
নয়াবার্তা ডেস্ক : ভূমধ্যসাগরে ভাসমান একটি রাবারের নৌকা থেকে ২৯ জন বাংলাদেশি অভিবাসনপ্রত্যাশীকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে। তাঁরা বর্তমানে মিসরের হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন। গতকাল রোববার মিসরের কায়রোর বাংলাদেশ দূতাবাস এই তথ্য জানায়।
দূতাবাসের প্রাথমিক প্রতিবেদনে বলা হয়, মানব পাচার চক্রের সহায়তায় লিবিয়ার তবরুক থেকে রওনা হয়ে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ঝুঁকিপূর্ণভাবে গ্রিসের উদ্দেশে যাত্রা করেছিল নৌকাটি। যাত্রাকালে নৌকাটি দিকভ্রষ্ট হয়। পরে ২৯ জন বাংলাদেশি অভিবাসনপ্রত্যাশীসহ নৌকাটি মিসরের মারসা মাতরুহ এলাকার উপকূলে এসে পৌঁছায়। তখন তাঁদের উদ্ধার করে স্থানীয় পুলিশ। উদ্ধার করা ব্যক্তিদের মধ্যে ১৮ জন গুরুতর অসুস্থ ও অচেতন অবস্থায় ছিলেন। উদ্ধার করা ব্যক্তিদের চিকিৎসার জন্য মিসরের মারসা মাতরুহ জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
মিশরের মারসা মাতরুহ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ওই বাংলাদেশির বরাতে বিষয়টি জানিয়েছেন কায়রোতে বাংলাদেশ দূতাবাসের ফার্স্ট সেক্রেটারি (শ্রম) মো. জাকির হোসেন। তবে মিশরের পুলিশ এখনো সাগরে মৃত্যুর ঘটনা নিশ্চিত করার মতো তথ্য পায়নি বলে জানিয়েছে দূতাবাসকে।
দূতাবাসের পক্ষ থেকে বলা হয়, বিষয়টি জানার পর দূতাবাসের প্রথম সচিব (শ্রম) মো. জাকির হোসেন স্থানীয় পুলিশসহ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। পুলিশের কাছ থেকে জানা যায়, তাদের তত্ত্বাবধানে ২৯ জন অভিবাসনপ্রত্যাশী হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন। পরবর্তী সময়ে হাসপাতালের একজন কর্মীর সহায়তায় চিকিৎসাধীন বাংলাদেশি আবদুল করিমের সঙ্গে মুঠোফোনে জাকির হোসেনের কথা হয়।
দূতাবাস বলছে, আবদুল করিমের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সমুদ্রে ভাসমান অবস্থায় তীব্র গরম, প্রচণ্ড সূর্যের তাপ, খাদ্য ও পানির অভাবে ৯ জন বাংলাদেশি ও ১ জন সুদানিসহ মোট ১০ জন অসুস্থ হয়ে মারা যান। একপর্যায়ে মৃতদেহগুলোয় পচন ধরে। তখন মৃতদেহগুলো সমুদ্রে ভাসিয়ে দিতে বাধ্য হন জীবিত যাত্রীরা।
ঘটনাটি জানার পর থেকে দূতাবাসের পক্ষ থেকে স্থানীয় পুলিশ ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে বলে জানানো হয়। দূতাবাস বলছে, মিসরে চিকিৎসাধীন বাংলাদেশিদের শারীরিক অবস্থার বিষয়ে তারা সার্বক্ষণিক খোঁজখবর রাখছে। প্রয়োজনীয় কনস্যুলারসহ অন্যান্য সহযোগিতার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। চিকিৎসাধীন বাংলাদেশিরা সুস্থ হয়ে উঠলে মিসরের প্রচলিত আইন অনুসরণ করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া শেষে তাঁদের দ্রুততম সময়ে বাংলাদেশে পাঠাতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
