, ছোট বাসে ৫৫৫, মাইক্রোবাস, জিপ, পিকআপে ৪৪৪, প্রাইভেট কারে ২৭৮ ও মোটরসাইকেলে ৫৬ টাকা টোল আসে। তবে কমিটি ট্রেইলারে এক হাজার ৩৭৫ টাকা, ভারী ট্রাকে এক হাজার ১০০ টাকা, মাঝারি ট্রাকে ৫৫০ টাকা, বড় বাসে ৪৯৫ টাকা, ছোট ট্রাকে ৪১৩ টাকা, ছোট বাসে ২৭৫ টাকা, মাইক্রোবাস, জিপ ও পিকআপে ২২০ টাকা, প্রাইভেট কারে ১৩৮ টাকা প্রস্তাব করেছিল, যা গত বছরের এপ্রিলে অর্থ বিভাগ অনুমোদন করেছিল। কমিটির প্রস্তাবে মোটরসাইকেলের বিষয়ে কিছু বলা নেই।

এদিকে পদ্মা সেতু পাড়ি দিতে ফেরির দেড়গুণ টোল হার নির্ধারণ করেছে সরকার। গত ১৭ মে জারি হওয়া প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, মোটরসাইকেল ১০০ টাকা, কার, জিপ ৭৫০ টাকা, পিকআপ ১২০০ টাকা, মাইক্রোবাস ১৩০০ টাকা, ছোট বাস (৩১ আসন বা এর কম) ১৪০০ টাকা, মাঝারি বাস (৩২ আসন বা এর কম) ২০০০ টাকা, বড় বাস (৩ এক্সেল) ২৪০০ টাকা, ছোট ট্রাক (৫ টন পর্যন্ত) ১৬০০ টাকা, মাঝারি ট্রাক (৫ টনের অধিক থেকে ৮ টন পর্যন্ত) ২১০০ টাকা, ট্রাক (৩ এক্সেল পর্যন্ত) ৫৫০০ টাকা, ট্রেইলার (৪ এক্সেল পর্যন্ত) ৬০০০ টাকা ও ট্রেইলার ( ৪ এক্সেলের বেশি) ৬০০০ টাকা+প্রতি এক্সেল ১৫০০ টাকা। এর সঙ্গে যুক্ত হবে এক্সপ্রেসওয়ের টোল।

সওজের তথ্য মতে, ঢাকা-মাওয়া-ভাঙ্গা এক্সপ্রেসওয়েতে টোল হার নির্ধারণ সংক্রান্ত কমিটি ঢাকা-মাওয়া এক্সপ্রেসওয়েতে চারটি এন্ট্রি এবং চারটি এক্সিট পয়েন্ট স্থাপনের সুপারিশ করেছে। ঢাকা থেকে মাওয়ামুখী যানবাহন রাজধানীর দোলাইপাড় দিয়ে প্রবেশ করে চারটি স্থানে টোল দিয়ে এক্সপ্রেসওয়ে থেকে বেরিয়ে যেতে পারবে। এগুলো হলো আবদুল্লাহপুর, ধলেশ্বরী, মালিগ্রাম এবং আড়িয়াল খাঁ। ঢাকামুখী গাড়ি ভাঙ্গা ইন্টারচেঞ্জ থেকে প্রবেশ করে আড়িয়াল খাঁ, শ্রীনগর, ধলেশ্বরী এবং আবদুল্লাহপুরে টোল দিয়ে এক্সপ্রেসওয়ে থেকে বেরিয়ে যেতে পারবে। এসব এক্সিট পয়েন্ট দিয়ে এক্সপ্রেসওয়েতে গাড়ি প্রবেশেরও সুযোগ থাকবে। কোনো যানবাহনকে একাধিকবার টোল দিতে হবে না। ঢাকা-মাওয়ায় টোল আদায় শুরুর পর পোস্তগোলা সেতু, ধলেশ্বরী সেতুতে আর টোল দিতে হবে না। একটি গাড়ি এক্সপ্রেসওয়ের ‘এন্ট্রি পয়েন্ট’ দিয়ে প্রবেশ করে ‘এক্সিট পয়েন্ট’ দিয়ে বেরিয়ে যাওয়ার মাঝে যত কিলোমিটার পথ চলবে, ঠিক ততটুকুর টোল দিতে হবে।

২০১৯ সালের সেপ্টেম্বরে একনেক সভায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, উন্নত দেশের মতো আমাদের দেশেও বড় বড় মহাসড়ক যেমন ঢাকা-চট্টগ্রাম, ঢাকা-সিলেট, ঢাকা-রংপুর ও ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে টোলের ব্যবস্থা রাখতে হবে। কেবল তা-ই নয়, টোলের মাধ্যমে আদায় করা টাকার জন্য একটি আলাদা ব্যাংক হিসাব করতে হবে। সেই টাকা দিয়ে মহাসড়কগুলো সংস্কার করা যাবে। এর পরই টোলের হার নির্ধারণে কমিটি গঠন করে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর।