
বিশেষ প্রতিনিধি : ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট-পরবর্তী সময়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর স্থবিরতার সুযোগে অস্থির হয়ে ওঠে ঢাকার অপরাধ জগৎ। ওই বছরের ২০ সেপ্টেম্বর রায়েরবাজারের জোড়া খুনের মাধ্যমে শুরু হয় প্রকাশ্য খুনোখুনি। ওই ঘটনায় অন্যতম আসামি ছিলেন শীর্ষ সন্ত্রাসী ইমামুল হাসান ওরফে পিচ্চি হেলাল।
সর্বশেষ, কারাগার থেকে জামিনে বের হওয়ার মাত্র এক মাসের মাথায় প্রতিপক্ষের হামলার শিকার হয়ে প্রাণ হারান আরেক শীর্ষ সন্ত্রাসী ইয়াছিন খান পলাশ ওরফে কাইল্যা পলাশ (৫০)। চলতি বছরের ১২ জুন রামপুরায় বাংলাদেশ টেলিভিশন ভবনের কাছে নিজ বাসার সামনে গুলিবিদ্ধ হন তিনি। এক সপ্তাহ চিকিৎসাধীন থাকার পর ১৯ জুন রাতে ঢাকার এভারকেয়ার হাসপাতালে তিনি মারা যান। হত্যা মামলায় যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত পলাশ এক মাস আগে কারাগার থেকে মুক্তি পেয়েছিলেন।
আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর রাজধানীতে অন্তত তিন ডজন চাঞ্চল্যকর ঘটনা ঘটেছে, যার নেপথ্যে ছিল পেশাদার অপরাধীরা। এর মধ্যে অন্তত ১১টিই ছিল হত্যার ঘটনা। অন্য ঘটনাগুলোর মধ্যে রয়েছে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে ঢুকে গুলি, বোমা বিস্ফোরণ, কোপানো ও সশস্ত্র মহড়া। ১১টি হত্যা মামলার মধ্যে আটটি ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) এবং তিনটি থানা পুলিশ তদন্ত করছে।
চাঞ্চল্যকর এই ১১টি হত্যাকাণ্ডের একটিতেও এখন পর্যন্ত আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করতে পারেনি পুলিশ। এসব খুনের নেপথ্যে উঠে এসেছে ঝুট ব্যবসা, ময়লা, ডিশ ও ইন্টারনেট নেটওয়ার্কের আধিপত্য, গণপরিবহন চাঁদাবাজি, কোরবানির পশুর হাটের ইজারা, ঠিকাদারি এবং নির্মাণ খাত থেকে অবৈধ অর্থ আদায়ের তীব্র দ্বন্দ্ব। পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা সংবাদ সম্মেলনে শীর্ষ সন্ত্রাসীদের সংশ্লিষ্টতা ও চাঁদাবাজির ভাগ-বাটোয়ারার কথা স্বীকার করলেও, নেপথ্যের মূল পরিকল্পনাকারী কোনো শীর্ষ সন্ত্রাসীকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
তবে গোয়েন্দা পুলিশের দাবি, তারা ইতোমধ্যে সাতটি হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটন করেছেন এবং মাঠপর্যায়ের শুটার ও সহযোগীদের গ্রেপ্তারও করা হয়েছে। যদিও আইনি প্রক্রিয়ায় কোনো মামলার তদন্তই এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ হয়নি।
অপরাধ বিশেষজ্ঞদের মতে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মাঠপর্যায়ের আসামি গ্রেপ্তার, রিমান্ড বা অস্ত্র উদ্ধার করলেও শীর্ষ সন্ত্রাসী সুব্রত বাইন ছাড়া মূল মাস্টারমাইন্ডদের কাউকেই আইনের আওতায় আনতে পারেনি। নেপথ্যের নায়করা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাওয়া এবং কেউ কেউ বিদেশি নাগরিকত্ব নিয়ে সেখান থেকে গ্যাং পরিচালনার সুযোগ পাওয়ায় ধারাবাহিক হত্যাকাণ্ড থামানো যাচ্ছে না। ফলে শীর্ষ সন্ত্রাসীদের পুরোনো সেই ভীতিকর রাজত্বই আবার ফিরে আসছে বলে সাধারণ মানুষের মনে আশঙ্কার সৃষ্টি হচ্ছে।
