গ্যাসের অভাবে উৎপাদন কম, ছুটি বাড়াচ্ছে বিভিন্ন কারখানা

নয়াবার্তা প্রতিবেদক : গাজীপুরের কোনাবাড়ী এলাকায় মিতালি ফ্যাশনের কারখানার ডাইং (কাপড়ের রং করা) সেকশন গ্যাস–সংকটের কারণে আট দিন ধরে বন্ধ। কাপড় ডাইং না হওয়ায় প্রতিষ্ঠানটির সেলাই সেকশনের ৩০টি উৎপাদন লাইনের মধ্যে ১৮ লাইন অলস হয়ে পড়েছে।

বিষয়টি জানিয়ে মিতালি ফ্যাশনের চেয়ারম্যান আবু ইউসুফ আবদুল্লাহ গতকাল সোমবার বলেন, গ্যাস–সংকটের কারণে কারখানার উৎপাদন সচল রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে। কয়েকটি রপ্তানি ক্রয়াদেশের বিপরীতে তৈরি পোশাক নির্ধারিত সময়ে পাঠাতে পারবেন না তাঁরা। এ জন্য ক্রেতাদের মূল্যছাড় দিতে হতে পারে।

মিতালি ফ্যাশনের মতো সারা দেশের শিল্পকারখানা দুই সপ্তাহ ধরে ভয়াবহ গ্যাস–সংকটে ভুগছে। সঙ্গে আছে বিদ্যুতের লোডশেডিং। এতে অনেক শিল্পের উৎপাদন অর্ধেকে নেমেছে। ফলে খাদ্য ও খাদ্যবহির্ভূত বেশ কিছু পণ্যের চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে। অন্যদিকে চাহিদা অনুযায়ী উৎপাদন না হওয়ায় পণ্য রপ্তানি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

একাধিক কারখানার মালিকপক্ষের পাশাপাশি ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর নেতারাও গ্যাস–সংকটের চিত্র তুলে ধরেছেন। তাঁদের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত দুই সপ্তাহে কারখানাগুলোর উৎপাদন কমেছে ৪০ শতাংশ। কিছু কারখানা বলছে, তারা ৫ আগস্ট সরকারি ছুটির সঙ্গে বাড়তি ছুটি দিচ্ছে।

বিভিন্ন খাতের ব্যবসায়ীরা বলছেন, গ্যাস–সংকটের কারণে কাচ, ইস্পাত, বস্ত্রকল ও তৈরি পোশাক, সিরামিক, বিস্কুট-কেক এবং ভোগ্যপণ্যের উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। উৎপাদন কম হওয়ায় ব্যয় বাড়ছে। তাতে লোকসান গুনতে হচ্ছে। শিগগিরই গ্যাসের সংকট না কাটলে কর্মী ছাঁটাইয়ের মতো পদক্ষেপ নিতে হতে পারে কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানে।

দেশের শিল্পকারখানায় গ্যাস–সংকট অনেক দিন ধরেই চলছে। গত ২১ জুলাই অগ্নিদুর্ঘটনায় তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) সরবরাহের একটি টার্মিনাল বন্ধ হওয়ায় গ্যাসের সংকট প্রকট হয়েছে। শিগগিরই টার্মিনালটি আংশিক চালু হলে ৩০ কোটি ঘনফুট সরবরাহ বাড়বে বলে জানিয়েছে পেট্রোবাংলা।

দেশে নিজস্ব খনি থেকে গ্যাস উত্তোলন করা হয়। পাশাপাশি বিদেশ থেকে আমদানি করা হয়। দেশে আমদানি করা এলএনজি রূপান্তর করে সরবরাহের জন্য কক্সবাজারের মহেশখালীতে দুটি ভাসমান টার্মিনাল রয়েছে। এর একটি মার্কিন কোম্পানি এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনাল অগ্নিদুর্ঘটনার কারণে বন্ধ আছে। এতে দেশে দিনে গ্যাস সরবরাহ সার্বিকভাবে ২১৫ কোটি ঘনফুটে নেমে গেছে। টার্মিনাল চালু হলে সরবরাহ দাঁড়াবে ২৭০ কোটি ঘনফুট। যদিও দেশে দিনে গ্যাসের চাহিদা ৩৮০ কোটি ঘনফুট।

