ঢাকার ধামরাই খাসজমির ‘দখল’ বিক্রি

নিজস্ব প্রতিবেদক : অভাবের তাড়নায় সিরাজগঞ্জের চৌহালী উপজেলার সৈলজানা গ্রামের কৃষক আব্দুস সালাম বছর সাতেক আগে স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে ঢাকার সাভারে চলে আসেন। তিনি সাভারের নামাবাজারে শ্রমিকের কাজ করেন। পরিবার নিয়ে সেখানেই ভাড়া থাকতেন একটি ছোট্ট ঘরে। ওই এলাকার এক জমি ব্যবসায়ীর প্ররোচনায় পাঁচ বছর আগে পাশের ধামরাইয়ের বড় কুশিয়ারা মৌজায় সাড়ে ৩ শতাংশ খাসজমির ‘দখল’ কিনে নেন। শতাংশপ্রতি ৪০ হাজার করে টাকা নিয়ে একটি স্ট্যাম্পের মাধ্যমে তাঁকে জমির দখল বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে। সেখানে ঘর তুলে বসবাস করছেন সালাম।

শুধু আব্দুস সালাম নন, তাঁর দুই ভাইসহ কয়েক শ পরিবার টাকার বিনিময়ে বড় কুশিয়ারা মৌজায় খাসজমির ‘দখল কিনে’ বসতি স্থাপন করেছেন, যাদের অধিকাংশই চৌহালীর বাসিন্দা। এ কারণে ওই এলাকার (বড় কুশিয়ারা) নাম বদলে হয়ে গেছে সিরাজগঞ্জপাড়া।

এলাকার লোকজন জানান, প্রতারণার অভিযোগে বন্ধ হয়ে যাওয়া বেসরকারি প্রতিষ্ঠান যুবকের কর্মকর্তারা ২০০৪ সালে বড় কুশিয়ারা মৌজায় বংশী নদীর তীরে খাসজমিতে বাংলো নির্মাণ করে ধামরাইয়ে তাঁদের কার্যক্রম শুরু করেছিলেন। তাঁরা পর্যায়ক্রমে বড় কুশিয়ারা মৌজার সব খাসজমির দখল নিয়ে প্লট করে টাকার বিনিময়ে তা হস্তান্তরের পরিকল্পনা করছিলেন। কিন্তু নানা অভিযোগে যুবকের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে গেলে কর্মকর্তারা গা ঢাকা দেন। তবে স্থানীয় প্রভাবশালীদের মাধ্যমে খাসজমি তাঁদের দখলে রেখেছিলেন। পরবর্তী সময়ে আব্দুল করিম, সালমান নামের দুই ব্যক্তি যুবকের সাবেক কর্মকর্তা সিরাজ উদ্দিনের সঙ্গে যোগাযোগ করে ওইসব খাসজমি বিক্রির দায়িত্ব নেন। এরপর তাঁরা সিরাজ উদ্দিনের মাধ্যমে টাকার বিনিময়ে অধিকাংশ খাসজমির দখল হস্তান্তর শুরু করেন। এ ছাড়া সালমান নিজেও স্ট্যাম্প করে দিয়ে খাসজমির দখল হস্তান্তর করে টাকা হাতিয়ে নেন।

স্থানীয় ইউনিয়ন ভূমি কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ধামরাইয়ের কুল্লা ইউনিয়নের বড় কুশিয়ারা মৌজায় বংশী নদীর তীরে প্রায় ১১৭ বিঘা খাসজমি রয়েছে। এসব জমিতে সরকারের কোনো নজরদারি ছিল না। এই সুযোগে আব্দুল করিম, সালমান ও সিরাজ উদ্দিনসহ কতিপয় ব্যক্তি ওইসব খাসজমি নিজেদের কবজায় নিয়ে স্ট্যাম্পের মাধ্যমে দখল হস্তান্তর করেন। এর বিনিময়ে তাঁরা শতাংশপ্রতি ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকা হাতিয়ে নেন। এভাবে প্রায় ৪০০ পরিবারের কাছ থেকে তাঁরা অন্তত ১০ কোটি টাকা আদায় করেন।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আব্দুল করিম ও সালমান একসময় সিরাজগঞ্জের চৌহালী উপজেলার বাসিন্দা ছিলেন। বেশ কয়েক বছর আগে তাঁরা সাভারে চলে আসেন। সাভারের পোড়াবাড়ি এলাকায় বিয়ে করে সালমান সেখানেই থেকে যান। করিম বড় কুশিয়ারা মৌজায় বাড়ি করে জমির ব্যবসা শুরু করেন।

বড় কুশিয়ারা মৌজায় বংশী নদীর তীরে সাড়ে ৭ শতাংশ খাসজমির দখল কিনেছেন চৌহালীর সৈলজানা গ্রামের কৃষক সোলায়মান ব্যাপারী। মাস দুয়েক আগে ওই জমিতে তিনি বড় দুটি টিনের ঘর তুলেছেন।

জানতে চাইলে সোলায়মান ব্যাপারী বলেন, ‘বছরখানেক আগে সালমানের কাছ থেকে ৩ লাখ টাকায় তিনি ওই জমির দখল কিনেছেন। তিনি (সালমান) ওই জমির ইজারাদার দাবি করে তাঁকে একটি স্ট্যাম্প করে দিয়েছেন।’

সোলায়মান ব্যাপারীর প্রতিবেশী আব্দুল হামিদ বলেন, কয়েক বছর আগে সালমান নদীতীরে কয়েক বিঘা জমি ভরাট করে বেশ কয়েকজনের কাছে ওই জমির দখল হস্তান্তর করেছেন। তাঁদের কাছ থেকে শতাংশপ্রতি ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকা নিয়ে সালমান স্ট্যাম্প করে দিয়েছেন। তিনি (হামিদ) নিজেও একইভাবে ৫ শতাংশ জমির দখল নিয়ে বসবাস করছেন।

সরকারি জমি টাকার বিনিময়ে কেন কিনেছেন—এমন প্রশ্নের জবাবে স্থানীয় মাদ্রাসার শিক্ষক ইব্রাহীম মিয়া বলেন, ‘আমাদের মাথা গোঁজার একটা ঠাঁই দরকার ছিল। কিন্তু টাকা ছাড়া কেউ খাসজমিতে বাড়ি করার সুযোগ দিচ্ছিলেন না। তাই জেনে-বুঝেই টাকার বিনিময়ে সরকারি জমির দখল নিয়ে বসবাস করে যাচ্ছি।’

যোগাযোগ করা হলে সালমান বলেন, ‘স্ট্যাম্পের মাধ্যমে জমির দখল হস্তান্তর করেছি, কিন্তু টাকা নিইনি।’

আব্দুল করিমও দাবি করেন, তিনি কোনো খাসজমি বিক্রি বা দখল হস্তান্তর করেননি। তবে ক্রেতা সেজে যোগাযোগ করলে আব্দুল করিম বলেন, ‘আমার কাছে অনেক প্রকারের জমি আছে ভাই। তিন পরচা, দুই পরচা ও এক পরচায় মালিকসহ খাসজমিও আছে। যেমন টাকা তেমন জমি। কম টাকায় কিনতে চাইলে খাসজমি কিনতে পারেন।’

মুঠোফোন বন্ধ থাকায় সিরাজ উদ্দিনের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। তাঁর সুনির্দিষ্ট ঠিকানাও কেউ বলতে পারেননি।

জানতে চাইলে ধামরাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) হোসাইন মোহাম্মদ হাই জকী বলেন, ‘বিষয়টি আমার জানা ছিল না। খোঁজখবর নিয়ে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’