২০২৪ সালের ২০ সেপ্টেম্বর রায়েরবাজার বধ্যভূমি সংলগ্ন বেড়িবাঁধে নাসির বিশ্বাস (২৯) ও মুন্না (২২) নামের দুই যুবককে কুপিয়ে হত্যার মধ্য দিয়েই মূলত রাজধানীর অপরাধ জগতে শীর্ষ সন্ত্রাসীদের প্রকাশ্য খুনোখুনি শুরু হয়। ওই ঘটনায় পুলিশ মিরাজ মোল্লা (২৩) নামের একজনকে গ্রেপ্তার করলেও প্রধান আসামি করা হয় শীর্ষ সন্ত্রাসী ইমামুল হাসান ওরফে পিচ্চি হেলালকে। মামলার অন্যতম আসামি এবং রায়েরবাজারের কিশোর গ্যাং ‘অ্যালেক্স গ্রুপ’-এর প্রধান ইমন হোসেন চলতি বছরের ১২ এপ্রিল প্রতিপক্ষের হামলায় নিহত হন।
পুলিশ সূত্রে জানা যায়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর ২৪ বছর ধরে কারাগারে থাকা শীর্ষ সন্ত্রাসী পিচ্চি হেলাল জামিনে মুক্ত হন। মোহাম্মদপুর এলাকায় তার একক আধিপত্য প্রতিষ্ঠার অংশ হিসেবে এবং পূর্বশত্রুতার জেরে তার নির্দেশেই এই জোড়া খুন সংঘটিত হয়। নিহত মুন্না ও অ্যালেক্স ইমনের বিরুদ্ধে মোহাম্মদপুর থানায় একাধিক মামলা ছিল। অন্য নিহত নাসির স্থানীয় ৩৪ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের কর্মী এবং পেশায় রাজমিস্ত্রি ছিলেন।
গত ২৮ এপ্রিল রাত পৌনে ৮টার দিকে রাজধানীর নিউমার্কেট এলাকার বটতলায় দুর্বৃত্তদের গুলিতে নিহত হন ২৩ শীর্ষ সন্ত্রাসীর তালিকায় ২ নম্বরে থাকা খন্দকার নাঈম আহমেদ টিটন। এ ঘটনায় টিটনের বড় ভাই নিউমার্কেট থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন, যা বর্তমানে ডিএমপির গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) রমনা বিভাগ তদন্ত করছে। হত্যাকাণ্ডের চার মাস পার হলেও নেপথ্যের মূল কারিগরদের কাউকেই গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ। তবে, গত ২১ জুলাই রাতে মোহাম্মদপুর এলাকা থেকে মামলার এজাহারভুক্ত আসামি রনি ওরফে ভাঙারি রনিকে গ্রেপ্তার করা হয়। তিনি সরাসরি হত্যায় জড়িত কি না, তা যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে।
তদন্তসংশ্লিষ্টরা জানান, ঘটনার দিন ওই এলাকায় ব্যবহৃত বিপুল পরিমাণ মোবাইল নম্বর ও সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে প্রযুক্তি ও ম্যানুয়াল উভয় পদ্ধতিতেই অনুসন্ধান চালানো হচ্ছে। তবে, নিহত টিটনের ব্যবহৃত মুঠোফোনটি খুনিরা নিয়ে যাওয়ায় তদন্তে প্রত্যাশিত অগ্রগতি হচ্ছে না। ফোনটি উদ্ধার করা গেলে হত্যাকারীদের শনাক্ত করা সহজ হতো। টিটন হত্যাকাণ্ডে অপরাধ জগতের দুই শীর্ষ সন্ত্রাসী—পিচ্চি হেলাল ও সানজিদুল ইসলাম ইমনের নাম সন্দেহের তালিকায় রয়েছে।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ইরফান খান বলেন, ‘হত্যাকারীরা মোটরসাইকেলে করে মোহাম্মদপুরের দিকে পালিয়ে গেছে এবং রায়েরবাজারের পর তাদের অবস্থান চিহ্নিত করা সম্ভব হয়নি। ভিকটিমের মোবাইল ফোন নিয়ে যাওয়া, মাস্ক ও হেলমেট পরিহিত অবস্থায় সিসিটিভি ক্যামেরাকে ফাঁকি দেওয়া— সবমিলিয়ে এটি একটি শতভাগ সুপরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। ফলে স্বাভাবিক মামলার চেয়ে এটি উন্মোচনে আমাদের কিছুটা বেশি সময় লাগছে।’
