
গাজী আবু বকর : প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান শিখা অনির্বাণ নিভানোর তথ্যের সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি জানিয়েছেন, দুর্নীতির বিষয়ে সাবেক অন্তর্বর্তী, আওয়ামী লীগ কিংবা বর্তমান ক্ষমতাসীন বিএনপির সরকারের ক্ষেত্রেও ছাড় দেওয়া হবে না। তিনি শেখ হাসিনার বক্তব্য প্রচারে গণমাধ্যমগুলোকে সতর্ক হওয়ারও আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘বর্তমান প্রেক্ষাপটে কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা অবস্থায় ‘রিফাইন্ড’ হোক বা অন্য কোনো নামে হোক, আওয়ামী লীগ কোনো কর্মসূচি চালাতে পারবে না। আজ মঙ্গলবার সকালে সচিবালয়ে তথ্য অধিদপ্তরের (পিআইডি) সম্মেলন কক্ষে সরকারের বিভিন্ন কার্যক্রমের অগ্রগতি বিষয়ে আয়োজিত সাপ্তাহিক প্রেস ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব কথা বলেন।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে আত্মোৎসর্গকারী বীর সৈনিকদের স্মৃতিকে অম্লান করে রাখতে ঢাকা সেনানিবাসের কেন্দ্রীয় মসজিদ এবং কুর্মিটোলা গলফ ক্লাবের সংলগ্ন এলাকায় অবস্থিত স্মৃতিস্তম্ভের শিখা অনির্বাণ নিভানো হয়েছে মর্মে সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন মাধ্যমে প্রচারণার বিষয়ে সরকারের ভাষ্য কি জানতে চাইলে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচারবিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান প্রশ্নকারী সাংবাদিকের প্রতি পাল্টা প্রশ্ন ছুঁড়ে শিখা অনির্বাণ নিভানোর তথ্যের সত্যতা জানতে চান।
আওয়ামী লীগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, যতদিন দলটি নিষিদ্ধ আছে ততদিন রিফাইন্ড বা তৃণমূল কোনো নামে তারা কার্যক্রম চালাতে পারবে না। জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানে প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনার বক্তব্য প্রচারে আদালতের নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও দেশের কিছু গণমাধ্যমে তা প্রচার করা হচ্ছে বলে মন্তব্য করে তিনি বলেন, এ ধরনের প্রচার আদালতের নির্দেশনার পরিপন্থী এবং গণমাধ্যমগুলোর উচিত আইন ও আদালতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থেকে এ ধরনের প্রচার থেকে বিরত থাকা।
এ প্রসঙ্গে তথ্য উপদেষ্টা আরও বলেন, বর্তমান প্রযুক্তির যুগে বিদেশি গণমাধ্যম বা অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে মানুষ বিভিন্ন তথ্য জানতে পারে। তবে সেটি দেশীয় গণমাধ্যমে প্রচারের বৈধতা তৈরি করে না। আদালতের নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকা পর্যন্ত এ ধরনের প্রচার অনুচিত বলেও মন্তব্য করেন তিনি। একই সঙ্গে তিনি ইঙ্গিত দেন, ভবিষ্যতে প্রয়োজন হলে সরকার বিষয়টি নিয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বিবেচনা করতে পারে।
ব্রিফিংয়ে ‘রিফর্মড’ বা নতুন নামে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম পরিচালনার সম্ভাবনা নিয়ে প্রশ্ন করা হলে ডা. জাহেদ উর রহমান বলেন, আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কর্মসূচি যতদিন নিষিদ্ধ থাকবে, ততদিন দলটি যে নামেই আসুক না কেন ‘রিফর্মড আওয়ামী লীগ’, ‘তৃণমূল আওয়ামী লীগ’ বা অন্য কোনো নামে তাদের কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচি পরিচালনার সুযোগ নেই।
তিনি বলেন, সরকারের অবস্থান এ বিষয়ে স্পষ্ট। ২০০৯ সালের সন্ত্রাস দমন আইনের সংশোধিত বিধান কার্যকর রেখেই আওয়ামী লীগের কর্মসূচির ওপর নিষেধাজ্ঞা বহাল রাখা হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা অনেক অধ্যাদেশ আইন হিসেবে বহাল না থাকলেও এ সংশোধনী বহাল রাখা হয়েছে, যা সরকারের অবস্থানকে প্রতিফলিত করে।
আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ সম্পর্কে তিনি বলেন, দলটি নিষিদ্ধ থাকবে কি না, সে বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আদালতের। আদালতের সিদ্ধান্ত না আসা পর্যন্ত সরকারের মত হলো, আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কর্মসূচির ওপর নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকা উচিত।
