জ্বালানি সংকটে প্রধানমন্ত্রীর দুঃখ প্রকাশ

বিশেষ প্রতিবেদক : দেশের চলমান জ্বালানি সংকটে ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষের কাছে দুঃখ প্রকাশ করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে জ্বালানি সংকটই দেশের সবচেয়ে বড় সমস্যা। এ সংকট মোকাবিলায় সরকার ইতোমধ্যে কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। আজ (শনিবার) বিকেলে বাংলাদেশ কৃষিবিদ ইনস্টিটিউট মিলনায়তনে বিএনপির ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষ্যে আয়োজিত আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। ‘করবো কাজ, গড়বো দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ’ শীর্ষক স্লোগানকে ধারণ করে বিকেল পৌনে ৪টায় পবিত্র কোরআন তেলাওয়াতের মধ্য দিয়ে এই সভা শুরু হয়।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, স্বৈরাচারী ও অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে তৈরি হওয়া জ্বালানি সংকট নিয়ে কিছু রাজনৈতিক দল বিভ্রান্তি ছড়ানোর চেষ্টা করছে। দেশে কোনো ধরনের অরাজকতা সৃষ্টির চেষ্টা করা হলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও সতর্ক করেন তিনি। একই সঙ্গে সবাইকে নিজ নিজ সীমার মধ্যে থাকার আহ্বান জানান।

বিএনপি রাজপথে থেকে আন্দোলন করেছে, কখনো গুপ্ত অবস্থায় কোনো কর্মকাণ্ড পরিচালনা করেনি-এমন দাবি করে দলটির চেয়ারম্যান প্রশ্ন তোলেন, ‘গুপ্তদের মধ্য থেকে কি কেউ অরাজকতা তৈরির চেষ্টা করছে? তা হলে তারাই কি স্বৈরাচারকে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছে। স্বৈরচার কি আবার গুপ্তদের মাঝে গুপ্ত হয়ে আছে? একজন আরেকজনকে আড়াল করার চেষ্টা করছে?’

জনগণের কাছে দেওয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের প্রত্যয় ব্যক্ত করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিএনপি সরকার একটি গণতান্ত্রিক ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তুলতে কাজ করবে। মানুষের দুর্ভোগ কমাতে সরকারের পাশাপাশি দলের নেতা-কর্মীদেরও দায়িত্বশীলভাবে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘দেশের চলমান সংকটকে পুঁজি করে কিছু রাজনৈতিক দল বা ব্যক্তি বিভ্রান্তির মাধ্যমে অরাজকতা সৃষ্টির পাঁয়তারা করছে।’ তিনি বলেন, ‘গত কিছুদিন ধরে খেয়াল করছি, যেসব সমস্যা আমরা ইনহেরিট করেছি, স্বৈরাচার আমলেই হোক অথবা অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের রেখে যাওয়া সমস্যাই হোক না কেন, সবগুলোই সমাধানের চেষ্টা করছি। সমস্যা নেই, তা কখনোই বলছি না। অবশ্যই বিভিন্ন ক্ষেত্রে সমস্যা আছে। কিন্তু সমস্যাগুলোকে পুঁজি করে কিছু রাজনৈতিক দল এবং কিছু ব্যক্তি বিভিন্নভাবে বিভ্রান্তি সৃষ্টির চেষ্টা করছেন। এর মাধ্যমে দেশে অরাজকতা তৈরি করার চেষ্টা করছেন।’

সরকারের অবস্থান তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমি পরিষ্কারভাবে বলতে চাই যে, বাংলাদেশের জনগণ এই সরকারকে দায়িত্ব দিয়েছে দেশ পরিচালনা করার। অবশ্যই আমরা গণতন্ত্রের ধারাকে সমুন্নত রাখবো। গণতান্ত্রিক নীতি-নৈতিকতাগুলো আপহোল্ড করার সর্বোচ্চ চেষ্টা করবো।’

একই সঙ্গে তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, ‘কেউ যদি অরাজকতা সৃষ্টি করতে চায়; সেটিকে কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে তা দেশের আইনে বলে দেওয়া আছে। কাজেই জনগণের দ্বারা নির্বাচিত সরকার হিসেবে পরিষ্কারভাবে বলতে চাই, প্রত্যেকের নিজেদের সীমার মধ্যে থাকা দরকার।’