রাজধানীর রামপুরায় প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা হয় পুলিশের তালিকাভুক্ত ‘শীর্ষ সন্ত্রাসী’ ইয়াছিন খান পলাশ ওরফে কাইল্যা পলাশকে (৫০)। গত ১২ জুন বেলা পৌনে ২টার দিকে বাংলাদেশ টেলিভিশন (বিটিভি) ভবনের উল্টো দিকে নিজ বাসার কাছেই দুর্বৃত্তদের গুলিতে মারাত্মক আহত হন তিনি। এক সপ্তাহ চিকিৎসাধীন থাকার পর ১৯ জুন রাতে ঢাকার এভারকেয়ার হাসপাতালে তার মৃত্যু হয়। একটি হত্যা মামলায় যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত পলাশ দীর্ঘ প্রায় দুই দশক কারাগারে থাকার পর মাত্র এক মাস আগে জামিনে মুক্ত হয়েছিলেন।
এ ঘটনায় নিহত পলাশের স্ত্রী মাহমুদা খানম বাদী হয়ে হাতিরঝিল থানায় হত্যাচেষ্টা এবং পরে তা হত্যা মামলায় রূপান্তরিত করে একটি মামলা দায়ের করেন। এতে বিদেশে অবস্থানরত শীর্ষ সন্ত্রাসী জিসান আহমেদ ওরফে মন্টীকে প্রধান আসামি করা হয়। চাঞ্চল্যকর এই ঘটনায় এখন পর্যন্ত দুজনকে গ্রেপ্তার করা হলেও হত্যাকাণ্ডের মূল রহস্য এখনও উদ্ঘাটিত হয়নি।
মামলার সার্বিক বিষয়ে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) তেজগাঁও বিভাগের উপ-কমিশনার (ডিসি) মো. জিয়াউদ্দিন আহম্মেদ বলেন, ‘মামলার প্রধান আসামি ও মূল সন্দেহভাজন শীর্ষ সন্ত্রাসী জিসান বর্তমানে বিদেশে অবস্থান করছেন। তাকে দেশে ফিরিয়ে আনা এখনও সম্ভব হয়নি। তবে, এ ঘটনায় দুই আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং মামলার তদন্ত কাজ অব্যাহত রয়েছে।’
রাজধানীর আলোচিত হত্যাকাণ্ডের একটি পল্লবী থানা যুবদলের সদস্য সচিব গোলাম কিবরিয়া (৫০) হত্যা। গত বছরের ১৭ নভেম্বর মিরপুরের একটি দোকানে ঢুকে মুখাবৃত তিন সন্ত্রাসী এলোপাতাড়ি গুলি চালিয়ে তাকে হত্যা করে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মতে, এই হত্যাকাণ্ডের মূল পরিকল্পনাকারী ও মাস্টারমাইন্ড ছিলেন দুবাইফেরত শীর্ষ সন্ত্রাসী সোহেল ওরফে ‘পাতা সোহেল’ (মনির হোসেন) এবং মাসুম ওরফে ‘ভাগিনা মাসুম’। কিলিং মিশন চলাকালে তারা ঘটনাস্থলে সরাসরি উপস্থিত ছিলেন।
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, পল্লবীর অপরাধ জগৎ, চাঁদাবাজি ও দখলদারিত্বে জড়িত ‘পাতা সোহেল’ ঘটনার প্রায় আড়াই মাস আগে দুবাই থেকে দেশে ফেরেন। এলাকায় নিজের পুরোনো আধিপত্য পুনরুদ্ধারে নামলে যুবদল নেতা কিবরিয়া তাতে বাধা হয়ে দাঁড়ান। আর সেই পথ পরিষ্কার করতেই পাতা সোহেল ও ভাগিনা মাসুমের নির্দেশে এই হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়।
এ ঘটনায় নিহত কিবরিয়ার স্ত্রী সাবিহা আক্তার দিনা বাদী হয়ে পল্লবী থানায় একটি হত্যা মামলা করেন। এতে জনি ভূঁইয়া, পাতা সোহেল, সোহাগ ওরফে কাল্লু, ভাগিনা মাসুম ও রোকনসহ নামীয় পাঁচজন এবং অজ্ঞাতপরিচয় আরও ৭-৮ জনকে আসামি করা হয়।