ভোগ্যপণ্যের উৎপাদন ব্যাহত

রাজধানীর তেজগাঁও শিল্প এলাকায় কোহিনূর কেমিক্যালের কারখানায় সকাল ৬টা থেকে দুই শিফটে ১৬ ঘণ্টা উৎপাদন হয়। তবে গ্যাস–সংকটের কারণে দিনে উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। রাতের বেলায় গ্যাসের চাপ কিছুটা বাড়লে পণ্য উৎপাদন করা হয়। এতে সাবান, ডিটারজেন্ট ও প্রসাধনীর উৎপাদন ২০ শতাংশ কমে গেছে।

কোহিনূর কেমিক্যালের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট (ব্র্যান্ড) গোলাম কিবরিয়া সরকার বলেন, ‘মধ্যপ্রাচ্যের সংকটের কারণে কাঁচামালের আমদানি ব্যয় বেড়ে গেছে। তার মধ্যে আবার গ্যাস–সংকটের কারণে উৎপাদন কমেছে। বাজারে চাহিদা অনুযায়ী পণ্যও সরবরাহ করা যাচ্ছে না। সব মিলিয়ে আমাদের লোকসান গুনতে হচ্ছে।’

প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ বলছে, হবিগঞ্জে তাদের শিল্পপার্কে উৎপাদন নেমেছে ৪০-৪৫ শতাংশে। গ্যাস–সংকটের কারণে ক্যাপটিভ জেনারেটরে বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রায় বন্ধ। পল্লী বিদ্যুৎ দিয়ে কারখানা কোনোরকমে চলছে। একইভাবে নরসিংদীসহ অন্যান্য এলাকায় থাকা শিল্পগ্রুপটির উৎপাদনও ব্যাহত হচ্ছে। গ্যাস–সংকটের কারণে প্লাস্টিকের আসবাব, বিস্কুট-কেক, বেকারিসহ বিভিন্ন পণ্য উৎপাদন ও সরবরাহ কমাতে বাধ্য হয়েছে তারা।

জানতে চাইলে প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের পরিচালক (বিপণন) কামরুজ্জামান কামাল বলেন, গ্যাস–সংকটের কারণে সামগ্রিকভাবে উৎপাদন সক্ষমতার ৬০ শতাংশ পর্যন্ত ব্যবহার করা যাচ্ছে। এতে অনেক পণ্যই চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ করা যাচ্ছে না। তার মধ্যে রপ্তানি পণ্যও আছে। তিনি দ্রুতই সংকট সমাধানের আশা প্রকাশ করেন।

বস্ত্র খাতে সংকট বাড়ছে

সাভারের লিটল স্টার স্পিনিং মিলসে প্রতিদিন ২৪ হাজার পাউন্ড সুতা উৎপাদনের সক্ষমতা আছে। গ্যাস–সংকটের কারণে গতকাল উৎপাদন হয়েছে ১০ হাজার পাউন্ড সুতা। তার আগের কয়েক দিন সক্ষমতার ৪০-৫০ শতাংশ উৎপাদন হয়েছে।

এসব তথ্য দিয়ে লিটল স্টার গ্রুপের চেয়ারম্যান খোরশেদ আলম গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, অর্ধেক সক্ষমতায় কারখানা চললে মাসে ৭০ লাখ থেকে ১ কোটি ২০ লাখ টাকা লোকসান হতে পারে।