দূতাবাস সূত্রে জানা গেছে, বেঁচে যাওয়া বাংলাদেশি নাগরিকের নাম আবদুল করিম। তিনি সুনামগঞ্জের শান্তিগঞ্জ উপজেলার পাথারিয়া গ্রামের বাসিন্দা। হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে তার সঙ্গে যোগাযোগ করে দূতাবাস।
করিমের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত ৩ আগস্ট লিবিয়া থেকে ৪২ জন যাত্রী গ্রিসের উদ্দেশে যাত্রা করেন। তাদের মধ্যে ৩৮ জন বাংলাদেশি এবং চারজন সুদানের নাগরিক ছিলেন। ভূমধ্যসাগরে যাওয়ার পর নৌকাটির ইঞ্জিন নষ্ট হয়ে যায় এবং জ্বালানি শেষ হয়ে যায়। পরে প্রায় ১১ দিন সাগরে ভেসে থাকার পর ১৩ আগস্ট তারা মিশরের মারসা মাতরুহ উপকূলে পৌঁছায়।
স্থানীয় লোকজন নৌকাটি দেখতে পেয়ে পুলিশকে খবর দেয়। পরে প্রায় ২৯ থেকে ৩০ জনকে উদ্ধার করে দুটি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। উদ্ধার হওয়া অনেকেই তখন অচেতন ছিলেন। তারা বর্তমানে পুলিশের তত্ত্বাবধানে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
আবদুল করিম দূতাবাসকে জানিয়েছেন, নৌকায় খাবার ও পানি না থাকায় এবং প্রচণ্ড গরমের মধ্যে অন্তত ১১ জন মারা যান। তাদের মধ্যে নয়জন বাংলাদেশি ছিলেন। পরে মরদেহগুলো সাগরে ফেলে দিতে হয়।
করিম সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতেও একই তথ্য জানিয়েছেন। সেখানে তিনি বলেন, নৌকাটিতে সর্বোচ্চ ২৫ জন যাত্রী বহনের সক্ষমতা থাকলেও ৪২ জনকে তোলা হয়েছিল। নৌকাটিতে ছিল মাত্র একটি ইঞ্জিন।
দীর্ঘ সময় সাগরে থাকার কারণে বেঁচে যাওয়া যাত্রীদের শারীরিক অবস্থাও গুরুতর বলে জানান করিম। তার ভাষ্য, লবণাক্ত পানিতে দীর্ঘ সময় থাকার কারণে তাদের শরীরের বিভিন্ন অংশ পচতে শুরু করেছে।
তবে দূতাবাসের ফার্স্ট সেক্রেটারি মো. জাকির হোসেন বলেন, মিশরের পুলিশ এখন পর্যন্ত ভূমধ্যসাগরে মৃত্যুর ঘটনা নিশ্চিত করার মতো কোনো তথ্য পায়নি। বেঁচে যাওয়া যাত্রীদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলার জন্য দূতাবাস কর্তৃপক্ষ অনুমতি চেয়েছে। সেই অনুমতি পাওয়া গেলে ঘটনার বিষয়ে আরও বিস্তারিত তথ্য জানা যাবে।
এদিকে, শান্তিগঞ্জ উপজেলার অন্তত পাঁচ যুবকের এখনো কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না বলে স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে। তারা হলেন পাগলা শত্রুমর্দান গ্রামের হৃদয় পাল, চিকরকান্দি গ্রামের এনামুল খান, রিপন মিয়া ও মামুন খান এবং রানসি গ্রামের মো. তালহা।
হৃদয়ের চাচা কানন পাল জানান, গত ৩১ জুলাই সর্বশেষ হৃদয়ের সঙ্গে তার কথা হয়। তখন হৃদয় জানিয়েছিলেন, ৩ আগস্ট গ্রিসের উদ্দেশে যাত্রা করবেন। ওই দিন দুটি নৌকা লিবিয়া থেকে ছাড়ে। পরে প্রথম নৌকার একজন পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করে জানান, হৃদয় দ্বিতীয় নৌকায় ছিলেন। এরপর থেকে তার আর কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি।
