পাম্পগুলোতে কৃত্রিম তেলসংকট তৈরি করে কালোবাজারি করা হচ্ছে: সংসদে জ্বালানিমন্ত্রী

গাজী আবু বকর : দেশের বিভিন্ন স্থানে এক শ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী অবৈধভাবে জ্বালানি তেলের মজুত ও কালোবাজারি করছে। ফলে পাম্পগুলোতে কৃত্রিম তেলসংকট তৈরি হচ্ছে বলে জানিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী। তিনি বলেন, দেশে বর্তমানে মজুদ গ্যাস দিয়ে ১২ বছর সরবরাহ করা সম্ভব হবে। গতকাল রোববার জাতীয় সংসদে বিরোধীদলের সংসদ সদস্য মাছুম মোস্তফা এবং বগুড়া-৪ আসনের সংসদ সদস্য মো. মোশারফ হোসেনের পৃথক দুটি প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ এ কথা বলেন।

এ প্রসঙ্গে পাম্পগুলোতে কত দিনের অকটেন-ডিজেল মজুত আছে, সংসদে তার জবাব চেয়েছেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২-এর সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা। সেইসঙ্গে জ্বালানির কোনো সংকটই যদি না থাকে, তবে এত লম্বা লাইন কেন-এমন প্রশ্ন রেখেছেন তিনি।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের ১৬তম দিনে দেশের বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে রুমিন এ সবকথা বলেন।

রুমিন তার বক্তব্যে বলেন, ‘মাননীয় স্পিকার কাদম্বরী মরিয়া প্রমাণ করিল, কাদম্বরী মরে নাই। তেলের দাম শেষমেষ বৃদ্ধিই হইলো। কিন্তু তার আগে আমরা দেখলাম কয়েক কিলোমিটার লম্বা লাইন, ড্রাইভাররা মাঝরাত পর্যন্ত অপেক্ষা করছে…তেল পাচ্ছে না। কিন্তু সরকারের কোনো হেলদোল নাই।’

রুমিন অভিযোগ করে বলেন, ‘মন্ত্রীরা সংসদে অবলীলায় বলেন, বাংলাদেশে জ্বালানির কোনো ঘাটতি নাই। কিন্তু তেল নিতে গেলে দেখা যায় ৩ কিলোমিটার লম্বা লাইন।’

রুমিন আরও বলেন, ‘জ্বালানির কোনো সংকটই যদি না থাকে এত লম্বা লাইন কেন, দামই বা বাড়াইতে হয় কেন, অফিস সময় পরিবর্তন করতে হয় কেন? সে সময় পাম্পগুলোতে কত দিনের অকটেন–ডিজেল মজুত আছে, সংসদে জ্বালানি মন্ত্রীর কাছে জবাব চান রুমিন ফারহানা। ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামালের সভাপতিত্বে বৈঠকের শুরুতে প্রশ্নোত্তর টেবিলে উত্থাপিত হয়।

‘দেশে জ্বালানির কোনো সংকট নেই’-সংসদে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলামের এমন বক্তব্য যথার্থ বলে মন্তব্য করেন জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ। তিনি বলেন, সরকার গত বছরের মার্চে যে পরিমাণ জ্বালানি তেল সরবরাহ করেছে, চলতি বছরের মার্চে একই পরিমাণ তেল সরবরাহ করেছে।

ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেন, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ বা বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন থেকে মোটরবাইকে ২০০ টাকার ফুয়েল প্রদান বা রং লাগানোর বিষয়ে কোনো নির্দেশনা দেওয়া হয়নি। তবে ‘প্যানিক বায়িং’ ও মজুতপ্রবণতার কারণে কৃত্রিম সংকট তৈরি হচ্ছে।

ইকবাল হাসান মাহমুদ আরও বলেন, জ্বালানি তেলের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার লক্ষ্যে সারা দেশে জেলা-উপজেলা প্রশাসন ও বিপিসি ট্যাগ অফিসার নিয়োগ করা হয়েছে। প্রতিদিন অবৈধ মজুতদারকে আইনের আওতায় এনে জেল-জরিমানা করা হচ্ছে। মজুত ও কালোবাজারি প্রতিরোধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতা অব্যাহত আছে। এ ছাড়া স্থানীয় প্রশাসনের মাধ্যমে সচেতনতামূলক কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে। সারা দেশে মোবাইল কোর্ট পরিচালনার মাধ্যমে এখন পর্যন্ত ৯ হাজার ১১৬টি অভিযানে ৩ হাজার ৫১০টি মামলা হয়েছে। ১ কোটি ৫৬ লাখ ৯ হাজার ৬৫০ টাকা অর্থদণ্ড আদায় হয়েছে। ৫ লাখ ৪২ হাজার লিটার জ্বালানি তেল উদ্ধার হয়েছে।