ছুটি বাড়িয়েছে কিছু কারখানা

গ্যাস–সংকটের কারণে তৈরি পোশাকশিল্পের শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান ডিবিএল গ্রুপের গাজীপুরের কারখানায় ডাইং সেকশনে উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। এ জন্য সুইং বা সেলাই সেকশনের উৎপাদন স্বাভাবিক রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে। সে জন্য ৫ আগস্টের সরকারি ছুটির সঙ্গে আরও তিন দিন ছুটি বাড়িয়েছে তারা।

জানতে চাইলে ডিবিএল গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান এম এ রহিম বলেন, ‘গ্যাস ছাড়া ডাইং কারখানা চলে না। সে জন্য আমরা ৫-৭ আগস্ট ছুটি দিয়েছিলাম। তবে শ্রমিকদের অনুরোধে ছুটি আরেক দিন বাড়িয়েছি। ছুটির শেষ হওয়ার আগেই গ্যাস সরবরাহ কিছুটা বাড়বে বলে প্রত্যাশা করছি।’

ডিবিএল গ্রুপের মতো আরও কিছু তৈরি পোশাক কারখানা ৫ আগস্টের জুলাই গণ-অভ্যুত্থান দিবসের সরকারি ছুটির সঙ্গে মিলিয়ে বাড়তি এক থেকে দুই দিন ছুটি দিয়েছে। কারণ, গ্যাস–সংকটের কারণে চাহিদা অনুযায়ী কাপড় ডাইং করা যাচ্ছে না। এতে তৈরি পোশাক কারখানা বস্ত্রের সংকটে পড়ছে।

তৈরি পোশাকশিল্পের মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, ‘তীব্র গ্যাস ও বিদ্যুৎ–সংকটের কারণে পোশাক কারখানাগুলো ৬০-৭০ শতাংশ উৎপাদন কার্যক্রম সচল রেখেছে। অতীতে ফিলিং স্টেশন থেকে আমরা সিলিন্ডার ভরে গ্যাস নিতে পারতাম। এখন দেওয়া হচ্ছে না।’ তিনি বলেন, ‘তিতাসকে চিঠি দিয়েও আমরা কোনো সাড়া পাইনি। প্রাইভেট গাড়িতে সিএনজি না দিয়ে শিল্পকারখানায় দেওয়া দরকার।’

নির্মাণসামগ্রীর কারখানায় সংকট

কাচ উৎপাদনে গ্যাস ব্যবহার করে চুল্লিতে কাঁচামাল গলানো হয়। একবার চুল্লি চালু হলে তা টানা ১২ থেকে ১৫ বছর সচল রাখতে হয়। গ্যাসের অভাবে চুল্লি বন্ধ হয়ে গেলে সেটি আবার চালুর সুযোগ থাকে না; পুরোনো চুল্লি ভেঙে নতুন করে স্থাপন করতে হয়। এ কারণে চলমান গ্যাস-সংকটে সবচেয়ে বেশি উদ্বেগে পড়েছেন কাচশিল্পের উদ্যোক্তারা।

চট্টগ্রামের পিএইচপি ফ্লোট গ্লাস ইন্ডাস্ট্রিজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আমির হোসেন বলেন, কয়েক দিন ধরে গ্যাসের চাপ কমে ৭৫ পিএসআইয়ে (মাপার একক) নেমেছে। এর নিচে নামলে চুল্লি ধীরে ধীরে অকার্যকর হয়ে পড়বে। চুল্লিটি নষ্ট হলে নতুন করে স্থাপনে প্রায় ৫০০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করতে হবে। তিনি আরও বলেন, ২০১৯ সালে চুল্লিটি চালু করা হয়েছিল। বিদ্যমান বিনিয়োগ রক্ষা করতে হলে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করা জরুরি। গ্যাসনির্ভর শিল্পকারখানাগুলোকে সরবরাহে অগ্রাধিকার দিতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।