দেশের প্রতিটি সংকটকালীন মুহূর্তে বিএনপি জনগণের পাশে ছিল উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘প্রত্যেকটি সংকটকালীন মুহূর্তে বিএনপি নামক রাজনৈতিক দলটি নেতাকর্মী ও দেশের মানুষকে সঙ্গে নিয়ে সংকট কাটিয়ে ওঠার জন্য পরিশ্রম করেছে। সংকট থেকে ধীরে ধীরে দেশকে বের করেও নিয়ে এসেছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘আজকে যেহেতু বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল এই মুহূর্তে দেশ পরিচালনার দায়িত্বে আছে। শিল্পকারখানার মালিকসহ বহু সাধারণ মানুষ যারা বিদ্যুৎ ও জ্বালানির কষ্টে রয়েছেন, তাদের সকলের কাছে আমি দলের পক্ষ থেকে দুঃখ প্রকাশ করছি।’

তিনি বলেন, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল এই মুহূর্তে দেশ পরিচালনার দায়িত্বে আছে। শিল্পকারখানার মালিকসহ বহু সাধারণ মানুষ যারা বিদ্যুৎ ও জ্বালানির কষ্টে রয়েছেন, তাদের সকলের কাছে আমি দলের পক্ষ থেকে দুঃখ প্রকাশ করছি। আগামীতে যেন দেশের মানুষকে এই জ্বালানি সংকটে পড়তে না হয়, সেভাবেই কর্মপরিকল্পনা তৈরি করছে বিএনপি।

স্বৈরাচারী শাসনামলে কিছু রাজনৈতিক দল ‘গুপ্ত’ বেশ ধারণ করে স্বৈরাচারের ভেতরে লুকিয়ে ছিল। বর্তমানে তারাই বিভ্রান্তি ছড়িয়ে অরাজকতা উসকে দিচ্ছে কিনা—এমন প্রশ্ন তুলে প্রধানমন্ত্রী বলেন, স্বৈরাচার আমলে দেখেছি একটি রাজনৈতিক দল গুপ্ত বেশ ধারণ করেছিল। তারা স্বৈরাচারের ভেতরে লুকিয়েছিল। পরবর্তীতে আমরা দেখছি তাদের নিজেদের লোকজনই বেরিয়ে এসে তা স্বীকার করেছে।’

দেশের জনগণকে সতর্ক করে দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এমনও তো হতে পারে যে, যে গুপ্তরা স্বৈরাচারের আড়ালে লুকিয়ে ছিল; এখন হয়তো তাদের ভেতরে স্বৈরাচারীরা লুকিয়ে থেকে এই অরাজকতা উসকে দিতে চাইছে। যদি তাই হয়, তাহলে তো বলতে হবে, গুপ্তরাই স্বৈরাচারকেই আবার সামনে নিয়ে আসার কাজ করছে। কারণ, কয়েকদিন আগে আমরা দেখলাম, গুপ্তদের এক নেতা বলেছে যে, তারা এলে আমাদের আপত্তি নেই। তাহলে তো দেখাই যাচ্ছে, উভয় পক্ষ একজন আরেকজনকে নানাভাবে গুপ্ত রাখার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।’

দলীয় নেতাকর্মীদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আসুন আমরা জনগণকে আরও সচেতন করি। কে কাকে মুক্ত করার দায়িত্ব নিচ্ছে, সেটি জনগণের সামনে উন্মুক্ত করে দেই। কারণ, এই গুপ্ত বাহিনী ৭১ সাল থেকে বছরের পর বছর, যুগের পর যুগ বিভিন্ন সময়-অসময়ে একজন আরেকজনকে আড়াল করেছে। একজন আরেকজনকে আশ্রয় দিয়েছে। কাজেই আজ তাদের এই রাজনীতি জনগণের সামনে তুলে ধরতে হবে।