তবে, তদন্তের গতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ ও অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন নিহত কিবরিয়ার স্ত্রী সাবিহা আক্তার। তিনি বলেন, তদন্তে মূল হোতাদের নাম উঠলেও ডিবি পুলিশ প্রধান আসামিদের কাউকেই গ্রেপ্তার করতে পারেনি। এমনকি নির্দেশদাতারাও ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাওয়ায় ন্যায়বিচার পাওয়া নিয়ে সংশয় তৈরি হয়েছে।
সার্বিক অগ্রগতি সম্পর্কে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) মিরপুর বিভাগের উপ-কমিশনার (ডিসি) মো. রাকিব খান ঢাকা পোস্ট-কে বলেন, ‘ঘটনায় এ পর্যন্ত পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং নেপথ্যের মূল কারিগরদের গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। মামলার উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে, দ্রুতই তদন্ত শেষ করে আদালতে চার্জশিট দাখিল করা হবে।’
রাজধানীর পল্লবী থানার সিরামিক রোড এলাকায় নিজ গ্রুপের অভ্যন্তরীণ কোন্দল এবং এলাকার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দ্বন্দ্বের জেরে কুপিয়ে হত্যা করা হয় বাবু ওরফে ‘ব্লেড বাবু’কে (৩২)। ২০২৫ সালের ২০ জানুয়ারি বিকেল পৌনে ৪টার দিকে পল্লবীর ১২ নম্বর সেকশনের বঙ্গবন্ধু কলেজের পাশের নতুন রাস্তায় তার ওপর হামলা চালানো হয়। চাপাতি, সুইচ গিয়ার চাকু ও ইট দিয়ে থেঁতলে গুরুতর আহত করার পর কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান। পরদিন ২১ জানুয়ারি নিহতের স্ত্রী রাবেয়া আক্তার মিম বাদী হয়ে পল্লবী থানায় একটি হত্যা মামলা করেন।
মামলার বিষয়ে পল্লবী থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) আবু সাবাহ বলেন, নিহত ব্লেড বাবু নিজেও চিহ্নিত সন্ত্রাসী ছিলেন। তার বিরুদ্ধে হত্যা, ছিনতাই ও সন্ত্রাসী কার্যক্রমসহ নানা অপরাধের একাধিক মামলা ছিল। মূলত গ্রুপের ভেতরের দ্বন্দ্বের কারণেই এই হত্যাকাণ্ড ঘটে।
পুলিশ এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত ছয়জনকে গ্রেপ্তার করেছে। তারা হলেন—রাজন ওরফে পিচ্চি রাজন (৩৫), রনি (২৬), মো. মুরাদ (২৭), ইরফান হোসেন তুফান (১৯), রাব্বি ওরফে কুত্তা রাব্বি (১৮) ও সাজ্জাদ।
স্থানীয় সূত্রের খবর, পল্লবী এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে ব্লেড বাবুর সঙ্গে সন্ত্রাসী মুসার বিরোধ চলছিল। সেই জের ধরে বিকেলে মুসার লোকজন ডেকে নিয়ে তাকে নির্মমভাবে কুপিয়ে হত্যা করে। অভিযুক্ত মুসা সাবেক সংসদ সদস্য আউয়ালের অনুসারী এবং অবিভক্ত মতিঝিল থানা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক জাহিদুল ইসলাম টিপু হত্যা মামলার অন্যতম প্রধান আসামি। টিপু হত্যার মূল পরিকল্পনাকারী হিসেবে ওমান থেকে তাকে দেশে ফিরিয়ে এনেছিল ডিবি। সম্প্রতি টিপু হত্যা মামলায় জামিনে মুক্ত হয়ে তিনি আবারও অপরাধে জড়ান এবং ব্লেড বাবু হত্যা মামলার ১ নম্বর আসামি হন। তবে, পুলিশ তাকে এখনও গ্রেপ্তার করতে পারেনি।