চট্টগ্রামের কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড (কেজিডিসিএল) সূত্র জানায়, গতকাল সকাল আটটা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় জাতীয় গ্রিড থেকে তারা পেয়েছে মাত্র ১৯ কোটি ঘনফুট গ্যাস। অথচ চট্টগ্রামে দৈনিক চাহিদা অন্তত ৩৫ কোটি ঘনফুট। এর ফলে শিল্পকারখানার পাশাপাশি আবাসিক গ্রাহক, বিদ্যুৎকেন্দ্র ও সিএনজি ফিলিং স্টেশন—সব খাতেই গ্যাসের চাপ কমে গেছে।

গ্যাস-সংকটে উদ্বেগ বেড়েছে ইস্পাত খাতের উদ্যোক্তাদেরও। বিএসআরএম গ্রুপের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক তপন সেনগুপ্ত বলেন, গ্যাসের সংকট অব্যাহত থাকলে একপর্যায়ে কারখানার উৎপাদন বন্ধ করে দিতে হবে।

তপন সেনগুপ্ত আরও বলেন, গ্যাসের বিকল্প হিসেবে ফার্নেস অয়েল বা ডিজেল ব্যবহার করে সাময়িকভাবে উৎপাদন চালু রাখা যায়। তবে এতে উৎপাদন খরচ অনেক বেড়ে যায়। বড়জোর এক-দুই দিন বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার করে কারখানা চালানো সম্ভব। কিন্তু একটানা গ্যাসের ঘাটতি থাকলে এভাবে উৎপাদন অব্যাহত রাখা সম্ভব নয়।

সিরামিকশিল্পের মালিকদের সংগঠন বিসিএমইএর গত সপ্তাহে তিতাস গ্যাস অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালককে দেওয়া এক চিঠিতে জানায়, ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর, নরসিংদী এবং ময়মনসিংহের ভালুকা ও ত্রিশাল এলাকার ২০টি সিরামিক কারখানায় তীব্র গ্যাস–সংকটে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। কারখানাগুলোতে গ্যাসের চাপ কখনো কখনো ২-৩ পিএসআই থেকে শূন্যের কোঠায় নেমে আসছে। শিল্প রক্ষায় দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ জানায় সংগঠনটি।

সমাধান কী

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকার দেশীয় খনি থেকে গ্যাস উত্তোলনে জোর না দিয়ে আমদানির দিকে গেছে। ২০১৮ সালে শুরু হয় আমদানি। তবে গ্যাস আমদানি করতে গিয়ে দেশের অর্থনীতিই সংকটে পড়েছে।

২০২২ সালে রাশিয়া ও ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর বিশ্ববাজারে গ্যাসের দাম অনেক বেড়ে যায়। আমদানি করতে গিয়ে কমে যায় বৈদেশিক মুদ্রার মজুত। এরপর দফায় দফায় গ্যাসের দাম বেড়েছে। কিন্তু সংকট আর যায়নি। বিগত অন্তর্বর্তী সরকার ও বর্তমান সরকার দেশে গ্যাস উত্তোলনের ওপর জোর দিয়েছে। কিন্তু তাতে সময় লাগবে।

বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সিপিডির গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, সহজলভ্যতা ও কম দামের কারণে স্বাধীনতার পর থেকে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন, সার কারখানা, শিল্পকারখানাসহ সবক্ষেত্রেই গ্যাসনির্ভর হিসেবে গড়ে উঠেছে। যখন সংকট হয়েছে, তখন একটি গোষ্ঠী আমদানিনির্ভর এলএনজির ওপর নির্ভরতা বাড়িয়েছে। মূলত বহুমুখী উৎস ব্যবহার না করার কারণেই সংকট বেড়েছে।

বর্তমানে এলএনজির ভাসমান টার্মিনাল দ্রুত সংস্কারে জোর দেওয়ার পরামর্শ দিয়ে খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, ভবিষ্যতে জ্বালানি উৎসের বহুমুখীকরণ করতে হবে। তবে এলএনজি নির্ভর হওয়া যাবে না। দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানের পাশাপাশি সৌরবিদ্যুৎ ও নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে জোর দিতে হবে। শিল্পকারখানাগুলোকে গ্যাসনির্ভরতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।

Share