সংবাদ সম্মেলনে দুর্নীতির বিষয়ে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না উল্লেখ করে জাহেদ উর রহমান বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের যেকোনো উপদেষ্টার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ থাকলে দুদক তা স্বাধীনভাবে তদন্ত করলে সরকার সেখানে কোনো বাধা হবে না।
এ সময় উপদেষ্টা জানান, দেশের বিভিন্ন জায়গায় কলেমার পতাকা টানানোর বিষয়টি সরকারের নজরে এসেছে। এর পেছনে কোন সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা আছে কিনা তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এটা বিদেশে বাংলাদেশের জন্য ভালো বার্তা দেয় না বলেও উল্লেখ করেন তিনি। এ নিয়ে সরকার ব্যবস্থা নিতে যাচ্ছে বলে জানান তথ্য উপদেষ্টা।
সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান তিস্তা মহাপরিকল্পনা নিয়ে সরকারের সুদৃঢ় অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করে বলেছেন, বাংলাদেশ একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে জনগণ এবং নিজস্ব স্বার্থ অনুযায়ী তিস্তা প্রকল্প বাস্তবায়ন করবে। এতে অন্য কোনো দেশের ‘কনসার্ন’ থাকার সুযোগ নেই।
তথ্য উপদেষ্টা বলেন, ‘তিস্তা পাড়ের মানুষের সংকট অত্যন্ত গভীর ও মানবিক। বর্ষায় নদীভাঙন এবং শুষ্ক মৌসুমে পানির তীব্র অভাব উত্তরাঞ্চলের মানুষকে চরম সংকটে ফেলে। তিস্তা মহাপরিকল্পনার মূল কাজ নদী শাসন, ড্রেজিং এবং পানি সংরক্ষণ করা। এই কাজে চীনের বিপুল দক্ষতা (এক্সপার্টিজ) এবং প্রয়োজনীয় ফান্ড রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে এই কাজ দ্রুততম সময়ের মধ্যে শুরু করার নির্দেশনা দিয়েছেন।’
প্রকল্পটি নিয়ে ভূ-রাজনৈতিক কোনো চ্যালেঞ্জ রয়েছে কি না- সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে ডা. জাহেদ বলেন, ‘বাংলাদেশ সার্বভৌম দেশ হিসেবে জণগণ ও তার নিজস্ব স্বার্থে পদক্ষেপ নেবে। এই স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব প্রকাশের অধিকার রাষ্ট্রের রয়েছে। আমাদের এই উন্নয়নমূলক পদক্ষেপে অন্য কোনো দেশের কনসার্ন হওয়ার কারণ দেখি না। ভারত বা অন্য যেকোনো দেশ বাংলাদেশের সঙ্গে সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবেই এনগেজ করবে। যদি কারো কোনো সিকিউরিটি বা নিরাপত্তা কনসার্ন থাকেও, বাংলাদেশ তা মাথায় রাখবে। এসব সংবেদনশীল বিষয়ে কোনো আপস না করেই কাজ করবে।’
বিগত আমলের সমালোচনা করে তিনি বলেন, ‘বিগত সরকারের সময় জনগণের স্বার্থ বিকিয়ে দিয়ে শুধু একটি নয়, একাধিক দেশের সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষা করার চেষ্টা করা হয়েছিল। বর্তমান সরকার সেই অবস্থান থেকে পুরোপুরি বেরিয়ে এসেছে। আমরা যেকোনো দেশের সঙ্গে পারস্পরিক ও রাষ্ট্রীয় স্বার্থ রক্ষা করেই কাজ করব।’
জাহেদ উর রহমান আরও বলেন, ‘এই প্রকল্প বা ব্যারাজ নির্মাণের অর্থ এই নয় যে বাংলাদেশ নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা দাবি করা ছেড়ে দিচ্ছে। আমরা তিস্তা ও গঙ্গাসহ অভিন্ন ৫৩টি নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা আদায়ে আমাদের কূটনৈতিক প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছি। তবে নদী শাসন ও সুরক্ষায় অভ্যন্তরীণ ডাউনস্ট্রিম ব্যারাজ প্রকল্পের কাজ নিজেদের স্বার্থেই দ্রুত করতে হবে।’
স্থানীয় সরকার নির্বাচন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বর্তমানে এ নির্বাচনে কোনো রাজনৈতিক দল আনুষ্ঠানিকভাবে অংশ নিচ্ছে না। অতীতে চেয়ারম্যান ও মেয়র পদে দলীয় প্রতীকে নির্বাচন হলেও এখন সেই ব্যবস্থা বাতিল হয়েছে। ফলে বিএনপি, জামায়াত, আওয়ামী লীগ বা অন্য কোনো দল দলীয়ভাবে নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে না।
ব্রিফিংয়ে তথ্য অধিদফতরের প্রধান তথ্য কর্মকর্তা সৈয়দ আবদাল আহমদ এবং মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব রিয়াসাত আল ওয়াসিফ উপস্থিত ছিলেন।