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী বলেন, ভোক্তা পর্যায়ে জ্বালানি তেল বিপণনে অধিকতর স্বচ্ছতা আনার লক্ষ্যে সরকার কর্তৃক ঢাকা মহানগরীর কয়েকটি ফিলিং স্টেশনে পরীক্ষামূলকভাবে ফুয়েল কার্ড চালু করা হয়েছে। পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে সফল হলে দেশব্যাপী তা বাস্তবায়ন করা হবে। এই ফুয়েল কার্ডে গ্রাহকদের জ্বালানি তেল সংগ্রহের তথ্য সংরক্ষিত থাকবে।

সরকারি দলের সংসদ সদস্য শামছুর রহমান শিমুল বিশ্বাসের প্রশ্নের জবাবে জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেন, দেশের এলপিজির বাজার প্রায় ৯৮ দশমিক ৬৭ ভাগ আমদানিনির্ভর। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতিতে দেশে এলপিজির সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে আমদানি পরিস্থিতি নিয়মিতভাবে মনিটর করা হচ্ছে। এ লক্ষ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের অ্যাসাইকুডা ওয়ার্ল্ড সিস্টেম থেকে নিয়মিত দেশে এলপিজির আমদানি পরিস্থিতি পর্যালোচনা করা হচ্ছে। কোনো অস্বাভাবিকতা দেখা গেলে সে বিষয়ে আমদানিকারকদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হচ্ছে। তা ছাড়া ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনকে জানানো হচ্ছে।

দেশে মজুদ গ্যাস দিয়ে ১২ বছর চলবে: দেশে মজুদ গ্যাস দিয়ে ১২ বছর সরবরাহ করা সম্ভব হবে বলে জানিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু। জাতীয় সংসদে বগুড়া-৪ আসনের সংসদ সদস্য মো. মোশারফ হোসেনের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা জানান।

লিখিত প্রশ্নের জবাবে ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেন, ‘বর্তমানে দেশে উত্তোলনযোগ্য গ্যাসের মজুদ ২৯ দশমিক ৭৪ ট্রিলিয়ন ঘনফুট। এর মধ্যে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ২২ দশমিক ১১ ট্রিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উত্তোলন করা হয়েছে। ২০২৬ সালের ১ জানুয়ারি পর্যন্ত অবশিষ্ট মজুদ ৭ দশমিক ৬৩ ট্রিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস। নতুন কোনো গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কৃত না হলে এবং বর্তমানে কম-বেশি দৈনিক ১ হাজার ৭০০ মিলিয়ন ঘনফুট হারে গ্যাস সরবরাহ করা হলে ওই অবশিষ্ট ৭ দশমিক ৬৩ ট্রিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস মজুদের ভিত্তিতে আনুমানিক ১২ বছর সরবরাহ করা সম্ভব হবে।

গ্যাস অনুসন্ধানের বিষয়ে তিনি জানান, পেট্রোবাংলার কূপ খনন ও ওয়ার্কওভারের মহাপরিকল্পনার আওতায় মোট ৫০ ও ১০০টি কূপ খননের পরিকল্পনা রয়েছে। এরই মধ্যে ২৬টি কূপ খনন এবং ওয়ার্কওভারের কাজ সম্পন্ন হয়েছে। বাকি কূপগুলোর কাজও বিভিন্ন পর্যায়ে চলমান আছে।

এ ছাড়া সাইসমিক সার্ভে সম্পর্কিত মন্ত্রী জানান, বাপেক্সের মাধ্যমে ব্লক-৭ ও ৯ এ ৩৬০০ কিলোমিটার ২ডি সাইসমিক ডাটা আহরণ শেষ হয়ে ডাটা প্রক্রিয়াকরণের কাজ চলছে।

পাশাপাশি বিজিএফসিএলর মাধ্যমে হবিগঞ্জ, বাখরাবাদ ও মেঘনার ১৪৫০ বর্গকিলোমিটার এলাকায় ৩ডি সাইসমিক ডাটা আহরণ কার্যক্রম শুরুর প্রস্তুতি চলছে। এ ছাড়া বাপেক্স ও এসজিএফএলের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন এলাকায় আরো বিপুল পরিমাণ ৩ডি সাইসমিক জরিপ সম্পাদনের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে।

Share