দেশের জনগণের স্বার্থ রক্ষাকারী দলের নাম বিএনপি বলেও উল্লেখ করেন তারেক রহমান। তিনি বলেন, জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার যদি কেউ নিশ্চিত করে থাকে, সেই রাজনৈতিক দলটির নাম বিএনপি। সে কারণেই প্রত্যেকটি নির্বাচনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল এদেশের মানুষের সমর্থন নিয়ে সরকার গঠন করতে সক্ষম হয়েছে। এখন আমরা এমন একটি মানবিক রাষ্ট্র তৈরি করতে চাই, যেখানে প্রতিটি নাগরিকের অধিকার নিশ্চিত হবে।

শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী প্রয়াত বেগম খালেদা জিয়াকে স্মরণ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা থেকে শুরু করে বহুদলীয় গণতন্ত্রের পুনঃপ্রবর্তন, রেমিট্যান্স ও তৈরি পোশাক (গার্মেন্টস) শিল্পের বিকাশ এবং নারীদের অবৈতনিক শিক্ষা চালু—সবকিছুর পেছনেই জিয়াউর রহমান, বেগম খালেদা জিয়া এবং বিএনপির যুগান্তকারী অবদান রয়েছে।’

তিনি বলেন, সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া নারীদের অবৈতনিক শিক্ষার ব্যবস্থা করে দেশ গঠনে তাদের সম্পৃক্ত করেছিলেন। এছাড়াও তিনি দেশে সংসদীয় গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনেন এবং নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তন করেন, যা পরবর্তীতে দেশকে একটি উদীয়মান টাইগার হিসেবে পরিচিতি দেয়।

সংকট মোচনে বিএনপির অবদান তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ১৯৭৫ সালের পর দেশকে খাদ্য উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ করা এবং ৯০-এর স্বৈরাচার-পরবর্তী সময়ে ধ্বংসপ্রাপ্ত অর্থনীতি ও দুর্নীতির কলঙ্ক থেকে দেশকে মুক্ত করে সামনের দিকে এগিয়ে নিতে বিএনপির ভূমিকা অনস্বীকার্য।

গত ১৬-১৭ বছরে সরকারের অন্যায়-অত্যাচার এবং নির্যাতনের পরেও বিএনপি রাজপথে থেকে আন্দোলন পরিচালনা করেছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ২০২৪ সালের আন্দোলনের মূল ‘মাস্টারমাইন্ড’ এবং সফলতা অর্জনের পূর্ণ কৃতিত্ব এ দেশের আমজনতার। তাদের সঙ্গে থেকে বিএনপি এই লড়াই সফল করেছে।’

বিএনপি আয়োজিত আলোচনা সভায় সভাপতিত্ব করেন দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী।

দলের কেন্দ্রীয় প্রচার সম্পাদক এবং মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকুর সঞ্চালনায় সভায় বক্তব্য দেন অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক মাহবুব উল্লাহ, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস, আমানউল্লাহ আমান, ফরহাদ হালিম, ইসমাইল জবিউল্লাহ, যুবদলের সভাপতি এম মোনায়েম মুন্না, কৃষক দলের সাধারণ সম্পাদক শহিদুল ইসলাম বাবুল, স্বেচ্ছাসেবক দলের সাধারণ সম্পাদক রাজীব আহসান, ঢাকা মহানগর বিএনপি দক্ষিণের সদস্যসচিব তানভীর আহমেদ রবিন, উত্তরের সদস্যসচিব মোস্তফা জামান এবং ছাত্রদলের সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব।

অনুষ্ঠানে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, আবদুল মঈন খান, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, সালাহউদ্দিন আহমদ, সেলিমা রহমান, ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেনসহ বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
আলোচনার শুরুতে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ও দলের সাবেক চেয়ারপারসন ও প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াসহ সকল শহীদের স্মরণে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়।

প্রথমে জাতীয় সংগীত এবং পরে দলীয় সংগীত পরিবেশন করা হয়। পরে জাতীয়তাবাদী দলের ওপর নির্মিত একটি প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শন করা হয়।

১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বিএনপি প্রতিষ্ঠা করেন। দিবসটি পালনে গত মঙ্গলবার পাঁচদিনের কেন্দ্রীয় কর্মসূচি শুরু হয়। আজকের এই আলোচনা সভার মধ্য দিয়ে তা শেষ হলো।

Share