
নয়াবার্তা প্রতিবেদক : বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের দুই প্রধান রপ্তানি গন্তব্য ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) ও যুক্তরাষ্ট্র। দেশের মোট তৈরি পোশাক রপ্তানির প্রায় ৭০ শতাংশই যায় এই দুই বাজারে।
দীর্ঘদিন ধরে বিকল্প হিসেবে সম্ভাবনাময় হয়ে উঠছিল অপ্রচলিত বাজারগুলো। তবে বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সেই বাজারেও বড় ধরনের ধস নেমেছে।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, বিদায়ী অর্থবছরে অপ্রচলিত বাজারে তৈরি পোশাক রপ্তানি ৪ দশমিক ২৯ শতাংশ কমেছে। একই সময়ে প্রধান বাজারগুলোর মধ্যে ইউরোপীয় ইউনিয়নে রপ্তানি ৩ দশমিক ৩১ শতাংশ কমেছে।
তবে যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি ২ দশমিক ৬৩ শতাংশ বেড়েছে। সব মিলিয়ে দেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি কমেছে ১ দশমিক ৬৪ শতাংশ।
২০২৫-২৬ অর্থবছরের পুরো সময়ে তৈরি পোশাক রপ্তানি থেকে বাংলাদেশের আয় হয়েছে ৩৮ দশমিক ৭০ বিলিয়ন ডলার। আগের অর্থবছরে এই আয় ছিল ৩৯ দশমিক ৩৫ বিলিয়ন ডলার।
অপ্রচলিত বাজারগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড় গন্তব্য জাপানে রপ্তানি ১ দশমিক ১৮ বিলিয়ন ডলার থেকে কমে ১ দশমিক ১৩ বিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে। অস্ট্রেলিয়ায় রপ্তানি ৮১৪ মিলিয়ন ডলার থেকে কমে ৭৩৯ মিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। ভারতে ৬৪৪ মিলিয়ন ডলার থেকে কমে হয়েছে ৫৭১ মিলিয়ন ডলার। আর তুরস্কে রপ্তানি ৪৫০ মিলিয়ন ডলার থেকে কমে ৪০১ মিলিয়ন ডলারে নেমেছে।
তবে অপ্রচলিত বাজারের মধ্যে ব্যতিক্রম ছিল ব্রাজিল ও চীন। বিশ্বের বড় তৈরি পোশাক আমদানিকারক এই দুই দেশে বাংলাদেশের রপ্তানি বিদায়ী অর্থবছরে প্রায় ১৭ শতাংশ করে বেড়েছে। এ দুই বাজারে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানির পরিমাণ ২০০ মিলিয়ন ডলারের মধ্যে।
সম্ভাবনাময় হওয়া সত্ত্বেও বিভিন্ন কাঠামোগত সমস্যার কারণে অপ্রচলিত বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি প্রত্যাশিত হারে বাড়ছে না। পাশাপাশি পশ্চিমা অর্থনীতির মন্দার প্রভাব নতুন বাজারগুলোতেও পড়ায় রপ্তানি সম্প্রসারণ কঠিন হয়ে উঠেছে বলে জানিয়েছেন তৈরি পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল।
তিনি বলেন, প্রচলিত বাজারগুলোর মতো অপ্রচলিত বাজারে বাংলাদেশের শক্তিশালী সোর্সিং নেটওয়ার্ক ও ক্রেতাভিত্তিক যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। ফলে সম্ভাব্য ক্রেতাদের সঙ্গে কার্যকর সম্পর্ক তৈরি করা কঠিন হচ্ছে।
মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, দেশের তৈরি পোশাক খাত মূলত ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের বড় আকারের অর্ডার পরিচালনায় অভ্যস্ত। কিন্তু অপ্রচলিত বাজারে সাধারণত ছোট আকারের অর্ডার আসে, যা অনেক বড় কারখানার উৎপাদনব্যবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। ফলে এসব বাজারে প্রতিযোগিতা করা কঠিন হয়ে পড়ে।
তিনি বলেন, নতুন বাজারগুলোর সঙ্গে ব্যাংকিং ও আর্থিক লেনদেনেও জটিলতা রয়েছে। ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের মতো সহজ আর্থিক লেনদেনব্যবস্থা অনেক দেশে নেই। উদাহরণ হিসেবে রাশিয়ার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ব্যাংকিং চ্যানেলের সীমাবদ্ধতার কারণে সেখানে লেনদেন জটিল হয়ে পড়ে।
মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, শক্তিশালী বাজারভিত্তিক নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা, ব্যাংকিং ও আর্থিক লেনদেন সহজ করা, শুল্ক বাধা কমাতে উদ্যোগ নেওয়া এবং সরবরাহব্যবস্থার দক্ষতা বাড়ানো গেলে অপ্রচলিত বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানির সম্ভাবনা অনেকগুণ বাড়বে।
তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের সবচেয়ে বড় বাজার ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) হলেও ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এ অঞ্চলে রপ্তানি ৩ দশমিক ৩১ শতাংশ কমে ১৯ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে। স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বাংলাদেশের উত্তরণের প্রাক্কালে এ প্রবণতাকে বাজার বৈচিত্র্যকরণের চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
অন্যদিকে দেশের প্রধান তিনটি বাজারে রপ্তানি কিছুটা বেড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি ২ দশমিক ৬৩ শতাংশ বেড়ে ৭ দশমিক ৭৪ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। মোট রপ্তানিতে দেশটির অংশীদারিত্ব বেড়ে ২০ দশমিক ১ শতাংশ হয়েছে, যা আগের অর্থবছরে ছিল ১৯ দশমিক ১৮ শতাংশ।
যুক্তরাজ্যে রপ্তানি শূন্য দশমিক ৯১ শতাংশ বেড়ে ৪ দশমিক ৩৯ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। মোট রপ্তানিতে দেশটির অংশীদারিত্ব বেড়ে হয়েছে ১১ দশমিক ৩৪ শতাংশ।
এ ছাড়া কানাডায় রপ্তানি ৩ দশমিক ২০ শতাংশ বেড়ে ১ দশমিক ৩৪ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছে। মোট রপ্তানিতে কানাডার অংশীদারিত্ব বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩ দশমিক ৪৭ শতাংশ।
সব মিলিয়ে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও কানাডায় বাংলাদেশের মোট পোশাক রপ্তানির অংশ এখন ৩৫ শতাংশের বেশি, যা ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারে রপ্তানি কমে যাওয়ার প্রভাব আংশিকভাবে সামাল দিয়েছে।
পণ্যের ধরন অনুযায়ী, নিট পোশাক রপ্তানি ২ দশমিক ৫৩ শতাংশ কমেছে। অন্যদিকে ওভেন পোশাক রপ্তানি তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল ছিল। এ খাতে রপ্তানি কমেছে মাত্র শূন্য দশমিক ৬১ শতাংশ। ফলে পুরো অর্থবছরজুড়ে ওভেন পোশাক নিট পোশাকের তুলনায় ভালো অবস্থানে ছিল।
গত এক বছর বা তারও বেশি সময় ধরে বিশ্ববাজারে নিম্নমুখী প্রবণতা বিরাজ করছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কনীতি এবং বৈশ্বিক শুল্কযুদ্ধের প্রভাব। ফলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে, যার প্রভাব বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতে পড়েছে বলে মনে করেন মহিউদ্দিন রুবেল।
তিনি বলেন, দেশের অন্যতম প্রধান রপ্তানি গন্তব্য ইউরোপে অর্থনৈতিক মন্দা অব্যাহত থাকায় সেখানে প্রত্যাশিত হারে রপ্তানি বাড়ানো সম্ভব হচ্ছে না। একই সময়ে চীন ও ভারত আন্তর্জাতিক বাজারে আরও আগ্রাসী বাণিজ্যিক কৌশল গ্রহণ করেছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য দ্বন্দ্বের প্রেক্ষাপটে চীন মূল্য প্রতিযোগিতার মাধ্যমে ইউরোপের বাজারে নিজেদের অবস্থান আরও শক্ত করার চেষ্টা করছে।
বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণের পথে রয়েছে। এ কারণে ভবিষ্যতে শুল্কমুক্ত বাজারসুবিধা হারানোর আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এই অনিশ্চয়তার কারণে ইউরোপের অনেক ক্রেতা নতুন অর্ডার দেওয়ার ক্ষেত্রে সতর্ক অবস্থান নিচ্ছেন এবং বিকল্প উৎস থেকেও পণ্য সংগ্রহের বিষয়টি বিবেচনা করছেন।
বিজিএমইএর এই সাবেক পরিচালক বলেন, নতুন সরকার লাইসেন্সিং প্রক্রিয়া সহজ করা, ব্যাংকিং সুবিধা বাড়ানো এবং ব্যবসা সহজীকরণের যে উদ্যোগ ও প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, সেগুলোর বাস্তবায়ন অত্যন্ত জরুরি। শুধু নীতিগত ঘোষণা নয়, বাস্তব ক্ষেত্রেও এসব সংস্কারের সুফল নিশ্চিত করতে হবে।
তিনি বলেন, দেশের অভ্যন্তরীণ প্রতিবন্ধকতাগুলো দূর করা এবং শিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়ানো গেলে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা, শুল্কযুদ্ধ কিংবা যেকোনো আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতাই বাংলাদেশ সফলভাবে মোকাবিলা করতে সক্ষম হবে।