সার্বিক তদন্ত সম্পর্কে পল্লবী থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. হাসান বাসির বলেন, ‘পেপার সানি হত্যা মামলার চার্জশিট দেওয়া হলেও ব্লেড বাবু হত্যা মামলার তদন্ত কার্যক্রম এখনও চলমান। মামলার মূল আসামি পলাতক রয়েছে এবং তাকে গ্রেপ্তারে জোর চেষ্টা চালানো হচ্ছে।’
২০২৫ সালের ২০ মার্চ রাতে রাজধানীর গুলশানের পুলিশ প্লাজার সামনে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা হয় সুমন মিয়া ওরফে ‘টেলি সুমন’কে। ইন্টারনেট সংযোগের ব্যবসা ও এলাকাভিত্তিক আধিপত্য নিয়ে বিরোধের জের ধরে এই হত্যাকাণ্ড ঘটে। মহাখালী এলাকার ‘সেভেন স্টার গ্রুপ’ এই খুনে জড়িত বলে সুমনের পরিবার দাবি করলেও, পরবর্তী তদন্তে উঠে আসে দুটি সন্ত্রাসী গ্রুপের কোন্দলের চিত্র। ঘটনার পরদিন নিহতের স্ত্রী মৌসুমী আক্তার বাদী হয়ে গুলশান থানায় একটি হত্যা মামলা করেন।
আলোচিত এই হত্যাকাণ্ডের মূল মাস্টারমাইন্ড ওয়াসির মাহমুদ সাঈদ ওরফে ‘বড় সাঈদ’ (৫৯) এবং সরাসরি কিলিং মিশনে অংশ নেওয়া মামুন ওরফে বেলালকে (৪২) গ্রেপ্তার করে র্যাব।
র্যাবের তদন্তে জানা যায়, গুলশান ও বাড্ডা এলাকার বিভিন্ন শপিং মল ও মার্কেটে চাঁদাবাজির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ‘মেহেদী গ্রুপ’-এর সঙ্গে ‘রবিন গ্রুপ’-এর অনুসারী সুমনের মারাত্মক বিরোধ তৈরি হয়। গত ৫ আগস্ট সরকার পতনের পর মেহেদী বিদেশে পালিয়ে গিয়ে তার সেকেন্ড-ইন-কমান্ড বড় সাঈদের মাধ্যমে এলাকা থেকে চাঁদা তুলছিল। অন্যদিকে, পটপরিবর্তনের সুযোগ নিয়ে রবিন গ্রুপের পক্ষে টেলি সুমন ওই এলাকার চাঁদাবাজির নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা করেন। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে শীর্ষ সন্ত্রাসী মেহেদীর নির্দেশে বড় সাঈদ ও তার দল সুমনকে হত্যার এই ছক বাস্তবায়ন করে।
গুলশানে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের (ডিএনসিসি) মার্কেটে দোকান বরাদ্দ, কেব্ল টিভি ও ইন্টারনেট ব্যবসা এবং বাড্ডা এলাকার চাঁদাবাজির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দুই সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর রক্তক্ষয়ী দ্বন্দ্বে খুন হন গুলশান থানা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক কামরুল আহসান সাধন। ২০২৫ সালের ২৫ মে রাত সোয়া ১০টার দিকে মধ্য বাড্ডার গুদারাঘাট ৪ নম্বর গলিতে তাকে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা।
তদন্তে উঠে আসে, সাধন বাড্ডার ‘রবিন-ডালিম-মাহবুব’ গ্রুপের অন্যতম প্রধান মাহবুবের মামা ছিলেন। এর আগে টেলি সুমনকে হত্যার বদলা নিতেই আমেরিকায় অবস্থানরত শীর্ষ সন্ত্রাসী ও তিতুমীর কলেজের সাবেক ছাত্রলীগ নেতা মেহেদী ওরফে কলিন্সের নির্দেশে এই হত্যাকাণ্ড ঘটায় প্রতিপক্ষ ‘মেহেদী গ্রুপ’। এ ঘটনায় সাধনের স্ত্রী দিলরুবা আক্তার বাদী হয়ে বাড্ডা থানায় একটি হত্যা মামলা করেন।
