
গাজী আবু বকর : উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস ও কিডনি জটিলতার পাশাপাশি নতুন করে ‘অটোনোমিক নিউরোপ্যাথি’ (Autonomic Neuropathy) নামক বিরল রোগে আক্রান্ত হয়ে পদত্যাগ করেছেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। এই ব্যাধির কারণে তিনি প্রায়ই সাময়িক অচেতন হয়ে পড়েন। ধারাবাহিক শারীরিক ও মানসিক অসুস্থতার কারণে রাষ্ট্রপতির মতো শীর্ষ সাংবিধানিক পদের গুরুদায়িত্ব পালন করা তাঁর পক্ষে অসম্ভব হয়ে পড়ায় তিনি এই সিদ্ধান্ত নেন।
সংবিধানের ৫০ (৩) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, আজ শুক্রবার স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের নিকট পদত্যাগপত্র প্রেরণ করেন রাষ্ট্রপতি। তাঁর পদত্যাগপত্র গৃহীত হওয়ার পর সংবিধানের ৫৪ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত স্পিকারই রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করবেন।
স্পিকারের কাছে পাঠানো স্বাক্ষরযুক্ত পদত্যাগপত্রে মো. সাহাবুদ্দিন উল্লেখ করেন:
“আমি মো. সাহাবুদ্দিন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে নির্বাচিত হয়ে ২০২৩ খ্রিষ্টাব্দের ২৪ এপ্রিল শপথ গ্রহণ করি এবং অদ্যাবধি নিষ্ঠা, সততা ও সংবিধানের প্রতি পূর্ণ আনুগত্যের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করে আসছি। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মুখে তৎকালীন সরকারের পতনের পর দেশে সাংবিধানিক সংকটের সৃষ্টি হয়। সেই সংকট থেকে উত্তরণের অভিপ্রায়ে সংবিধানের ১০৬ অনুচ্ছেদের ক্ষমতাবলে সুপ্রীম কোর্টের আপিল বিভাগের মতামত কামনা করি এবং তাঁদের পরামর্শক্রমে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন করা হয়। পরবর্তীতে এই সরকারের তত্ত্বাবধানে এবং রাজনৈতিক দলগুলোর পরামর্শে আয়োজিত সাধারণ নির্বাচনের মাধ্যমে বর্তমান সরকার গঠিত হয়, যা বর্তমানে সফলভাবে রাষ্ট্র পরিচালনা করছে। আমার সুদৃঢ় ও ইতিবাচক ভূমিকার কারণে দেশে কোনো সাংবিধানিক বিপর্যয় ঘটেনি।
কিন্তু আমি বর্তমানে অত্যন্ত গুরুতর অসুস্থ। হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস ও কিডনি জটিলতায় ভোগার পাশাপাশি সম্প্রতি আমার স্বাস্থ্য পরীক্ষায় ‘অটোনোমিক নিউরোপ্যাথি’ ধরা পড়েছে। ফলে আমি মাঝেমধ্যেই ক্ষণিক অচেতন হয়ে পড়ি। এই শারীরিক ও মানসিক অসামর্থ্যের কারণে দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসার প্রয়োজন থাকায় আমার পক্ষে রাষ্ট্রপতির মতো গুরুত্বপূর্ণ পদের দায়িত্ব পালন আর সম্ভব হচ্ছে না।
এমতাবস্থায়, সংবিধানের ৫০ (৩) অনুচ্ছেদের বিধান অনুযায়ী আমি রাষ্ট্রপতির পদ থেকে পদত্যাগ করছি। ধন্যবাদান্তে— মো. সাহাবুদ্দিন, রাষ্ট্রপতি।”
পরবর্তী রাষ্ট্রপতি নির্বাচন ও রাজনৈতিক পেক্ষাপট
সংবিধানের ১২৩ (২) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, পদত্যাগের কারণে রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হলে পরবর্তী ৯০ দিনের মধ্যে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করতে হয়। সংবিধানের ৪৮ (১) অনুচ্ছেদ মোতাবেক জাতীয় সংসদের সদস্যদের ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হবেন। বর্তমানে সংসদে ক্ষমতাসীন দল বিএনপির একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় তাদের মনোনীত প্রার্থীরই পরবর্তী রাষ্ট্রপতি হওয়ার সম্ভাবনা জোরালো। মো. সাহাবুদ্দিনের উত্তরসূরি হিসেবে বঙ্গভবনে কে যাচ্ছেন, তা নিয়ে বিএনপির শীর্ষপর্যায়ে জোর আলোচনা চলছে।
ব্যাংকক থেকে তড়িঘড়ি ফিরলেন স্পিকার
আজ শুক্রবার দুপুরে থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংকক থেকে জরুরিভিত্তিতে ঢাকায় ফেরেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ। চিকিৎসার জন্য গত ১৯ জুলাই তাঁর ব্যাংকক যাওয়ার কথা থাকলেও নির্ধারিত সফরসূচির দুদিন আগেই তিনি দেশে ফিরে আসেন।
দুপুর সোয়া ১২টার দিকে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে রাষ্ট্রপতির সম্ভাব্য পদত্যাগের বিষয়ে সাংবাদিকরা জানতে চাইলে স্পিকার বলেন, বিষয়টি সম্পর্কে তিনি অবগত নন। তবে তিনি স্পষ্ট করেন, “রাষ্ট্রপতি পদত্যাগ করলে স্পিকারের কাছেই পদত্যাগপত্র জমা দেবেন। সেক্ষেত্রে সংবিধান মেনে স্পিকারই রাষ্ট্রপতির সাময়িক দায়িত্ব নেবেন এবং পরবর্তী ৯০ দিনের মধ্যে সংসদ নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করবে।”
বিতর্কিত মেয়াদের আগাম সমাপ্তি
২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর থেকেই পদটিতে মো. সাহাবুদ্দিনের বহাল থাকা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা বিতর্ক চলছিল। পরবর্তীতে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে বিএনপি ক্ষমতায় এলে তাঁর অবস্থান নিয়ে আলোচনা আরও তুঙ্গে ওঠে। অবশেষে সব জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে পদত্যাগ করলেন তিনি।
উল্লেখ্য, ২০২৩ সালের ২৪ এপ্রিল দেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছিলেন মো. সাহাবুদ্দিন। সংবিধান অনুযায়ী ২০২৮ সালের এপ্রিলে তাঁর মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও, মেয়াদ শেষ হওয়ার প্রায় পৌনে দুই বছর আগেই বিদায় নিতে হলো তাঁকে।
