আশুলিয়ায় কর্মরত অবস্থায় পোশাক কারখানায় শ্রমিকের মৃত্যু

আশুলিয়ায় কারখানায় কাজ করার সময় এক নারী পোশাকশ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। মৃত্যুর ঠিক আগে এক কর্মকর্তাকে তাকে ভর্ৎসনা করতে দেখা যায়। এরপরই ওই নারী শ্রমিক ফ্লোরে লুটিয়ে পড়েন। কারখানার সিসিটিভি ক্যামেরায় এই দৃশ্য ধরা পড়েছে।

নিহত শ্রমিকের নাম সুমি আক্তার ওরফে মিশু (২৭)। তিনি ডেকো গ্রুপের প্রতিষ্ঠান ‘আগামী অ্যাপারেলস লিমিটেড’-এর সুইং অপারেটর ছিলেন। তার বাড়ি নীলফামারীর ডিমলা উপজেলায়। স্বামী সাজ্জাদ হোসেন ও দুই ছেলেকে নিয়ে তিনি আশুলিয়ার কাঠগড়া এলাকায় ভাড়া বাসায় থাকতেন।

গতকাল শুক্রবার বিকেলে এ ঘটনা ঘটে। অভিযোগ উঠেছে, সুমি অসুস্থ ছিলেন। তিনি ছুটি চাইলেও দেওয়া হয়নি। অতিরিক্ত সময়ে তিনি কাজ করছিলেন। এক কর্মকর্তা তার সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেন।

সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, বিকেল ৫টা ১ মিনিটে সুমি নিজের মেশিনে কাজ করছিলেন। কিছুক্ষণ পর এক কর্মকর্তা তার দিকে তেড়ে আসেন। তিনি সুমির মেশিন চাপড়াতে থাকেন। কয়েক দফায় তার সঙ্গে উদ্ধত আচরণ করেন ওই কর্মকর্তা। একপর্যায়ে সুমির হাত থেকে কাপড় কেড়ে নিয়ে ফেলে দেন। এর পরপরই কারখানার মেঝেতে লুটিয়ে পড়েন সুমি। এ সময় ওই কর্মকর্তা কিছুটা দূরে সরে যান। পরে সহকর্মীরা তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নেন।

মৃতের স্বজন ও সহকর্মীদের বরাতে বাংলাদেশ গার্মেন্টস অ্যান্ড সোয়েটার শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের আইনবিষয়ক সম্পাদক খাইরুল মামুন মিন্টু বলেন, ‘সুমি অসুস্থতা নিয়ে কাজ করছিলেন। দুপুরে বাসায় খেতে গিয়ে ছেলেকে বলেছিলেন, শরীর খারাপ লাগছে। ছুটি চেয়েও পাননি। এরপর খাবার খেয়ে তিনি আবার কারখানায় যান।’

মিন্টু অভিযোগ করেন, ৫টায় ছুটি হওয়ার কথা থাকলেও তাকে জোর করে কাজ করানো হচ্ছিল। কর্মকর্তার মানসিক নির্যাতনের কারণেই সুমি মারা গেছেন।

সুমির স্বামী সাজ্জাদ হোসেন বলেন, ‘মৃত্যুর আগে কারখানার এক কর্মকর্তা আমার স্ত্রীকে বকাবকি ও মানসিক নির্যাতন করছিলেন। সেই মুহূর্তেই সে মারা যায়।’ তিনি জানান, প্রথমে ময়নাতদন্ত ছাড়াই লাশ দাফন করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু মামলা করার জন্য পরে ময়নাতদন্তের সিদ্ধান্ত নেন। রাতে থানায় লিখিত অভিযোগ দিয়ে লাশ ঢাকার শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজের মর্গে নেওয়া হয়।

এ বিষয়ে আগামী অ্যাপারেলস লিমিটেডের চেয়ারম্যান এম শাহাদাত হোসেন কিরণকে ফোন করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।

কারখানার মানবসম্পদ বিভাগের কর্মকর্তা হাসান বলেন, ‘ছুটির আগমুহূর্তে মাথা ঘুরে ফ্লোরে পড়ে যান সুমি। দ্রুত তাকে নারী ও শিশু হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসকেরা মৃত ঘোষণা করেন।’ সুমি ছুটি চেয়েছিলেন কি না—এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘অসুস্থতার কথা বললে শ্রমিকদের ছুটি দেওয়া হয়। তিনি অসুস্থতার কথা কর্তৃপক্ষকে জানাননি।’ তবে সিসিটিভি ফুটেজে কর্মকর্তার খারাপ আচরণের বিষয়ে জানতে চাইলে পরে এই কর্মকর্তা আর ফোন ধরেননি।

নারী ও শিশু হাসপাতালের জ্যেষ্ঠ ব্যবস্থাপক হারুন-অর-রশীদ জানান, সুমিকে নিথর অবস্থায় হাসপাতালে আনা হয়েছিল। চিকিৎসকেরা পরীক্ষা করে দেখেন তিনি মারা গেছেন।

সিসিটিভি ফুটেজে কর্মকর্তার খারাপ আচরণের বিষয়ে ডেকো গ্রুপের এইচআর অ্যান্ড কমপ্লায়েন্স বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক (ডিজিএম) মোহাম্মদ সালাউদ্দিন বলেন, ‘৫টায় কারখানা ছুটি হয়ে গিয়েছিল। ওই কর্মকর্তাকে শোকজ ও সাসপেন্ড করা হয়েছে। তবে তিনি আজ কারখানায় আসেননি বলে চিঠি দেওয়া সম্ভব হয়নি।’ তিনি আরও বলেন, ‘আগামীকাল বিস্তারিত জানাতে পারব।’

আশুলিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ তরিকুল ইসলাম বলেন, ‘শ্রমিকের মৃত্যুর ঘটনায় লিখিত অভিযোগ পেয়েছি। তদন্ত চলছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘সিসিটিভি ফুটেজে মৃত্যুর আগমুহূর্তে এক কর্মকর্তাকে ওই নারী শ্রমিকের সঙ্গে খারাপ আচরণ করতে দেখা গেছে। ওই কর্মকর্তার নাম আমরা জেনেছি। তবে তদন্তের স্বার্থে এখনই তা প্রকাশ করা হচ্ছে না।’

Share