হত্যাকাণ্ডটি অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে তিনটি লেয়ারে ‘স্লিপার সেল’ স্টাইলে পরিচালনা করা হয়। চাঞ্চল্যকর তথ্য হলো, বিদেশের ছক অনুযায়ী এই কিলিং মিশন সমন্বয় ও নিয়ন্ত্রণ করেন শতভাগ সরকারি মালিকানাধীন ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেডের (ডিএমটিসিএল) সেফটি অ্যান্ড সিকিউরিটি অফিসার মিজানুর রহমান মিমি।
সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে প্রথমে মিমকে হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করে ডিবি। পরে তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে মূল দুই শুটার হৃদয় ও মুন্নাকে গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তার তিনজনই অপরাধ স্বীকার করে আদালতে জবানবন্দি দিয়েছেন।
মামলার সার্বিক অগ্রগতি নিয়ে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) গুলশান বিভাগের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার (এডিসি) সোনাহর আলী শরীফ বলেন, ‘মামলার তদন্ত প্রায় শেষ পর্যায়ে, মাসখানেকের মধ্যেই আদালতে চার্জশিট দাখিল করা সম্ভব হবে। কিলিং মিশনে সরাসরি জড়িত চারজনের মধ্যে তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পলাতক জাহিদুর রহমানকে গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে।’ এছাড়া পূর্বে আলোচিত টেলি সুমন হত্যা মামলাটি আদালতের নির্দেশে বর্তমানে সিআইডিতে হস্তান্তরিত হয়েছে বলেও জানান তিনি।
রাজধানীর মগবাজার ও হাতিরঝিল এলাকায় অপরাধ জগতের নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে শীর্ষ সন্ত্রাসী সুব্রত বাইনের সঙ্গে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে বলি হন স্থানীয় যুবদল নেতা আরিফ শিকদার। ২০২৫ সালের ১৯ এপ্রিল রাতে হাতিরঝিল থানার ‘দি ঝিল ক্যাফে’-এর সামনে তাকে লক্ষ্য করে গুলি চালায় দুর্বৃত্তরা। গুরুতর অবস্থায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ২১ এপ্রিল তিনি মারা যান। আরিফ ঢাকা মহানগর উত্তরের ৩৬ নম্বর ওয়ার্ড যুবদলের সহক্রীড়া সম্পাদক ছিলেন।
এ ঘটনায় নিহতের বোন রিমা আক্তার বাদী হয়ে সুব্রত বাইনসহ ১০ জনের নাম উল্লেখ করে হাতিরঝিল থানায় একটি হত্যা মামলা করেন। মামলার পর একই বছরের মে মাসে কুষ্টিয়া শহর থেকে ইন্টারপোলের রেড নোটিশভুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসী সুব্রত বাইনকে গ্রেপ্তার করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। পরবর্তীতে তদন্তের ভিত্তিতে তার মেয়ে খাদিজাকেও গ্রেপ্তার করা হয়।
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট-পরবর্তী প্রেক্ষাপটে মগবাজার ও হাতিরঝিল এলাকায় পুনরায় নিজেদের একক আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিল সুব্রত বাইন ও তার বাহিনী। ওই এলাকায় আরিফ শিকদারকে নিজেদের রাজনৈতিক ও স্থানীয় প্রতিপক্ষ মনে করতেন সুব্রত বাইন। মূলত সুব্রত বাইন ও তার মেয়ে খাদিজার প্রত্যক্ষ প্ররোচনা ও মাস্টারপ্ল্যানেই আরিফকে হত্যা করা হয়। পুলিশ জানিয়েছে, খাদিজার প্রত্যক্ষ সম্পৃক্ততার যথেষ্ট তথ্য-প্রমাণ মিলেছে এবং মামলাটির তদন্ত বর্তমানে শেষ পর্যায়ে রয়েছে।
পুরোনো বন্ধু ইমনের সঙ্গে দ্বন্দ্বে বলি শীর্ষ সন্ত্রাসী মামুন
অপরাধ জগতের নিয়ন্ত্রণ ও পুরোনো বিরোধের জেরে নিজ জোটের সঙ্গীর হাতেই খুন হন পুরান ঢাকার তালিকাভুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসী তারিক সাইফ মামুন (৫৫)। ২০২৫ সালের ১০ নভেম্বর পুরান ঢাকার সূত্রাপুরে দিনদুপুরে তাকে গুলি করে হত্যা করা হয়। স্বজনদের সূত্রে জানা যায়, একটি পুরোনো মামলায় আদালতে হাজিরা দিয়ে আফতাবনগরের বাসায় ফেরার পথে তার ওপর হামলা চালায় দুর্বৃত্তরা। দুই বছর আগেও তেজগাঁও এলাকায় তাকে একবার হত্যার চেষ্টা করা হয়েছিল। ঘটনার পাঁচ দিন পর ১৫ নভেম্বর মামুনের স্ত্রী বিলকিস আক্তার রীপা বাদী হয়ে অজ্ঞাতপরিচয় ১০-১২ জনের বিরুদ্ধে সূত্রাপুর থানায় মামলা করেন।
হত্যাকাণ্ডে সরাসরি অংশ নেওয়া দুই শুটারসহ পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। তারা হলেন— ফারুক ওরফে কুত্তা ফারুক, রবিন, ইউসুফ, রুবেল ও শামীম। ডিএমপির লালবাগ বিভাগ জানায়, ফারুক ও রবিন পেশাদার শুটার। গ্রেপ্তারের সময় হত্যায় ব্যবহৃত দুটি পিস্তল, পারিশ্রমিকের নগদ টাকা ও মোটরসাইকেল উদ্ধার করা হয়েছে।
পুলিশ সূত্রে জানা যায়, নিহত মামুন ও শীর্ষ সন্ত্রাসী সানজিদুল ইসলাম ইমন একসময় ঘনিষ্ঠ সহযোগী ছিলেন। ধানমন্ডি, মোহাম্মদপুর ও তেজগাঁও এলাকায় তাদের আধিপত্যের কারণে গড়ে উঠেছিল কুখ্যাত ‘ইমন-মামুন’ বাহিনী। তারা দুজনই চিত্রনায়ক সোহেল চৌধুরী এবং সাবেক সেনাপ্রধান আজিজ আহমেদের ভাই সাঈদ আহমেদ টিপু হত্যা মামলার অন্যতম আসামি। তবে, অপরাধ জগতের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে পরবর্তীতে তাদের মধ্যে তীব্র বিরোধ তৈরি হয়। মামুন হত্যাকাণ্ডে প্রধান সন্দেহভাজন হিসেবে ইমনের নাম এলেও তাকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ।
তদন্তের অগ্রগতি সম্পর্কে ডিবি লালবাগ বিভাগের এক কর্মকর্তা ঢাকা পোস্ট-কে বলেন, ‘হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে ইমনের নাম আলোচনায় এলেও জিজ্ঞাসাবাদ বা তদন্তে এখনও তার সরাসরি সম্পৃক্ততার নির্ভরযোগ্য প্রমাণ মেলেনি। এ ঘটনায় রনি ও সম্রাট নামের দুজন আসামি পলাতক রয়েছে। তাদের গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত আছে। মামলার তদন্ত প্রায় শেষ পর্যায়ে, খুব শিগগিরই আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করা হবে।’
বিদেশে থাকা শীর্ষ সন্ত্রাসীর চুক্তিতে খুন স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা মুসাব্বির
বিদেশে অবস্থানরত এক শীর্ষ সন্ত্রাসীর টাকার চুক্তিতে ভাড়াটে খুনিদের হাতে নির্মমভাবে প্রাণ হারান ঢাকা মহানগর উত্তর স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আজিজুর রহমান মুসাব্বির। চলতি বছরের ৭ জানুয়ারি রাত সোয়া ৮টার দিকে বাড়ি ফেরার পথে তেজগাঁওয়ের তেজতুরী বাজারে স্টার কাবাবের পেছনের গলিতে তাকে লক্ষ্য করে গুলি চালায় দুর্বৃত্তরা।
এ সময় মুসাব্বিরের সঙ্গে থাকা আবু সুফিয়ান নামের অপর এক ব্যক্তিও গুলিবিদ্ধ হন। স্থানীয়রা তাদের উদ্ধার করে প্রথমে বিআরবি হাসপাতাল এবং পরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসক মুসাব্বিরকে মৃত ঘোষণা করেন। এ ঘটনায় নিহতের স্ত্রী সুরাইয়া বেগম বাদী হয়ে তেজগাঁও থানায় একটি হত্যা মামলা করেন। চাঞ্চল্যকর এ মামলায় এক শুটারসহ চারজনকে গ্রেপ্তার করেছে গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)।
ডিবি পুলিশ সূত্রে জানা যায়, হত্যাকাণ্ডের আগের দিন ৬ জানুয়ারি ‘রিয়াজ’ নামের এক সহযোগী ঘটনাস্থল রেকি করে যায়। কিলিং মিশনে দুটি আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করা হয়— যার একটি দিয়ে গ্রেপ্তার হওয়া শুটার জিনাত এবং অন্যটি দিয়ে পলাতক রহিম গুলি চালান।
সার্বিক বিষয়ে ডিবির অতিরিক্ত কমিশনার মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, গ্রেপ্তারদের মধ্যে শুটার জিনাত এবং এ হত্যাকাণ্ডের মূল সমন্বয়কারী বিল্লাল হোসেন রয়েছেন। মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে চুক্তিবদ্ধ হয়ে বিল্লাল এই কিলিং মিশন সাজান এবং এতে তার দুই ভাই কাদির ও রহিমকে যুক্ত করেন। কাদির গ্রেপ্তার হলেও রহিম এখনও ধরাছোঁয়ার বাইরে। ঘটনার প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটনের পাশাপাশি হত্যায় ব্যবহৃত মূল অস্ত্রের উৎস সন্ধান ও উদ্ধারে ডিবি পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
আইনি প্রমাণের জটিলতা ও ব্যালিস্টিক রিপোর্টের অপেক্ষা
ঢাকার আলোচিত ১১ হত্যাকাণ্ডের তদন্তে ডিএমপির এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ঢাকা পোস্ট-কে বলেন, ‘মামলায় বিভিন্ন এলাকার পেশাদার অপরাধী ও শীর্ষ সন্ত্রাসীদের নাম উঠে এলেও আইনি প্রক্রিয়ায় আদালতের কাছে প্রমাণের জন্য প্রয়োজনীয় সাক্ষ্য মিলছে না। সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ কিংবা উন্নত প্রযুক্তিগত সহায়তা নেওয়ার পরও নিশ্চিতভাবে তাদের সম্পৃক্ততা প্রমাণ করা বেশ কঠিন হয়ে পড়ছে।’
তবে, ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ডিবি) মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘তদন্তাধীন স্পর্শকাতর বিষয়ে শতভাগ নিশ্চিত না হয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু বলতে চাচ্ছি না। আলোচিত প্রায় সব মামলার তদন্তেই উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি রয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘বেশ কয়েকটি ঘটনার তদন্ত শেষ পর্যায়ে হলেও প্রতিবেদনগুলো মূলত ব্যালিস্টিক পরীক্ষার ফলাফলের জন্য আটকে আছে। প্রয়োজনীয় কারিগরি ও বৈজ্ঞানিক তথ্য-প্রমাণ নিশ্চিত করেই আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেওয়া হবে। অচিরেই অন্তত দুটি আলোচিত হত্যা মামলার তদন্ত প্রতিবেদন আদালতে দাখিল করা সম্ভব হবে।’
